Skip to main content

Full text of "Nabajogindrasangbad"

See other formats


নবযোগাল্্রগংবাদ 


অধ্যাপিকা লা বন্দ্যোপাধ্যাক্স 


অনুপম প্রকাশনী 


১২/৬ ট্যামার লেন * কলিকাতা ৯ 


প্রকাশনা 
আমতী রমা বন্দ্যোপাধ্যায় 
শ্ীধাম নবদ্ধীপ 
নদীয়া 


প্রকাশকাল 
বৈশাখ ১৩৭১ 


পরি 
অনপম শনী 


হর 


কলিকাতা ৯ 


মুদ্রণ 
দেবদাস নাথ 

সাধনা প্রেস প্রাইভেট লিমিটেড 

৭৬ বিপিনবিহারী গাঙ্গলী স্ট্রীট 
কলিকাতা ১২ 


আরাধারমণো জয়তি 


উহসর্প 


আমার পরম প্রিয় বাবু ও এবাম্মার 
পুণ্য ক্ম্মতির উদ্দেশ্যে । 
আদরের রমা 


প্রাককথন 


পরাশরাত্মজ ভগবান্‌ বেদব্যাস। শাস্ব্রমৃতি তিনি, শাস্ত্প্রকাশ ও প্রচারণার 
জন্যই তীহার জল্ম ও কর্ম। কত কত শাল্ত্রগ্রন্থ তিনি প্রণয়ন করিয়াছেন ; 
রচনা করিয়াছেন অষ্টাদশ পুরাণ, বেদেরই তত্ব কহিয্াছেন সেই সকল 
গ্রন্থে কত মনোরম কাহিনীসংযোগে । পুরাণশ্রেন্ঠ শ্রীমত্ভাগবত। অস্টাদশ সহশ্র 
ইহার শ্লোকসংখ্যা | দ্বাদশ স্কন্ধে ইহা বিভক্ত । কথিত আছে শ্রীরুষ্লীলাম্ৃত 
বিশেষভাবে বলিবার জন্যই দেবষি নারদ কর্তৃক আদিম্ট হয়া তিনি এই গ্রন্থ 
রটনা করেন। গ্রন্থের প্রাণপূরুষ অখিল রসামৃতসিন্ধু শ্রীকুষ*_“কুফ্ণস্ত ভগবান্‌ 
স্বয়ম্‌।”, নিখিল শাক্ভ্রের লার এই গ্রন্থে বিধৃত হইয়াছে। কত তত্ব- 
কথা, কত মনোরম কাহিনী সম্গিবিষ্ট হইয়াছে এই মহাগ্রন্ছে। তত্বসম্থলিত 
নিমি-নবযোগীন্দ্রসংবাদ সেই সব মনোরম কাহিনীর অগ্যতম। বক্ষ্যমান 
গ্রন্থের ইহাই বিষয়বন্ত। অপূর্ব সে কথা-_তত্বসার সে কথা মানবমনের 
চিরস্তন জিজাসর সদুত্তর। শ্রীশুকমুখে সে কাহিনী উত্ত হইয়াছে। 
পুগ্যকীতি শ্রীবসুদেব। পুণ্যালোকে তাহার গৃহ সদা উত্ভাসিত। আসিয়াছেন 

সেই গৃহে দেবষি নারদ বীণাযন্ত্রে হরিশুণগান করিতে করিতে । ঘ্বেচ্ছাবিচরণ- 
ভ্রমেই তাহার এই আগমন। সৎসঙ্গের মাহাত্ম্যকীতন করিতে যাইয়া একদা 
মহারাজ যুধিন্ঠির বিদুর মহাশয়কে বলিয়াছিলেন-_-“ভবদ্িধা ভাগবতা 
স্ীথীভুতাঃ স্বয়ং প্রভো।” হে প্রভো! আপনার ন্যায় ভগবস্তক্তগণ স্বয়্ংই 
তীর্থস্বরূপ। সেই তীর্থ আজ স্বয়ংই সমুপচ্ছিত বসুদেবগুছে। সাধুসঙগ বড় 
দুর্লভ। তার ফলশ্চতিও বড় কম নয়। আচার্য শঙ্কর বলেন : 

ক্ষণমিহ সঙ্জন-সঙ্গতিরেকা 

ভবতি ভবার্ণব-তরণে নৌকা । 
ক্ষণকালের জন্যও সাধুসজ সংসারসাগর উত্তরণের ভেঙলাস্বরাপ। তারই 
প্রতিধ্বনি শ্রীল রুফদাস কবিরাজ মহাশয়ের মুখে : 

সাধসঙ্গ সাধুসজ সর্বশান্ত্রে কয়। 

লবমানঘ্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়॥ 


1০ 


সেই সাধসমাগমে বসুদেব হইলেন আনন্দে আত্মহারা । পাদ্যার্ঘদানে করিলেন 
তাঁহার যথোচিত সৎকার, বসাইলেন সুখাসনে। সেই সুখাসনে মহযিকে সুস্থ ও 
সুস্থ দর্শনে প্রীত হইলেন বসুদেব। সমীপবতী হইয়া কহিলেন বিনয়নয্র বচনে £ 
পিতামাতার আগমন যেমন সন্তানের কল্যাণের জন্যই হয় তেমনি আপনাদের 
ন্যায় ভগবদ্তক্তগণের সমাগমও সংসার-তাপদগ্ধ জীবগণের পরম কল্যাণই 
সাধন করিয়া থাকে। আর দেখুন, দেবতারা কর্মানুযায়ীই ফল দেন, 
কিন্ত-_ভবাদশ ভগবভ্তক্তগণের কল্্যাণসাধন অহৈত্ুকী, কর্মনিরপেক্ষ 1; 
অতএব আপনার এই পূণ্য আগমন যে আমার শ্রেয়োবিধানার্থই হইয়াছে 
তাহাতে আর সন্দেহ কি? কল্যাণকামী আমি, আমার জিজ্ঞাসার সদুত্তর- 
দানে আমাকে রুতাথ করন। বস্দেব যথার্থ কথাই বলিলেন, কারণ 
ভাগবতকার বলেন : 
ততো দুঃসজমুণস্জ্য সৎসূ সজ্জেত বৃদ্ধিমান্‌। 
সন্ত এতস্য ছিন্দস্তি মনোব্যাসঙ্গমুক্তিভিঃ ॥ ১১২৬২৬ 

দু'সজ পরিত্যাগপ্বক সাধৃসঙ্গ করাই বৃদ্ধিমান ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্, 
কারণ সাধ্গণই সদুপদেশ দ্বারা মনের দুর্বাসনাসকল দুরীভুত্ত করিয়া 
থাকেন। ভগবান কপিল মাতা দেবহুতিকেও তাহাই বলিগ্জাছেন £ 

তাং প্রসঙ্গান্মম বীর্ষসংবিদো ভবতি হাৎকর্ণরসায়নাঃ কথাঃ । 

তড্জোযণাদাশপবর্গ বত্ব নি শ্রদ্ধারতিততজিগ্রনুক্রমিষ্যতি ॥ ভা. ৩২৫২৫ 
হে মাত: ! সাধূসঙ্গেই আমার মহিমাস্চক কার্যসমূহ হইয়া থাকে, উহা হাদয় 
ও কর্ণের তৃপ্তিদায়ক। এ সকল পবিভ্র কথা শ্রবণ করিতে করিতে 
অবিদ্যাবিনাশকারী আমাতে শ্রদ্ধারতি ও ভক্তি উপজাত হয়। বসুদেবের আজ 
সেই সৎসঙ্গলাভ হইয়াছে, তাহার সার্থকতা সম্পাদনে কৃতসঙ্কল্প হইয়া কহিলেন : 
“হে ব্রন্মণ! শ্রন্ধা সহক।রে যাহা শ্রবণ করিলে মানব সর্ববিধ ভয় হইতে 
মুক্ত হইতে পারে আমি আপনার নিকট সেই ভাগবত ধর্ম জানিতে ইচ্ছা 
করি। 'যান্‌ শ্রদ্ধয়া শ্ত্বা মতে মুচ্যতে সর্বতোভয়াৎ। ভা, ১৯২৭ 

আমি পূর্বে নিশ্চয়ই ভগবন্মায়ার় মোহিত হইয়া গৃথিবীতে পুপ্ললাভাাঁ 
হইয়াই মুক্তিপ্রদ ভগবান অনন্তের পূজা করিয়াছিলাম-_মোক্ষলাতের জন্য 


1৬0 


করি নাই। এ্রক্ষণে আমার প্রার্থনা এই বিচিত্র বিপদসঙ্ল সর্বদা অয়প্রদ 
সংসার হইতে অনায়াসে, ক্ষণবিলঘ্ব ব্যতিরেকে, যাহাতে পরিভ্রাণ পাইতে 
পারি আমাকে তদ্দপ উপদেশ প্রদান করুন। যে ভাগবত ধর্ম সম্বন্ধে এই 
জিজাসা তাহার মূল. কথা হইল বাসুদেববিষয়ক । আর এই বাসুদেববিষয়ক 
কথার মাহাত্ম্য শ্রীশুকমুখে কীতিত হইয়াছে : 
বাসুদেবকথাপ্রশ্নঃ পূরুষাংক্ত্রীন্‌ পুনাতি হি। 
বক্তারং প্রচ্ছকং শ্রোস্তংস্তৎপাদসলিলং যথা ॥ ভা. ১০১১৬ 

বাসুদেবের চরণজল অর্থাৎ গঙ্গাজল ও চরণাম্ৃত যেন জনগণকে পবিল্ন 
করে সেইরূপ বাসু:দববিষয়ক প্রশ্ন প্রশ্নকর্তা, বক্তা ও শ্রোতা-_এই শ্রিবিধ 
পুরুষকেই পবিত্র করিয়া ধাকে। দেবষি নারদও তদনুরাগ্ বাক্যই কহিলেন : 

“হে যাদবশ্রেন্ঠ বসুদেব! আপনি উত্তম প্রশ্নই কারিয়াছেন। ভাগবত 
ধর্ম সম্বন্ধে আপনার এই প্রশ্ন, বিশ্বপবিভ্রতাকারক। এ ভাগবত ধর্ম শত 
পঠিত, চিন্তিত, আদৃত কিংবা অনুমোদিত হইয়া দেবদ্রোহী' এবং বিশ্বদ্রোহীকেও 
পবিভ্র করিয়া থাকে । যিনি পরম কল্যাণময়, যাহার নামাদি শ্রবণ কীর্তন 
পুণ্যজনক আপনি সেই ভগবান নারায়ণের কথা আমাকে ক্মরণ করাইয়া 
দিয়া উত্তম কার্য ই করিয়াছেন। আপনার প্রশ্নোত্তরে একটি পুরাতন কাহিনী 
বলিতেছি। অবহিত হইযগ্লা শ্রবণ করিলে আপনার প্রশ্নের সম্যক উত্তর 
উপলন্ধি হইবে। স্থায়ভূব মনুর প্রিয়ব্রত নামে এক পুত্র ছিল। তাঁহার পুর্ন 
অগ্নীধু। অগ্নীধের পুত্র নাভি। নাভির পুত্র খষভদেব। ইনি বাসুদেবের 
অংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং মোক্ষধর্মের প্রবর্তক বলিয়া খ্যাত ছিলেন। 
তাহার শত পৃত্র সকলেই বেদজ। তন্মধ্যে ভরত জ্যে্ঠ। তাঁহার 
নামানুসারেই অজনাড বর্ষ ভারতবর্ষ নামে খ্যাত হয়। ভরত ধর্মপরায়ণ, 
সুকতোর তপশ্চরণে কৃতকৃতার্থ। অপর একোনশত পুণ্রের মধ্যে নয়জন 
নয়টি দ্বীপের অধিপতি হন এবং একাশী জন কর্মকাণ্ডের প্রবর্তক 'ব্রাক্মণ বলিয়া 
প্রসিদ্ধি লাভ করেন। অবশিষ্ট নয়জন ত্যাগব্রতধারী বেদান্তশাস্মে পারদর্শী, 
আত্বদ্রষ্টা মূনি। ইহাদের নাম কবি, হরি, অন্তরীক্ষ, প্রবৃদ্ধ , পিপ্পলায়ন, 
আবিহোৌত্র, ভ্রুমিল, চমস ও করভাজন। সর্ববিষয়ে নিষ্পৃহ এই সকল 


19 


আত্মক্ত মুনিগণ দিগম্বরবেশে সর্বত্র ঘুরিয়া বেড়াইতেন। সর্ব ছিল 
তাহাদের অবাধ গতি। স্বেচ্ছাবিচরণশীল ই'হারা একদা ভারতবর্ষে খষিগণ 
কর্তৃক অনুষ্ঠিত মহাত্মা নিমির যজস্থলে আসিয়া উপস্থিত হন। সূর্যসমপ্রভা- 
শালী অপূর্বদর্শন সেই সকল মুনিরন্দকে দর্শন করিয়া মহাত্মা নিমি, 
যকজের খত্বিক, পুরোহিত এবং দর্শকরুন্দ সকলেই বিজ্ময়পুলকিতনেন্র! 
সশ্রদ্ধ অভিবাদন জ্ঞাপন করিতে সকলেই তৎপর হইলেন। অপাথিব আনন্দে 
সকলেই বিগলিতচিত্ত। পাদ্যার্ঘযদানে পুজিত হইয়া তাঁহারা সুখাসনে উপবিষ্ট 
হইলেন। যথার্থ ধর্মপ্রবত্তণ- ধর্মজিজ্ঞাসার সদুতর দিতে পারেন এইরাপ 
আচার্য বড় বিরল। বহুপণ্যের ফলেই মহাত্মা নিমি এইরূপ আচার্য প্রাপ্ত 
হইয়াছেন। তাও একজন নহে, দুইজন নহে-_একেবারে নয়জন। মহারাজ 
নিমি তাহাদের সমীপাগত হইয়া বিনয়নম্বচনে কহিলেন : 

মন্যে ভগবতঃ সাক্ষাৎ্পার্যদান্‌ বো মধুদ্বিষঃ। 

বিষ্কোর্ভতানি লোকানাং পাবনায় চরস্তি হি॥ ২৮ 

দুর্নভো মানুষো দেহো দেহিনাং ক্ষণভঙ্গুরঃ। 

তন্রাপি দুর্লভং মন্যে বৈকুণ্ঠ প্রিয়দর্শনম্‌ ॥ ২৯ 

অত আত্যন্তিকং ক্ষেমং পুচ্ছামো ভবতোহনঘাঃ। 

সংসারেহস্মিন ক্ষণার্ধোইপি সৎসঙ্গ: সেবধিন্ণাম্‌ ॥ ৩০ 

-_ভা. ১১২২৮-৩০ 
অহো, আপনাদিগকে আমি ভগবান মধুস্দনের সাক্ষাৎ পার্ষদ বলিয়া মনে 
করিতেছি। ভগবান বিষ্ণর পার্দগণ নিশ্চয়ই লোকদিগকে পবিভ্র করিবার 
জন্যই সর্বক্ধ বিচরণ করিয়া থাকেন। দেহীদিগের মানবদেহ ক্ষণভঙ্গর 
হইলেও তাহা দুর্লভ, তন্মধ্যে আবার ভগবৎপ্রিয় ব্যক্তিগণের দর্শন তো আরও 
দুর্গভ। হে নিষ্পাপ মুনিগণ! এই সংসারে সাধূসঙ্গ ক্ষণার্ধকাল স্থায়ী 
হইলেও উহা মন্ষ্যগণের গক্ষে নিধিস্বরূপ অর্থাৎ মোক্ষপ্রাদ ; অতএব আমরা 
আপনাদিগকে আত্যন্তিক মঙ্গল জিজাসা করিতেছি : 
ধর্মান্‌ ভাগবতান্‌ হত যদি নঃ শ্ুনতয়ে ক্ষমম্। 
যৈঃ প্রসন্ন প্রগন্নায় দাস্যত্যাত্মানমগ্যজঃ। ৩১ 


|1/0 


হে মুনিগণ ! যদি আমাদিগকে যোগ্য মনে করেন তাহা হইলে নিত্যমৃতি 
ভগবান যে ধর্মের অনুশীলনে সন্তস্ট হইয়া অনুশীলনকারী ভক্তকে স্থীয় 
স্বরাপক্তান প্রদান করিয়া থাকেন, আপনারা সেই ভাগবত ধর্ম আমাদিগকে 
বনুন। নবযোগীন্দ্রের অন্যতম কবি এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান 
করিয়াছিলেন। মহারাজ নিমির প্রশ্ন এখানেই থামিয়া যায় নাই। তিনি 
পর পর আরও আটটি প্রশ্ন নবযোগীন্দ্রসমীপে উপস্থাপিত করেন। বাকা 
আটজন মুনি একে একে দেই সকল প্রশ্নের যথাষণ্খ উত্তরদানে মহারাজ 
নিমির সকল প্রশ্নের সকল সমস্যার সমাধান করিয়া দেন। ধর্মোগপদেশ 
কেবলমান্র শ্রাব্য নহে, সাধ্য। মহারাজ নিমি সেই সকল উপদেশ শ্রবণ 
করিয়া তৎসাধনে তৎপর হইলেন। তীহার সাধনা বার্থ হইল না-_ফলদান 
করিলে তিনি ভপবদ্দর্শনে রুতরুতার্থ হইলেন। 

নবযোগীন্দ্রকথিত সেই সকল উপদেশ নিখিল শাঞ্চপ্রের সার, মানবমনের 
চিরন্তন জিক্তাসার সদুত্তর । ভাগবত ধর্ম সম্বন্ধে এই সকল কথাই 
এই সকল উপদেশে বলা হইয়াছে-নূতন আর কিছুই বলিবার নাই। 
নারদকথিত নবযোগীন্দ্রের এই সকল উপদেশ শ্রবণে বসুদেব ও তগ্পত্রী 
উভয়েই মোহমুক্ঞ হইলেন। তত্ত্বোপলব্ধিতে জিজ্াসার পরিসমাপ্তি হইলে-_ 
তাহারা কৃতরুতার্থ হলেন। 

এই সকল উপদেশহ গ্রন্থের বিষয়বন্ত। উপদেশসকল জন্্রাকারে লিখিত । 
বুঝিতে হইলে প্রয়োজন হয় বিস্তারব্রমে বুঝাইবার। বুঝাইবে কে ? যিনি 
বুঝিয়াছেন,__তিনিই তঃ এ সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য হইল গ্রস্থকত্রী এই 
সকল তত শ্রীগুরঃরুপায়, নিজে উপলব্ধি করিয়াছেন, _তাই তাঁহার বক্তব্য 
শুধু শোনা কথা নহে, দেখা কথা । দেখা অর্থ এখানে উপলব্ধ সত্য। 
্রন্থকন্রী শ্রীমতী রমা ব্যানাজী শাম্ত্রারশী--শ্ুতি-স্মৃতি-পুরাণপাঠে কৃতবিদ্য। 
শুধু তাহাতেই কি তিনি উপদেশসমূহের এমন মর্মগ্রাহী প্রাঞ্জল বাখ্যা করিতে 
পারিয়াছেন £ না তাহা নহে। তিনি গুরুক্পাধন্য। পাণঙ্ডিত্যের সঙ্গে গুরুরুপা 
মিলিয়া সৃষ্টি করিয়াছে মণিকাঞ্চম যোগ। তাহারই ফল এই গ্রন্থ। 
সাধারণতঃ পাণডত্যের ফন্রে শাস্ম্রের যে সকল ব্যাগ্যা রচিত হয় তাহা হয় 


1 


দুর্বোধ্য গ্রন্থ, হইয়া দীড়ায় গ্রন্থি, যাহার জট কিছুতেই উন্মোচিত হয় না, 
কিন্ত আলোচ্য গ্রন্থ তাহার বিশেষ ব্যতিক্রম। বজ্'ব্য বলিতে যাইয়া গ্রস্থকন্তা 
যে বিচার বিশ্লেষণের অবতারণা করিয়াছেন, তাহা অপ্ব»_ যেমন সহজ, 
সরল তেমনি হাদয়গ্রাহী। তাহার ব্যাখ্যা গৌড়ীয় ধারায় গুরুপরম্পরা 
অনুসারিণী। বিশেষত: পূর্বাপর সামঞ্জস্যের অভাব কোথাও দুষ্ট হয় না। 
শ্রীমত্ভাগবত অবলম্বনে কত গ্রন্থই রচিত হইয়াছে, তন্মধ্যে এই গ্রন্থ যে একটি 
বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া লইবে এমন কথা নিঃসঙ্কোচেই বলা যাইতে 
পারে। এমনটি যে হইবে তাহার কারণও আমরা পূরেই বলিয়াছি-_- 
বলিয়াছি গ্রন্থকন্রী গুরুর্ুপাধন্য । তবেই না তাহার ব্যাখ্যায় তত্বের এমন সহজ 
সরল অপৃব স্ফরণ--+মাধূর্যের অস্ৃতপ্রত্রবণ। শুতি দ্বয়ংই ত বলিয়াছেন : 
যস্য দেবে পরাতক্তি যথা দেবে তথা গুরো 
তস্যেতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ | 
প্রকাশত্তে মহাত্মনঃ | শ্বে, উ. ৬২৩ 

যাহার পরমেশ্বরে পরাভক্তি আছে এবং তদনূরূপ ভক্তি গুরুতেও আছে, 
উপনিষদুক্ত তত্বসকল দেই মহাত্ম।র নিকটই প্রকাশিত হয় /--হয় যে তাহার 
প্রমাণ এই গ্রন্থ ॥ তাই বলি ধর্মপরায়ণ সত্যজিজ্ঞাসু গ্রন্থুপাঠে উপরুত হইবেন 
_ তৃপ্ত হইবেন। 

বজ্ব্য শেষ করিতে যাইয়া মনে পড়ে শ্রীরুষ্চদাস কবিরাজ মহাশয়ের 
সেই মহান উক্তি-গ্রচ্থেরও যাহা মূল বক্তব্যঃ “যাহা যাহা নেন্তর পড়ে তাহা 
কৃষ্ণ জ্ফুরে।” শ্ুতির প্রতি নিবেদনেও এই ভুমার ধর্মই দেখিতে পাই, 
তিনি আছেন,_-আছেন সবন্প, সিদ্ধির ইহাই শেষ কথা-_অনুভুতির ইহাই 
চরম অনুভূতি। আমরাও বলি শুতির সঙ্গে সুর মিলাইয়া £ 

যো দেবো অগ্লৌ যো অপসু যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ ॥। 
য ওষধীষু যো বনস্পতিষু তঈ্মৈ দেবায় নমো নমঃ ॥ 
ও তৎ সৎ 
সম্তআশ্রম শ্রদ্ধাবনত 

কল্যাণী, নদীয়া ব্রন্মচারী শিশিরকুমার 


9]17/ব97 1৬/৮7/৯, 0.8 চল, 11111 ইোঢারঞবা 00 [৪ম 
9ন/৮73৮/২৮ ৮7২0585308২ 0৮ ঘাব০19ল ০8170011812 
£বো) 
না 0৮ 05৮2াএহাবনা 
8৪]0880131২/1 ঢাবি 


ভুমিকা 


আমি যতদূর জানি, “নবযোগীন্দ্র সংবাদ" অধ্যাপিকা রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় 
গ্রন্ছ। লেখিকা, শুধু গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজেই নয়, বাংলাদেশের বহু ভক্তজনের 
কাছে, শ্রীমন্ভাগবত-কথার নিপুণ, হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনের জনা, অতি প্রিয়জন । 
তার মধ্যে পাণ্ডিত্যের সঙ্গে উপলব্ধির মণিকাঞ্চন ষৌগ হয়েছে। তাই তাঁর 
প্রথম গ্রন্থ “কে আমি'তে গৌড়ীয় বৈষ্ণবতত্ত্ের প্রাঞ্জল. অথচ সারগর্ভ ব্যাখ্যান 
দেখে, আমরা আশা করছিলাম চঘ, তক্িযাজনের গৌড়ীয় পন্থ।টির, তিনি 
শ্রীমণ্ডগবত অনুসরণ ক'রে, বিশদ আজে।চনার প্ররুত্ত হবেন। 

নবযোগান্দ্রসংঝ।দ শ্রীমভাগবতের একাদশ স্কদ্ধের দ্বিতীগন থেকে পঞ্চম 
অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তত। এই নবযোগীন্দ্র হলেন কবি, হরি, অন্তরিক্ষ, প্রবুদ্ধ, 
পিপ্পলায়ন, আবিহোন্র, দ্রুমিল, চমস ও করভাজন। এরা খষভদেবের সন্তান । 
দেবষি নারদ এদের মহামনি বলে বর্ণনা করেছেন । এ রা ব্রক্মভূত, আত্মারাম 
পৃূরুষ। ভ্রেতাযুগে মহারাজ নিমির যজস্থলে এরা যদুচ্ছাক্রমে এসে উপস্থিত 
হন। এদের কাছে মহারাজ নিমি, পরমাত্ম-তত্তঃ মায়া-তত্,র কমযোগ, 
অবতার-তত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন এবং এরা সেই সকল প্রশ্নের উত্তর 
দিয়ে এই ব'লে শেষ করেন যে, মুমুক্ু ও বুভ্ক্ষ-_ এই দুই জাতীয় মানুষের মধ্যে 
ধারা মুমুক্ষু তাঁদের পক্ষে এই কলিকালে সাধন অপেক্ষারৃত সহজেই হবে 
এবং শুধু হরিসংকীর্তনে মগ্ন হয়েই তারা শ্রীহরির পাদপদ্ম লাভ করবেন। 
এমন কি সত্য-ব্রেতার জীবও কলিতে জন্মলাভ করতে ইচ্ছা করেন: 

ক্ুতাদিষু প্রজা রাজন! কলাবিচ্ছস্তি সম্ভবমূ। 
কলো খল ভবিষ্যস্তি নারায়ণ-পরায়ণাঃ ॥ 
এই কলিতেই সংকীর্তনযজের প্রসার । নবদ্বীপচন্দ্র শ্রীগৌরাঙ্গ এই যজের 


84০ 


প্রধান পূরুষ। লেখিকা নবযোগীন্দ্রসংবাদে অবতার বর্ণনা অংশে ও 
সংকীতনযজের কলিতে প্রাধান্যের কারণ বিশ্লেষণ করে গৌড়ীয়বৈষ্বধারানুযায়ী 
ও গোস্বামিপাদগণের মতানুবতী হয়ে, শ্রীমত্তাগবঞ্ঠের এই অংশের যে অর্থবিস্তার 
করেছেন তা অতি মনোহর। যুক্তি ও ভজি-___দুই মিশ্রিত হয়ে তাঁর এই 
ব্যাখ্যান অতি হাদয়গ্রাহী হয়েছে । তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এই গ্রন্থেরযে কত 
আদর হবে তা আমি অনুমান করতে পারি। আর যারা শুধু তত্বের ও 
ও বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সহাদয় পাঠক, তারাও “নবযোগীন্দ্রসংবাদ' 
পড়ে নূতন ক'রে ভাববেন। 
ইতি 
শ্রীশীতাংশু মৈল্ল 


নিবেদন 


কিছুদিন আগে শ্রীগুরুদেবের অপার করুণায় ও আমার পুজনীয় হিতৈষী- 
গণের শুভ ইচ্ছায় ও আন্তরিক আশীবাদে 'কে আমি গ্রন্থখানি প্রকাশ 
পেয়েছে। সুধীসমাজে ও ভক্ঞসমাজে গ্রস্থথানি যথেম্ট সমাদর ও প্রশংসা 
লাভ করেছে। লেখনীশক্তির গৌরববোধে আমি এ কথা উল্লেখ করছি না, 
কারণ ভগবান যেমন হ্বয়ংপ্রকাশ, তাঁর শ্রীমুখনিগলিত শান্ত্রবাক্যও তেমনি 
স্বপ্রকাশ। তাই তাকে মহিমায় প্রতিন্ঠিত করবার 'মত কৃতিত্ব বা স্পর্ধা 
আমার মত ক্ষুদ্রবৃদ্ধির বিন্দুমান্ন নেই। বরং প্রতিক্ষণো্ই শঙ্কা জাগে শান্ত্রবাণী 
আমার লেখনীদোষে যেন বিরুত বা অন্যভাবে রূপান্তরিত না হয়। কিন্ত 
ভুবনমঙ্গল শ্রীগৌরগোবিন্দের শুভ দৃচ্টিপাতে শাস্ত্রের মর্মকথা “কে আমি" 
গ্রন্থের মাধ্যমে যে ভাবে প্রকাশিত হয়েছেন তাতে ভক্তপ্রাণে পরম আনন্দের 
সঞ্চার হয়েছে-_এ শুভ সংবাদটি সুবিখ্যাত ইংরাজী ॥ও বাংলা পন্দর-পন্লিকার 
মাধ্যমে যখন জানতে পারলাম তখন নূতন গ্রন্থ &ই 'নবযোগীন্দ্রসংবাদ' 
প্রকাশে উৎসাহ ও প্রেরণা লাভ করলাম । 

দ্বাপর যুগের অবসানে আচার্য বেদবাস-দ্বারে শ্রীমত্তাগবত শান্তর মহাপূরাণের 
প্রকাশ। নবযোগীন্দ্রসংবাদটি শ্রীমত্তাগবতের একটি বিশিষ্ট অংশ-- 
মহাজনগণের পরম আসশ্বাদনের বস্ত। সংসারাবদ্ধ আমাদের মত একান্ত 
দুর্গত কলিহত জীবের হাদয়ে যে প্রশ্নগুলি স্বভাবতঃ জাগে তারই সমাধান 
করা আছে এই প্রাচীন ইতিহাসটিতে। সাধকের সাধন বলতে যা কিছু, 
মহামুনি আত্মবিশারদ যোগীন্দ্রণ তা উপাখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। 
শ্রীতুরুমহারাজের রুপাকে অবলম্বন করে আমার এ গ্রন্থ প্রকাশের প্রয়াস। 
আমার পরমারাধ্য পূজনীয় পিতৃদেব প্রতিক্ষণে আমাকে প্রেরণা দিয়েছেন 
তার সয্মেহ আশীর্বাদ আমার প্রধান সম্বল। আর আমার পরম হিতৈষী 
স্বনামখ্যাত শ্রীমৎ ব্রন্মচারী শিশিরকুমার (শ্রীসুদর্শন পন্নিকার সম্পাদক ) 
মহারাজজীর কাছে আমার কৃতজতা অপরিসীম। তাঁর দৈহিক অসুস্থতা 
সত্বেও আমার জন্য কতই না কষ্ট বরণ করেছেন। আর যার চরণপ্রান্তে 


1০ 


'উপবেশন করে শ্রীমদ্ভাগবতশাস্্রের সংবাদ শ্রবণের সৌভাগ্য হয়েছিল সেই 
আমার পরম পৃজনীয় আচার্দেব পণ্ডিতপ্রবর পরম ভাগবত শ্রীযু্ত 
কেদারনাথ রায় কাব্য-ব্যাকরণ-পূরাণতীর্থ মহোদয়ের কাছে আমি চিরখণী। 
্রন্থপ্রকাশে আমি পরম ভক্িভাজন ভক্টর শ্রীযত্তত শীতাংশ্ড মৈত্র মহোদয়কে 
(লব্ধপ্রতিষ্ঠ শেক্সপীয়র অধ্যাপক ও ইংরাজী বিভাগের অধ্যক্ষ, কলিকাতা, 
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ) জানাই আমার অকুন্ঠ কৃতজ্তা। তাঁর ওর 
দায়িত্বপূর্ণ কাজের মাঝেও অঙ্গাধারণ যত্র ও পরিশ্রমের ফলেই এ গ্রন্থ প্রকাশ 
অতি সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হয়েছে। সাধনা প্রেসের পরম শ্রদ্ধেয়, শ্রীযুক্ত দেবদাস নাথ 
মহাশয় যিনি এই সুষ্ঠুভাবে প্রকাশের সকন ভার গ্রহণ করেছেন তাকে আমার 
অন্তরের গভীর ক্লুতজতা জানাই। আর শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত কমলরুফ ঘোষ মহাশয়ের 
ব্যবস্থাপনা ও যত্রতো আছেই। তাদের কাছে আমার রুতক্ততার অন্ত নেই। 
শ্রীশ্রীগোরগোবিন্দচরণে তাদের দীর্ঘ জীবন, অটুট স্বাস্থ্য ও শাস্তি সমৃদ্ধি 
প্রার্থনা করি। 
তত্তগণ ও স্ধীজন যদি এ গ্রন্থের ভ্রুষ্ি-বিচ্যুতি নিজগুণে মার্জনা করে 
রসাস্বাদন করে তুগ্তিলাভ করেন তাহলে আমার সকল শ্রম সার্থক হল 
বলে মনে করব। 
শ্রীগুরুবৈষ্ণ বকৃপাপ্রাথিনী 
রমা বদ্দ্যোপাধাযক়্ 


বিষয়সূচী 


শ্রীমর্ভাগবত পরিচয় রা না ১ 
পটভুমিকা 2 চা ১৯ 


নিমিরাজসভায় নবযোগীন্দ্রের আগমন ও তাঁদের পরিচয় ৪১ 


প্রথম প্রশ্ন হী হ ৬৪ 
দ্বিতীয় প্রশ্ন হ রঃ ১০২ 
তৃতীয় প্রশ্ন ০28 রি ১২৯ 
চতুর্থ প্রশ্ন হী টা ১৫৫ 
পঞ্চম প্রশ্ন ঠা র্‌ ১৮৪ 
যষ্ঠ প্রশ্ন হি ও ২৩০ 
সপ্তম প্রশ্ন দ্র 2 ২৫০ 
অস্টম প্রশ্ন নি ৪ ২৬ 
নবম প্রশ্ন নি নি ৩২৭ 


উপসংহার তরি বর ৩৯২ 


নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


[ শ্রীমস্তাগবত পরিচয় ] 


শ্রীমদ্ভাগবতশান্ত্র মহাপুরাণ সর্বশাস্্মুকুটমণি । বেদ, ব্রাহ্মণ, 
আরণ্যক, উপনিষদ্‌, অষ্টাদশ পুরাণ-_সর্বদর্শন_সকল শাস্ত্রের 
ক্ষতিপূরণ করেছেন শ্রীমন্তাগবতশীস্ত্র। সেই জন্য এই শাস্বকে 
সর্বশাস্ত্রে পূরক বলতে পারা যায়, এমন! কি শ্রীমন্তগবদগীতা 
শান্ত্রেরও ক্ষতিপূরণ করেছেন শ্রীমন্ভাগবত |: তাই শ্রীমন্ভাগবত 
গীতা প্রপূতি। নিগমকল্পতরুর গলিত অর্থাৎ শপ কফলরপে 
আচার্য বাদরায়ণ ব্যাসদেব এই শ্রীমদ্ভাগবতশাস্ত্রকে বর্ণনা 
করেছেন। 
নিগমকল্পতরোর্গলিতং ফলং শুকমুখাদমূতদ্রবসংযুতম্‌। 
পিবত ভাগবতং রসমালয়ং মুহুরহো রমিকা ভূবি ভাবুকাঃ ॥ 
_ভা. ১1১1৩ 
শ্রীমন্তাগবতশাস্ত্রকে গীতার প্রপৃতি বলা হল, তার কারণ হচ্ছে 
গীতায় স্বয়ং ভগবান শ্রীগোবিন্দের যে অমৃত উপদেশ তাঁর 
মধ্যেও সাধকের কিছু অভাব থেকে যায় । ভগবানকে জানতে 
হলে তাকে ছুই দিক থেকে জানতে হবে £ (১) ভগবানের 
রসরূপতা জখব! লীলারূপতা৷ এবং (২) ভগবানের ভক্তবাৎসল্য- 
গুণ। ভগবানের যত গুণ আছে তার মধ্যে ভক্তবাৎসল্যগুণই 
সবচেয়ে বেশী উপকারী এবং যে ভগবানে এই গুণ যত বেশী 
প্রকাশ পেয়েছে তিনি তত বেশী ভজনীয় বলে প্রমাণিত 


২ নবযোগীক্্রসংবাদ 


হয়েছেন । গীতাশান্ত্রে ভগবানের তত্বস্ত প্রচারিত হয়েছে কিন্তু 
ভাগবতে তত্ব, রস, গুণ, লীল। সবই শ্মীমাংসিত হয়েছে__তাই 
গীতাশাস্ত্রেরও পুরক শ্রীমন্তাগবত _ এ কথা বলতে পারা যায়। 
ক্রীমভাগবত বেদকল্পতরুর গলিত ফল-_-এ কথ ব্যাখ্যা করতে 
গিয়ে শ্রীজীবগোন্বামিপাদ বলেছেন__-গলিতমিত্যনেন রসস্ত 
স্থপাকিমত্নোধিকস্বাহুহমুক্তা শান্ত্রপক্ষে সুনিষ্পন্নার্থবেনাধিক- 
স্বাছুধং দ্শিতম্।” ফল যখন পেকে রসে ভরপুর হয় তখন তার 
আন্বাদ যেমন সবৌত্তম_ শীস্্পক্ষে তেমনি স্থুসিদ্ধান্তিত হলে তার 
সবৌচ্চ প্রশংসা । শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবন্তিপাদ আন্বাদন করেছেন 
-গিলিতমিতি বৃক্ষপক্তয়। ত্বয়মেব পতিতং ন তু বলাৎ পতিত- 
মিতি স্বাছুসংপূর্ণতং নচোচ্চনিপাঁতনেন স্ফুটিতং নাপ্যনতিমধুরং 
চ।? ফল সুপ হলে বৃক্ষ হতে আপনি খসে পড়ে _ তখন 
তার আম্মাদ সম্পূর্ণ হয় । আর যতক্ষণ ফলে রসের পূর্ণতা না হয়, 
তাতে কাচা দোষ থাকে, ততক্ষণ মাটিতে খসে পড়ে না। বুঝতে 
হবে তখনও তার আস্বাদ সম্পূর্ণ হয়নি-তাকে আঘাত করে 
পাড়তে হয় । 

বেদবৃক্ষের সবোৌধ্বশীখা বৈকুগধামবাসী শ্রীমন্নারায়ণ। 
অযাচিত-কৃপাকারী বৈকুষ্টবিহারী নিজপুত্র ব্রহ্মাকে চতুঃশ্লোকী 
ভাগবত উপদেশ করেন । লোকপ্রজাপতি পিতামহ ব্রহ্মা হলেন 
এর দ্বিতীয় শাখা_ পরে ব্রহ্মা নারদকে এ শাস্ত্র উপদেশ করেন। 
দেবধিপাদ পিতার কাছে অযাচিতভাবে এই কৃপার দান পেয়ে 
উত্তমবস্তরটি ব্যাসশাখায় নিহিত করেন। ব্যাসদেব পরে নিজ 
তপস্তালব্ধ পুত্র শ্রীশুকদেবকে এই শাস্ত্র অধ্যয়ন করান। 


নবযো গীক্দ্রসংবাদ ৩ 


শ্রীমস্ভাগবতশান্ত্র কৃষ্ণতন্থসম । এটি শ্রীমন্মহা প্রভুর শ্রীমুখ- 
নির্গলিতবাক্য__“ভাগবতরূপে সাক্ষাৎ কৃষ্ণ অবতার” । পদ্ম- 
পুরাণের খধিও এই কথাই বলেছেন- শ্রীমন্তাগবতশাস্ত্রের ধ্যান 
করে প্রণাম করেছেন 2 

তমাদিদেবং পুরুষং প্রধানং তমালবর্ণং স্থহিতাবতারম্‌ । 

অপারসংসারসমুদ্রসেতুং ভজামহে ভাগবত্বব্বরূপম্‌ ॥ 

ব্যাসনন্দন শ্রীশুকদেব মাতৃগর্ভে ষোল প্লছর বাস করেন__ 
এটি শ্রীমন্ভাগবত-শীস্ত্ের মত। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণমতে মাতৃগর্ভে 
শুকদেব বার বছর ছিলেন। শ্্রীশ্রীরাধামাধবের নিত্যলীলায় 
শ্রীমতীর নিকুঞ্জের শুকপাখীই ভাগবতীকথ| জগতের মাঝে 
প্রকাশ করার জন্য শুকদেব হয়ে এসেছেন-_ গিনি ছাড়া সে কথা 
আর কেই বা বলবে ? আজন্বমুক্ত, অপাপবিদ্ধ, নিত্য শুদ্ধ সুকুমার 
নবীন ব্রহ্মচারী শুকদেব এই মায়াময়ী পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে 
স্বীকৃত হন নি। ধার মায়া-_ভগবানের শ্রীমুখের বাক্য 

দৈবী হোষা গুণময়ী মম মায়। হরত্যয়া। __ গীতা ৭১৪ 

সেই মাধবকে সাক্ষী রেখে জন্মগ্রহণ করলেন । জন্মগ্রহণমাত্রে 
শুকদেব শ্রীকৃষ্চরণে ও পিতামাতার চরণে প্রণাম করে বনে চলে 
গেলেন । ব্যাসদেবপুত্রমমতায় কাতর্‌ হয়ে তার অন্থুগমন করলেন । 
পথের মাঝে রমণীরা নগ্নযুব। শুকদেবকে দেখে লজ্জিত হলেন 
না__কিন্তু বৃদ্ধ, বসনপরিহিত ব্যাসদেবকে দেখে লজ্জিত হয়ে 
নিজেরা বস্ত্রসংবরণ করলেন। ব্যাসদেব এ দৃশ্য দেখে কুতৃহলী 
হয়ে প্রশ্ন করলে তার! উত্তর দিলেন-_“গওগো ঠাকুর, তোমার 
যে স্ত্রীপুরুষভেদবুদ্ধি আছে কিন্তু তোমার পুত্রের সে ভেদবুদ্ধি 


৪ নবযোগীক্দসংবাদ 


একেবারেই নেই; তাই তাকে দেখে আমরা লজ্জিত হই নি, 
কিন্ত তোমাকে দেখে আমরা লজ্জিত হয়েছি ।” পুত্র শুকদেব 
্হ্ধজ্ঞানী, তার কোন বাহ্যাবেশ নেই, অথচ ব্যাসদেবের অতি 
দুর্লভবস্তু ভাগবতশাস্ত্রজ্ঞান পুত্রকে দিতে না পারলেও তৃপ্তি 
নেই। কি করেন-_তখন সমগ্র ভাগবতশীস্্ব আলোচন! করে কি 
উপায়ে পুত্রকে ফিরিয়ে আনা যায় চিন্তা করতে লাগলেন। 
এমন সময় শ্রীমদ্ভাগবতশাস্ত্রের গ্লোকে দৃষ্টি পড়ল ঃ 


আত্মারামাশ্চ মূনয়ো নিগ্রস্থাপুযুরুত্রমে | 
কুর্বস্ত্যহৈতুকীং ভক্তিমিখস্ভুতগুণো হরিঃ ॥  ভা- ১1৭১০ 


ভগবান হরির এমনই রূপ, গুণ, লীলামাধূর্য যে তার ফলে 
আত্মারাম মুনিরা, ধাঁদের পরত্রন্ম সাক্ষাৎকারের ফলে সর্ব 
হৃদয়গ্রন্থি ভিন্ন হয়ে গেছে _সবসংশয়ের ছেদন হয়েছে- তারাও 
আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পরমমাধুর্ষমপ্তিত শ্রীভগবান সৌন্দর্যের 
লোভ দেখিয়ে আত্মারাম মুনিগণকেও আকৃষ্ট করেন। শ্রীল 
কবিরাজ গোস্বামিপাদ বলেছেন 


ব্রন্মানন্দ হইতে কোটিগুণ লীলারস। 
আত্মীরামে আকধিয়া করে কৃষ্ণবশ ॥ 


শ্রীমন্ভাগবতশাস্ত্রের এ বাক্যে বেদব্যাসের পরিপূর্ণ বিশ্বাস 
আছে। তাই শুকপাখীকে ধরবার জন্য যেমন ব্যাঁধ ফাদ পাতে 
তেমনি ব্যাসদেব ব্যাধের মত শুকদেব-পাখীকে ধরবার জন্য 
ভাগবতের শ্লোকরূপ ফাঁদ রচন। করলেন £ 


নবযো গীক্দ্রসংবাদ ৫ 


বহাপীড়ং নটবরবপুঃ কর্ণয়োঃ কর্ণিকারং 
বিভ্রবাসঃ কনককপিশং বৈজয়ন্তীঞ্চমালম্‌। 
রন্ত্রান্‌ বেণোরধরমুধয়া পূরয়ন্‌ গোপবুন্দৈ- 
বৃন্দারণ্যং স্বপদরমণং প্রাবিশদ্‌ গীতকীন্তিঃ 
_-ভা. ১০।২১।৫ 


শ্যামন্ুন্দরের এই মধুরমৃন্তিটি গোচারণ থেকে ফিরবার সময় 
শ্রীমন্তাগবতকার বর্ণন করেছেন । মাথায় ময়ুরপাখার চূড়া, ভুবন- 
ভুলান নটনভঙ্গি, মোহনবেণুকর, সকলের মনগ্রাণ হরণ করেন । 
পরণে গীতবসন, গলদেশ হতে শ্রীচরণ পর্যন্ত 'লম্বিত পাঁচরঙ্গের 
ফুলে গাঁথা বৈজয়ন্তীমালা, এক কানে তার কর্নিকার কুম্ম। 
সিদ্ধান্ত হচ্ছে যখন যে সখার দিকে দৃষ্টি দেবেন তার চিত্ত হরণ 
করবেন । “কৃষ্জের অধররস ধ্বনিরূপে পাইয়। পরিণাম”--অধরে 
মুরলী--তার ছিদ্রপথ গোবিন্দের অধররসে ভরা-বাঁশী 
বাজাতে বাজাতে নিজপ্রিয়ভূমি শ্রীবৃন্দাবনে সখাঁসঙ্গে প্রবেশ 
করছেন। পিতা! ব্যাসদেব ব্যাধদের এ মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছেন 
_শুকদেবকে ধরবার জন্য, কিন্তু কৃষ্ণের বংশীনিনাদ যতই 
যুদ্ধকারী হোক না কেন- আত্মারাম সমাহিত-চিত্ত মুনি 
শুকদেবের কানে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ-_ 

ইক্জ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিক্জ্রিয়েভাঃ পরং মনঃ। 

মনসন্ত পরাবুদ্ধিধো বুদ্ধেঃ পরতস্ত সঃ॥ গীতা ৩৪২ 


ইন্দ্রিয় মনে, মন বুদ্ধিতে, বুদ্ধি আত্মাতে, আত্মা পরমাত্মাতে 
সমাসীন। কাজেই শব্দ ইন্দ্রিয়পথে প্রবেশ করতে পারে না 


৬ নবযোগীক্দসংবাদ 


কিন্তু শব্দ প্রবেশ না করলেও লীলাত্বক বাক্যের আনন্দের 
অপ্রাকৃত একটি স্ুক্ম রেশ শুকদেবের আত্মাকে আলোড়িত 
করতে লাগল ৷ তখন ব্রহ্মানন্দ হতেও এই আনন্দের পরিমাণ 
বাড়তে লাগল । শুকদেবের শব্দের আক্ষরিক অর্থবোধ হয় নি 
বটে, কিন্তু আনন্দের এক অপূর্ব অনুভূতি তার মনে প্রাণে দেহে 
ইন্দিয়ে এমনই এক শিহরণ জাগিয়েছে যে প্রতিক্ষণে মনে হচ্ছে 
এ সুরের রেশ যেন চিনি চিনি, যেন জানি জানি । এই চেনা এবং 
জানার মাত্রা ক্রমশ বাড়তে লাগল এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনিও 
স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠলো । অবশেষে ভগবানের লীলা” 
প্রকাশিক বাণীর আকর্ষণ শুকদেবের হৃদয়ে দোল দিল-_যার 
ফলে পরমাত্বা আত্মাতে, আত্ম! বৃদ্ধিতে, বুদ্ধি মনে, মন ইন্দ্রিয়ে, 
ইন্্রিয় দেহে ফিরে এল । খবি তো প্রাকৃত ইন্্রিয়ে শোনেন 
না__তপস্যাপৃত কানে শোনেন । এ বংশীধ্বনি বড় পরিচিত ও 
বলবান। কাজেই সেটি ফিরে না এসে সেই ধ্বনিজাত আনন্দ- 
লীলারস পরমাত্মাতে গিয়ে পৌছুল। অলক্ষ্য আকর্ষণে 
ব্রন্মান্থুভব শিথিল হল । ধ্যান ভেঙ্গে গেল শুকদেবের। স্মৃতি 
ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে । তারপর যখন লীলার মাধ্যমে শ্রীবৃন্দাবন- 
ধামের খবর পেলেন, তখন ধাম ও শ্যাম একসঙ্গে হওয়ায় তার 
আর কোন সংশয়ই রইল না । মনে পড়লস্পঞষ্ট করে__আরাধ্ো। 
ভগবান্‌ ব্রজেশতনয়স্তদ্ধাম বৃন্দাবনম্ঠ। 

শ্রীমদ্ভীগবতের মীমাংসাগুলি সব স্ুসিদ্ধান্তিত। অন্য শাপ্বের 
ক্রুটির এখানে পূরণ হয়েছে । তাই একে সর্শাস্ত্রের পূরক বলা 
হয়েছে । ধাষি বললেন --গলিতম্‌ ফলম্‌ঠ । যেমন একটি দৃষ্টাস্ত 


নবযোগীক্দসংবাদ ৭ 


দেওয়া যায় অন্যান্য পুরাণে উল্লেখ আছে-_-সগরবংশের 
সন্তানেরা কপিলমুনির ক্রোধবহ্িতে ধ্বংস পেয়েছিল--কিন্তু সে 
কথা সমীচীন নয়। শ্রীমন্ভাগবতের সুসিদ্ধাস্ত হল-_ নিজেদের 
ক্রোধবহিতে তাঁরা প্রজ্জলিত হয়ে ধ্বংস পেয়েছিল । তা না 
হলে কপিলদেব ভগবানের অবতার- শুদ্ধ সত্বস্বরূপ- তার 
ক্রোধ কেমন করে সম্ভব হবে? গীতাবাকো বলা আছে £ 
কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুন্তৰ। গীতা ৩৩৭ 

প্রাকৃত রজোগুণ থেকে ক্রোধের উৎপত্তি | সববেদান্তসার 
শ্রীমন্ভাগবত এইভাবে অন্যশান্ত্রের অপসি্ধান্তকে সুসিদ্ধান্তে 
পরিণত করেছেন । | 

শ্রীমন্ভাগবতশাস্্র জীবের গতি সম্বন্ধে জালোচনা করেছেন 
জীবের জন্ম এবং মৃত্যু উভয়ই স্তুনিয়ন্ত্রিত। “জাতত্য হি 
পরবে মৃত্যুঃ প্বং জন্ম মৃতস্য চ।" গ্রীনৈষধকাঁবোর উদয়ে যেমন 
অন্য কাব্যপ্রতিভা শ্নান হয়ে গিয়েছিল--তেমনি শ্রীমন্ভীগবত- 
শান্সের আবি্ভাবে অন্যশাস্ত্রের প্রাধান্য লোপ পেয়েছিল । এ 
শীস্্র শুনবার বাঁসনামাত্র যার হৃদয়ে জেগেছে অনাদিরাঁদি 
্রীগোবিন্দ তার হৃদয়ে অবরুদ্ধ হন । তখন বিশ্বনাথ মন্নাথ হন। 
প্রেমেতেই একমাত্র হরিকে হৃদয়ে বাধা যাঁয়__চিনির পুতুলের 
যেমন সবটাই চিনি দিয়ে গড়া বলে সর্বাংশে গ্রহণীয়, এর ত্যাজ্য 
অংশ কিছু নেই- শ্রীমভাগবতশীস্ত্বও তেমনি স্বয়ং ভগবান 
শ্রীগোবিন্দের লীলারসে গড়া-_এর সবটাই গ্রান্ত-_কোনটিই 
হেয় নয়। মহারাজ পরীক্ষিং শ্রী শুকদেবকে মুমূর্যু জীবের কর্তব্য 
সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছেন-_তার উত্তরে শ্রীশুকদেব জানিয়েছেন £ 


৮ নবযোগীক্দ্রমংবাদ 


শ্রোতব্যাদীনি রাজেন্দ্র বুণাং সম্ভি সহত্রশঃ 
অপশ্ঠতামা ত্মতন্বং গৃহেধু গৃহমেধিনাম্‌ ॥ ভা. ২১।২ 


আমি অর্থাৎ আত্মার খবর যাদের জানা নেই তাদের সম্বন্ধে 
কোন প্রশ্ন নেই, কিন্ত এই “'আমি'কে যারা জানতে চায়__ 
আতন্মতন্জিজ্ঞান্থু যারা অর্থাৎ কৃষ্ণপাদপদ্প যারা পেতে চায় 
তাদের পক্ষে সবাত্বা ভগবান ঈশ্বর হরির শ্রবণ কীর্তন ও 
স্মরণ একান্ত প্রয়োজন । 

তম্মাস্ভারত সর্বাস্বা ভগ্বান্‌ হরীরিশ্বরঃ | 

শ্োতব্যঃ কীতিতবাশ্চ ম্মতব্যশ্চচ্ছতাভয়ম্‌॥ ভা, ২১1৫ 


খট্যাঙ্গরাজা অর্ধমুহূর্ত পরমায়ু জেনে ব্বর্গভূমি, ভোগের ভূমি 
ত্যাগ করেছেন। সাঁধনভূমি ভারতের মাটিতে ফিরে এসে 
ভগবানে শরণাগত হয়ে ভক্তিঅঙ্গ যাজন করে ভগবান হরিকে 
লাভ করেছিলেন। আর মহারাজ পরীক্ষিতের তো সপ্তাহকাল 
পরম।যু--ত। ছাড়া পাগুববংশের সম্পত্তি শ্রীকৃষ্ণপাদপন্ম__ 
এতে তার জন্মগত অধিকার, কিন্তু মুনিগলে মৃতসাঁপ জড়িয়ে 
দেওয়ার ফলে তিনি সে সম্পত্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে অনুতপ্ত 
হয়েছেন। উত্তরাদেবীর গর্ভে বাসকালে মহারাজের কুষ্ণদর্শন 
হয়েছিল । মাতা উত্তরাদেবী গর্ভস্থ সন্তানকে রক্ষা করবার জন্য 
ব্যাকুল। এখন প্রশ্ন হতে পারে কৃষ্ণদর্শন লাভ করার পরেও 
তার পুত্রমমতা কেন? ভক্তিরসাম্ৃতসিন্ধগ্রন্থের টাকায় শ্রীজীব 
গোস্বামিচরণ এ প্রশ্নের সমাধান করেছেন। লৌকিক সম্বন্ধে 
কৃষ্ণ মামাশ্বশুর বলে উত্তরাদেবী কৃষ্ণপাদপদ্মদর্শনলাভের পরও 


নবযোগীক্দসংবাদ ৯ 


তার সাক্ষাংভাবে সেবা করতে পারেন নি। “আত্ম! বৈ জায়তে 
পুত্রঃ ।” তাই পুত্র দিয়ে সেই সেবার সাধ পুর্ণ করবেন । উত্তরাদেবীর 
গর্ভস্থ সন্তানকে রক্ষা করবার জন্য ভগবান গদ1 ও চক্র নিয়ে 
গর্ভে প্রবেশ করেছেন৷ শ্রীচন্রবতিপাদ বলেছেন--ভগবানের 
ইচ্ছামাত্রে অশ্বথামার ব্রন্ষাস্ত্ব নিবারিত হত কিন্তু ভক্তবাৎসল্যে 
ভগবানের আবেশ ভুল হয়েছে। শ্রীমন্তাগবতশাম্ম সাধককে 
ভাগবতীভক্তি উপদেশ করেছেন--ভক্তিষিশ্র কর্মসাধককে 
চিত্তশুদ্ধি ফল দান করে, ভক্তিমিশ্র জ্ঞান সাঁধককে ব্রন্মান্ুভৃতি, 
ও ভক্তিমিশ্র যোগ সাধককে পরমাত্মানুভূত্তি দান করে, কিন্ত 
শুদ্ধাভক্তি, কেবল! ভক্তি, অহৈতুকী ভক্তি স্বয়ং শ্রীকষ্ণপাদপন্নকে 
আকর্ষণ করে এনে দেন। শ্রীকৃষ্ণপাদপঞ্ম ছুরারাধ্য বস্ত্ব। 
ভক্তিমহারানী কৃষ্ণকে সাধকের প্রেমে মজিয়ে সাধকের হৃদয়ঘরে 
এনে দিতে পারেন__এতদুর সামর্থ্য তার আছে। 


কহ! হরিং প্রেমভাজং প্রিয়ব্গসমন্বিতং | 
ভক্তিবশীকরোতীতি শ্রীকৃষ্ণাকিণী মতা || 
--ভ. র. সি. পু+ ১ম লহরী ৪১ 


ভক্তি যে ভগবানকে সাধকের কাছে নিয়ে আসেন তার 
প্রধান দৃষ্টান্তস্থল ধরব । গ্ুবের তপস্তার সিদ্ধিকালে শ্রীবৈকুঞ্ঠনাথ 
তাকে বৈকু্ধধামে নিয়ে আসতে পাঁরতেন। কিন্তু তিনি তা 
করেন নি। কারণ তাতে ভক্তের মহিমা! বাড়ে না । মধুবনে 
শ্রীযমুনাতীরে ভগবান নিজে এলেন- শ্রীশুকদেব বলেছেন, 
ভক্তকে দেখা দিতে ভগবান এলেন না-_-ভক্তকে দেখতে এলেন 


১০ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


_-মধোর্বনং ভক্ত দিদৃক্ষয়া গতঃ।”' দেখতে এলে দেখা দেওয়া 
আপনিই হয়ে যায়। ঞ্রুব ভক্তিভূষণে কেমন সেজেছে সেটি 
দেখবার জন্য ভগবানের ভারী লোভ । শ্রীএকাদশে ভগবান 
প্রিয়সখা উদ্ধবজীর কাছে বলেছেন £ “ভক্ত্যাহমেকয়া গ্রাহাঃ 
তক্তি দ্বারাই একমাত্র আমি গ্রাহ্য হই। গীতাবাক্যেও বল! 
আছে £ 

ভক্ত্য! মামভিজানাতি যাবান্‌ যশ্চাস্মি তত্বতঃ ৷ গী. ১৮1৫৫ 
আমার স্বরূপ কেমন অথবা আমার ধাম, লীলা, পরিকর 
কেমন, এটি ভক্তিদ্বারা যেমন করে জানা যায় এমনটি কিন্ত 
অন্ত কোন উপায়ে জানা যায় না। 

এই হরিভক্তি স্ুৃহূর্লভা | শ্রীভগবানের মন্তব্যবাক্ £ 


মন্বপ্যানাং সম্রেষু কশ্চিদ্‌ যততি সিদ্ধয়ে । 
যততামপি সিদ্ধানীং কশ্চিন্মীং বেত্তি তত্ৃতঃ || গী. ৭৩ 
ভক্তি কোনও মূল্য দিয়ে যদি কিনতে পাওয়া যায় তাহলে 
কিনবার উপদেশ মহাজন দিয়েছেন । 
কুষ্ণচভক্তিরসভাবিতামতি ক্রীয়তাং যদি কৃতোহপি লভ্যতে। 
তত্র লৌল্যমেব মূল্যমেকলং জন্মকোটি ুকৃতৈর্ন লভ্যতে। 
কষ্চভক্তি লাভ করার কোন উপায় শাস্্কার বলেন নি__ 
লৌন্য অর্থাৎ লোৌভ একটা মূল্য আছে বললেন-_কিন্তু তার 
ঠিকানা বললেন না। একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবান যদি নিজে 
এ ভক্তি দান করেন তবে পাওয়া যায়। কিন্তু ভগবান সাধকের 
ভজনের বিনিময়ে ভজনের অনুরূপ সম্পদ দান করেন। এটি 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১১ 


তার চিরকালের প্রতিজ্ঞা__-এমনকি মুক্তি পর্যস্ত সাধককে 
দান করেন, কিন্তু ভক্তিপ্রিয় মাধব ভক্তিসম্পদটি স্বেচ্ছায় কাউকে 
দিতে চান না । কারণ ভক্তি যাকে দেবেন তার কাছে নিজেকে 
বাধা পড়ে থাকতে হবে । ইচ্ছা করে কে আর অপরের কাছে 
বাধা পড়ে থাকতে চায়? শ্রীগোবিন্দের এ কপণতা-দোষটি 
প্রীশুকদেব সর্বসমক্ষে ঘোষণা করেছেন £ 


রাজন্‌ পতিগু রুরলং ভবতাং যদুনাং। 
দৈবং প্রিয় কুলপতিঃ ক চ কিন্করো বঃ॥ 
অস্তেবমঙ্গ ভগবান্‌ ভজতাং মুকুন্দো। 
মুক্তিং দদাতি কছিচিৎ স্ম ন ভক্তিয়োগম্‌॥ ভা. ৫৬1১৮ 
শ্রীল কবিরাজ গোম্বামিপাদ বলেছেন £ 
কৃষ্ণ যদি ছুটে ভক্তে ভূক্তি মুক্তি দিয়া । 
কভু প্রেমভক্তি না দেন রাখেন লুকাইয়া ॥ 
তাহলে এ প্রেমভক্তি লাভের উপায় কি? মহাজনগণ 
সিদ্ধান্ত করেছেন_ কৃষ্ণকৃপয়' তদ্ভক্তকৃপয়া বা । শ্রীমাধূর্য- 
কাদশ্বিনী গ্রন্থে শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবন্তিঠীকুর মশাইএর বাক্য-_ 
ভক্তকৃপায় ভক্তিলাভ সহজ এবং এ দৃষ্টান্ত বহু দেখা ষায়। 
বাক্য আছেঃ 
যস্াস্তি ভক্তির্ভগবত্যকিঞ্চন! সর্বেগ্চ ৈস্তত্র সমাসতে স্রাঃ। 
হরাবভক্তস্ত কুতো! মহদ্‌গুণা মনোরথেনাসতি ধাবতো বহিঃ ॥ 
_-ভা" ৫1১৮১২ 


১২ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


কৃষ্ণের যতেক গুণ ভকতে সঞ্চরে, তাহলে কৃষ্খের 
ভক্তিদান সন্বন্ধে যে কৃপণতা সেটি ভক্তে সধশরিত হবে না? 
না, তা হবে না__এ বিষয়ে ভক্ত উদ্ার। ভক্তের যোগা গুণই 
সে ভগবাঁনের কাছ থেকে লাভ করে। শ্রীচৈতন্তভাগবতকার 
গ্রীল বৃন্দাবনদাস ঠাকুর বলেছেন ভক্তি পেলে কৃষ্ণ পাওয়া! 
যায়। ভক্তকৃপাঁয় ভক্তিলাভ--এ বিষয়ে ভক্তিপথের মহাজন 
প্রহলাদ মহারাজ ও রাজধি ভরতের চরম জন্ম জড়ভরত জন্মের 
বাক্য উদাহরণ আছে । প্রহ্লাদবাক্য £ 


নৈষাং মতিস্তাবদুরুত্রমাজ্বিং স্পুশত্যনর্থাপগমো যদর্থঠ | 
মহীয়সাং পাদরজোইভিষেকং নিক্ষিঞ্ণনানীং ন বৃণীত যাবৎ ॥ 


-ভী. ৭1৫1৩২ 


পিতা হিরণ্যকশিপুকে প্রহ্লাদ বলেছেন, গুরু যণ্তীমর্ক 
অন্যান্ত বিগ্ভায় পারদশিতা লাভ করলেও ভক্তির সন্ধান তারা 
জানেন না । পিতা পুত্রের এ ওদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ হয়েছেন; বলেছেন, 
ভক্তির সন্ধান যখন তারা জানে না, তখন ভক্তিধর্ম শাস্ত্র- 
বহিভূতি। প্রহ্লাদ বলেছেন, না পিতা, তাদের ভক্তি লাভ হয় 
নি। প্রমাণ হবে কেমন করে জানেন_ তাদের বুদ্ধি ভগবানের 
পাদপদ্নকে স্পর্শ করে নি। কি করে বুঝা যাবে যে স্পর্শ করে 
নি? বুদ্ধি যদি ভগবানের পাঁদপদ্ম স্পর্শ করে তাহলে যতরকম 
অনর্থ আছে সব শিঃশেষে দূরীভূত হয়ে যাঁবে। অনর্থ বলতে 
ভগবৎপ্রাপ্তিতে যা কিছু বাঁধা স্থষ্টি করে তাকেই বুঝায়। ঘরে 
আলো৷ জাললে যেমন অন্ধকার চলে যাবে, এটি ত্বতঃসিদ্ধ। 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৩ 


আলো জ্বালা হয়েছে অথচ অন্ধকার যায় নি,-অন্ধকার 
যেমন ছিল তেমনি আছে, এ যেমন হয় না, অন্ধকার যদি না 
যায় তাহলে বুঝতে হবে আলো জ্বালা হয় নি। তেমনি 
বুদ্ধি ভগবৎপাদপদ্ম স্পর্শ করেছে অথচ অনর্থ যায় নি-_ 
এও হতে পারে না। ভগবানের পাদপন্মে বুদ্ধিবৃত্তি স্পর্শ 
করবার একটি মাত্র উপায় হল মহাজন ভক্তজনের চরণরজে 
মস্তককে অভিষিক্ত করা। ভক্তকৃপান্গাঁমিনী ভগবৎকৃপা। 
বিষ্ণুনৈবেষ্ঠে যেমন আগে তুলসী অর্পণ করে রাখ। হয় তাতে 
বুঝা যায়__এটি অন্য কোন দেবতার ক্রোগ্য নয়__কৃষ্ণেরই 
ভোগ্য। ভক্তকৃপাও তেমনি জীবের ওপর তুলসী অর্পণের মত; 
যার ওপর ভক্তকরুণা হয়েছে বুঝতে হবে ভগবানের কুপা 
পেতে তার দেরী নেই । জড়ভরতও সিন্ধুসৌবীরাধিপতি রহুগণের 
কাছে তাই বলেছেন ঃ 
রহুগণৈ তত্তপসা ন যাতি ন চেজ্যয়া নির্বপনাদ্‌ গৃহাদ৷ | 
নচ্ছন্দমা নৈব জলাগ্নিনূর্বৈবিনা মহৎপাদরজোইভিষেকম্‌ ॥ 
__ভা. ৫১২১২ 


তপস্তা, বৈদিক যাঁগযন্ঞ্, অন্নদান, গারস্থ্য ধর্ম, বেদাধ্যয়ন, 
অথবা জন্ম অগ্নি সূর্যের উপাসনা, কিছুতেই শুদ্ধা ভক্তি 
লাভ হয় না, যে পর্যস্ত মহাপুরুষের চরণরজে মস্তক অভিষিক্ত 


না হয়। 
দুরস্ত গাভীকে নিয়ে যেতে না প্দরলে তার বাছুরটিকে 
যদি নিয়ে যেতে পারা যায় তাহলে গাভী তার পেছনে পেছনে 


১৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আঁপনিই আসবে । তেমনি ভগবান হলেন গাভীর মত-_-তাকে 
পাওয়া দুক্ষর, কিন্তু বংসরপ শ্রীগুরুপাদপন্মকে যদি ধরতে পার 
যায়, তাহলে ভগবান আপনিই ধর! দেবেন । কৃষ্ণতক্তিরসভাবিতা 
মতি বলা হয়েছে । কবিরাজমশাইরা যেমন ভাদের তৈরী বড়িতে 
ছাগলের দুধের অথবা পাতার রসের ভাবনা দেন অর্থাৎ একবার 
তাতে ডোবাঁন একবার ওঠান তেমনি এখানেও মনটিকে একবার 
কৃষ্ণভক্তিতে ডুবাতে হবে, একবার ওঠাতে হবে । লোভমূল্যে 
ভক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা কিন্তু এই লৌভ কোথায় পাওয়া যায় তা 
বল। হল না। আমরা মহাজনের শ্রীমুখে বড় নিরাশার 
বাণী শুনেছি £ 
তত্র লৌল্যমেব মূল্যমেকলং। 
জণ্মকোটি স্থকৃতৈরন্ন লভ্যতে ॥ 

কোটি জন্মের স্বকৃতিতেও এ লোভ পাওয়ার উপায় নেই। 
লোভই ভক্তি পাওয়ার একমাত্র মূল্য-__-ত1 যদ্দি কোটি জন্মের 
সকৃতিতে না মেলে তাহলে তো হরিভক্তি সুহুর্লভা হয়েই 
রইলেন। এতে সমাধান হল এইটি - লোভ পাওয়ার একমাত্র 
উপায় হল লোভীলোৌকের সঙ্গ করা । লোভ যাঁদের হয়েছে 
তাদের পায়ে পড়া । অরুচির রোগীর রোগ সারাবার উপায় হল 
রুচি করে যারা লোভে পড়ে খায় তাদের খাওয়া দিনের পর দিন 
দেখান_ দেখতে দেখতে কোন সময়ে সেই অরুচিররো গীরও মনে 
হবে_ আমি কবে এমন করে রুচি করে খাব 1? আমরাও তেমনি 
ভগবং অরুচির রোগী--ভগবানের নাম, রূপ-গুণ-লীলা। শ্রবণ- 
কীর্তন-স্মরণ-বন্দনে আমাদেরঅরুচি মজ্জায় মজ্জায় দানা বেঁধেছে। 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৫ 


এ রোগ অনাদিকাল থেকে শিকড় গেড়েছে। এখন প্রশ্ন ; 
এ রোগ সারাবার উপায় কি ? ধারা ভজনলোভী, সাধুগুরু-বৈষ্ণব 
পরিপূর্ণ আন্বাদে, লোভে পড়ে, ভগবানের নাম-রূপ-গুণ-লীলা- 
শ্রবণ-কীর্তন প্রভৃতি করেন, ইন্দ্িয়বৃত্তি, মন বুদ্ধি ধাদের 
স্বতঃই ভগবানে উন্মুখনামামৃত পান ছাড় ধাদের প্রাকৃত 
অন্জলগ্রহণে শরীর ক্ষীণ হয়, দেহ বিকল হয়__সেই সাধু- 
মহাজনের চরণপ্রাস্তে বসে তাদের লোভের ক্ষণ আচল পেতে 
ভিক্ষা করতে হবে। রাজভোগ আস্বাদনে ভিখারীর অধিকার 
নেই সত্য কিন্তু সেই ভিখারী যদি ধনীর ছুয়ারে পড়ে থেকে 
আতিভরে জানায় তাহলে ধনী করুণাপরৰ্ণ হয়ে তার নিজ 
আস্বা্চ রাজভোগের কিছু অংশ ভিখারীকে দিলে সে তো 
রাজভোগের আম্বাদ পেয়ে যেতে পারে । এইভাবে ধনীর 
অধরামৃত রাজভোগ দরিদ্র ভিখারী পেয়ে ধন্ঠ হয়--তেমনি 
সাধু-গুরু-বৈষ্ণব, ভজনের আন্বাদনে ধারা ধনী। কারণ এ 
জগতের নশ্বর সম্পদকে মনীষিগণ ধনের মধ্যে গণনা করেন না। 
ভগবৎপাদপদ্মে প্রেমই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ--এ ধন 
কখনও বিনাশ পাবে না । শ্রীপাদ শ্রীল রামদাসবাবাজী 
মহারাজের শ্রীমুখের অমৃত বাণী £ 
প্রেমধন নাই যার_ জগমাঝে সেই দরিদ্র । 

সেই ধনীর চরণপ্রান্তে আশ্রয় লাভ করে আতিভরে জানাতে 
হবে--ওগো। প্রেমের মহাজন, ওগো ভক্তিরত্বের ভাণ্ডারী, 
তোমার লোভের কণা, কৃপা করে আমাকে দাও । ভিখারী 
যেমন অতি জানায়, চীৎকার করেই চলে, তার প্রার্থনা যেমন 


১৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


থামে না__আমাদেরও তেমনি নিজেদের মধ্যে ভিখারীর চেহারা 
ফোটাতে হবে__দৈন্যে হৃদয় ভরিয়ে আতি জানাতে হবে 
প্রার্থনাকে নিরন্তর জাগিয়ে রাখতে হবে_কখনও ম্লান করা 
চলবে না। অভিমান গর্ব অহঙ্কারের উচু মাচা থেকে নেমে এসে 
নিজেকে ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে । এ আতিশ্রবণে সাধুর 
হৃদয় গলবে, কারণ তার! অকারণে দয়ালু । তখন তাদের নিজস্ব 
ভজনসম্পদের কণা কৃপা করে দিতে পারেন-তাতে আমর 
কৃতকৃতার্থ হয়ে যাব । 

এই ভক্তির আবার স্তরবিচার আছে-_ভক্তি সবৌচ্চ সীম। 
লাভ করেছেন ব্রজরামাদের গোবিন্দপ্রেমে ৷ ব্রজরমণীদের এই 
প্রেমের নামকরণ করেছেন গ্রীল বুপগোক্বামিপাদ-_-উন্নতোজ্জল- 
রস । উজ্জলরস বলতে মধুররসকে বুঝায়-আর উন্নত কেন অর্থাৎ 
ব্রজবালাদের গোবিন্দ গীতি এতই উচুতে যে তার নাগাল কেউ 
পাচ্ছেন না। কেউ বলতে যে কেউ নয়__মুকুণ্দমহিষীরাও এ 
প্রেমের সন্ধান জানেন না। গোপবালাদের প্রেমে কোন হেতু 
নেই-_কোন কারণে তারা গোবিন্দ ভালবাসেন না _ প্রেমে 
হেতু থাকলেই প্রেম নিন্দিত হয়-_ নিহেতুক প্রেমই একমাত্র 
অনিন্দিত। তারা গোবিন্দ ভাল না বেসে পারেন না, তাই 
ভালবাসেন । ব্রজরামাদের এই নিষলুষ প্রেমের প্রশংসা করে 
শ্রীগোবিন্দ সর্বসময়ে স্বীকার করেন_ তোমরা যে আমার সঙ্গে 
মিলিত হয়েছে এটি নিরবদ্য অর্থাৎ অনিন্দিত। তোমাদের এ 
প্রেমের খণ শোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় এ প্রেমের 
কাছে ভগবানকে খণী থাকতে হয়েছে এবং ধণশোধের জন্য 


নবযোগীক্্রসংবাদ ১৭ 
শ্রীগোবিন্দকে শ্রীগৌরাঙ্গ অবতারে আবিভূত হতে হয়েছে। 
শ্রীগৌরসুন্দর ব্রজরামাদের এই মালিন্যহীন প্রেম নিজে আস্বাদন 
করে আচগ্ডালে অবিচারে বিনামূল্যে বিতরণ করছেন । মহাজন 
বলেছেন 2, 

হেন প্রেম শ্রীচৈতন্ত দিল যথা তথা । 
জগাই মাধাই পধন্ত অন্তের কা কথা ॥ 
শীল শ্রীপাদ রামদাসবাবাজী মহার।জ কাঁতন প্রসঙ্গে গেয়েছেন £ 
গৌর আমার বড় অবতার রে-_ 
পতিতেরে বিলাওল প্রেমের ভাণ্ডার রে-_ 
গৌরন্ন্দরের বড় অবতারত্ব তার বড় দাতৃত্বে। মহাভাব- 
স্বরূপিণী ব্রজগোগীর হৃদয়মঞ্ুষার এ ভক্তিরত্বের ভোক্তা হচ্ছেন 
একমাত্র শ্রীশ্টামনুন্দর | শ্যামরস শ্যামবধূকে নিরস্তর পান 
করানই রাধা প্রভৃতি ব্রজরামার একমাত্র লক্ষ্য । ব্রজবালারূপ 
রত্বমালার মধ্যমণি বা পদক হচ্ছেন কৃষ্চন্দ্র। গোপবালাদের 
প্রেমের অনুরূপ করে শ্রীকৃষ্ণভজন-এর নামই “রাগান্ুগা 
ভক্তি । এ ভক্তি এতদিন শাস্ত্রে ধরা ছিল। আচরণে যে কখনও 
হতে পারে সে সন্ধান কেউ জানত না। শ্রীমন্মহাপ্রভূ কলিহত 
জীবের কাছে রাগানুগ। ভক্তির সন্ধান দিলেন । এ আনন্দসংবাদ 
জীবের কাছে পৌছে দিলেন যে, জীবও গোপীর মত করে 
গোবিন্দ ভালবাসতে পারে । গৌর এই পরমার্থের দাতা-_ 
নন্দনন্দনই শচীনন্দন-_ 
নন্দস্থত বলি যারে ভাগবতে গাই । 
সেই কৃষ্ণ অবতীর্ণ চৈতন্য গৌসাই ॥ 


১৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মহাভাবের প্রেম-উন্মায় কাচা শ্যাম রসে পেকে ভরপুর হয়ে 
পাঁকা গৌর হয়েছেন । তত্ব, লীলা, রস, ভাব, করুণা ঘে কোন 
দিক দিয়ে বিচার করা যাক না কেন দেখা যাবে গৌরের মত 
এমন মিষ্টি ভগবান আর হয় না _সর্বাবতারী' গৌরহরি 
সহায়সম্বলহীন সাধনভজনহীন, একাস্ত দুর্গত পতিত কলিজীবকে 
পরমার্থমণি দান করেছেন--কলিজীবের উপাস্ত হলেন 
শ্রীগৌরসুন্দর । পতিত জীবের একমাত্র গতি পতিতপাবনের 
চরণতল । 

সবময় অধীশ্বর শ্রীগৌরাঙ্গনুন্দরের এবং তারই অভিন্ন- 
কলেবর গৌরতত্ব-মৃতিমান শ্রীপাদ শ্রীনিতাইনুন্দরের একনিষ্ঠ 
পূজাবী ভজনলোভী, তীব্রবৈরাগী, জাতরতি প্রেমময় শ্রীবিগ্রহ 
আমার শ্রীগ্ুরুপাদপদ্ন শ্রীপাদ শ্রীল বাঁবাজীমহারাজের প্রীচরণে 
আমার অন্তরের অন্তস্তল হতে প্রণতি-অর্ধ্য নিবেদন করে তার 
কৃপাশীবাদ প্রার্থনা করি। 


শ্ীপ্তরুবৈষ্ণবককপাপ্রাধিনী 
রম। বন্দ্যোপাধ্যাক়্ 


পটভুমিকা 
শ্রীভাগবতশাস্ত্র দ্বাদশ স্কন্ধে সম্পূর্ণ। তার মধ্যে একাদশ স্বন্ধে 
দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে শ্রীনবযোগীন্্ উপাখ্যান শ্রীশুকদেব 
আর্ত করেছেন। পদ্মপুরাণের ধষি এ্রমন্ভীগবতশাস্ত্রের যে ধান 
করেছেন তাতে শ্রীকৃষ্ণ ভগবানের অভিন্ন তনু বলা হয়েছে_ এর 
মধো একাদশ ক্ষন্ধকে ললাটদেশ বলা আছে । ললাটে যেমন 
ভাগ্যরেখা অঙ্কিত থাকে, একাদশ স্কন্ধে তেমনি জীবের ভাগ্য 
নিয়ন্ত্রণের সকল বাবস্থা, জীবের বা কিছু একান্ত প্রয়োজন, 
পরমার্থ সম্পদলাভে জীবের সাধনপথ, আত্যন্তিক কল্যাণ 
লাভের ব্যবস্থা-পরম শ্রেয়োলাভের পশ্থা শাস্ত্রমাধ্যমে 
পরিবেশিত হয়েছে । নবযোগীন্দ্র প্রসঙ্গটি প্রাচীন ইতিহাস-_ 
ভ্রেতাযুগে বিদেহরাজ নিমির সভায় নয়জন যোগীন্দ্রের সঙ্গে 
মহারাজ নিমির কথোপকথন | সে 'প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন 
দেবন্মিপাদ নারদ যিনি ব্রন্মাণ্ডের দূত--জীবের প্রতি করুণায় ধার 
চিত্ত সতত উদ্বেলিত, মানুষের জন্য ধার প্রাণ কাদে_ তাদের 
পরমার্থলাভের পথ সুগম করবার জন্য ধার সতত প্রয়াস সেই 
পরম করুণ খধি দ্বারক। মন্দিরে বসে এ উপাখ্যান উল্লেখ 
করেছেন। কথা-পরিবেশনে তাকে প্রেরণা দিয়েছে স্বয়ং ভগবান 
শ্ীগোবিন্দ ধাকে পিতৃতে বরণ করেছেন সেই বস্থুদেবের হৃদয়ের 
আকুতিভরা প্রশ্ন । বক্তার বলাটি সহজ, স্বচ্ছ, স্বতংস্কূর্ত হয় 
যদি শ্রোতার দিক থেকে প্রশ্ব থাকে । এইভাবে তৃতীয় পাওব 


২০ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


অর্জুনের প্রশ্নে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ হতে গীতামৃত ক্ষরণ 
সম্ভব হয়েছে । শ্রীউদ্ধবজীর প্রশ্নে শ্রীগোবিন্দ নানা তত্বকথা 
উপদেশ করেছেন । সে প্রসঙ্গ উদ্ধবগীতা নামে শ্রীমন্ভাগবত- 
শান্সের একাদশ কনে স্থান পেয়েছে । 

নবযোগীন্দ্র উপাখ্যানের বক্তা দেবষিপাদ নারদ একদিন 
দ্বারক। ভবনে শুভাগমন করেছেন। দ্বারকায় আসা নূতন নয় ! 
শুকদেব বলেছেন 2 


গোবিন্দভূজগ্প্তায়াং দ্বারবত্যাং কুরূদ্বহ | 
অবাংসীন্নারদোহভীক্ষ্মং কৃষ্ধদর্শনলালসঃ ॥ ভা. ১১।২।১ 


গোবিন্দের বাহু যে দ্বারকানগরীকে নিয়ত রক্ষ। করছে সেখানে 
নারদ বারে বারে আসেন উদ্দেশ্য শ্রাকৃষ্পাদপন্ম দর্শন । 
নারদের প্রতি দক্ষপ্রজাপতির অভিশাপ আছে তিনি বহুদিন 
একাদিক্রমে একস্থানে বাস করতে পারবেন ন।- তাকে বরঙ্গাণ্ডে 
ঘুরে বেড়াতে হবে। কিন্তু দ্বারকাভূমি দক্ষের অভিশাপের 
আওতায় পড়ে না। তাই দেবধষিপাদের পক্ষে এখানে দীর্ঘদিন 
বাস করতে অন্ুুবিধা নেই । একথা রসিক টাকাকার শ্রীবিশ্বনাথ 
চক্তরবতিপাদ উল্লেখ করেছেন । কৃষ্*উপাসনা তো ভক্তমাত্রেই 
করেন । কিন্ত দেবষিপাদের কৃঞ্উপাসনার প্রকারভেদ আছে । 
এ অ্রক্-চন্দন-তুলসীর দ্বারা অর্চনা নয়। হরির তুষ্টিবিধানকেই 
পরধর্ম বল৷ হয়েছে। হরিতুষ্টিঃ পরোধর্ম: ৷ দবধিপাদ বৈকুণঠনাথের 
কাছে থাকেন__তিনি জানেন কি করলে কৃষ্ণ সবচেয়ে বেশী সখী 
হন। তাই তিনি সেইটিই বেছে নিয়েছেন। ভগবানের গুণ- 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১১ 


কীর্তন করলে তিনি সবচেয়ে বেশী সন্তুষ্ট হন তাই নারদ এই নাম 
কীর্তন ধর্মকেই শ্রেষ্ঠ বলে গ্রহণ করে দেশে দেশে হরিগুণ- 
কীর্তন করে বেড়ান। কলিপাবনাবতার শ্রীগৌরস্থন্দরও এই 
নামধর্মকেই যুগধর্মদূপে কলিজীবকে উপদেশ করেছেন । দেবধি- 
পাদ বলেছেন £ ্‌ 
দেবদত্তামিমাং বীণা স্বরত্রন্মবিভূষিতাম্‌ । 
ূর্ছযিত্বা হরিকথাং গায়মানশ্চরামাহম্‌॥ ভা. ১1৬৩৩ 

দেবদত্তবীণাতে হরি গুণগানের মূষ্ছনা তুলে শ্রীদেবষিপাদ বিশ্ব 
্রন্মাণ্ডে ঘরে বেড়ান । এ নামসঙ্গীর্তন বৈকুণ্ঠপাধদ নারদের ধর্ম 
--কাজেই ছুবল ধর্ম নয়। নারদ বিশ্বত্রক্মাণ্ডে ঘুরে ঘুরে নাম- 
কীর্তন করেন। তার প্রয়োজন হল যদি ব্রন্মাণ্ডের কোন জীব 
শুনে কৃতকৃতার্থ হয়। তাহলে হরির আরও সন্তোৰ হয়। 
নারায়ণের চরণতলে বাঁস করেন তিনি । তাই তিনি যে ধর্ম 
গ্রহণ করেছেন সেটি শ্রেষ্ট ধর্ম। কিন্ত রাজার পোষাক যদি অন্থা 
কেউ পরে তাহলে তো তাকে শাস্তি দেওয়া হয়: তাই নারদের 
ধর্ম কলিজীব কেমন করে পাবে? কলিজীব নামসস্কীর্তন ধর্মটি 
শ্রীমন্মীপ্রভূর করুণার দানে অযাচিতভাবে পেয়েছে, তাই এখানে 
দোষ হয় নি। এই নামসক্কীর্তন আজকের জিনিষ নয়। রাস- 
স্থলীতে কৃষ্ণ হারিয়ে গেছেন। কৃষ্ণ গোপবালাদের প্রাণ নিয়ে 
চলে গেছেন। তখন গোঁপবালারা বনে বনে কৃষ্ণ অন্বেষণ 
করেছেন, কিন্তু পান নি। কৃষ্ণ তো তাদের দেখা ন1 দেবার 
জন্যই লুকিয়েছেন, তাই এভাবে খুঁজলে তাকে পাওয়া যাবে না 
_--বন হতে বনাস্তরে চলে যাবেন । আর তা ছাড়া গোপরামার। 


১৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


এটিও চিন্তা করেছেন__বনভূমির পথ তো কুস্থুমাস্তীর্ণ নয় 
সে পথে কত কাট! আছে কত কাকড় আছে, কৃষ্ণ যতই পথে 
চলবেন ততই কুণ্ুম হতেও কোমল চরণে তার ব্যথা লাগবে 
এবং সে ব্যথার কারণ হব আমরা । তাই খোজার পথ ছেড়ে 
দিয়ে তার! শ্রীষমুন।পুলিনে একত্র মিলিত হয়ে পরামর্শ করে 
সিদ্ধান্ত করলেন, কৃষ্ণগুণগানই হারান কৃষ্ণ ফিরে পাওয়ার 
একমাত্র উপায় । শ্রীশ্তকদেব তাই বলেছেন £ 
সমবেতা জগ্ডঃ কষ তদাগমনকাজিক্ষতাঃ | ভা. ১০।৩০।৪৫ 

কৃষ্ণহার! রাধা-আদি ব্রজরাম! কৃষ্ণ ফিরে পাবার জন্য যে গীত 
গেয়েছিলেন সেইটিই শ্রীমদ্তাগবতশান্ত্রে দশম স্বন্ষে একত্রিশ 
অধায়ে গোপীগীত আখ্যা পেয়েছে । এই নামকীর্তন ধর্ম প্রথম 
আরম্ভ করলেন দেবষিপাদ ! সে ধর্মকে পরে বহন করলেন 
প্রহলাদজী এবং এই নামধর্মের মহাজন হলেন গোপবালাগণ। 
রাসস্থলীতে কৃষ্ণ হারিয়ে গোপবালারা ষে সিদ্ধান্ত করলেন 
কৃষ্ণগুণগান করলেই কৃষ্ণ পাওয়া যাবে, রাঁধাঠাকুরাণীর নিশ্চয় 
এটি অমোঘ উপায়, অবার্থ উ্ষধ। এখন কথা হল পরামর্শের 
সিদ্ধান্ত কি ফলেছিল ? কুষ্ণকে কি তার! পেয়েছিলেন ? হ্যা, 
পেয়েছিলেন ৷ শুকদেব স্বাক্ষর দিয়েছেন £ 


তাসামাবিরভূচ্ছৌরিঃ স্ময়মানমুখাম্বজঃ। 
গীতাম্বরধরঃ অর্থী সাক্ষান্মন্মথমন্মথঃ ॥ ভা. ১০।৩২।২ 


অধরে মৃছ্ হাসি নিয়ে গোপবালাদের মাঝে কৃষ্ণ এসে উপাস্থিত 
হয়েছেন । কৃষ্ণের এ হাঁসির তাৎপর্য কি? গোপবালাদের কৃষ্ণ 


নবযোগীক্দ্সংবাদ ২৩ 


হারানোর ব্যথা যেন কিছুই নয়। কৃষ্ণ তার হাসির ঝলকে 
গোপবালাদের সমস্ত বিরহ-বাথা মুছে দিতে চান। 'পীতান্বরধর' 
বলেছেন শুকদেব, শুধু গীতান্বর বললেই হত-_আবার ধর 
বেশী বললেন কেন? শুকদেব তো একটি কথাও বেশী বলবেন 
না। কারণ মহারাজ পরীক্ষিতের সাতদিন পরমায়ু যে শুকদেবের 
কাছে গচ্ছিত আছে, তার একটি মুহুর্তও তো তার অপবায় 
করবার অধিকার নেই। মহারাজের পরমায়ু পরিমিত ও 
মূলাবান। গীতাম্বরধর বলবার সার্থকতা হল পীতাম্বর ধারণ 
করেছেন বুঝাতে হবে, অর্থাৎ গললগ্রীকৃতবাসে অপরাধীর মত 
কৃষ্ণ এসে দাড়িয়েছেন। আর এইটিই বুঝাতে চেয়েছেন, আমি 
গীতান্বরই ধারণ করেছি-_অন্য কোন বসন পরি নি। কারণ 
গীতাম্বরে স্বর্হাতিতে গোপবালাদের অঙ্গকাস্তি স্মরণ হবে । কৃ 
এখানে স্সপ্বী অর্থাৎ কণ্ঠে মাল ধারণ করেছেন | এ মালা কোন 
মাল।? গোপরামাদের দেওয়। মালাই কৃষ্ণের ধক্ষেব সঙ্গিনী, 
অন্য দ্বিতীয় সঙ্গিনী নেই-_এইটিই তাৎপর্য । “সাক্ষাৎ মন্মথ- 
মন্মথ অর্থাৎ অত্যন্ত শোভাশালী । এক একটি ব্রন্ধাণ্ডে বৈকুণ্ঠ- 
নাথের কায়ব্যুহ_ বাসুদেব, সন্কর্ষণ, প্রছাম়্, অনিরুদ্ধ । এর মধ্যে 
প্রদান হলেন সাক্ষাৎ মন্মথ। প্রাকৃত মন্মথ বা কন্দর্প (মদন) এই 
সাক্ষাৎ মন্মথের ছাঁয়া, অর্থাৎ সাক্ষাৎ মন্মথের কৃপা লাভ হলে 
প্রাকৃত মদনের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, তুচ্ছ হয়ে যায়। এই 
সাক্ষাৎ মন্মথ অনন্ত বন্গাণ্ডে অনন্ত | শ্রীগোবিন্দকে “দাক্ষাৎ 
মন্মথমন্মথ' বল। হয়েছে__অনস্ত সাক্ষাৎ মন্থকেও তিনি তার 
অতুলনরূপে গুণে পরাজিত করেন। তাই তিনি * “সাক্ষাৎ 


২৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মন্মথমন্মথণ । তাহলে দেখা গেল রাসস্থলীতে শ্রীকৃষ্ণসন্কীর্তনে 
কাজ হয়েছে_ হারানো কৃষ্ণ ফিরে পাওয়া! গিয়েছে । এই নাম- 
সঙ্কীতন শ্রীমন্সহাপ্রভি কলিজীবকে দান করেছেন। আমাদের 
বৃত্তি ভাল নয়, কিন্তু ভগবানের বৃত্তি তে মন্দ হতে পারে না। 
আমর! নিমন্ত্িত ব্যক্তিকে সুন্বাহু স্থখাগ্ পরিবেশন করি । আর 
পচ। খুদ, পচা ডালের খিচুড়ি করে কাঙ্গালীভোজন করাই, 
কিন্ত পতিতপাবন অবতার শ্রীগৌরহরি এমন পচা দান কলি- 
জীবকে করেন নি। সতা, ত্রেতা দ্বাপর কোন যুগের জীবের 
পক্ষে যা গোচর ছিল না--সকলের অগোচর যা তাই কলি- 
জীবকে দিয়েছেন । আমাদের এ বস্তু সম্পর্কে অনুভব নেই। 
শীল রূপগোস্বামিপাদ ছোট্র কথায় বলেছেন, “অনপিত? | 
রাধাপ্রেম অর্থাৎ গোপীপ্রেম মহাপ্রভু দান করেছেন, কিন্ত 
আমরা তো! দেখছি মহাপ্রভু কলিজীবকে নামধর্ম দান করেছেন 
_-এ হল পুরপিষে । রাধাপ্রেমের পুর দেওয়া নাম পিঠে । পিঠে 
খেলেই যেমন ভিতরের ক্ষীরের বা নারকোলের পুর খাওয়া হয় 
তেমনি শ্রীমন্মাপ্রভুর শ্রীমুখনির্গলিত নাম উচ্চারণে রাধাপ্রেমের 
উদয় হয়। এই দানের মহিমা বসে বসে ভাবতে হবে এবং যত 
ভাবতে পারা যাবে ততই কাজ হবে। এ নামধর্ম উপদেশ সত্য, 
ত্রেতা দ্বাপরে হয় নি--তাই 'অনপিত'। সত্যে হয় নি বলার 
চেয়ে ত্রেতায় হয় নি বলার দাম বেশী। কারণ সত্যযুগে তেমন 
অবতার আবিভূত হন নি। কিন্তু ত্রেতাধুগে লীলাবতার 
পূর্ণ ব্রহ্ম ভগবান রামচন্দ্রের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু তিনিও 
রাধা প্রেম দান করতে পারেন নি। কয়েকজন বিশিষ্ট তার দান 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৫ 


ভক্তিসম্পদ্‌ পেয়েছিলেন-_ যেমন শ্রীহন্মানজী, চণ্ডালিনী শবরী, 
গুহকচগ্ডাল প্রভৃতি । গুরু বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র রামচন্দ্র ভগবানের 
মস্তকে চরণ অর্পণ করেছেন, কিন্তু ভক্তিলাভ করতে পারেন নি । 
তারাই ভক্তিলাভের জন্য অপেক্ষা করে দ্বাপরযুগে বৈবঠনাথের 
কাছে এসে উপস্থিত হয়েছেন সতের যুগ ধরে তারা অপেক্ষা 
করেছিলেন এই ভক্তি পাবার আশায় । কারণ যে দ্বাপরে কৃষণ- 
ভগবান তার পূধবতী ত্রেতাযুগে রাম অবতার নন। যে দ্বাপরে 
কৃষ্ণভগবান তার ঠিক পরবর্তী কলিতে গৌরভগবান__এটি 
হল ২৮ চতুযুগআর ১৪ চতুরযুগের ত্রেতায় রামচন্দ্র । 
কাজেই ১৭ যুগ পরে বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র কৃষ্ণভগবানের কাছে 
উপস্থিত হন। 

দেবষিপাদ হলেন এই নাম সঙ্গীর্তন ভক্তি-অঙ্গ যাজনের 
প্রথম যাজক । দেবধিপাদের কৃষ্ণদর্শনলালস শ্রীশুকদেব বর্ণন 
করেছেন । “কৃষ্কোপাসন-লালসঃ--এই কথাটিতে । সাধক ভজন 
করে- একদিকে শ্রীপগুরূপদিষ্ট ভজন অভ্াস করে--সাধকের 
ভজনকালে একদিকে থাকে ভজনের গৌরব অন্যদিকে থাকে 
বিষয়ের আকর্ধণ। বিষয়বাসন! বিষয়ের দিকে টানছে আর গুর- 
পদিষ্ঠ ভজন-গৌরব ভজনের দিকে টানছে । এই দোটানার 
মধ্যে পড়ে সাধক কখনও নিজের সন্বল্প সফল করে উঠতে পারে 
আবার কখনও পারে না। যখন ভজনসম্বল্প পুরণ হয় তখন 
ভজনের আকর্ষণ বেশী; আবার যখন হয় না তখন বিষয়ের 
আকর্ষণ বেশী। এই টানাটানির মাঝে সাধক যখন পড়ে -তখন- 
কার অবস্থার নাম হল বিষয়সঙ্গরা ভক্তি । কখনও ভজনের জয় 


২৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


কখনও বিষয়ের জয় । তাহলে প্রশ্ন হতে পারে ভজন যখন 
বিষয়ের দ্বারা পরাজিত হয় তখন কি বুঝতে হবে ভক্তি ছুরবলা' 
তাই সে বিষয়ের দ্বারা পরাজিত হয়? না, তা নয়। যেমন 
ছুধ বলকারর্ক, কিন্ত একসের করে ছুধ খেয়ে হজম করতে 
পারলে তবে শরীরে বল হবে, কিন্তু ছুধ যদি পেটে সহ্য ন৷ হয় 
তাহলে আর বল দেবে কেমন করে? তেমনি ভক্তি-মহারাণী 
মহা বলবতী, কিন্তু ভক্তিকে হজম করতে পারলে তবে তো৷ 
তাব বল প্রকাশ পাবে। ভক্তিকে আমরা হজম করতে পারি 
না, তাই তার বলও আমাদের কাছে প্রকাশিত হতে দেখা 
যায় না। ভক্তির এমনই বল যে সে মত্তকুঞ্জর সদৃশ কৃষ্ণকে টেনে 
আনে । অন্ন পেটে পড়লে যেমন ক্ষুধার নিবৃত্তি হয় তেমনি 
প্রাকৃত ক্ষুধার যদি নিবৃন্তি হয় তাহলে বুঝতে হবে ভজন-অন্ন 
পেটে পড়েছে । আর প্রাকৃত ক্ষুধার নিবৃত্তি না হলে বুঝতে হবে 
ভজন কিছু হচ্ভে না। এইভাবে প্রাকৃতভোগবাসনারহিত মন 
নিয়ে যদি ভজন করা যায় তাহলে তাঁর নাম হবে ভক্তি । 
আমাকে কেউ ভক্ত বললে গবে উচ্ছু(সিত হয়ে পড়ি, কিন্ত 
একলা ঘরে বসে চিন্তা! করতে হবে ভক্তির যে লক্ষণ শাস্ত্র 
বলেছেন, তার সঙ্গে আমার ভক্তি মিলছে কিনা । দেখা যাবে 
কিছুই মেলে না। আমাদের ভজন তাই ভক্তি আখা। পেতেই 
পারে না। সত্যি কথা তো কইতে হবে, জীবনকে তো গড়তে 
হবে আমরা যে যাই ভজন করি বিষয় ছেড়ে নয়। বিষয় 
যেমন আছে তেমনি থাকুক। এর ওপর বদি গৌরগোবিন্দ 
মেলে আপত্তি নেই। এই হল আমাদের মনের ভাব । অনাদি- 


নবধযো গীক্দ্রসংবাদ ১৭ 


কালের কৃষ্ণবিমুখতার ফলে জীব লোহার মত হয়েছে । ভক্তি 
হলেন চুম্বক । চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করে, তেমনি 
ভক্তি জীবকে আকর্ণ করে না কেন? চুম্বক লোহাকে আকষণ 
করে সতা, কিন্তু লোহা যদি গোবর চাঁপা থাকে তাহলে 
যেমন চুম্বক তাকে আকর্ষণ করতে পারে না তেমনি জীব 
ছুবাসনা-গোবরে চাঁপা পড়েছে । তাই ভক্তিছুম্বক তাকে আকর্ষণ 
করতে পারে না। 

নারদ ধ্যানে বৈকুষ্ঠনাথকে নিয়ত দর্শন করেন। আন্ত 
বাক্তির মত ভগবান তার ধানে ধরা দেন। নারদের কাছে 
ভগবৎদর্শন ছুর্লভ নয়, তবে তার দ্বারকাবাসে লালসা কেন ? 
গ্রীজীবপাদ বিচার করেছেন নারদ সাক্ষাংভাবে ভগবানকে 
দর্শন করবেন । এইজন্য তার এত লালসা | দ্বারকামন্দিরে 
দেবষিপাদ আড়ালে শ্রীগোবিন্দচরণ স্পর্শ করবেন--এই তার 
লোভ । আডালে স্পর্শ কেন? সাক্ষাতে স্পশ করতে পারেন 
না। কারণ নারদ তো দেবধি--কৃষ্ণ সাক্ষাতে দেবধিপাঁদকে 
প্রণাম করেন । কারণ লোকবৎ লীলা । তবে যদি আড়ালে 
ন্যোগ সুবিধা পান তাহলে কৃষ্ণকে নারদ প্রণাম করেন, এই 
লোভেই তার দ্বারকাবাস । তাহলে দেখা যাচ্ছে ধ্যানে দর্শন 
অপেক্ষা সাক্ষাৎ দর্শন গরীয়ান। শ্রীবৃহস্ভাগবতামৃতগ্রন্থের টাকায় 
শ্রীল সনাতনগোম্বামিপাদ বিচার করেছেন- সাক্ষাৎদর্শনের 
পরও সাধক মনে করতে পারবে না যে তার ভজন শেষ 
হয়েছে । গোস্বামিপাদের দৃষ্টি কত উঁচুতে উঠেছে__তিনি 
বলেছেন, সাধকের এ অবস্থা হওয়ার পরেও সাধককে আরও 


২৮ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


ভজতে হবে। মনে দেখার পর চোখে দেখা কিন্তু তখনও 
ভজনের বাকী আছে। 

সাধক যে রসেই ভগবানকে ভজুক না কেন সেই রসের 
পরিকরসঙ্গে শ্রীগৌরগোবিন্দের দর্শন চাই--এইরকম দর্শন যখন 
শীগুরুকৃপায় সাধক লাভ করল তখনও সাধকের ভজন বাকী 
আছে । সাধক আরও ভজতে লাগল। ধারা শ্রীগোবিন্দের 
মধুর রসের উপাসক তারা শ্রীরাসমগ্ডলে গৌপবালাদের সঙ্গে 
শ্রীগোপীজনবল্পভকে দর্শন করলেন । শ্রীসনাতনগোস্বামিচরণ 
কিন্তু অপেক্ষা করে আছেন এবং সাবধানবাণী উচ্চারণ করছেন 
ওগো সাধক, মনে করো না তোমার ভজন শেষ হয়েছে-_ 
তোমাকে আরও ভজতে হবে ।” শ্রীরাসমণ্ডলে গোপীসমাজে 
শ্রীগোপীজনবল্লভকে দর্শন করে ভার শ্রীমুখে এমন কোন 
প্রসন্নতা কি দর্শন করেছ ষাঁতে করে অনায়াসে বিনা ছিধায় 
তাদের খেলাতে তুমি যোগ দিতে পার । যদি তা পার তাহলে 
বুঝতে হবে তোমার ভজন শেষ হয়েছে । এই কথাঁটিই 
সংক্ষেপে শ্রীল কবিরাজ গোম্বামিপাদ বলেছেন--প্রেমে 
কৃষ্ঠীম্বাদ হলে ভবনাশ পায়। ঘটলে তবে আম্বাদ হবে। 
প্রেম ছুবল থাকা পর্যস্ত আন্বাদ হবে না । প্রেম যদি সুস্থ 
হয়, পুষ্ট হয় তাহলে গোবিন্দখেলাতে সাধককে মিলিয়ে 
দেবে। দেবষিপাঁদের নাঁরায়ণদর্শন সুলভ হলেও গোবিন্দদর্শনের 
লোভে তিনি দ্বারকা বাসের লোভ সংবরণ করতে পারেন নি। 
নারদের মত ব্যক্তি যদি গোবিন্দদর্শন বিরহ অবস্থায় না থাকতে 
পারেন, তাহলে শ্রীশুকদেব মন্তব্য করছেন- মহারাজ, এমন 


নবযোগীক্দ্রসংবাঁদ ২৯ 


কোন ব্যক্তি আছে যার ইন্দ্রিয় আছে, সে কেমন করে কৃষ্ণ 
পাদপন্প না ভজে থাকতে পারে? এখানে শুকদেব কৃষ্ণভজনের 
অধিকারী মানুষ বলেন নি--বলেছেন ইন্ড্রিয়বান। শ্রীজীবপাদ 
এর তাৎপধ তুলেছেন_- যাদের ইন্দ্রিয় নেই তাঁরাও কৃষ্চভজনের 
লোভ সামলাতে পারে না। তাহলে যার! ইন্দ্রিয় পেয়েছে 
তারা কেমন করে কৃষ্ণ না ভজে থাকতে পারে ? রাসলীলার 
পরে গোপবালাদের যে গীত আছে, তাতে তারা বলেছেন-__ 
বৃন্ধাবনের লতা-তরু-_-তারাও কৃঞ্চ ভজে। লক্ষণ তাদের 
শ্রী-অঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে--লতা পুষ্পিত, তরু ফলিত, নব নব 
ফুলফলে সমুদ্ধিমান তরু-লতা- এ সম্পদ তারা পেল কোথায় ? 
গোবিন্দ না ভজলে কি এত সম্পদ আসে? বৃক্ষলতার শাখা- 
প্রশাখা দৈন্যে অবনত হয়েছে, ভূমি স্পর্শ করেছে। ভক্তি 
হৃদয়ে এলে এমনই স্বভাব জাগে-_-তাদের পুত্রকন্তা দাসদাসী 
পর্যস্ত এ স্বভাব পায় । 
“বুন্দাবনের তরুলতী-- 
তার সদাই অবনতশির--” 

প্রেমপুলকিত তন্-_অস্কুরছলে রোমোদগম-আঁর মধুধারা- 
বর্ধণছলে প্রেমা শ্রু-বর্ষণ-_এ প্রেমবিকার দেখা যাচ্ছে । 

শ্রীশুকদেবের ইন্দ্রিয়বান বলবার তাৎপর্য হল-_সকলের 
পক্ষেই কৃষ্ণভজন স্বাভাবিক । 'শ্রীকৃষ্চভজনে সবে অধিকারী 
কুলের গরব নাই'_ আগে ভয় নিবারণ পরে খাগ্ প্রয়োজন । 
তেমনি আগে মৃত্যুসর্পের দংশন হতে রক্ষা পরে গৌরগোবিন্দ 
পাদপদ্মমধুখাদ্য লাভ। বিচারশীল, বদ্ধ সকল জীবের পক্ষে 


৩০ নবযোগান্দ্রসংবাদ 


কঞ্চভজন স্বাভাবিক । এমন কি মুক্ত ব্যক্তিও কৃষ্ণ ভজে_ 
উপাস্তমমরোত্তমৈঃ। শিবাবরিঞিও কৃষ্পাদপন্প ভজনা করেন । 
কৃষ্ণপাদপন্ন মুক্তদেরও আরাধ্য | 
এইরূপে একদিন দেবধিপাদ দ্বারকানগরীতে কমষ্ণপিতা 
বনুদেবের কক্ষে উপস্থিত হলেন । বন্ুদেব নারদকে সুখাসনে 
বসিয়ে পাগাঘা দিয়ে যথাবিহিত পুজা করে প্রণাম করে বললেন 
-বন্থদেব যে প্রশ্ন করেছেন তাতে প্রথমে নিজের প্রয়োজন 
বলেন নি_দেবধিপাদের আগমনের প্রশংসা করছেন- 
ভগবন্‌ ভবতো যাত্রা স্বস্তয়ে সবদেহিনাম্‌। 
কৃপণান।ং যথা পিত্রোরুত্বমঃশ্লোকবত্ম নাম্‌ ॥ ভা.১১।১।৪ 
দেবষিপাদ, আপনার আগমনে সবজীবের কল্যাণ । যেমন 
পিতামাতার আগমনে ত্রিবিধ সন্তান উত্তম, মধ্যম এবং অধম 
সকলেরই কল্যাণ সাধিত হয়। সাধুর আগমনে কৃপণের কল্যাণ 
হয়_-কৃপণ অর্থে জাগতিক দৃষ্টিতে আমরা বলি যে টাকা খরচ 
করে নিজে খেতে পরতে পারত কিন্তু খরচ করল না সে কৃপণ; 
কিন্তু এখানে কৃপণ শব্দে এ জাগতিক অর্থ নিলে হবে না। 
এর একটি বৈদিক অর্থ আছে। যে কপণতার উল্লেখ করে 
গীতায় অজুনদেবের উক্তি আছে 


কার্পণ্য দোষোইপহতনম্বভাব; পুচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ । 
যচ্ছে রঃ স্যান্িশ্চিতং ভ্রহি তন্মে শিষ্তান্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্‌॥ 
গীতা! ২1৭ 
শ্বীবৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা আছে-_যো বা এতদক্ষরম- 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৩১ 


বিদিত্বা গাগি অন্মাল্লোকাৎ প্রেতি স কপণঃ।” মানুষ জন্মের 
একমাত্র কর্তব্য হল ভগবানকে জানতে হবে- মানুষ যা চাইতে 
জানে এবং যা চাইতে জানে নাঁসব গোবিন্দে আছে ! সাধু- 
সমাগমে এই ভগবানকে জানবার পথ প্রশস্ত হয়। অন্যের 
আগমনে নরকে যাওয়ার পথ তৈরী হয়। সাধুসমাগমে 
আমাদের তাই প্রার্থনা করতে হবে--আমাদের ভজন সন্ধান 
দাও। শ্রীজীবপাঁদ বলেছেন, সবদেহী বলতে সাধারণ, 
কৃপণ বলতে নিকৃষ্ট এবং উত্তমঃশ্লোকবর্মনাম বলতে সবোৎকুষ্ট 
জীবকে বুঝাচ্ছে। সন্তানদের মধ্যে উত্তম, মধ্যম এবং অধম কি 
বিচারে হবে? পিতামাতার মন জেনে যারা আজ্ঞ। পালন 
করে তারা উত্তম, আদেশ করলে যারা পালন করে তারা মধ্যম 
আর আদেশ করলেও যারা করে না তারা অধম । সাধু- 
সমাগমে নিকৃষ্ট জীবের শুভবুদ্ধির উদয় হয় । সে তখন ভগবানকে 
ভজতে আরম্ত করে। মধ্যমের রুচি আরও গাঢ় হয়, অর্থাৎ 
সে তখন আরও বেশী করে ঘন করে ভজে। আর উত্তমের 
প্রেমপিপাসা তো আছেই__সে পিপাসা তো৷ আরও বাড়ে । 
মহতের সমাগমে সবজীবের কল্যাণ । দেবতাদের সঙ্গেও 
মহতের উপমা দেওয়। চলবে না। কারণ মহৎ দেবতার অপেক্ষা 
অনেক বেশী গুণবান । বন্থুদেব বলেছেন, দেবতাদের জশীবগণের 
গ্রতি আচরণ কখনও শস্ুুখের হয় কখনও হঃখের হয় যেমন, 
সুবৃষ্টি হলে সুখের এবং অতিবুষ্টি হলে ছুঃখের হয়। কিন্ত 
সাধুদের আচরণ সবসময় স্থখেরই হয় ; ছুঃখের কখনও হয় না। 
মিছরির টুকরে! থেকে যেমন নিমপাঁতার রস কখনও বেরোয় 


৩২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


না। জীব প্রবৃত্তির দাস-_প্রবৃত্তিমার্গে চলেছে তাই বুঝতে 
পারে না। অন্থুলোম প্রতিলোম ছুই রকম পথ আছে-__ 
প্রবৃত্তিমার্গে যাওয়া৷ সহজ--পিছল পথ--কামী জীব- পিছল 
পথে নামা সহজ। সাধুর স্বরূপ কেবলই মঙ্গলপ্রবাহ। 
কোনটি কল্যাণ, কোনটি অকল্যাণ আমরা বুঝি না । আমাদের 
গোড়ায় গলদ । পরিশ্রম করি, কিন্তু নির্বাচনে ক্রটি থেকে যায়। 
শান্্রই কল্যাণ বুঝিয়ে দেবে । তাহলে সাধুর দরকার কি? 
সাধু শাস্বের উদাহরণ । দেবতা সাধকের গুণ অনুযায়ী স্ুখ- 
বিধান করেন। কিন্তু দীনবৎসল হলেন সাধুরা। অর্থাৎ যে 
কিছু করতে পারে না, তার প্রতি সাধু বংসল-_অর্থাৎ স্নেহবান। 
জীব যেমন করে ভজবে দেবতারাও ঠিক তেমনি করে ভজবেন। 
সাধু কিন্ত তা নয়। সাধু ষোল আনা দেয় স্বাতন্ত্র্য 
দ্য়ালব:-_সাঁধুদের দয়। কেবল কল্যাণ । কল্যাণ শবেের প্রকৃত 
অথ কি? গোবিন্দে উন্মুখতাই কল্যাণ আর বিমুখতাই 
অকল্যাণ। কৃষ্ণেরই একমাত্র কৃপা করবার অধিকার । কৃষ্ঃ 
যখন ইচ্ছ। করবেন এই পতিতজীব কৃষ্ণ ভঙ্কুক তখনই সে 
কৃষ্ণ ভজবে । কৃষ্ণ কপা-কন্যাকে গচ্ছিত রেখেছেন সাধুর 
কাছে সাধু ন্বাতন্ত্যে কপা করেন। বন্থুদেব এর পরে বলেছেন, 
_দেবষিপাদ, যদিও আপনার দর্শনমাত্রেই কৃতকৃতার্থ হয়েছি, 
তথাপি ভাগবতধর্ম কেমন তাই জিজ্ঞাসা করছি। ঘা শ্রদ্ধার 
সঙ্গে শুনলে মরণধর্মশীল জীব কর্মবন্ধন থেকে যুক্ত হয়-_আচরণ 
তো পরে আছে- শুধু শ্রদ্ধা করে শুনলেই কর্মবন্ধন মোচন 
হবে অর্থাৎ সংসাঁর ছুঃখ নিবারণ হয়। সংসারের সীমা কতদুর ? 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৩৩ 


বৈকুষ্ঠধামের আগে পর্যন্ত সংসার- চৌদ্দতুবনের সর্বত্র মৃত্যু । 
গোবিন্বপাদপন্মে পৌছালে সেখানে আর মৃত্যু নেই। শ্রীতায় 
ভগবান বলেছেন £ 

আব্রন্মভ্ুবনাল্লোকাঃ পুনরাবতিনোই্জুন | 

মামুপেত্য তু কৌস্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্তৃতে ॥ গী. ৮১৬ 
অন্যত্র বল আছে £ 


গত্বা গত্বা নিবর্তন্তে চন্দ্রনূর্যাদয়গ্রহাঃ | 
অগ্ঠাপি ন নিবর্তন্তে দ্বাদশাক্ষরচিন্তকা ॥ 


কুর্য-চন্ত্র আকাশে নিয়মিত উদ্দিত হয় এবং অস্তগমন করে 
অর্থাৎ একবার যায়, আবার ফিরে ফিরে আসে, কিন্তু ধারা 
শ্রীহরির পাদপদ্ন ধ্যান করেন তাদের আর ফিরে আসতে হয় 
না, অর্থাৎ পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয় না। 

সংসারবন্ধন যে দর্শনকার বলেছেন তার অর্থ কি? অপ্রিয় 
অবাঞ্কিত, অসহনীয় এক তাগাদ! জীবের পিছনে লেগে আছে । 
সেটি হল মৃত্যার তাগাদা, অর্থাৎ জীবের বাঁচবার কোন অধিকার 
নেই। কিন্তু যে ভাগবতধর্ম শ্রবণ করলে আর মরতে হয় না, 
সেই ভাগবতধর্মকেই বন্ুদেব বলেছেন,-তব ভাগবতধর্ম__ 
এই ভাগবতধর্ম সম্বন্ধে বস্থুদেবের জিজ্ঞাসা । দেবধিপাদ হলেন 
মৃতিমান ভাগবতধর্ম। তার দর্শনের পরও আবার শুনবার 
প্রয়োজন কি? বস্থদেবের নিজের কোন প্রয়োজন নেই, কিন্ত 
যার! দেবধিপাদকে দেখবার সৌভাগ্য লাভ করবে ন! তাদের 
জন্য শুনতে চান। তারা যদি এই ভাগবতধর্ম শুনতে পায়, 


৩ 


৩৪ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


তাহলে কৃতকৃতার্থ হবে। বন্মুদেবের এ বাক্য থেকে কি এইটিই 
বুঝতে হবে- কৃষ্ণভক্তের কি তাহলে মৃত্যু নেই? নৈমিষারণো 
যাট হাজার খষির মুখপাত্র শ্রীশৌনক স্বৃতমুনিকে বলেছেন” 
কৃষ্ণভক্তের আয়ু সূর্য হরণ করে না--তা যদি হয় তাহলে 
কৃষ্ণভক্তের মৃত্যু হয় কেমন করে? এর মধ্যে বিচার আছে। 
শ্রীবিশ্বনাথ চক্রব্তিপাদ বলেছেন, গৃহস্থ উপাজিত ধন ভোগ- 
বিলাসে খরচ করে-_তাদের সেটা শুধু খরচই হয়, কিন্তু সাধু- 
সেবায় বা গোবিন্বসেবায় যে অর্থ ব্যয়িত হয়, সেটি প্রকৃতপক্ষে 
ব্যয় নয়-_সেটি তোলা থাকে-_তেমনি কৃষ্ণভক্তের আয়ু ব্যয় 
হচ্ছে না গৌরগোবিন্দের জন্য যে ব্যক্তি আয়ু খরচ করে সে 
আয়ু খরচ হয় না-_তোলা থাকে গোবিন্দ কৃষ্ণ- তাইসে আয়ু 
অনেক করে ফিরিয়ে দেন। এ জগতে কারও জন্য আয়ু ব্যয় 
করলে সে মনে রাখে না, কারণ এ জগতের লোক কৃতজ্ঞ নয় 
ভগবানের বেশী করে আ'য়ু দেওয়া কি রকম? ভগবান 
বলেছেন--যদ্‌ গত্বা ন নিবর্তস্তে তদ্ধাম পরমং মম'-আমার 
কাছে যার! যায় তার আর ফেরে না। 

বস্থদেবের আজ নিজের ভুল হয়ে গেছে যে তিনি ভগবানের 
পিতা । লীলার এমনই পরিপাটি-__তাই তার মনে হচ্ছে আমার 
নিজেরও ভাগবতধর্ম প্রয়োজন । দেবধিপাদ বলছেন,_“বস্ুদেব, 
তোমার চেয়ে আর ভাগাবান এ জগতে কে আছে? ভগবান যার 
পুত্রত্ব গ্রহণ করেছেন--ভগবান যাঁর বাংসল্যে বশীভূত হয়েছেন । 
পারমাথিক সাধনের প্রথম ফল হল- মুক্তি--এটি হল সাযুজ্য- 
মুক্তি। এই মুক্তি আবার ছুরকম £ ব্রহ্মসাযুজা এবং ঈশ্বর- 


নবযোগীজ্্রসংবাদ ৩৫ 


সায্জ্য । তার মধ্যে ব্রহ্মসাযুজ্য অপেক্ষা ঈশ্বরসাযুজা আরও 
নিন্দিত। ঘরে খাগ্য না থাকলে খাঁয় না তাতে তত নিন্দা নেই, 
কিন্তু ঘরভরা খাদ্য ও পেটভরা ক্ষুধা থাকতেও যে হাতে তুলে 
না খায় তার মত নিন্দিত আর কে আছে? ব্রন্মের লীলার 
প্রকাশ নেই, তাই তার যদি অনুভূতি না থাকে তাতে ততনিন্দার 
নেই, কিন্তু ঈশ্বর অনন্ত লীলাময় সেখানে যদি লীলার অনুভূতি 
না পায় তবে তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কি হতে পারে? এই 
সাযুজ্যমুক্তির পরে সালোক), সামীপা, সার্টি এবং সারূপা-_ 
এই চারপ্রকার হল মুক্তির প্রকারভেদ-_ শুদ্ধভক্ত কিন্তু এই মুক্তি 
চায় না “সালোক্যাদি মুক্তি ভক্ত-অন্থলি না ছোঁয়'। শুদ্ধ ভক্ত 
চায় গোবিন্দ চরণারবিন্দের সেবা । মুক্তির পরে আসে সম্বন্ধ- 
লক্ষণ] ভক্তি, বৈকুঠে দাস প্রভূ সম্বন্ধ পর্বস্ত থাকে অন্য সম্বন্ধ, সখা 
মাতাপিতা ব! কাস্তা বৈকুষ্ঠে থাকে নাঁ_এ সন্বন্ধ হয় গোলোকাঁ- 
ধীশের সঙ্গে । বৈকৃণ্ হতে পঞ্চাশ কোটি যোজন উতর গোলোক । 
সেখানে চারপ্রকারের সম্বন্ধলক্ষণা ভক্তি__ভূবৃন্দীবনেও পাওয়া 
যায়। দেবধিপাদ বন্ুদেবকে বলছেন- বস্ুদেব, তুমি তো বাস্ু- 
দেবের পিতা, তাই কৃপাপাত্র তো বড় কম নও। তবে এত 
কাতর হয়েছ কেন? তোমার কথা শুনে এবং তোমাকে দেখে 
মনে হচ্ছে তোমার বুঝি পারমাথিক সম্পদ কিছু নেই। এ 
জগতেও কথা আছে, যার ছেলে যত খায় তার ছেলের তত 
নোলা। বন্ুদেবের তাই পূর্ণতা থেকেও অভাব বোঁধ। 
প্রীবস্থদেব আজ ভগবানকে পুত্র করে পাওয়ার গৌরব তুলে 
গেছেন তার ভক্তিসঞ্জাত দৈন্তে, কারণ কৃষ্ণদম্পর্ক যার। করেছে 


৩৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তারা আর মাথা উচু করতে পারে না। কারণ গর্বের কাছে 
থাকলে কৃষ্ণের গায়ের জাল! হয়। বন্ুদেব নিজ দৈন্তে বলছেন 
-_ দেবধিপাদ, আমি পূর্বে মুক্তিদাতা অনন্তদেবকে পূজা করে- 
ছিলাম, কিন্তু আনার প্রার্থনা ছিল পুত্রের । আমি মুক্তির জন্য 
পূজা করি নি, দেবমায়ায় মোহিত হয়ে মুক্তি চাই নি, পুত্র 
চেয়েছিলাম । বস্থদেব তো৷ এ কথা! ভক্তিদৈন্যে বললেন, কিন্তু 
বিচার কি? শ্রীজীবপাদ বিচার করেছেন--বস্ুদেবের ভাবনা 
হয়েছে, কৃষ্ণকে ভালবেসে বন্থুদেব এখন সেই প্রেমের তাপ 
অনুভব করে ছঃখ পাচ্ছেন । প্রেমের যে শুধু আনন্দ আছে তা৷ 
নয়__ প্রেমের তাপও আছে। শ্রীরাধাঠাকুরাণী বলেছেন,_ 
প্রেমের তাপ বিষাম্বতে একত্র মিলনের অবস্থা, তপ্ত ইচ্ষু চর্বণ, 
মুখ জলে না যায় ত্যজন। তাই বস্ুদেবের মনে হচ্ছে, আর 
কাউকে ভাল না বাসলেই ভাল । কৃষ্ণ বলতে বলতে কত 
বিপদই তো! আসে, কিন্তু কৃষ্ণ বল! ছাড়া যায় না। এ প্রেমের 
বিক্রম বক্রমধুরা । এখন বস্থুদেবের সেই প্রেমের জ্বাল! উপস্থিত 
হয়েছে, তার মনে হচ্ছে সব হারাতে হবে । বন্ুদেব যে বললেন, 
যুক্তি চাই নি দেবমায়ায় যুদ্ধ হয়ে পুত্র চেয়েছিলাম, এর থেকে 
কি এইটিই বুঝতে হবে যে, ভগবানকে পুত্র করে পাওয়ার চেয়ে 
মুক্তি পাওয়া বড়? শ্রীজীবপাদ্ বিচার করেছেন_ না, তা 
কখনই হতে পারে না। কারণ ভগবানকে পুত্র করে পাওয়ার 
স্তর কোথায়? আর মুক্তিই বা কোথায়? মুক্তির প্রথম স্তর 
সাধুজ্য। ব্রন্মে লীলাতরঙ্গ নেই, তাই তাতে লীন হওয়া বরং 
চলে, কিন্তু ঈশ্বর নব নব লীলাতরঙ্গমালায়বি ভূষিত। তাই 


নবযোগীক্দ্রংবাদ ৩৭ 


তার সেই লীল। অনুভব না করে তাতে লীন হলে তা 
নিন্দনীয় । এই সাযুজ্যমুক্তিরই অপর নাম নিবাঁণ ব৷ কৈবল্য। 
এর পরের মুক্তির ভেদ হল সালোক্য, সামীপ্য, সার্টি, সারপ্য। 
এর জন্য জ্ঞানমিশ্রা ভক্তিপ্রধান সাধন চাই। এই চতুবিধা 
মুক্তি লাভ কালেও সমন্বন্ধলক্ষণা ভক্তি হয়। সম্বন্ধলক্ষণ! 
ভক্তি চার প্রকার--দাস্ত, সখা, বাৎসল্য, মধুর। মুক্তির 
পরে দাস্তলক্ষণা ভক্তি। এর পরে সখ্যলক্ষণা ভক্তি, এর পরে 
বাংসল্যরসের ভক্তি। তাহলে দেখা যাচ্ছে মুক্তির কথা 
আর ভগবানকে পুত্ররূপে পাওয়ার কথাঁ-ছুএর মধ্যে কত 
পার্থক্য । ছেলে যখন বাপ-মাকে যন্ত্রণা দেয় তখন বাপ-মা 
মনে মনে ভাবে-_ ছেলে না হলে বাঁচতাম। কিস্ত মুখে 
বললেও এ তাদের মনের কথা নয়। বন্থদেব বললেন” 
দেবমায়ায় মোহিত হয়ে পুত্র চেয়েছি দেবধিপাদ, মুক্তি 
চাই নি। এ তার মনের কথ! না হলেও কথা তো শাস্ত্রে 
উঠে গেছে, তার তো বদল হবে না । এখন উপায় কি? এর 
প্রকৃত তাৎপর্য কি? প্রকৃত তাৎপর্য হল, দেবস্ত মায়া অর্থাৎ 
কৃপয়া (মায়া দন্তে কপায়াং চ), ভগবানের মাধুরীতে বশীভূত 
হয়ে আমি মুক্তিকে তুচ্ছ করেছিলাম, পুত্র প্রার্থনা করেছিলাম 
--এ প্রার্থন! প্রেমের প্রার্থনা । যেমন কারাগারে বন্ুদেব এবং 
দেবকীমায়ের স্তরতির পর ভগবান বলেছেন £ 
শীর্ণপর্ণানিলাহারাবুপশান্তেন চেতস! । 
মত্তঃ কামানভীগ্গান্তৌ মদারাধনমীহতুঃ ॥ ভা ১০1৩1৩৫ 

তোমাদের প্রাণের ইচ্ছা যে আমি তোমাদের পুত্র হই কিন্ত 


৩৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


লজ্জা করে বলেছিলে তোমার মত পুত্র যেন পাই। কিন্তু 
আমার মত পুত্র তো কেউ হয় না__তাই আমাকেই পুত্র হয়ে 
আসতে হয়েছে । ভগবানকে পুত্ররূপে পাওয়া এবং মুক্তি-_ 
দুইএর আস্বাদে কত পার্থক্য । যুক্তিতে ভগবানের মাধুর্য আস্বাদ 
হয় না, আর সম্বন্ধলক্ষণ! ভক্তিতে মাধুষ আম্বাদ হয়। জন্ম- 
লীলা প্রসঙ্গে শ্রীচক্রবতিপাদ টীকায় বলেছেন, মমতাই বস্তুকে 
স্থন্দর করে । জাগতিক সন্তান বিচারে অস্থন্দর,কিন্ত মাতা-পিতার 
কাছে মমতাই তাকে সুন্দর করে। আর সত্যকার সুন্দর যে 
গোবিন্দ তাতে যদি মমতা হয় তাহলে ন। জানি কত সুন্দর হয়। 
বন্থুদেব বলছেন, হে সুব্রত, আমাকে উপদেশ করুন যাতে বিচিত্র 
বিপদসন্কুল বিশ্বভয় থেকে অনায়াসে মুক্তিলাভ করতে পারি । 
লীলার এমনই পরিপাটি যে বন্্দেবের মনে নেই, তিনি 
ভগবানের পিতা! তার প্রার্থনা হচ্ছে সংসার থেকে 
কেমন করে মুক্তি পাব। এখন কথা হচ্ছে, ভগবানের 
সঙ্গে স্বন্ধ হলে কি আর সংসার থাকে? বস্থুদেব হলেন 


ভগবানের পিতা, ভার আবার সংসার কি? পৃতনা-বধপ্রসঙ্গে 
শ্রীশুকদেব বলেছেন £ 


তাসামবিরতং কৃ্ণে কুবতীনাং সুৃতেক্ষণম্‌ । 

ন পুনঃ কল্পতে রাজন্‌ সংসারোইজ্ঞানসম্ভবঃ ॥ ভা. ১০।৬।৪০ 
কৃষ-অঙস্পর্শে পৃতনার দেহ অপ্রাকৃত হয়ে গেছে এবং সে দ্রেহ 
দাহ করবাব সময় তার থেকে সৌরভ উঠছে । যে কৃ অঙগস্পর্শ- 
মাত্র রাক্ষসী পুতনার এতাদৃশী অবস্থা হয় সেই কৃষ্ণকে পুত্র 
করলে কখনও সংসার হয়? সংসারের মূলে আছে অজ্ঞান । 


নবযোগীক্মসংবাদ ৩৯ 


তাই শুকদেব বললেন-_-অজ্ঞানসম্ভবঃ সংসারঃ। বন্থুদেব যে 
মুক্তি চাইছেন এটি লীল।র আবরণ । 'লোকবত্তু লীলাকৈবল্য্‌ 
_ ভগবান অপ্রাকৃত হয়েও প্রাকত আচরণ করেন- এতে 
লীলার সুখ কি হয়? এ লীল৷ ভক্তজনের পরম আসম্বাদনের 
বন্ত। অপ্রাকৃত বস্তুকে প্রাকৃতবৎ আচরণ করতে দেখলে বড় 
ভাল লাগে। শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকে কলিমহারাজ বলেছেন, 
অলৌকিকী লীলা অপেক্ষা লৌকিকী লীলা! অধিক মনোহারিণী। 
চিন্ময় ধামে চিশ্ময়ী লীলা! অধিক শোভা পায় না। সেই লীল৷ 
নরজগতে প্রকাশ পেলে তার মহিমা বেশী। যেমন মহেশ-শীষে 
যখন গঙ্গ৷ আছেন, তখন তিনি পতিতপাবনী হতে পারেন ন!। 
কিন্তু সেই গঙ্গা যখন মাটির জগতে এলেন, পতিতকে স্পর্শ দান 
করে পবিত্র করলেন -তখন পতিতপাবনী হলেন। তাই 
লীলান্রোধে বস্থুদেব প্রার্থনা করলেন £ 
যথা বিচিত্রব/সনাদ ভবন্ভিবিশ্বতোভয়াৎ । 
মুচোমহাগ্জসৈবাদ্ধা তথা নঃ শাধি সুব্রত ॥ ভা. ১১1২৯ 

হে স্তুব্রত, হরিনামত্রত ( দেবধিপাদ ), তথা শাধি--সেইরূপ 
উপদেশ করুন যাতে অনায়াসে বিপদ্স্কুল ভবসাগর উত্তীর্ণ 
হতে পারি। 

ধীমান্‌ বস্থুদে'বর প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে দেবধষিপাদের হরিকে 
স্মরণ হয়েছে এবং হরির গুণও স্মরণ হয়েছে ; তাই দেবধিপাদের 
পরম আনন্দ। বিষয় চিন্তা করতে করতে কেউ যদি কৃষ্ণহরি 
স্মরণ করিয়ে দেয় তাহলে তা প্রীতির কারণ হয়। দেবধিপাদ 
দ্বীত হয়ে উত্তর দিলেন-_বন্তুদেব, ভক্তশ্রেষ্ঠ তুমি, তোমার 


৪৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


নিশ্চয়টি সম্যক হয়েছে অর্থাৎ তুমি যে নিশ্চয় করেছ তার আর 
নড়চড় নেই। তুমি ভাগবত ধর্ম কাকে বলে জিজ্ঞাসা করছ। 
ভাগবতধর্ম হল বিশ্বভাবনান্‌ অর্থাৎ সর্বশৌধকান্‌ সকলকে পৰিত্র 
করে-_ভাঁগবতধর্ম ভক্তিধর্ম ছাড়া এমন কোন ধর্ম নেই যা 
সকলকে পবিত্র করতে পারে । হরিনাম মুখে উচ্চারণ করতে 
পারলেই তো ভাগবতধর্ম যাজন করা হল। যার জিহবা আর 
ওষ্ঠ আছে, সেই মানুষমাত্রেরই এই ধর্মে অধিকার । মানুষ তো 
দূরের কথা, পশুপাখীতেও ভাগবতধর্ম যাজন দেখা যায়। 
জটায়ু তো পক্ষী, কিন্ত ভক্তিধর্মমাীজনের বলে তিনি পূর্ণব্রহ্ম 
রামচন্দ্রের সেবা! পাবার অধিকারী হয়েছিলেন । রামচন্দ্রও 
পিতার মত তার শ্রাদ্ধকাধ করেছিলেন । হন্ুমানজী বিচারে 
পশু হলেও ভক্তির বলে ব্রন্মারও বন্দনীয় হয়েছেন। এইভাবে 
বস্থদেবের প্রশংসা করে দেবহিপাদ ভাগবতধর্মের মহিমা বর্ণন 
করছেন। এই ভক্তিধর্মের কথা কানে শুনলে, শোনার পর পাঠ 
করলে, আস্তিক্য বুদ্ধির দ্বার! ধ্যান করলে, অনুমোদন করলে 
অর্থাৎ অন্টে কেউ যদি সে ধর্ম আচরণ করে তার সংস্ততি 
করলে তৎক্ষণাৎ তাকে পবিত্র করে। বন্থুদেব তুমি ভাগবতধর্ম 
সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছ, তা এবিষয়ে আমি নিজের কথা আর 
কি বলব? সাধুদের কথা বলবার এইটিই রীতি-- প্রাচীন 
এঁতিহ্বোর অবতারণা করেন । আমি বলছি, বলেন না_-ইতিহাস 
আছে-_ত্রেতাযুগে মহারাজ নিমির (রাজধি জনকের পূর্বপুরুষ ) 
সভায় নবযোগীন্দ্রের যে সংবাদ হয়েছিল-_তাই আমি বলি, 
তুমি শ্রবণ কর। 





নিমিরাজের সভায় নবযোগাক্দ্ের আগমন 
ও তাদের প্িচয় 


ত্রেতাযুগে নিমিরাজের রাজত্বকাল। নিমিরাজ রাজধি জনকের 
পুর্পুরুষ । নিমিরাজ যখন বিদেহ হন নি তখনকার প্রসঙ্গ | এ 
বড় পুরাতন ইতিহাস। কারণ দ্বাপরযুগে শ্রীদ্বারকামন্দিরে 
বসে কৃষ্ণপিতা বন্থদেবকে দেবষিপার্দ বলছেন, এ নবযোগীন্দ্ 
প্রসঙ্গ__-এ দ্বাপরযুগ হল অষ্টাবিংশতি চতুরযুগের দ্বাপর। আর 
চতুবিংশতি চতুর্যুগের ত্রেতায় ভগবান রামচন্দ্রের অব্বতার অর্থাৎ 
কৃষ-অবতারের সতের যুগ আগে । তাই নিমিরাজ প্রসঙ্গ বড় 
প্রাচীন প্রসঙ্গ ৷ সৃষ্টিকর্তা লোকপিতামহ ব্রহ্মা তার দক্ষিণ অঙ্গ 
থেকে পুত্র মন্ত্র এবং বাম অঙ্গ থেকে শতরূপা কন্যাকে স্যগ্টি করে 
তাদের বিয়ে দিলেন। এই মন্তুর পুত্র প্রিয়ব্রত। তার পুত্র 
আগ্মীধ্র-- আগ্নীঞর-পুত্র হলেন নাভি, নাঁভি-পুত্র খষভদেব । এই 
খষভদেব ভগবান বাস্থদেবের অংশ । দেবরাজ ইন্দ্র তার কন্তা 
জয়ন্তীর সঙ্গে খধষভদেবের বিষে দেন। খষভদেবের শতপুন্র 
জন্মগ্রহণ করে। এরা সকলেই বেদশাস্ত্রে নিপুণ | তাদের 
মধ্যে জোষ্ঠ হলেন রাজধি ভরত । ধাঁর নাম থেকে অজনীভবর্ষের 
নাম হয় ভারতবর্ষ । রাজষি ভরতের পরিচয় দিতে গিয়ে 
শুকদেব বড় গরব করে বলেছেন £ 

যো! দুস্তযজান্‌ দারস্ৃতান্‌ সুহৃদ্রাজ্যং হাদিস্পুশঃ 

জহোৌ যুবৈব মলবদুত্বমঃশ্লোকলালস: ॥ ভা. ৫1১৪1৪৩ 


৪১ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


গোবিন্দসেবাতে ধাদের চিত্ত মজেছে, তারাই জগতে মহান । 
এই মহান বাক্তির কাছে মুক্তিস্ুখও তুচ্ছ । রাজধি ভরত রাজা- 
সম্পদ মলবৎ ত্যাগ করেছিলেন । “মলবং-এ উপমা কেন? 
এর ছুটি তাৎপর্ব আছে । একটি হল মলত্যাগেই স্বাস্থ্য রক্ষা 
পায়, আর দ্বিতীয়ত; মলত্যাগের জন্য পরে ষেমন কারও চিত্তে 
কোন আক্ষেপ ওঠে না রাজধি ভরতও তেমনি সেই দৃষ্টিতে 
রাজাসম্পদ তাগ করেছিলেন। জীবের স্বরূপ হল নিত্য 
কৃষ্ণদাস- এইটিই তার স্বাস্থা। আর রাজ্যত্যাগের জন্য তার 
পরে কোন আক্ষেপ হয় নি। শুকদেব এই কথা বলবার পর 
মহারাজ পরীক্ষিং বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করছেন- ব্রহ্মন এই অতুল 
রাজাসম্পদ মলবৎ কেমন করে ত্যাগ করা যায়? শুকদেব 
উত্তরে বললেন--উত্তমঃশ্লোকলালসঃ। ভগবানে লালস। হলে 
ত্যাগ আপনিই হয়ে মায় মহারাজ । হরিণের প্রতি আসক্তিতে 
ভরতকে হরিণ হয়ে জন্মাতে হল । ভজন বড় কঠিন ঠাই। এ 
একেবারে খাটি মোনা । একটু খাদ থাকলেও ওজনে চাঁপান 
যায় না। ভগবানের বাকা আছে £ 

যংযং বাপি ন্মরন্‌ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্‌। 
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তণ্ভাবভাবিতঃ ॥ গীতা ৮৬ 

যে বাক্তি মৃত্যুকালে যে চিন্তা নিয়ে দেহত্যাগ করে তার 
পরবতী জন্মে সেই দেহ প্রাপ্তি হয়। শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবততিপাদ 
বিচার করেছেন- রাজধি ভরত হরিণ হন নি। জগতকে 
দেখাবার 'জন্য তিনি একটা জন্ম হরিণরূপ ধারণ করেছেন । নিজে 
হরিণরূপ ধারণ করে জগংকে শিক্ষা দিচ্ছেন-_-তোমরা! যেন কেউ 


নবযোগীক্দ্রসংবাদ ৪৩ 


হরি ভজতে গিয়ে হরিণ ভজ না । তাহলে আমার মত অবস্থা 
হবে। মহাজন নিজে ছুঃখ বরণ করে জগৎকে শিক্ষা দেন। 
যেমন ভগবান রামচন্দ্র পরব্রহ্ম বনে বনে ঘুরছেন, সীতাবিরহে 
কেঁদে আকুল হচ্ছেন, তার শোকে পাষাণ গলে যাচ্ছে, বজ্রের 
হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে। স্বয়ং ভগবান শ্রীগোবিন্দ রাধা প্রভৃতি 
গোঁপবালার বিরহযাতনা ভোগ করেছেন, কত কষ্ট বরণ করেছেন, 
সবই লোকশিক্ষার জন্য । কৃষ্ণ এখানে চালাকি করেছেন । 
যার হরি ভজতে চায় তাদের শিক্ষা দেবার জন্য নিজের লোক 
দিয়ে উদাহরণ রেখেছেন যেমন তেতাস খেলায় নিজের লোক 
দিয়েই খেলায় । তারাই হারে, তারাই জেতে । বাইরের লোক 
তাই দেখে খেলায় লুব্ধ হয়। চতুরামধি চতুর-্চুড়ামণি কৃষ্ণ 
জগৎকে শিক্ষা দিচ্ছেন, ভরতকে দেখে যেন কেউ হরি ভজতে 
হরিণ ভজ না_-সবই কৃষ্ণের চতুরতা। এর থেকে শিক্ষা হল, 
দয়া ভক্তির বিরোধী হলে সে দয়াকেও তাগ করতে হবে। 
এর চরম দৃষ্টাস্ত হল রাজধি ভরতের উপাখ্যান । দয়াধর্মকে 
প্রমধর্ম বলা হয়েছে । তুলসীদাসজী বলেছেন ঃ 


দয়া ধরম কি মূল হায় 
নরকমূল অভিমান । 
তুলসী মাত ছোড়িয়ে দয়া__ 
যব কণ্ঠাগত জান ॥ 


দয়াবৃত্তি না থাকলে কোন গুণই কাজে লাগে না। মহাজন 
বলেছেন £ 


88 নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


কি করব জপ তপ দান ব্রত নৈষ্ঠিক 
যদি করুণ! নাহি দীনে । 

স্ন্দর কুল শীল রূপ গুণ যৌবন 
কি করব লোচন হীনে ॥ 


কিন্তু এই দয়া যদি ভক্তির বাধক হয়, তাহলে তাতে 
সফলের পরিবর্তে কুফল ফলে । এ বিষয়ে আর একটি উৎকৃষ্ট 
দৃষ্টান্ত সৌভরি উপাখ্যান । কালীয় হৃদে গরুড়ের যেতে মানা 
ছিল- সৌভরি মুনির অভিশাপ । হৃদের মাছ গরুডকে বিনাশ 
করতে দেখে মাছেদের প্রাণরক্ষার জন্য মুনির প্রাণ কেঁদে 
উঠল। তাই তিনি গরুড়কে নিষেধ করেন, তুমি আর এ 
হদে এসো না। গরুড পরম বৈষ্ণব । তাই ব্রাহ্মণকে অপমান 
করেন নি। সেই নিষিদ্ধ হদে যান নি। কিন্তু এতে সৌভরির 
বৈষব অপরাধ হল। কলে সংসার বন্ধন হল। তখন সত্য- 
যুগ। মান্ধাতার পঞ্চাশটি কন্যা! স্বয়ংবর। হয়ে সৌভরিকে বরণ 
করলেন । তপোবলে মদননিন্দিত কান্তি ধারণ করে যোগবলে 
পরমন্ত্খসাগরে গা ভাসিয়ে মুনি সংসার করতে লাগলেন । 
অবশেষে তার মন ফিরল । বিষয়ভোগ সহজে নিবুত্তি হয় 
না। কাঠ আর ঘি নিরন্তর জোগালে আগুন কখনও নেভে 
না__সৌভরির জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারলেন এবং প্রতিজ্ঞা 
করলেন- ভক্তিবাধিনী দয়! আর করর না । 


রাজধি ভরত বন্ুদিন রাজ্যভোগ করবার পর যখন বুঝতে 
পারলেন যে, সংসারে নৃতন স্থখ আর কিছু নেই তখন তিনি 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ৪৫ 


রাজ্য ত্যাগ করে বনে গেলেন । দৃষ্টশ্রুত যা কিছু বন্ধন তা 
লালসাতেই হয়-_লালসাই বন্ধন। অন্য কোন কামনা যদি 
মনের কোণে স্থান না পায় তবে সে ভক্তি হবে উত্তমা । কৃষ্ণ- 
'পাঁদপদ্ম মহিমার আরাধন! করতে হবে । শ্রীকৃষ্ণপাদপদ্ম অর্চনার 
এমনই মহিমা যে 'শীকুষ্ণর্চনং আরষ্টমপি উদ্ধরতি” | হরিণজন্মেও 
ভরতের পুর্বম্থীতি বিনষ্ট হয় নি। হরিণ-জন্মে ভরত সাধুদের 
কাছে বসে কৃষ্ণকথা শুনতেন | অবিচ্া ব্যাম্ীর তাড়নায় 
সাধুর আশ্রয় গ্রহণ করলেন। সাধুবৈদ্য পুল পুলস্ত্যাদি 
খষির আশ্রমে এইভাবে ভরতের পশুজন্ম কাটল। পশু হয়ে 
ভরত যা করেছেন, আমরা মানুষ হয়েও তা করি না। তৃতীয় 
জন্ম জড়ভরত জন্মই ভরতের চরম জন্ম । এই জন্মই তাকে হরি- 
চরণে স্থান দিল। এতটুকু খাদ থাকা পর্যন্ত হরিচরণে যাওয়। 
যায় না। গোবিন্দ বড় রসিক রসের, নূন্যতা! থাকলে নেন না, 
রসে পেকে তৈরী হলে তবে গোবিন্দের ভোগে লাগে । তৈরী 
আমের মত, তৈরী গোপী, তাই রাসলীলায় গোবিন্দের ভোগে 
লেগেছিল । গোপী তিন শ্রেণীর- নিত্যসিদ্ধা, কপাসিদ্ধা এবং 
সাঁধনসিদ্ধা। নিত্যসিদ্ধা ললিতা বিশাখা প্রভৃতি, কৃপাসিদ্ধা 
শ্র্তিগণ আর সাঁধনসিদ্ধা দণ্তকারণ্যের মুনিগণ । এদের সকলকে 
ব্রজধামে জীক দিলেন-_রসপুষ্ট হবার জন্য । যেমন যেমন তৈরী 
হবে তেমনি তেমনি গোবিন্দের ভোগে লাগবে । নিত্যসিদ্ধা 
নিত্যই স্তুপক্ক সুরসিকা, রসের ন্যনতা তাদের নেই। আর 
কৃপাসিদ্ধা যারা তাদেরও কোন দোষ থাকতে পারে না । 
গোবিন্দের কাছে যাওয়া বড় কঠিন। হরিণজন্মে ভরতের হয! 


৪৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


কিছু খাদ ছিল তা৷ কেটে গেছে। জড়ভরত এই চরম জন্মে 
জনসঙ্গে ভীত, কথা কইবেন না কারুর সঙ্গে। কারণ কথাই 
আসক্তির দ্বার । ভ্রাতজায়ার প্রদত্ত অবহেলিত কদন্ন পরম 
অমুতঙ্ঞানে ভক্ষণ করতেন। জড়ভরতের নিজের কোন চেষ্টা 
নেই। জড়ভরতকে ডাকাতের! বলি দিতে নিয়ে গেল। জড়- 
ভরতের কোন আপত্তি নেই। সমপিত আত্মার কোন আপত্তি 
থাকতে পারে না। ব্রন্মজ্ঞশিরোমণি অধোবদনে উপবেশন 
করলেন। দেবী ভদ্রকালী ভক্তের মহিম। রক্ষা করবার জন্ত 
ফেটে গেলেন। ভগবতভক্তের মহিমা রক্ষা করতে পারায় 
দেবীর বড় আনন্দ। এই উপখ্যান শুনে মহারাজ পরীক্ষিত 
বিশ্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন-_ ব্রহ্ম, ডাকাতেরা তো দেবীর পুজা 
করতে এসেছিল, তাহলে উল্টো ফল ফলল কেন? শ্রীশুকদেব 
উত্তরে জানালেন-_মহদতিক্রম করলে তার ফল নিজের ওপরেই 
ফলে। দেবীর ওপর ভগবানের আজ্ঞা আছে ভক্তকে রক্ষা 
করবার জন্য । জড়ভরতের সমস্ত চিত্ত শ্রীতগবানের পাদপদ্ধে 
ডুবে গেছে। হরিভক্তিতে লেগে থাকলে তার ভার হরিই নিজে 
নেন। হরিপাদপদ্ম ভজে না খেতে পেয়ে মরে গেছে এ দৃষ্টাস্ত 
নেই। শ্্রীবাস পণ্ডিত হাতে তিনতালি দিয়ে শ্রীগৌরসুন্দরকে 
বলেছিলেন__-তিনবার তোমার নাম করে যদি খেতে না পাই 
গঙ্গায় ঝাঁপ দেব, আর লোকের কাছে বলব, হরিনাম খেতে দেয় 
না। রত্বাকর দন্থ্য ( বাল্সীকি ) দীর্ঘদিন তপস্যা করে উই টিপি 
হয়ে গেছেন কিন্তু বেঁচে আছেন-_মরেন নি। অন্নজল খাছ 
না পেলেও এমন খাগ্ পেয়েছেন যাতে বেঁচে আছেন । খান 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৪৭ 


তো শুধু দেহের নয়, দেহের খাগ্য অন্নজল, আর আত্মার খাগ্ 
নামামৃত-_এই রামনামামৃতের ঝরণা রত্বাকর দস্থ্য আকণ্ঠ পান 
করেছেন তাই তিনি মরেন নি। জগতের প্রতিটি বস্তু বৈচিত্র্য- 
পূর্ণ, তাঁর কারণ সবটাতেই মায়া আর ভগবান মেশান আছে । 
গৌরগোবিন্দপাদপদ্ম যিনি ভজন করেন, তিনি হলেন ভাগবত 
পরমহংস । মহাজন বলেছেন, কুষ্জনাম ভজে যে সে বড় 
চতুর | ক্রমশঃ চাতুরী করে সংসারকে ফাঁকি দিয়ে ভগবানের 
কাছে যেতে হবে__ এরাই ভাগবত পরমহংস । 

জড়ভরত বড় চতুর। রাজা রহুগণের পাঁন্ধী ৰইছেন। এর 
দ্বারা কি তিনি প্রীরন্ধ ক্ষয় করছেন? এতে বিচার আছে-_যে 
জড়ভরতের পদরজঃ যোগী মুনি বাঞ্ছ৷! করেন, ভার আবার 
প্রারন্ধ ক্ষয় কি? মাতা দেবহৃতি পুত্র ভগবান কপিলদেবকে 
বলেছেন £ 

যন্নামধেয়শ্রবণান্থুকীর্তনাৎ যৎপ্রহ্বণাদ্যৎস্মরণাদপি কচিৎ। 

শ্বাদোইপি সগ্ভ: সবনায় কল্পতে কুতঃ পুনস্তে ভগবন দর্শনাৎ ॥ 

_-ভা. ৩।৩৩।৬ 

এ কথার দাম আছে। গোম্বামিপাদগণ বিচার করেছেন-__ 
ভগবানের নাম শ্রবণ করলেই তার প্রারন্ধ তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে 
যায়। যজ্ঞের বাধক চগ্ডালত্ব যে ছুর্জীতি তাও তৎক্ষণাৎ চলে 
যায় এবং সে যজ্ঞ করবার অধিকারী হয়। শ্রীজীবপাদ প্রশ্ন 
তুলেছেন, তাহলে সেই চগ্ডাল তখন যজ্ঞ করবে কি না? 
ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থের টীকায় শ্রীজীবপাদ বিচার করেছেন, 
ভক্তিই একমাত্র প্রারন্ধ নষ্ট করে। অন্য কোন সাধন, জ্ঞান- 


৪৮ নবযো গীল্দ্রসংবাদ 


যোগ ব! নিষ্ষাম কর্ম কিছুতেই প্রারব্ধ যায় না প্রারন্ধ কর্ম 
তাকেই বলা হবে যার ফল ভোগ করা আরম্ত হয়েছে । অন্যান্য 
সাধনে সঞ্চিত কর্ম নষ্ট হলেও প্রারন্ধ নষ্ট হয় না। ভোগ ন' 
করা পর্যন্ত তাঁর ক্ষয় নেই। ভোগের দ্বারাই একমাত্র প্রারন্ধ 
নাশ হয়। ভোগ না করে অন্য সাধনে প্রারদ্ধ যায় না 
'নাতুক্তং ক্ষীয়তে কর্ম কল্পকোটিশতৈরপি ! বেদান্তে জীবনুক্ত 
বলে একটি কথা আছে; এমনই ঠেকা যে মুক্তিলাভ করবার 
পরেও তার জীবনধারণ করতে হচ্ছে_ ভোগ করে প্রারন্ধ নাশ 
করতে হবে বলে। জীবনুক্ত তাঁকেই বলা হবে যার ব্রহ্মজ্ঞান 
লাভ হয়েছে অথচ প্রারব্ধ ক্ষয়ের জন্য দেহ ধারণ করে থাকতে 
হয়েছে । এই হল জ্ঞানশাস্ত্রের সিদ্ধান্ত । ভক্তিশাস্ত্রেও জীবন্মক্ত 
সংজ্ঞা আছে। তুলারাশিতে অগ্নি সংযোগের মত ভক্তিস্পর্শ 
মাত্রে প্রারন্ধ নিঃশেষ হয়। দেবধিপাদ জীবনুক্ত শব্দের সংজ্ঞা 
করেছেন যে সর্বদা ভগবানের জঙ্গে যুক্ত। দেবষিপাদ তো 
জানেন না আমাদের জগতে কত আঠা- পাখী যেমন খাঁচায় 
থেকে থেকে বদ্ধ হয়ে যায়, ছেড়ে দিলেও উড়তে পারে না, 
আমাদেরও তেমনি পা বাঁধা আছে সংসারের খু'ঁটোয়। ভগবানের 
সঙ্গে জীবের কেমন করে সংযোগ হবে? ভগবান থাকেন 
কোথায় আর জীব থাকে কোথায় ? মহাজন বলছেন, ভগবান 
দূরে থাকলেও ক্ষতি নেই “যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি। 
নামের সহিত আছেন আপনি শ্রীহরি ॥ নামসংযোগ হলেই 
ভগবানের সঙ্গে সংযোগ হল । ব্রক্ষজ্ঞানও প্রারন্ধ নাশ করতে 
পারে না। জ্ঞানবাদী প্রশ্ন তুলেছেন-_ভক্তিসম্পর্ক যদি প্রারন্ধই 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৪৯ 


নষ্ট করে--তাহলে প্রারন্ধের ফলে যে দেহ ধারণ হয়-_তা কেমন 
করে থাকে ? জ্ঞানীরা তো ভক্তির ঘরের লোক নয়__তাই 
বাইরের লোকের মত প্রশ্ন করেছেন । শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবতিপাদ 
এর জবাব দিয়েছেন_ এন্দ্রজালিক যেমন গলাকাটা! খেল দেখায়, 
গল। সত্যি করে না কাটলেও যেমন কাটাই দেখায়--এও তেমনি 
গৌরগোবিন্দের কপার খেলা__এখানেও তেমনি প্রারন্ধ না 
থাকলেও আছে বলে দেখায় । এতে প্রয়োজন কি? প্রয়োজন 
আছে- কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অর্জুনের রথ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, 
কিন্ত ভগবান রথ বাঁচিয়ে রেখেছেন। তা না হলে অর্জুনকে 
শত্রুপক্ষের কাছ থেকে উপহাস, অপমান পেতে হত্ব, অর্জুনকে 
আবার নূতন করে রথ খুঁজতে হত । গোঁবিন্দের দাস জীব হল 
রঘী, দেহ তার রথ- এখানে যুদ্ধ হল মায়ার সঙ্গে | মায়া নান। 
শঙ্খলে জীবকে বেঁধেছে । মায়ার বন্দী জীব সত্রী-পুত্র নিয়ে 
আনন্দ করে, মায়ার বাইরে সাধুর চরণে যেতে পারে না । মায়ার 
সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবের কৃষ্ণদাস্ত সিংহাসন পেতে হবে। মায়া 
এবং মায়ার চর আমাদের নিরন্তর ধনী, মানী, কুলীন পণ্ডিতের 
সিংহাসন দিচ্ছে। অর্জুন তো৷ তার ছুখানি হাত দিয়ে যুদ্ধ 
করেছিলেন, কিন্তু আমাদের হাত পাঁচখানি বা তার চেয়েও 
বেশী। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক প্রভৃতি এই হাত দিয়ে 
আমরা শ্রবণ কীর্তন প্রভৃতি বাণ নিক্ষেপ করলে মহামায়! 
অচিরে বিধ্বস্ত হবে। পিতামহ ভীম্মের বাণে যেমন অর্জুনের 
রথ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল তেমনি শ্রীগুরুপাদপদ্ম ভীম্মের 
দেওয়া মন্ত্রবাণ যেদিন আমাদের কানে প্রবেশ করেছে সেইদিনই 


৪ 


৫০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আমাদের দেহ নাশ হয়েছে । ' কৃষ্ণ ইচ্ছায় অর্জুনের রথ টাটকা 
ছিল। নৃতন রথ, খু'জতে হয় নি। ভক্তের দেহও ভগবানের ইচ্ছায় 
ঠিক থাকে । কারণ নূতন দেহধারণে কাল বিলম্ব হবে। অর্জুনকে 
আঠার দ্রিন যুদ্ধ করতে হয়েছিল । আর জীবকে অনেকদিন ধরে 
ভজতে হবে। প্রারন্ধ নাশ তখনই হয়ে গেছে, কিন্তু প্রারন্ধ 
যেন আছে এইরকম দেখায় । যার প্রারন্ধ নাশ হয়েছে তাকেও 
জানতে দেওয়া হয় না। কারণ তাহলে সে আর ভক্তি . অঙ্গ 
যাজন করবে না। জ্ঞানিগণ এতেও সন্তষ্ট নন। তারা বললেন 
এ তে! কথার চালাকি । প্রারন্ধ নাশ যার হয়েছে, আর যার 
নাশ হয় নি-_এই ছুই-এর মধ্যে পার্থকা কি? শ্রীচক্রবন্তিপাদ 
বললেন, ছুই ব্যক্তি-_-একজন প্রারন্ধ ভোগ করছে আর একজন 
অপূর্ব ভোগ করছে। প্রারন্ধভোগী আর অপূর্বভোগী__-ওপরে 
ঘরের চাল! ঠিক রেখে যেমন তলায় তলায় খুঁটি বদলান হয়, 
চাল! জানতেই পারে নী, তেমনি যার প্রারন্ধ নাশ হয়েছে, তার 
ভিতরে ভিতার দেহ বদলে গেছে, কিন্ত জানতে পারে না 
অর্থাৎ তাকে জানতে দেওয়া হয় না; কারণ প্রাকৃত ধর্ম চলে 
গিয়ে অপ্রাকৃত ধর্ম তার এসে গেছে-_এ কথা জানতে 
পারলে তার ব্যবহারে অন্থবিধা হবে । আর ভক্তিযাজনও তার 
পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রীরব্ধভোগী যে, তার পরকাল চিন্তা 
আসে না__অসাড়ে বিষয়ভোগ করে । আর যার প্রারন্ধ নাশ 
হয়েছে অথচ দেহ ধারণ করে কর্ম ভোগ করছে অর্থাৎ অপূর্ব 
কর্মভোগী, সে বিষয় ভোগ করতে গেলেই কাটা বেঁধার মত ছুঃখ 
ভোগ করে--ব্যথা অনুভব করে। জড়তরত এইরূপ অপূর্ব 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৫১ 


কর্মভোগী ব্যক্তি। রাজা রহুগণের শিবিকা বহন করছেন 
নিবিচারে | 

রাজধ্বি ভরতের চরম কলেবর হল জড়ভরত জন্ম। নির্বাধে 
রাজার পালকি বইছেন। কোন আপত্তি নেই, সুখ বা ছুঃখ 
কোনটাতেই আপত্তি করলে প্রারন্ধ বাঁড়বে। পাপ পুণ্য 
কোনটিকেই নেওয়া চলবে না শ্রীল নরোত্তম ঠাকুরমশাই তাই 
বলেছেন, “পাপ পুণ্য ছুই পরিহরি?। 

পুণ্য যে স্থখের ধাম তার না লইও নাম 
পুণ্য মুক্তি ছুই ত্যাগ করি। 

মহাজন বলেন, স্বরণশৃঙ্খল আর লৌহশৃঙ্খল। প্লাপের বন্ধন 
কখনও কাটতে পারে কিন্তু পুণ্যবন্ধন কিছুতেই 'কাটে না। 
তার আসক্তি বড় বেশী। যেমন লোহার শৃঙ্খল বন্ধন বলে 
মনে হয় কিন্ত সোনার শিকলে যদি চরণ আবদ্ধ থাকে, তাহলে 
আর বন্ধন বলে মনে হয় না, বরং মনে হয়__বেশ আছি। 
গীতায় ভগবান বলেছেন £ 


বুদ্ধিযুক্তো! জহাতীহ উভে স্ুকৃততুক্কৃতে ৷ গীত ২৫০ 
দৈব হল পুর্বজন্মকৃত কর্ম--এরই নাম কর্মফল । দেবধিপাদ 
বলেছেন 5 
তল্লভ্যতে হুঃখবদন্যতঃ স্থখং কালেন সবত্র গভীররংহসা । 
ভা, ১1৫১৮ 


জীবের পাওনা স্থখ বা ছুখ সে পাবেই, তার জন্য চেষ্টার 
প্রয়োজন নেই। ব্রহ্মা বলেছেন £ 


৫২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তত্রেন্ুকম্পাং সুসমীক্ষমাণে। ভূপ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্‌। 

হৃদ্বাগ বপুভিবিদধন্নমস্তে জীবেত যো মুক্তিপদে স দায়ভাক্‌॥। 
__ভা. ১০।১৪।৮ 

যে ব্যক্তি ভগবানকে ফুলের মাল! পরায় তার ওপর ভগবান 
যত না সন্তু হন, অজ্জানে আচ্ছন্ন জীবকে তার পাদপদ্সে 
উন্মুখ করে দিলে ভগবানের আর তৃপ্তির সীমা! থাকে না। 
“জীবকে আমার পাদপদ্ন পাইয়ে দিলে আমি বেশী সুখী হই'__ 
এইটিই ভগবানের নিজের মত। ব্রহ্মাকে ভগবান জিজ্ঞাস! 
করছেন_ত্রন্মন, তুমি তো স্থষ্টিকর্তা, তোমার তো কর্তব্য 
আছে। জীব কেমন করে আমার পাদপন্ম পাবে এ সম্বন্ধে 
তুমি কিস্থির করেছ বা কি বিচার করেছ? তুমি বল-_যদি 
তোমার বাকো ভুল থাকে তাহলে আমি সংশোধন করে দেব ।? 
ব্রহ্মা বলছেন_“ভগবন্, আমি যখন বেদপাঠ করেছিলাম__ 
বেদবক্তা যখন আমি তখনও আমার এ জ্ঞান হয় নি-তোমার 
কৃপায় এখন আমার জ্ঞান হয়েছে । যেব্যক্তি তোমার কৃপাকে 
নু এবং “সম” করে দর্শন করে ম্্ অর্থাৎ ফলাকাজ্াশুন্ 
হয়ে এবং “সম' অর্থাৎ অন্থদেবতানিরপেক্ষভাবে |” আত্মকৃত- 
বিপাক হল নিজের কর্মফল । বিনা আপত্তিতে ভোগ করে, 
তোমার কপার দিকে কেমন করে তাকাতে হয়? তোমার 
কপার দিকে চাওয়া মানে তোমার কৃপাকে বুঝে নেওয়া। 
প্রাতিক্ষণে তার কপার দিকে চাইতে হবে । আকাশ, বাতাস, 
ফল, ফুল, নদী, জল, মাতাপিতা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ঘর 
বিত্ব-সবই তার করুণার প্রকাশ । কৃপার তিনটি রূপ-_ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৫৩ 


ব্যবহারিক পারলৌকিক ও পারমাধিক। সব তার কপা। 
কৃপা না হলে পরমার্থের সঙ্গে সম্পর্ক হয় না; সাধুদর্শন হয় না। 
মহাজন বলেছেন £ 
কৃষ্ণ যদি কপা করে কোন ভাগ্যবানে | 
গুরু অন্তামিরপে শিখান আপনে ॥ 

শ্রীগুরুকুপা চিকের আড়ালে শ্ীগৌরগোবিন্দ থাকেন । 
কৃপা ছাড়া হরিনাম কানে ঢোকে না। সাধুদর্শন, হরিনাম 
আমাদের কাছে সস্তা হয়েছে, তাই আমর] কৃপা বলে বুঝি 
না। বরধার জল যখন ঘরে এসে ঢোকে তখন তাঁকে আমরা 
তাড়াতে যাই। আবার গ্রীষ্মকালে সেই একরিন্দু জলের 
জন্যই হাহাকার ওঠে । এখনকার যুগে নিতাইগৌরের করুণার 
বন্যার যুগ__ প্রেমের প্লাবন বয়ে গেছে। চারিদিকে হরিনাম 

সঙ্কীর্তন, সাধুবৈষব দর্শন এত সন্তা হয়েছে যে কৃপা বলে বুঝতে 
পারা যায় না। কৃপা অনেক, শ্রীগুরুদেব অনেক কৃপা করেছেন । 
কৃপার চাপ যতই অনুভব হবে ততই দীনাতিদীন মুত্তি হবে। 
ভক্ত, আত্মকৃত বিপাক-_অবশ্ঠয ভোক্তব্য কর্মফল, বিনা আপত্তিতে 
ভোগ করে এবং তাঁর মধ্যে তোমার কৃপা অনুভব করে । তারা 
কাঁয়মনোবাক্যে ভগবানের চরণে প্রণাম করে_ এইটিই সাধন । 
ব্রহ্মা বললেন, “জীব যে উপায়ে কৃষ্ণপাদপন্প পাঁবে ভার উপায় 
আমি এইটিই নির্ধারণ করেছি।” ভগবান স্বয়ং এতে সম্মতি 
দিয়েছেন । শ্রীজীবপাঁদ বলেছেন, -নমঃ, পদটি ভক্তি অঙ্গের 
প্রতিনিধি অর্থাৎ প্রণামের দ্বারা কায়মনোবাক্যে শ্রবণাদিকেও 
বুঝাচ্ছে। পিতার সন্তান যেমন কেবলমাত্র প্রাণে বেঁচে থাকলেই 


৫৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


পিতৃসম্পত্তির অধিকারী হয়, তেমনি সাধক যদি এইভাবে 
ভক্তিপথে স্থিতিলাভ করতে পারে, তাহলে সে মুক্তিপদে অর্থাৎ 
মুক্তি ধার পদে-_(চরণে) থাকে সেই ভগবানের প্রেমসম্পাত্তির 
দায়ভাগ হয়। অন্যান্ত যুগের সত, ত্রেতা, দ্বাপরের সন্তানের! 
তপস্তা যজ্ঞ, অর্চনা করছে, সাধনসম্পদ তাদের আছে কিন্তু 
কলির জীব কিছু পারে না। সাধনসম্পদহীন-_-তবু যদি 
শুধু পিতার অন্কুল হয়ে “হা গৌর গোবিন্দ বলে জীবন 
কাটাতে পারে (পিতাকে ত্যাগ যদি না করে পিতার তাজ্য 
পুত্র যদি না হয়) তাহলেই পিতা ভগবানের প্রেমসম্পত্তির 
দায়ভাগী হবে। কাণ! খোঁড়া ছেলে হলে কি হয়, বেঁচে 
থাকলেই ভাগের ঠাকুর । ভাগের বেলায় সমান। ভক্তিমার্গে 
থাকার নামই জীবন। শ্রীজীবপাদ বলেছেন, _-ভক্তিমার্গে 
স্থিতিরেব জীবনম্‌। 

এখন প্রশ্ন হতে পারে ভক্ত যদি নিজের বিপাকই ভোগ 
করল তাহলে আর কায়মনোবাক্যে কেমন করে ভজবে? 
শ্রীজীবপাদ তাই আর একটি "অর্থ করেছেন_তুগ্জান নয় 
অভুঞ্জান। লুপ্ত অকারটি প্রশ্নেষ করে নিতে হবে। অর্থাৎ 
ভক্তের আর কর্মফল ( আত্মকৃত বিপাক ) ভোগ করতে হয় না, 
কর্মফল তাদের আপনা থেকেই খগ্ডন হয়ে যায়। সাধক কিন্তু 
বুঝতে পারে না যে তার প্রারন্ধ খণ্ডন হয়ে গেছে । জড়ভরত 
তাই আপত্তি না করেই পালকি বইছেন দেখে মনে হচ্ছে প্রারন্ধ 
ভোগ করছেন। তা নয়। প্রারন্ের মত দেখালেও প্রকৃত- 
পক্ষে প্রারন্ধ নয়, প্রারন্ধবং। এই জড়ভরত জন্মই রাজধি- 


নবযোগীজ্রসংবাদ ৫৫ 


ভরতের তৃতীয় জন্ম ব৷ চরম জন্ম । এই জন্মেই তার হরিপাদপদ্প 
প্রাপ্তি হয়েছিল । 

ভগবান ঝষভদেবের একশত পুত্রের মধ্যে জোষ্ঠপুত্র রাজধি 
ভরতের পরিচয় আমরা পেলাম । রাজধি ভরত ছাড়া আর নয় 
জন পুত্র ব্রহ্মাবর্ত প্রভৃতি নয়টি ভূমগ্ুলের অধিপতি হয়েছিলেন । 
আর একাশী জন কর্মমার্গ প্রবর্তক ব্রাহ্মণ হয়ে ভারতবর্ষে বাস 
করতে লাগলেন । বাকী যে নয়জন থাকলেন : তারাই নব 
যোগীল্দ্র নামে খ্যাত। এরাই মহারাজ নামর সত্ভীয় সমাগত 
হয়েছিলেন । তারা মহাভাগ্যবান, কারণ ভগবান দেখাই তাদের 
স্বভাব, বিষয় ভাবতে তারা পারেন না। তীরা ধরি অন্যকে 
কৃপা করেন তবেই তাদের মহাজন বলা হয় নতুবা নয়। মহাবৃক্ষ 
তাকেই বলা হবে, যাকে আশ্রয় করে অনেক পাঁশী থাকে । 
নৌকাকে এইজন্য মহাজন বল। হয়। শ্রীগুরুপাদপন্সও তেমনি 
তরণী। নবযোগীন্র অপরকে কৃপা করেছেন। তাই তার 
মহাজন-_মহাভাগ্যবান। এই নয় জন যোগীন্দ্র মুনি অর্থাৎ 
মৌনব্রতধারী অথবা ভগবংমননশীল। সাধুজন বাক্যে সংযত 
কিন্তু ভগবংপ্রসঙ্গে বড় মুখর হয়ে ওঠেন। তারা অর্থশংসিন, 
পরমার্থের নিরপক । জগতে সাধারণত মানুষ অর্থ উপার্জনে 
পটু হয় কিন্তু পরমার্থ উপার্জনে ধারা চতুর তারাই প্রকৃতপক্ষে 
বুদ্ধিমান। এরা শ্রমণা, শ্রমবিমুখ বা শ্রমকাতর নন, কিন্ত 
শ্রমশীল, কিন্তু এ পরিশ্রম সংসারের জন্য নয়, আত্মাভ্যাসে 
কৃতশ্রমা। ভজনের পরিশ্রম এর! স্বীকার করেছেন। ভজনের 
জন্য যিনি ষত পরিশ্রম করবেন, ভগবানের কৃপার ধারাও তার 


৫৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


প্রতি তত ঝরে পড়বে । ভজনপথ এমনই যে, হরি পাওয়ার 
পরেও ভজন করতে হবে । পাওয়ার পরেও যে ভজন তাতেই 
আরও বেশী সুখ । এ ভজন হল হরিকে ধরে রাখবার উপায়, 
এ হল বণিকের বৃত্তি । মহারাজ অন্বরীষ যেমন অষ্টপ্রহর নবধ। 
ভক্তিঅঙ্গ যাজন করতেন, তাতেও তৃপ্ত না হয়ে আরও বেশী করে 
ভজন করবেন বলে বনে গেলেন। এটি বণিকের স্বভাব । 
নিজের হাজার থাকলেও তার! সুখী হয় না। আরও চায়। 
তপোলোকে নবযোগীন্দ্র আছেন। সেখানে সনকাদি মুনিগণও 
আছেন। বাতবসন! যোগীন্দ্রগণ, এ'রা দিগন্বর মূতি। বাইরের 
বসনভূষণের প্রয়োজন হয় তারই যার দেহাভিনিবেশ আছে । 
আর যাদের দেহবুদ্ধি নেই তাদের আবার বসনের কি প্রয়োজন? 
আত্মবিদ্ভাবিশারদ যোগীন্দ্র, আর্থাৎ হরি-বিদ্ভাতে বিশারদ । 
“আততাৎ মাতৃত্বাচ্চ আত্মা হি পরম! হরি । গর্ভোদশায়িরূপে 
ধারণ পৌষণ ব্যাপকতা। এবং মাতৃত্ব, এ আত্মবিদ্া হল হরিকে 
পাবার বিদ্যা । এদের নাম যথাক্রমে-_-কবি, হবি অথবা হরি, 
অস্তরীক্ষ, প্রবুদ্ধ, পিপ্ললায়ন, আবির্বোত্র, দ্রবিড় অথবা দ্রমিল, 
চমস এবং করভাজন। তারা পৃথিবীতে বিচরণ করেন, জগতে 
যেদিকে তারা দৃষ্টিপাত করেন তাঁতে ভগবানের রূপই প্রত্যক্ষ 
করেন। স্থাবর-জঙ্গম, সং-অসৎ কার্ষ-কারণ, স্থুল-সুল্্প কিছু 
বোধ নেই। সবত্র তাদের ভগবত্দর্শন। ভগবান বলেছেন £ 

ময়াহধ্যক্ষেণ প্রকৃতি; সৃয়তে সচরাচরম্‌। গীতা ৯।১০ 

ঘট পেলে যেমন উপাদান কারণ মাটিকে পাওয়। যায়, 
কুম্তকার যে ঘটের প্রতি নিমিত্ত কারণ, তাকে পাওয়! যায় 


নবযোগীন্্রসংবাদ ৫৭ 


না, তেমনি ব্রহ্মাগ্ডঘট এই জগৎকে পেলে মায়াকে পাওয়া যায় 
বটে, কিন্তু ভগবানকে পাওয়া যায় না। কুস্তকারের মত 
ভগবানকে খু'জতে হবে । শাস্ত্র ভগবানের ঠিকানা যা বলেছেন 
তাতে বিশ্বাস করে ভগবানকে খুঁজতে হবে। শান্তর বলেছেন, 
“'আরাধ্যো ভগবান্‌ ব্রজেশতনয়ঃ । জগৎ পেলে ভগবানকে 
পাওয়া যায় না। শাস্ত্রের উপদেশ শুনতে হবে। তামস 
অহঙ্কার থেকে পঞ্চমহাভূতের স্থষ্টি । যোগীন্দ্রগণ কার্ধকারণাত্মক 
জগৎকে দেখছেন, স্থাবর জঙ্গমাত্বক জগংকে আত্মা হতে 
অভিন্নভাবে দেখছেন । মহাজন বলেছেন, ভক্তের ঘষ্টি এই 
রকমই হয় £ | 

স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তার মুতি ? 

সবত্র হয় যে তাঁর ইষ্টদেব স্কৃততি ॥ 

এ কথার ধারাটি কি? এ বাকা মহাজন বললেন কেন ? 
মনে করা যাক কোন মায়ের সন্তান হারিয়ে গেছে, হয়ত সে 
ছেলে সন্সাসী হয়ে গেছে, তার সন্ধান পান নি। তখন সেই 
ছেলের অভাব তাকে সর্বদার তরে বাথ দেয়। পুত্রবিরহের 
ব্যথায় সে তখন মরমের কান্না কাদে । ছেলের ব্যবহার করা 
জিনিষপত্র দেখলে তার স্মৃতি আরও বেশী করে মনে পড়ে। 
ছেলের প্রতিটি জিনিষে ছেলের ছাপ পড়ে, তেমনি সাধক এ 
জগতের স্থাবর-জঙ্গম, পত্র-পুষ্প, ফল-জল, আলো-বাতাস, 
তরু-পল্লব, নদী-পর্বত য! দেখে তার মধ্যে আষ্টার স্মৃতি জাগে 
মনে হয় এর মধ্যে আষ্টা আছেন । তাই স্থাবর-জঙ্গম যা কিছু দেখে 
সবেতেই ইষ্টদর্শন করে, নিজেকে তদন্থুগত হয়ে দর্শন করছে । 


৫৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


নয়জন যোগীন্দ্র, এর! অব্যাহতেষ্টগতয়ঃ যথেচ্ছভাবে সবত্র 

বিচরণ করেন। এদের গতিতে কোথাও বাধা নেই, সুর সিদ্ধ 
সাধ্য গন্ধব যক্ষ নর কিন্নর নাগ লোক-_সবত্র অবাধগতি। 
তারা যদৃচ্ছায় একদিন মহারাজ নিমির সভায় উপস্থিত হলেন। 
নব যোগীন্দ্র দৈবগতিতে স্বয়ং সমাগত হয়েছেন । মহৎ কৃপা 
যাদৃচ্ছিকী। কৃপা তো খাজনা নয়_তাই পাওনা নেই। 
কৃপাকারী হলেন দাতা এবং যাকে কৃপা করবেন সে হল ভিখারী । 
ভিখারীর যেমন কোন পাওনা থাকে না, কুপা-গ্রহীতারও 
তেমনি । ভিখারী মুখে বলবে অনেক দিন খাই নি, কিন্ত সেটি 
বখন তার চেহারায় ফুটবে তখন দাতার হৃদয় গলবে, দাত৷ দান 
করবেন। আমরা মুখে বলি কৃপা করুন, কিন্ত কৃপা পাওয়ার 
প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। প্রয়োজন কখন বুঝ! 
যাবে? কৃপা না পেলে অন্নজল ত্যাগ হবে । আমাদের কুপ। 
প্রার্থনা হল, সব বজায় থাক, এর ওপর গৌরগোবিন্দ আসেন 
আনুন, আপত্তি নেই। কিন্ত তাতে কৃপা হয় না_কাম রাম 
একত্র থাকে না। 

যাহা কাম তাহা নাহি রাম। 

রবি রজনী নাহি মিলে এক ধাম ॥ 
মহাজন বলেছেন ; হয় লোক ভজ না হয় গৌর ভজ ভাই-_ 

ছুই বস্তু কভু নাহি মিলে এক ঠাই॥ 
মধ্যাহ্ন ভাঙ্কর আর অমানিশার অন্ধকার একত্র মিলতে পারে 
না। আমরা কৃপা! প্রার্থনা করি, মুখস্থ কথ! বলি। আমাদের 
কৃপা চাওয়াও তাই, সাধু গুরু বৈষ্কক মনে মনে বোঝেন। 


নবষো শীন্দ্রসংবাদ ৫৯ 


শুধু ব্যথা পাব বলে কিছু বলেন না। কৃপা পাওয়ার মত ভাব 
চেহারায় ফোটাতে পারলে মহাজনের কাছে যদি কৃপা করবার 
মত সম্পদ নাও থাকে ধার করেও তারা কৃপা করেন । দোতলায় 
বসে কৃপা চাইলে যেমন কৃপা চাওয়াট। হাস্তকর হয়, আমরাও 
তেমনি অভিমানের দোতল। থেকে কুপা চাইছি । তাই এটিও 
হান্তকর হচ্ছে । কর্মনদীর শোতে জীব ভেসে চলেছে, নদীর 
প্রবাহে ষৈছে কাষ্ঠ লাগে তীরে'_“তীরসঙ্গম্‌ মহৎকৃপ্পা' । মহৎ 
কৃপা লাভই জীবনে তীরে পৌছান। নবযোগীষ্্র মহারাজ 
নিমির সভায় এসে উপস্থিত হয়েছেন । কেউ তাদের চেনন না, 
কিন্ত তাদের স্বরূপের এমনই মহিমা যে স্ুপ্রকাশতুল্য পরম 
ভাগবত এই নয়জনকে দেখে যজমান স্বয়ং নিমিরাজ, যঙ্জীয় 
অগ্নি---আহ্বনীয়, গাহপত্য, দক্ষিণাগ্নি প্রভৃতি, ব্রাহ্মণ যাজ্জিকগণ 
সকলেই গাত্রোথান করে তাদের সন্বর্ধন। জানিয়েছেন । নিমিরাজ 
বুঝলেন এরা নারায়ণপরায়ণ। আমাদের জগতের নারায়ণ- 
পরায়ণ শব্দে খাদ আছে। আত্মমহিমায় যদি সুখ অনুভব হয় 
তাহলে বুঝতে হবে তক্তিস্পর্শ হয় নি। ভক্তিস্পর্শ যার হয়েছে 
সে শুধু গৌরগোবিন্দেরই মহিমা শুনবে । নিজের মহিম! শুনবে 
না। পরায়ণ শব্দের অর্থ হল শ্রেষ্ঠ আশ্রয়, এখানে ষোল আনাই 
খাটি। তাদের কান্তি দেখে মনে হল, এর! কি তাহলে ব্রহ্মার 
পুত? বিনয়ে অবনত হয়ে নিমিরাজ “অহো। ভাগ্য বলে মনে 
করলেন । এ যেন আশার অতিরিক্ত লাভ । ভিখারী যেন চার 
পয়সার পাওনার পরিবর্তে একটাকা পেয়ে গেছে । নিমিরাজ 
আজ যজ্ঞ করতে গিয়ে যজ্জেশ্বরের পার্যদ্দের দর্শন পেয়েছেন । 


৬০ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


এ'দের এমন কান্তি, এর! তাহলে বৈকুগ্ঠনাথের সাক্ষাৎ পার্ধদ্‌। 
আবার মনে মনে ভাবছেন, তাই যদি হয়_-তীারা এখানে 
আসবেন কেন? বিষ্ণুভক্ত লোকদের পবিত্র করবার জন্য সবত্র 
বিচরণ করেন । 
মান্ুুষদেহ তুর্লভ, কৃমিকীটের কাছে এই মানুষদেহ সুহূর্লভ, 
আমাদের কাছে ভক্তিপরায়ণ ব্যক্তি সুছর্লভ । প্রহ্লাদও বলেছেন, 
ক্ষণভন্গুর এই দেহ দিয়ে ুছুর্লভ হরিভজন যত তাঁড়াতাড়ি 
পেরে নিতে পারা যায় ততই লীভ। যে কাজ চুরাশি লক্ষ দেহে 
হয় নি, মনুষ্যদেহে সেই হরিভজন কাজ হয় । মহারাজ পরীক্ষিৎ 
সাতদিন পরমায়ুতে কৃষ্ণপাদপদ্ম লাভ করেছিলেন । খট্াঙ্গ রাজা 
অর্ধমুহূত পরমায়ূতে কৃষ্ণপাদপদ্ম পেয়েছিলেন । কলিজীবের 
ওপর মহাপ্রভুর করুণ! £ 
দিন গেলে হ! গৌরাঙ্গ বলে একবার । 
সেজন আমার হয় আমি হই তার ॥ 
গৌরগোবিন্দের ভজন হল পরশমণি, ষে পেয়েছে তার পক্ষে 
সুলত--এটি হল মুক্তির সাধক | নিমিরাজ বললেন £ 
ছুর্লভো মানুষো দেহে দেহিনাং ক্ষণভন্ুরঃ | 
তত্রাপি ছুর্লভং মন্যে বৈকুগ্প্রিয়দর্শনম্‌ ॥ ভা, ১১।২।২৯ 


বালিক! বন্ধ্যা নয়, জননী সে হতে পারে কিন্তু পিতৃসংযোগ 
ছাড়া যেমন বালিকা জন্ম দিতে-পারে না, তেমনি মনুয্যদেহও 
মুক্তি-সস্তান প্রসব করতে পারে কিন্তু শ্রীগুরুকূপা সংযোগ 
ব্যতিরেকে তা৷ একান্ত অসম্ভব । তাই বৈকুষ্ঠপ্রিয়দর্শন__এ হল 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ৬১ 


অলভ্য লাভ! মনুষ্জীবনের স্থলভতা-ছুর্লভতা বিচার হবে 
কাজের ওপর । একমাত্র মনুষ্যদেহ ছাড় অন্য কোন দেহে 
হরিভজন হয় না__নীচেও কোন জন্মে নয়, ওপরেও কোন জন্মে 
নয়। দেবতারা হরিভজন করতে পারেন ন। ব্বর্গে (ব্বর্লোকে 
বা উপরের কোন লোকে )। ন্ুুখোন্মাদনা এমনই যে গোবিন্দ 
ভজতে দেয় না। দেবরাজ ইন্দ্র ব্রজবাসীর পুজা গ্রহণ করছেন । 
এশ্বর্ষের এমনই চাপ যে সে গুরুগোবিন্দ বুঝতে দেয় না । দক্ষ 
প্রজাপতি হয়েও শিবমাহাত্ব্য বুঝতে পারেন নি। শিবকে 
অভিশাপ দিয়েছিলেন, শিব যক্জভাগ পাবেন না । নন্দীর 
দক্ষের প্রতি অভিশাপ দক্ষের ছাগমুণ্ড হবে। ভূগুমুনি 
শিবকে অভিশাপ দিয়েছেন £ 
ভবব্রতধরা যে চ যে চ তান্‌ সমনুব্রতাঃ। 
পাঁষগ্ডিনস্তে ভবস্ত সচ্ছান্ত্পরিপন্থিনঃ ॥ ভা. 81২২৮ 

ধারা শিবব্রত করবেন বা তার অন্থুমোদন করবেন, তার! 
পাষগ্ডিমধ্যে পরিগণিত হবেন । তা যদি হয়, তাহলে শিব- 
চতুর্দশীব্রত বৈষ্ণবেরা করলে তে ভূগুমুনির অভিশাপ লাগবে । 
এ বিষয়ে শ্রীজীবপাদ সমাধান করেছেন_ শিবকে ঈশ্বরবোধে 
উপাসনা করলে অভিশাপ লাগবে, আর কৃষ্ণভক্ত হিসাবে 
উপাসনা করলে অভিশাপ লাগবে না। দক্ষের শিবহীন 
যজ্ঞের কথা দেবধিপাদ ইচ্ছা করেই শিবপার্ততীকে নিবেদন 
করলেন । ইচ্ছা ষে, মহতের নিন্দা যে করে সে দণ্ড ভোগ 
করুক | দক্ষ বৃহস্পতি সব ষজ্ঞ করছিলেন- দক্ষ প্রজাপতি 
যজ্সভায় প্রবেশ করলে ব্রহ্গা, বিষু$ মহেশ্বর ছাড়া আর 


৬২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


সকলে গাত্রোথান করে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। দক্ষ 
প্রজাপতি ব্রহ্মাকে পিতা বলে কিছু বলেন নি, আর বিষু 
তো যজ্ঞেশ্বর স্ৃতরাং তার সম্বন্ধে গাত্রোথানের কোন প্রশ্নই 
ওঠে না, কিন্তু মহেশ্বর যে গাত্রোথান না করে অবমাননা 
করলেন, এটি দক্ষ প্রজাপতির কাছে অসহ্য । বিশেষ করে 
আবার শঙ্করের সঙ্গে প্রজাপতির শ্বশুর-জামাতা সম্পর্ক | দক্ষের 
বিচার হল-_আমাকে দণ্ড দেবে কে ? মহৎনিন্দায় যদি মহান 
ব্যক্তি রুষ্ট হন তাহলে দণ্ড পেতে হবে । শিব যদি নিন্দায় রুষ্ট 
হন তাহলে তে দণ্ড পাব । কিন্ত যদি তিনি কুষ্টই হন, তাহলে 
আর মহৎ হলেন কি করে ? আর যদি রুষ্ট না হন তাহলে আর 
দণ্ড কেমন করে আমাতে লাগবে ? সতী মা বলেছেন-__মহানের 
নিন্দা করলে মহান রুষ্ট হন না বটে, কিন্তু তীর চরণের ধূলি রুষ্ট 
হয়ে তার দণ্ড বিধান করে-_তার সমস্ত তেজ হরণ করে। এটি 
কিন্তু শোভন । স্মৃতিশান্ত্র বলেছেন-__গুরুনিন্দা শুনলে কর্ণ, 
আচ্ছাদন করবে । সতীম! দ্রেহত্যাগ করেছেন ; বলেছেন, শিব 
আমাকে দাক্ষায়ণি বলে সম্বোধন করবার আগে আমি দেহত্যাগ 
করব। কারণ “মহৎশিন্দুক দক্ষের কাছ থেকে উৎপন্ন তোমার 
দেহ' এই অর্থেই তিনি দাক্ষায়ণি সম্বোধন করবেন | বিষমাখা 
অন্ন যদি ভুলক্রমে পেটে যায় তাহলে তাবমন করে ফেলতে হয়। 
এখানেও তেমনি, সতী ম! দেহত্যাগ করলেন-_-যে দেহ দক্ষের 
কাছ থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। শিব-অন্ুচর বীরভদ্র দক্ষের 
মস্তক ছেদন করতে ন! পেরে মুণ্ড ছি'ড়ে নিল। পরে তাতে 
ছাগমুণ্ড বসিয়েছিল-_এ হুল মহতনিন্দার ফল। দক্ষ প্রজাপতি 


নবষোগীন্দ্রসংবাদ ৬5 


তাতে অসন্তষ্ট হন নি; বরং বলেছিলেন--জগৎ আমাকে দেখে 
শিক্ষা করুক যে মহতনিন্দা করলে তার ফল এমনই হয়। দক্ষ 
প্রজাপতি হয়ে এবং ইন্দ্র দেবতা হয়েও ভগবানকে চিনতে 
পারেন নি। তাহলে দেখা যাচ্ছে মন্ুষ্যজন্মের ওপরের জন্মেও 
হরি চেনা যায়না । তাই মনুম্য দেহকেই সর্বাপেক্ষা হুর্নভ 
বল! হয়েছে, কারণ দেবতারাও ভজন করতে পারেন না। স্বর্গ 
হল ভোগের ভূমি । সেখানে ভজন চলে না-অতএব এই দেহ 
নিয়ে বিচার । ছুর্লভতা৷ প্রয়োজনবোধে | 

মনুষ্যদেহ তো হুর্পভ, কিন্তু ভক্তদর্শন আরও ছুর্লভ। হাজার 
বছর আগে একজন বৈষ্ণব যেখানে ছিলেন, সেখান্তম নেমে শিব 
সাষ্টাঙ্গে প্রাণীম করলেন, কারণ বৈষ্ণবমহিমা শিব জানেন । হরি 
না ভজলে বৈষ্ণব চেনা যায় না । মার্কপ্েয় খধি ভগবানের 
কাছে তার মায়ার বিভূতি দেখতে চাইলেন। নারায়ণ বললেন 
“তথাস্ত । মার্কগেয় খষি মহাপ্রলয় দর্শন করলেন । মার্কগেয় 
অব্যয় পুরুষে ভক্তিলাভ করেছেন। তাই কিছু নেবেন না। 
না৷ নিলেও শিব তার কাছে এলেন । উদ্দেশ্য খষি কিছু না নিন 
আমার তো তক্ত-সঙ্গ হবে। গুরুকপাসংযোগ হলে তবে 
মনুন্যদেহজননী পুত্রবতী হবে-__যুক্তি সন্তানকে প্রসব করবে । 

মহারাজ নিমি পরমভাগবত যোগীন্দ্রগণকে পাগ্চ-অর্থ্য দিয়ে 
যথাবিধি পুজা করে আসন গ্রহণ করিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলেন । 


প্রথম প্রশ্ন 


নবযোগীন্দ্রের প্রতি বিদেহরাজের যথাক্রমে নয়টি প্রশ্ন 
'ভগবদ্ধর্ম তত্তক্ত মায়। তত্তরণানি চ। 
ব্রহ্মা কর্মীবতারেহা ভক্তপ্রাপ্য যুগক্রমান্‌ ॥ 
প্রথম প্রশ্ন ভাগবতধর্ম কাকে বলে? দ্বিতীয় প্রন্ন ভক্তের 
লক্ষণ কি? তৃতীয় প্রশ্ন মায়ার স্বরূপ কি? চতুর্থ প্রশ্ন মায়াকে 
উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় কি? পঞ্চম প্রশ্ন ব্রন্ষের স্বরূপ কি? যষ্ঠ 
প্রশ্ন কর্ম কাকে বলে? সপ্তম প্রশ্ন অবতারগণের চেষ্টা কি? 
অষ্টম প্রশ্ম অভক্তের গতি কি? নবম প্রশ্ন যুগের ক্রমনিরুপণ । 
নয় জন যোগীন্দ্র যথাক্রমে এই নয়টি প্রশ্নের উত্তর দেন। 
এর মধ্যে প্রথম প্রশ্ন--ভাগবতধর্ম কাকে বলে? মহারাজ 
নিমি প্রশ্ন করছেন £ 
অত আত্যন্তিকং ক্ষেমং পৃচ্ছামে। ভবতোইনঘাঃ | 
সংসারেহস্মিন ক্ষণার্ধোহপি সংসঙঃ সেবধিন্ণাম্‌ ॥ 

_ভা. ১১২।২৮ 
জীবের আত্যন্তিক মঙ্গল বলতে কোনটি বুঝায়? অর্থাৎ কি 
করলে আর হুঃখের লেশ স্পর্শ করবে না। এ মঙ্গল কোন 
উপায়ে পাওয়া যায়? মহারাজ নিমির নবযোগীন্দ্রকে নয়টি 
প্রশ্নের মধ্যে সব পরমার্থ জগত সব সাধনজগৎ বাঁধা হয়ে আছে। 
সাধুসঙ্গ জীবনে অল্পক্ষণের জন্য ঘটে। কাজেই তার মধ্যেই 
কাজ সেরে নিতে হবে। সাধুসঙ্গ পরশমণি--লোহায় স্পর্শ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৬৫ 


করলেই সোনা পীওয়া যাবে । সাধুসঙ্গ বড় ছুর্লভ ৷ নবষোগীন্দ্রের 
দর্শনকে মহারাজ অলভ্য বলে মনে করেছেন। তাই সন্বোধন 
করছেন, “হে অনঘা' অর্থাৎ যাঁদের দর্শনমাত্রে সকল পাপ নিঃশেষে 
দূরীভূত হয়ে যায়__নিমিরাজ যোগীন্দ্রগণকে কুশল প্রশ্নও করতে 
পারেন না_কারণ বিপদ স্থুলভ যাদের তাদেরই কুশল প্রশ্ন করা 
চলে, কিন্তু এঁদের কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই । কাজেই কুশল 
প্রশ্ন চলে না। নিধি বলতে কুমুদ, শঙ্খ, পদ্ম প্রভৃতি বুঝায় । 
যে ক্ষণে সাধুসঙ্গ-হয়, সেই ক্ষণটিরই মাহাত্ময । দৈবাৎ সাধুদর্শন 
হয়ব জপে তপে হয় না, কষ্ণকুপায় হয়। আচাধ শঙ্কর 
বলেছেন £ 


তত্বং চিস্তয় সততং চিত্তে পরিহর চিস্তাং নখর-বিষ্চে । 
ক্ষণমিহ সঙ্জনসঙ্গতিরেকা ভবতি ভবার্ণৰ তরণে নৌকা ॥ 


ধনে জনে মন দেওয়াই আমাদের স্বাভাবিক । সেখান থেকে 
মন আমর! তুলতে পারি না, তত্বও চিন্তা করতে পারি না। যদি 
নিজে না পারা যায়, তাহলে সাহায্য নিতে হয়। পরোপকারী 
এবং বলবান হলেন সাধু-__সাধুসঙগ হলে গৌরগোবিন্দ বলবার 
সন্যোগ হল। 

সাধুসঙ্গ সাধুসঙ্গ সর্বশাস্ত্রে কয়। 

লবমাত্র সাধুসঙ্গে সবসিদ্ধি হয় ॥ 
ভগবানের জন্য আতির কীজ হল সাধুসঙ্গ । মহারাজ নিমির 
আশয় কি? যে ব্যক্তি দারিপ্রযক্লিষ্ট ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির, 


সে যদি সামনে অমৃত পায় তাহলে পান করতে যেমন বিলম্ব 
৫ 


৬৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


করে না, তেমনি সংসারদারিদ্র্যক্ি্ট আমি । অম্বতের মত 
আপনাদের আগমন হয়েছে- আমার কি সে অমৃত ভোজন 
করতে দেরী করা উচিত? আপনাদের স্থিতি তো গোদোহন 
কাল পর্যস্ত। তাই চরণ যে বেশীক্ষণ পাব সে নিশ্চয়তা নেই, 
তাই আর বিলম্ব করতে পারি না। 

আত্যন্তিক মঙ্গল কি? যে মঙ্গল এলে ভয় আর স্পর্শ 
করবে না । এ প্রশ্ন শুধু নিমিরাজের নয়, এ প্রশ্ন সর্বসাধারণের | 
এই আত্যস্তিক মঙ্গল কেমন করে লাভ হবে? ভাগবতধর্ম 
কাকে বলে? যে ধর্মের ফলে ভগবান হরি সন্তুষ্ট হয়ে নিজেকে 
পর্যস্ত দান করেন। আত্যস্তিক ক্ষেম এবং ভাগবতধর্ম--এ ছুটি 
পৃথক প্রশ্নের মত শোনাচ্ছে বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছুটি প্রশ্ন 
নয়__একই প্রশ্ব কেবল প্রকারভেদ মাত্র। ভাগবতধর্মই 
আত্যস্তিক ক্ষেম, যা থাকলে ভয় মোটেই স্পর্শ করে না । মঙ্গল 
বলতে তাকেই বুঝায় যাতে ভয়ের নিবৃত্তি হয়। এ জগতে 
স্থখের বস্তু মাত্রই কাটা-ফোটান আছে। পুত্র বিত্ত সবই 
' পরের; তাকে আপন করে আমরা কষ্ট পাই। পুত্র তো৷ চলেই 
ষায়, কিন্ত সেআঘাত দিয়ে যায়। চিত্তের সে ঘা আর শুখায় 
না। ভয় সর্বত্রই এক প্রকার। ভয়ের কোন জাতি নেই। ভয় 
মানে হারিয়ে যাওয়া । আত্যস্তিক মঙ্গল কখনও হারায় না। 
ভগবান গীতায় বলেছেন £ 

নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ে। ন বিষ্ঠতে। 
স্বল্পমপ্যন্ত্য ধর্মস্য আায়তে মহতো৷ ভয়াৎ ॥ গী. ২1৪০ 

ভক্তিধর্ম আরম্ভ করলেও তার ফল আছে, নাশ হবে না_ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৬৭ 


তক্তিধর্মে ত্রুটি নেই। অন্য ধর্ম কিন্তু হাজার নিখৃ'ত করে 
করলেও যদি সমাপ্ত না হয় তাহলে কোন ফল নেই, কিন্তু, হরি 
একবার বললেও তার ফল আছে । অজামিল তার সাক্ষী । 
ভগবন্ভজনধর্মই আত্যস্তিক মঙ্গল ৷ কর্ম, যোগ, জ্ঞান_ সবটাঁতেই 
ভয় আছে, বিভ্ব আছে-_ পথের পরিচয় জেনে তবে লোকে যেমন 
পথে অগ্রসর হয়। যদি শোনে পথ ভাল কিন্তু পথে কয়েকটি 
খুন হয়েছে, তবে আর সে পথে কেউ অগ্রসর হতে চায় না। 
তেমনি কর্ম, যোগ, জ্ঞান__এসব পথে প্রায়ই খুন হয়। সর্বজ্ঞ 
কোন দরিত্র ব্যক্তিকে তার গুপ্ত পিতৃধন পাওয়ীর উপায় 
বলেছিলেন । মাটির নীচে ধনের কলসী পৌতা আছে; কিন্তু 
দক্ষিণ দিকে মাটি খু'ড়লে ধনের কলমী তে। পাবেই নী, ভীমরুল 
দংশনের জ্বালা পাবে-_অর্থাৎ কর্মমার্গ অবলম্বনে নানারকম 
যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে । কখনও ব্বর্গে কখনও নরকে, কর্মফলে 
নান! গতি লাভ হবে এবং সেটি হবে ছুঃখের আকর। 
নানা যোনি সদা ফিরে কদর্য ভক্ষণ করে 
তার জন্ম অধঃপাতে যায়। 

পশ্চিমে যদি মাটি খোঁড় তাহলে এক যক্ষের হাতে পড়বে। 
সে বিত্ব করবে, ধন হাতে মিলবে না। এ ফক্ষস্থানীয় হল যোগ- 
মার্গ, অর্থাৎ যক্ষ যেমন ধন রক্ষা করে মাত্র। নিজেও ভোগ 
করতে পারে না, অন্যকেও ভোগ করতে দেয় না। তেমনি 
যোগমার্গে পরমাত্মারপে ভগবানকে যোগিগণ অনুভব করেন 
মাত্র কিন্ত নিজে শ্রীভগবানের মাধুর্য অন্থুভব করতে পারেন না 
এবং অন্তকেও করতে দেন না। আর উত্তরে মাটি খু'ড়লে 


৬৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


“আছে কৃষ্ণ অজগরে । ধন নাহি পাঁবে খুদিতে গিলিবে সবারে । 
কুষ্-অজগর স্থানীয় হল জ্ঞানমার্গ। যাকে কৃষ্১অজগরে গ্রাস 
করছে তার আর বেঁচে থেকে ভোগন্ুখ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই । 
এই রকম জ্ঞানমার্গ যাকে গ্রাস করেছে তার পক্ষে আর ভক্তি- 
স্থখ আম্বাদনের সম্ভাবনা নেই । তাই উপায় হল-_ 
পূর্বদিকে তাতে মাটি অল্প খুদিতে। 
ধনের জাড়ি পড়িবেক তোমার হাতেতে ॥ 

সর্বজ্ঞের বাক্যের তাৎপধ হল 2 দক্ষিণ দিকে সূর্যের গমনে 
তেজ মন্দ হয় এবং শীত উৎপাদন করে লোকের জড়তা এনে 
দেয়। এইরকম বিশ্বাসরূপ স্বধ দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ কর্মে গেলে 
তার তেজ মন্দ হয় অর্থাৎ তাঁর থেকে আর অগ্রসর হতে পারে 
না এবং কর্ম-বিশ্বাসী ব্যক্তি কর্ম-উপদেশরূপে শীত উৎপাদন করে 
লোকের জড়তা উৎপাদন করে। 

পশ্চিমে সর্ষের অস্তগমন কালে কেবল আলো মাত্র থাকে । 
কিন্তু স্বর্ষের তেজ কিছু থাকে না। এইরূপ বিশ্বাসরূপ স্থর্য 
যোগরূপ পশ্চিম দিকে অস্তমিত হলে ক্রমে তেজ বৃদ্ধি না 
হয়ে হাস হয়। 

উত্তরে সুমের পরতে সূর্য আচ্ছন্ন হলে ঘোর অন্ধকার সমস্ত 
জগৎ গ্রাস করে। এইরকম জ্ঞানমার্গরপ উত্তর দিগবর্তী 
বিশ্বাসরূপ স্ষ জগৎ অন্ধকারে আবৃত করে । 

পূর্বদিক হতে যখন প্রভাতে স্তর্যের উদয় হয়, তখন উদয় 
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার নাশ করে এবং ক্রমে ক্রমে হ্থর্যের 
তেজের বৃদ্ধি হয় - সর্ব জগৎকে প্রকাশ করে । এইবপ বিশ্বীসম্ূর্য 


নবযোগীক্দসংবাদ ৬৯ 


ভক্তিমার্গবপ পূর্বদিকে উদ্দিত হয়েই জগতের অন্ধকার নাশ 
করতে থাকেন এবং ক্রমে যত অগ্রসর হন, ততই তেজের বৃদ্ধি 
হয় এবং সমস্ত জগৎকে প্রকাশ করেন | কিন্তু সত্য উদয়ে পেচক 
প্রভৃতি কতকগুলি প্রাণী যেমন অন্ধ হয়, এইরূপ ভক্তি-বিশ্বাস 
নূর্যের উদয়ে কতকগুলি বহিমুখ জীব অন্ধ হয়। এইটিই দক্ষিণ 
পশ্চিম উত্তর পূর্বদিকে কর্ম, যোগ, জ্ঞান ও ভক্তির স্থান নির্ণয় 
করে প্রতিপন্ন করলেন । অতএব, 

এঁছে শাস্ত্র কহে কর্ম জ্ঞান যোগ রি) | 

ভক্তযে কু্ণ বশ হয়, ভক্ত্যে তারে ভজি ॥ 

অতএব ভক্তি কৃষ্ণপ্রাপ্তির উপায় । 

অভিধেয় বলি তারে সর্বশান্ত্রে গায় ॥ 

__ক্্ীচৈতগ্ঠচরিতামূত, বিংশ পরিচ্ছেদ 

অণিমা লঘিম! প্রভৃতি অষ্টসিদ্ধির কবলে পড়ে অথব৷ 
“সোইহংত “অহং ব্রহ্ষান্মি'--এই বুদ্ধিতে সাধক কৃষ্ণপাদপদ্প 
হতে বহু দূরে সরে যায়। এইটিই তার মৃত্যু । গৌরগোবিন্দ- 
পাদপদ্নভজনই একমাত্র নির্ভয়। মহারাজ নিমির প্রশ্ন 
আত্যস্তিক মল কাঁকে বলে? প্রথম যোগীন্দ্র কবি এর উত্তর 
দিলেন- প্রশ্ন হতে পারে কবি জবাব দিলেন কেন? প্রথম 
প্রশ্নের জবাব প্রথম যোগীন্দ্র দেবেন_ এইটিই বিধেয় ; কিন্তু 
দীপিকাঁদীপনকার এর একটি বিশেষ তাৎপর্য দেখিয়েছেন । “কবি, 
শব্দের অর্থ ধার সুক্ষ নিপুণ দৃষ্টি-_“কবিনিপুণদৃক্‌ বিদ্বান । এঁর 
কখনও ভ্রান্তি হতে পারে না--গৌরগোবিন্দপাদপদ্ন ছেড়ে 
আমাদের যে প্রতিষ্ঠার লোভ এইটিই আমাদের বুদ্ধির দোষ। 


৭০ নবযোগীক্রসংবাদ 


কাণাকড়ি দিয়ে যদি পরশমণি রোজগার করে আনা যায় তাহলে 
বাহাছুরি। আবার সেই পরশমণি যদি বুদ্ধিমানের কাছ থেকে 
আনতে পাঁর। যায়, তাহলে আরও বাহাছুরি। আমাদের দেহ 
কিন্ত কাণাকড়ির চেয়েও নিকুষ্ট, কারণ কাণাকড়ি তো পচে না। 
এ দেহ পচে যায়-_অন্তর্যামী পরমাত্বা ছাড়া দেহের কোন সত্তাই 
নেই। আমাদের দেহ যখন আর কারে! সেবায় লাগে না, 
একেবারে অপটু হয়ে যায়__-তখন আমরা বলি “গোবিন্দ, আমি 
তোমার । ভগবান বুদ্ধিমান--কাণাকড়ির মত দেহ দিয়ে 
যদি সেই বুদ্ধিমান ভগবানের কাছ থেকে চিস্তামণির চিন্তামণি 
ভগবানকে আদায় করে নিতে পারে তারই বুদ্ধির দাম। ভয়গ্রস্ত 
জীবকে নির্ভয় করার নামই প্রকৃত বিগ্ভাবত্তা ৷ সুতরাং ভাগবত- 
ধর্ম উপদেশদানই প্রকৃত বিদ্ভাবত্তার পরিচয় | কবি বিদ্বান, তাই 
তিনিই সেই বিছ্যাবস্তার পরিচয় দিয়ে ভাগবতধর্মের উপদেশ দান 
করছেন, যাতে ভয়কাতর জীব চিরতরে নির্ভয় হতে পারে। 
কবি উত্তর দিলেন £ 
মন্যেইকুতশ্চ্দ্ভয়মচ্যুতস্য পাদাম্বজোপাসনমত্র নিত্যম্‌ | 
উদ্বিপ্নবুদ্ধেরসদাত্মভাবাৎ বিশ্বীত্বনা যত্র নিবর্ততে ভীঃ॥ 

ভা. ১১২৩৩ 
এটি কবির মন্তব্য শ্লোক । তাই এর দাম খুব বেনী। 
কষ্ণপাদপন্প উপাসনাই একমাত্র নির্ভয়। গোবিন্দচরণের 
গন্ধ যেখানে সেখানে মৃত্যু যায় না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে এই 
উপান! করবে ? হরিভজনের অধিকারী কে? প্রেমানন্দদাসজী 
বলেছেন £ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৭১ 


শ্রীকৃষ্ণভজনে সবে অধিকারী কুলের গরব নাই। 

প্রেমানন্দ কহে যে করে গরব নিতাই মূরখ ভাই। 
জীবনে যে হরি বলতে পারে সে-ই উত্তম। বশিষ্ঠদেব 
ভগবান রামচন্দত্রকে বলেছেন, মাঘ মাসে প্রয়াগে গঙ্গাজীনে 
যেমন মান্ুষমাত্রেরই অধিকার, তেমনি হরিভজনে সকলেরই 
অধিকার । যোগীন্দ্র কিন্ত সে কথা শুনলেন না। তিনি 
অধিকারী বিচার করেছেন৷ প্রেমানন্দদাস বলেছেন _ শ্রীকৃ্ণ- 
ভজনে কুলের গরর নেই। বিছুর দাসীপুন্র, তার :তো কুলের 
গরব ছিল না। কিন্তু তিনি তো ভগবানকে পেয়েছিলেন । 
বিছুরপতীর কাছে ভগবান ক্ষুধার্ত হয়ে চেয়ে খেয়েছ্থেন। এখন 
প্রশ্ন, হতে পারে- শ্রুতি তো ভগবানকে অপিপার্স অজিঘৎস 
বলেছেন। তীর ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছু নেই। তাহলে আবাব তার 
ক্ষুধ। হয় কেমন করে? ভগবান গীতাবাক্যে বলেছেন £ 

অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরে ব চ। গীতা 1২৪ 

শ্রীবলদেব বিগ্ভাভূষণ মহাশয় গীতাভান্তে সমাধান করেছেন। 
ভগবানের ক্ষুধা আমাদের ক্ষুধার মত নয়। আমাদের ক্ষুধা 
প্রাকৃত প্রাণের বিকার । প্রাণবায়ু থেকে আমাদের ক্ষুধা 
পিপাস! ওঠে । তাই না খেলে আমাদের প্রাণ থাকে না। 
কিন্তু গোবিন্দের ক্ষুধা প্রাণবাযুর বিকার নয়। তার প্রাণ 
চিন্ময়, তাই না খেলে গোবিন্দের মৃত্যু হয় না, কারণ তার মৃত্যু 
নেই। জীব গোবিন্দের নাম করে মৃত্যু অতিক্রম করে, আর 
সেই গোবিন্দের মৃত্যু হবে কেমন করে ? চিদ্বস্তর ক্ষুধা, পিপাস। 
হয় না। তাই না খেলে মরে না; কিন্তু খেতে পারে না তা! 


৭২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


নয়। খেতে পারে, খাবার সামর্থ্য আছে। এ ক্ষুধা প্রেমের 
ক্ষুধা_আব্দার করে খাওয়ালে খায় । ভগবান স্বীকার করেছেন £ 

পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রষচ্ছতি । 

তদহং ভক্ত'পহৃতমন্্রীমি প্রযতাত্মনঃ ৷ গীতা ৯২৬ 
ভগবানের ক্ষুধ! ক্ষুধা নয়, তার ইচ্ছাই তার ক্ষুধা। যখনই 
যার কাছে খেতে ইচ্ছা করবেন তখনই খেতে পারেন । বিছবর- 
পরীর বাৎসল্য প্রেমকে লক্ষ্য করে ভগবানের খাবার ইচ্ছা 
হয়েছে। ভক্তিকে বুঝতে পারা যায় না। বিছুরপত্বী গোবিন্দ 
খুজতে বাইরে যান নি। তিনি তার প্রেম নিয়ে, ভক্তি নিয়ে 
কুটারে বসে ছিলেন গোবিন্দ খুজে খুঁজে আপনি এসেছেন । 
শ্রীপাদ রামদাসবাবাজী মহারাজ অনেক উচু স্তরেব কথা 
বলেছেন। গোবিন্দ লম্পট পুরুষ, রূপ ও যৌবনেরই দাম দেয়, 
অন্ত কিছুর দাম দেয় না। তাই ভাবভূষণে ভজনযৌবনে 
সেজে ঘরে বসে থাকলে লম্পট গোবিন্দ আপনি আসবে 
_ডাকতে হবে না। বিছুরপত্বী প্রেমে বিহবল হয়ে গোবিন্দকে 
কলার খোসা খাইয়েছেন। ভগবানেরও ভক্তদর্শনে আকুল 
চিত্ত_-তারও তুল হয়েছে__ভক্ত ভগবান-ছুজনেরই ভুল। 
তাহলে মহাজনের মতে ইন্দ্রিয় থাকলেই হরিভজন করা যায়। 
যোগীন্দ্র কিন্তু এখানে অধিকার নির্বাচন করলেন। ধারা 
জানেন যে এ বিষয়বিষ ত্যাজা, ত্যাগ করবার ইচ্ছাও তাদের 
আছে, অথচ ত্যাগ করতে পারছেন না, তারাই হরিভজনের 
অধিকারী ৷ 

যোগীন্দ্রের মন্তব্যবাক্য থেকে জানা যাচ্ছে-_ভয়নিবৃত্তির 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ৭৩ 


উপায়, একমাত্র অফ্যুতের পাদাম্বজ উপাসনা । আতান্তিক 
ক্ষেম, অর্থাৎ চরম মঙ্গল- যে মঙ্গলে ভয়নিবৃত্তি হয়। গোবিন্দ 
মহাভয়ের ভয়দীতা-_ ভয় চিকিংসকের খাতির রাখে না। 
অর্থাভাব, পুত্রহারানো, ব্যাধি, লাঞ্কনা, অপমান কত রকমের 
ভয় আমাদের ঘিরে রেখেছে । মৃত্যুই হল প্রধান ভয়, অন্যান্য 
ভয় হল খুচরো তয়। জগতে সবত্র তো ভয়। এখানে আমর! 
অভয়কে পাব কেমন করে? কাটার শযায় শুয়ে যেমন তুলোর 
গদির স্থখ আশা করা যায় না, এ জগৎ হল কাট্রীর রাজ্য । 
এখানে এই ভয়ের রাজো, মায়ার রাজা, আমরা অত্তয় চাইছি। 
কেমন করে তা সম্ভব হতে পারে? অভয় চাওয়া আমাদের 
জন্মগত অধিকার । কারণ আমরা অভয়ের অংশ |; এই অভয় 
লাভ করার একটাই উপায়। ভগবানের সঙ্গে দাস-প্রভু 
সম্বন্ধ করতে পারলেই, ভয় পালাবে, অভয় আসবে । বলবানের 
আশ্রয় নিয়েছে জানতে পারলেই তুর্বল সরে যায়। মায়ার 
হাত হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটাই উপায়। ভগবান বলেছেন, 
“মামেব ষে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরস্তি তে । মায়া জ্ঞানের 
খাতির রাখে না, খাতির রাখে শ্রীকৃষ্ণপাদপন্মে শরণাগতির | 
তাই শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর মশাই বলেছেন £ 
গৃহে বা বনেতে থাকে হাঁ গৌরাঙ্গ বলে ডাকে 
নরোত্তম মাগে তার সঙ্গ । 

একান্ত বিপদে পড়লে মানুষ যেমন শরণাগত হয়, তেমনি করে 
শরণাগত হতে হবে। করাগারে যার থাকে তারা মনে করে 
বেশ আছি । আমরাও মহামায়ার কারাগারে থেকে ভাবি এ 


৭8 নবযোগীন্দ্রসংবাদ 
কারাগারে আমর! বেশ আছি । আমাদের আত্যস্তিক উপায় 
নেওয়া হয় নি। শ্রীপাদ রামদাসবাবাজী মহারাজ বলেছেন__ 
“গৌরগোবিন্দ তো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে গো, বসতে জয়গ। পায় 
না। আমাদের কামনার ডাক ওতে আসে আসে ফিরে ষায়, 
বসবার আসন পায় না। গৌরগোবিন্দ তো যে কোন আসনে 
বসেন না বাসনানিমুক্ত হৃদয়-আসনেই তারা বসেন ।' কৰি 
যোগীন্দ্র তাই বলেলন কৃষ্ণপাদপল্পভজনই অভয় অবস্থা পাওয়ার 
একমাত্র উপায় । 

দেহেতে আত্মবুদ্ধি এবং দৈহিক মমত্ববুদ্ধি_“আমি' “আমার” 
_এই আসক্তি আমাদের মজিয়ে রেখেছে । আমরা সুস্থ ও 
স্বন্দর থাকতে চাই-যাতে করে আরও ভাল করে বিষয় ভোগ 
করতে পারি । ভজনের জন্য যদি এটি চাইতাম তাহলে ভালই 
হত। আসক্তি যে নরকে নিয়ে যায়, এ বোধ যাদের পাকা 
হয়ে গেছে, ত্যাগ করবার জন্য চেষ্টাও করছে কিন্তু পেরে উঠছে 
না, "স্বভাবের তুরবলতাঁয় ত্যাগ করতে পারছে না, এরা হল 
উদ্িপ্নবুদ্ধি। ভগবান উদ্ধবজীকে বলেছেন,_- 

ন নিবিপ্লো নাতিসক্তো ভক্তিযোগোইস্ত সিদ্ধিদঃ | 
ভা. ১১২০৮ 

যারা অতিনিধিন অর্থাৎ বৈরাগ্য করেছে, তারা৷ ভক্তিযোগের 
অধিকারী নয়। আর অত্যন্ত বিবয়াসক্ত যে সেও ভক্তিযোগের 
অধিকারী নয়। বৈরাগ্যবানের বৈরাগ্য করেছি বলে অভিমান 
থাকে । তাই ভক্তিমহারাণী তাকে কৃপা করেন না । নিজেকে 
দীন বলে ভাবতে না পারলে ভক্তিমহারাণীর কৃপা মেলে না! 


নবধোগীন্দ্রসংবাদ ৭৫ 


ত্যাগ করতে পারছে না, অথচ ত্যাগ করা উচিত, সেজন্য 
নিজেকে অসহায় ভাবছে । তারই ভক্তিযোগে অধিকার । যার 
এক লক্ষ টাকার এক্ষুনি দরকার, অথচ মাত্র দশহাজার টাকা 
আছে, তার কাছে লক্ষ টাকার প্রয়োজন যেমন দশহাজার টাকার 
কিছু দাম আছে বলে মনেই করতে দেয় না তেমনি সম্পদ, রূপ, 
বিদ্য। পাণ্ডিত্য যা কিছুই থাকে না কেন, ত৷ দিয়ে যদি হরি ন! 
মেলে তাহলে তার কোন দামই নেই । একজন লোককে ঘরে বন্ধ 
করে বাইরে থেকে দরজায় তালা দেওয়া হয়েছে। ঘরে বন্দীদশায় 
ঘরের মেঝেতে দেখ। গেল একটি কালসাপ বেরিয়ে তাকে তাড়া 
করেছে__এই অবস্থায় সেই লোকটির যে উদ্বেগ, আসক্তির ঘরে 
আমরা চাবিবন্ধ আছি এদিকে মৃত্যুরূপ কালসাপেক্প তাড়া__এ 
উদ্বেগ যার জীবনে হয়েছে সেই হরিভজনে মুখ অধিকারী । 
হরিভজনে সবে অধিকারী আগে বলা হল, তবে আবার মুখ্য 
অধিকারী বিচার করা হল কেন? কোন বিষ্ভালয়ে সকল 
রকম জাতির ছাত্রই ভতির অধিকার পায়, তার মধ্যে যদি 
কোন ব্রাহ্গণের ছেলে ছাত্রহিসাবে ভন্তি হতে আসে তাহলে 
কিসে ভাল অধিকারী বলে বিবেচিত হবে না? শ্রীবলদেব 
প্রমেয়রত্বাবলীতে বিচার করেছেন-_-জ্ঞানবৈরাগ্যপূর্বা চেৎ ফলং 
সঃ প্রকাশয়েৎ । জ্ঞান বৈরাগ্য নিয়ে যদি কেউ কৃষঞ্জভজন 
করে সে হবে উত্তম অধিকারী, তার ফল তাড়াতাড়ি পাবে। 
ভক্তিকে স্থুসমিদ্ধ অগ্নি বলা হয়েছে । জলে ভেজান কাঠে 
আগুন তাড়াতাড়ি জ্বলে না। রোদে শুকাতে পারলে সে কাঠে 
তাড়াতাড়ি আগুন ধরে। তেমনি ছূর্বাসনা জলে বদি হৃদয় 


৭৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


দিক্ত থাকে, তাতে ভক্তি-অগ্নি তাড়াতাড়ি জলবে না । ধোৌয়াকে 
ধুইয়ে ধুইয়ে বিষয়রস মরিয়ে তবে তাতে অগ্নি জ্বলবে | বিষয়- 
রসলালসায় সিক্ত হলে সে হৃদয়ে ভক্তি কাজ করতে দেরী হবে । 
বৈরাগ্য-অগ্নিতে শুকালে তাড়াতাড়ি ভক্তি-অগ্নি জ্বলবে । আমরা 
ভক্তি যাজন করি কিন্তু কাজ পাই না বলে আক্ষেপ করি । 
কেমন করে কাজ হবে? ইচ্ছামত তেলেভাঁজা! খেলে যেমন 
হজমিগুলির ক্রিয়া হয় না এখানেও তেমনি শ্রীগুরুদেবের দেওয়। 
মন্ত্র হল হজমিগুলি, আর প্রাকৃত ভোগস্থখ হল তেলেভাজার 
মত কুপথ্য । ভজন বুঝতে হলে পাকস্থলী হালকা করতে হবে । 
মায়াব্যাধির ওষধ হল কৃষ্ণবলা। "জ্বরাদৌ লজ্ঘনং পথাম্+_ 
নিদানে বলা আছে । খেলে ফল পেতে দেরী হবে-উপবাস 
দিলে ফল তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে। এখানে উপবাস হল 
মায়িক ভোগ তাগ । এই ত্যাগ যে যে পারিমাণে পারে সে তত 
তাড়াতাড়ি ফল পায়। আমরা যে ফল পাই না তাঁর কারণ 
হল, আমরা উপবাস দিতে পারি না, অর্থাৎ মায়িক বস্ত ত্যাগ 
করতে পারি না। উদ্ধবজী ভগবানকে বলেছেন, তুমি তো পাকা 
চিকিৎসকের মত কলিজীবকে চিকিৎসার বিধান দিলে, সব 
বিষয়বাসন! ত্যাগ করে আমাকে ভজ | কিন্তু কলিজীব তো তা 
পারবে না। জীব তোমার মত চিকৎসকের কাছে যাবে না। 
অর্জুনকে তে তুমি বলেছ,_“সবধর্মান্‌ পরিত্াজ্য মামেকং শরণং 
ব্রজ-কিন্তু কেউ তা শোনে নি। সর্বধর্মীন্‌ পরিত্যজ্য পর্যস্ত 
শুনেছে, কিন্তু পরের অংশটি আর শোনে নি। উদ্ধব জিজ্ঞাসা 
করছেন, তুমি যে চিকিৎসার উপায় বললে তার বিকল্প নেই? 


নবষোগীন্দ্রসংবাদ ৭৭ 


ভগবান বললেন, বিকল্প আমি তো৷ কিছু জানি না। তবেতুমি 
তো! শাস্ত্রবিদ্‌--পরামর্শদাতা? মন্ত্রী, তুমি কোন উপায় জান তো 
বল, ঠিক হলে আমি সম্মতি দেব। উদ্ধব বললেন জীব তো 
বিষয় ভোগ না করে পাববে না। তা সেই বিষয় যদি 
তোমার অধরামূত করে গ্রহণ করে তাহলে হবে না % ভগবান 
বললেন, হ্যা, তা হবে -এর দ্বারা মায়া জয় হবে, কিন্তু এরকম 
বিষয়ভোগে যেন কপটতা না থাকে । বিষয়ভোগ করবার 
নিজের ইচ্ছা, তাই ভগবানের চরণে স্পর্শ করিয়ে নিলাম, 
এরকম করলে হবে না। ভগবানকে ফাকি দেওয়া যায় না। 
নিজের কাছেই নিজেকে বঞ্চক হতে হয়। একমাত্র প্রসাদের 
দ্বারা জীবনধারণ করলে তবে তাঁকে ত্যাগী বলা হযে ৷ যোগীন্দ্ 
বলছেন, কৃষ্ণপাদপদ্ন উপাসনা! করলে বিশ্বাত্বনা অর্থাৎ সাকল্যে 
ভয় নিবৃত্তি হবে। শ্্রীজীবপাঁদ বলেছেন- বিশ্বাত্মনা শব্দটি 
ব্যাপক । গোস্বামিপাদগণের ব্যাখ্যায় যোগীন্দ্রের কথা বুঝা 
যাবে। তা না হলে "ভাগবত পড়িয়াও কারে বুদ্ধি নাশ" । 
গৌরগণের কথা বুঝতে হবে । গৌরগণ হলেন ভাগবতদর্শনের 
চশমা । এই চশম। ধারণ করলে তবে আমাদের বুদ্ধি শুকবাক্য 
নেবে । “বিশ্বাত্মনা” অর্থাৎ সাধন অবস্থাতেও ভয় নিবৃত্তি হয়। 
অন্য সাধনে সাধনকালে ভয়নিবৃত্তি নেই । সিদ্ধি হলে ভয়নিবৃত্তির 
ব্যবস্থা । মহাজন বলেন, জ্ঞান কর্ম যোগ- এরা পুরুষ জাতি, 
তাই হিসাব রাখেন । সাধক সাধন করে যাবে, সিদ্ধিকালে ফল 
পাবে, কিন্ত ভক্তিমহারাণী স্ত্রীজাতি। তিনি অত হিসাব রাখতে 


৭৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


পারেন না_তাই নগদ নগদ দেন। আজই গৌরগোবিন্দ বললে 
আজই তার ফল পাওয়া যাবে । 

ভাগবতধর্মের লক্ষণ করেছেন প্রথম যোগীন্দ্র কবি- ভগবান 
নিজে যে ধর্মের কথা বলেছেন, অন্য কারে দ্বারা বলান নি, তার 
নাম ভাগবতধর্ম আর নিজেকে পাওয়ার জন্য যে ধর্ম বলেছেন, 
তার নাম ভাগবতধর্ম। জীব অনাদি কৃষ্ণ-বিমুখ। তাই 
ভাগবতধর্ম কোনদিনই নেবে না, তাই ভগবান তাঁর উপায় নিজে 
চিন্তা করেছেন। মন্থু প্রভৃতি খষির মুখে বর্ণ ও আশ্রম ধর্ম 
সম্বন্ধে ভগবান বলিয়েছেন,কিস্তু মন্ধু প্রভৃতি বক্তাও স্বাধীন নন। 
তারাও ভগবানের আদেশে বক্তা | কিন্তু সদ্ধর্ম অত্যন্ত গোপা বলে 
ভগবান নিজে বলেছেন, যেমন কোন কৃতি পুরুষ অন্ন ব্যঞ্জন অন্য 
লোক দিয়ে পরিবেশনকরান,কিস্তু পরমান্ন মিষ্টান্ন নিজেপরিবেশন 
করেন। কারণ এটি একটু হিসেব করে দিতে হবে। ভাগবত 
ধর্ম ভগবান নিজেই প্রথমে বলেছেন। কালের প্রবাহে বেদশাস্ত্র 
লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল । ভাগবান মীনরূপে সে বেদ উদ্ধার করেন । 
যে বাণীতে মদাত্মকধর্ম আছে, আর্থাৎ ভগবান যেখানে আত্মা 
বা স্বরূপ হয়ে আছেন-_এই বাণী লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল । ভ্গবানই 
তাকে উদ্ধার করেন। এই মদাত্বক বাণী বলতে ভক্তিধর্মকেই 
বুঝায়। জ্ঞান যোগ, কর্ম, কোনটির সঙ্গেই ভগবানের সম্পক 
নেই, শ্রবণকীর্তনময়ী ভক্তির সবটাই ভগবান । প্রতিটি অঙ্গের 
সঙ্গে ভগবান ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছেন। তাহলে 
ভাগবতধর্মের লক্ষণ হল ছুটি ; (১) ভগবৎপ্রাপ্তির জন্য বলেছেন, 
€২) ভগবান নিজে বলেছেন । ভক্তিধর্ম ছাড়া ভগবৎপ্রাপ্তি হয় 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ৭৯ 


না, ভক্তি দ্বারা ভগবান যে ভাবে প্রকাশিত হন এমন আর কোন 
সাধনে হয় না । ভগবান উদ্ধবজীর কাছে বলেছেন-_“ভক্ত্যাহ- 
মেকয়। গ্রান্ঃ । গীতাতেও ভগবান বলেছেন £ 

ভক্ত্যা মামভিজানাঁতি যাঁবান্‌ ষশ্চাম্মি তত্বতঃ| গী. ১৮৫৫ 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ধার! ভাগবতধর্ম অবলম্বন করেন--তারা কি 
ভাবে ভগবান পাবেন ? যোগীন্দ্র বললেন, অনায়াসে পাবেন। 
কে পাবে? অবিদ্বান যে সেও পাবে । অবিদ্বানেরই হয, বিদ্বানের 
হয় না? বল। হয়েছে ? 

কুমতি তাফিকগণ অধম পড়ুয়াজম__ 
তার৷ জন্মে জন্মে ভকতি বিমুখ । 

পণ্ডিতের ভক্তি হয় না কারণ, তারা নিজেদের 'পাণ্ডিত্যের 
অভিমান ত্যাগ করে বৈষুবের চরণতলে বিকাতে পারেন না । 
শাস্্ বলেছেন--ভক্তকৃপানুগামিনী ভগবতকুপা"। দেবতাদের 
ভোজন যেমন দ্বৃতগন্ধি হতেই হবে, তেমনি দেবতার দেবতা 
শ্রীগোবিন্দের কাছে এই দেহনৈবেছ্য উৎসর্গ করতে হলে তাতে 
ভক্তকূপারপ ঘ্ৃৃতগন্ধ থাকতেই হবে । এই ভক্তকৃপাগন্ধ দেহে 
না থাকলে গোবিন্দ তা গ্রহণ করেন না। মায়া নানা পদমর্যাদা 
দিয়ে আমাদের আটকে রেখেছে । অভিমানের বেড়া ভেঙ্গে 
সাধুর চরণে লুটাতে পারলে তবে কৃপা লাভ হবে। নিরন্তর 
অনুশীলন করতে হবে । গোবিন্দ জীবকে দেখে ভাবেন মায়ার 
দেওয়া উপহারে ভুলে আছিস্‌? ধন আছে তার সং ব্যয় কর, 
'সাধুসেবা কর। বিদ্যা আছে-_সে বিষ্ভা বিনয়ভূষণে ভূষিত কর, 
“বিষ্া দ্ধাতি বিনয়ম্ঠ । জীব যতক্ষণ অভাবগ্রস্ত না হবে 


৮০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ততক্ষণ কৃপা প্রার্থনা করবে না। বিষ্ভা, ধন, রূপ, যৌবন, 
আভিজাত্য যত কিছুর অভিমানই থাকে না কেন, সব অভিমান 
এপার পযন্ত, ওপারে কোন অভিমান যাবে না। নৌকায় 
উঠবার আগে পাথেয় সঞ্চয় করে নিতে হবে, নৌকায় উঠে 
পাথেয় খু'জলে হবে না। কর্মময় নদীকেই ভবসাগর বা বৈতরণী 
বল। হয়েছে । সাগরে যেমন নিরস্তর হাঙর কুমীরের দংশন, 
তেমনি জীবের নিত্যবাসনার দংশন | ভাগবতধর্মের এই ছুটি 
লক্ষণে স্বরূপলক্ষণ ও তটস্থলক্ষণ বিচার কর! হয়েছে । স্বরূপলক্ষণ 
অর্থাৎ যার পরিবর্তন হয় না, আর তটস্থলক্ষণ হল যার পরিবর্তন 
হয়। ভাঁগবতধর্মের যে ছুটি লক্ষণ কর! হয়েছে তাতে ভগবান 
বলেছেন_-এটি তটস্থ লক্ষণ। কারণ ভগবান ছাড়া আরও 
অনেকে বলেছেন, যেমন প্রহ্নাদ বলেছেন, আর ভগবংপ্রাপ্তির 
জন্য 'ভাগবতধর্ম_এই যে লক্ষণ করা হয়েছে, এটি স্বরূপ- 
লক্ষণ অর্থাৎ এটি অব্যভিচারী লক্ষণ, আর্থাৎ এর কখনও 
ব্যতিক্রম হয় না। ভাগবতধর্মকে আশ্রয় করলে ভগবৎপ্রাপ্তির 
কখনও ব্যতিক্রম হয় না। তাই এটি স্বরূপলক্ষণ। 

ভাগবতধর্মের মহিমা প্রসঙ্গে যোগীক্দ্র বলেছেন- যিনি বিশ্বাস 
করে এই ভক্তিধর্ম যাজন করেন তিনি কখনও গবিত হন না। 
কারণ গর্বস্থানে ভক্তি থাকেন না__দৈন্য-আঁসনে ভক্তির স্থান। 
মহাজন বলেছেন_-যে জন কৃষ্ণ ভজে সে বড় চতুর” কর্ম, 
যোগ, জ্ঞান, গর্বেই নষ্ট হয় তাই ভক্তি দেখেন আমারও 
যদি গর্ব থাকে তাহলে আমিও বিনাশ পাব। তাই ভক্তিতে 
আর গর থাকে না। ভগবান কখনও কারও গর্ব সহ্য করেন 


নবযোগীন্্রসংবাদ ৮১ 


না। গোপীর যে কৃষ্ণের প্রিয়তমা, সেই গোপবালাদের গবও 
কৃষ্ণ সহা করতে পারেন নি। গোপীদের যে গর্ব সে হল কৃষ্ণ 
পাওয়ার গর । কিন্তু কৃ পেলেও গর্ব করা চলবে না । 
গব হলেই কৃষ্ণ সরে থাকেন। এই গর্রোগ সারানোর 
জন্য কৃষ্ণ চিকিৎসা করলেন। মূর্খের গর্বই হয়। ভাগবতধর্ম 
যিনি যাজন করেন তার অসতর্কতা বিদ্ব হয় না। গৃহস্থ 
জেগে থাকলে যেমন চোর ঢুকতে পারে না॥ তেমনি 
সাধকও যদি সাধনরাত্রিতে জেগে থাকেন, তাহলে অপরাধ 
চোর ঢুকতে পারে না। কর্মী, যোগী, জ্ঞানী সকলেই বিদ্বের 
দ্বারা অভিভূত হয়। তপম্বী বৈরাগীও বিদ্বিত হয়। কিন্তু 
ভক্তিধর্মে বিদ্ধ প্রবেশের স্থান নেই। কর্মমার্গে স্বরবৈগণ্য 
দেখা দিলেই বিদ্ব, বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে গিয়ে যদি 
স্বরে একটু উচ্চারণে ক্রটি ঘটে, তাহলে অনর্থের স্থষ্টি হয়। 
যেমন বৃত্রাস্ুরের পিতার মন্ত্র উচ্চারণে ত্রুটি থাকায় বৃত্রান্থর 
নিজেই নিহত হলেন । যোগের পথে অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি পথের 
দূরত্ব ঘটায়, অর্থাৎ কৃষ্ণপাদপদ্মে পৌছতে দেরী হয়ে যায়। 
জ্ঞানমার্গে ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে মায়িক বলে মনে করে_ তাতে 
অপরাধ হয়। এইটিই বিদ্ব স্থষ্টি করে। তপস্বীরও গর্ব আছে 
_ হ্ুর্বাসা, বিশ্বামিত্র প্রভৃতি খষি গবিত | জ্ঞানাগ্নি দ্বারা কর্ম দগ্ধ 
হয়ে গেলেও অপরাধরূপ স্ুবৃষ্টিপাতের ফলে আবার কর্মের 
(পাপের) অঙ্কুর জন্মায়। যেমন তক্ষকের দংশনে নধর বটবৃক্ষ 
তন্মীভূত হলেও ধ্ব্বস্তরী দ্বারা সেটি পুনরায় সঞ্ীবিত হয়। 
শ্রীমন্মহাপ্রভূ বলেছেন__প্রাকৃত করিয়া মানে বিষণ্ণ কলেবর, 


ঙ 


৮২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


বিষু নিন্দা আর নাহি ইহার উপর” । বৈরাগোও বিশ্ব আছে। 
বৈরাগ্য করে প্রসাদ গ্রহণ করে না, অর্থাৎ প্রসাদে চিন্ময় বুদি 
করে না ত্যাগ কিসের জন্য ? কৃষ্ণপাদপন্ধে প্রেমলাভের জন্য 
কিন্তু ত। আর তাদের হয়ে ওঠে না । শেষ পর্যস্ত প্রেম অন্ুরাগও 
শোষণ হয়ে যায় বৈরাগ্যং রসশোষণম্‌ । কায়মনোবাক্যে দীন 
হতে হবে, মুখেও দীনতা। রাখতে হবে । মুখে দীনতা করতে 
করতে অন্তরে দীনত। আসবে--ওপরে মলম লাগালে 'যেমন 
নীচে হাড়ের ব্যথা ভাল হয় । হরিভজনে বিদ্ব বলে কিছু নেই। 
ভক্তিরজ্ভ্ব দিয়ে ভক্তগণ ভগবানের চরণের সঙ্গে নিজেদের বেঁধে 
রাখে- তাই তার! কখনও ভ্ট হয় না। 

ভক্তিবাজনে সবে অধিকারী--তাঁই বলে ভক্তি সস্তা নয়। 
হরিভক্তি মুক্তজনেরও প্রাথিত বস্ত । বাক্য আছে ঃ 

“মুক্তা অপি লীলয়। বিগ্রহং কৃত্বা ভগবস্তং ভজস্তে ৷ 

ভগবদর্শনের পর গ্রন্থি ছিন্ন হয়ে যায়। বেদাদি শান্ধে 
ভগবান বিধিনিষেধের জাল দিয়ে রেখেছেন । এইজন্য বেদকে 
ঈশতন্ত্রী বল! হয়। জীবমংস্তকে ধরবে বলে। জাল থেকে 
মাছ পালতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা হয়। এখানে শাস্ত্ের 
বিধিনিষেধে যাতে জীব আটকে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হয়। 
বিষয়প্রীতির নামই গ্রন্থি, এরই নাম অহংকারগ্রন্থি, এরই নাম 
হৃদয়গ্রন্থি। ভক্তি যে অহৈতুকী-_-এটি যার প্রয়োজন বোঁধ 
নেই সে বুঝতে পারে না; যার প্রয়োজন আছে সে বোঝে । 
হরিনামের কাছে কিছু চাইতে নেই। হরিনাম প্রেমরত্ব দিতে 
পারে। কিন্তু আমরা তো! চাইতে জানি না। আমরা সেই 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ৮৩ 


ভূরিদাতার কাছে বিচুলি চেয়ে বসব। জীবের স্বভাব দ্বিতীয় 
বন্তকে নিয়ে আনন্দ করা। পুত্র, অর্থ, খাস্, পানীয়, শয্যা, 
আত্মীয়, মর্ষাদা, লাভ, পুজা, প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি দ্বিতীয় বস্তু না হলে 
আমাদের আনন্দ হয় না। কিন্তু আত্মাতে যারা রমণ করে, 
তারা কোন দ্বিতীয় বস্তু স্পর্শ করে না। এ জগতে আত্মারাম- 
তার একটু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যখন আমর! আয়নায় নিজের 
মুখ দেখে আনন্দ পাই, তখন সেখানে আর দ্বিতীয় বস্ত কিছু 
নেই। নিজেই নিজের মুখ দেখে আনন্দ পাই, তাই অনেকক্ষণ 
ধরে দেখেও আশা মেটে না । কিন্তু আর কোন উদাহরণ জগতে 
নেই বলেই এটি নেওয়া হল। তা না হলে এটিও ঠিক উদাহরণ 
হয় না। কারণ আয়নায় যে মুখের দর্শন হয়, সেও মায়ার মুখের 
দর্শন । প্রকৃত যে 'আমি' তাকে দেখা হয় নি। কৃষ্ণভক্তির 
আয়নাতেই একমাত্র নিজেকে দর্শন হয় । জীবের স্বভাব নিতা- 
শদ্ধবুদ্ধমুক্ত-_সচ্চিদানন্দময় আত্মা যখন জ্ঞান বা যোগের 
আয়নায় উপলব্ধি কর হয়, তখনই আত্মারাম হয়। জ্ঞান, যোগ 
যত সাধনেই আত্মোপলন্ধি হোক না কেন, কৃষ্ণতক্তি আয়নায় 
যেমন আত্মোপলব্ধি হয়, এমন আর কিছুতে হয় না। তাই 
আত্মারাম মুনি শুকদেবও কৃষ্ণগুণে আকৃষ্ট হয়েছিলেন । মুড়ি 
থেকে পি'পড়ে ছাড়াতে গেলে পাশে মধু রাখতে হয়। কিন্তু 
আমাদের মন-পিপড়ে কিছুতেই বোঝে না । বিষয়-মুড়ি ছেড়ে 
সে কিছুতেই আসতে চায় না। পাশেই গৌরগোবিন্মভজন-মধু 
রয়েছে । কিন্তু বিষয় ছেড়ে মন আমাদের ভজনে কিছুতেই যায় 
না। এ বোধ আমাদের মনে আজও হয় নি। 


৮৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


হরি, হরিনাম, হরিভক্ত জগৎ মরুর আশ্রয় । তাই হরিকে, 
হরি কথাকে, এবং হরিভক্তকে সমান মর্ধাদা দিতে হবে। 
নিজের যদি সামর্থ না থাকে তাহলে পেট ভরাবার জন্য যারা 
খায়, তাদের কাছে হাত পাততে হয়। তেমনি ধীরা ভজন- 
খাগ্যে ভরপুর, নিরস্তর ভগবংপ্রেমামৃত আস্বাদন করছেন, তাদের 
কাছে কাঙালের মত হাত পাততে হবে। কাঙালের চেহারা 
চোঁখে, মুখে, হৃদয়ে, বেশভূষায়, আচারে-ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলতে 
হবে। তাহলে তাদের করুণা হবে। কারণ মরবার পরের পেট 
হরিনাম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভরবে না। অপরাধের জন্যই 
একমাত্র বস্তু পাওয়া আমাদের কাছে কঠিন হয়। পরমার্থের 
ভিক্ষুক আমরা । হরিভক্তি সাধনে মেলে না । আমাদের সাধন- 
সামর্থ্য তো নেই-ই, আর কেউ এ সম্পদ দানও করবে না । তাই 
যার! আস্বাদন করেন তাদের পায়ের তলায় কুকুরের মত পড়ে 
থাকতে হবে। নিঞ্ষপট হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে । বৈষ্ণব 
হলেন সবজ্ঞ, তারা হৃদয় বুঝে কপ! করবেন। 

ভজনের অঙ্গের লঙ্ঘন করা যেতে পারে কিন্তু ভজন লঙ্ঘন 
করা যাবে না । এইটিই যোগীন্দ্রের বাক্যের তাঁৎপর্য। সাধন- 
পথ নির্ণয় করা বড় কঠিন। নিজে বুদ্ধি করে ওষধ খেলে 
রোগের যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না। চিকিৎসক যদি ওষধ 
বেছে দেন তবেই রক্ষা। তেমনি শাস্ত্র হল ওষুধের আলমারি 
জীব ভবরোগী। শ্রীগুরুদেব বিজ্ঞ চিকিৎসক, তিনিই পথ 
নির্ণয় করে দেবেন । ভগবানের উপাসনার নামই ধর্ম । ভগবানে 
অপ্িত সর্বকর্মই ভাগবতধর্ম_-এ কথাটি ছুই অর্থে বিচার করতে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৮৫ 


হবে| কায়মনোবাক্যে যা কিছু করা যায়, সব ভগবানে অপণ 
করলে তার নাঁমই ভাগবতধর্ম। ভগবান গীতাবাক্যে বলেছেন £ 
যৎ করোষি যদশ্বাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ। 
যৎ তপস্তাসি কৌস্ত্েয় ত করুষ মদর্পণম্‌ ॥ গীতা ৯২৭ 
য|করবে কর, আপত্তি নেই। সব কিন্তু নারায়ণে অপণ 
করতে হবে। এই অর্পণ দ্বারে ভগবানের সঙ্গে একটু সম্বন্ধ 
করার অভ্যাস হবে । দিন দিন একবার করে গোবিন্দপাদপন্ম 
তো! চিন্তা কর হবে। তাতেই পাপক্ষালন হবে। ওই রকম 
করতে করতে কর্সের করতৃত্বাভিমান কমবে । প্রতিদ্দিন অপণ 
করতে করতে মনে হবে, এমন কুৎসিত কর্ম ভগবানে অপ্পণ 
কর! ঠিক হবে না । এই বিবেক যখনই জাগবে, তখনই'সে সাধুর 
কাছে যাবে। তার ফলে গুরুপদাশ্রয় হবে। গোবিন্দভজন 
নিখুত করে করতে হবে । কর্ম, জ্ঞান, যোগ খাঁটি নয়। তাই 
শুদ্ধাভক্তির লক্ষণ শ্রীল রূপগোস্বামিপাদ করেছেন--চ্গান- 
কর্মাগ্নাবৃতম্” । ভজনে কোন কামনা! মেশান চলবে না। গৌর- 
গোঁবিন্দপাদপন্ন ছেড়ে কামনা অন্যত্র গেলেই তার নান কপটতা। 
এই কপটতা অজ্ঞানতার ফলে হয়। অজ্ঞান বলেই আমরা 
গৌরগোবিন্দ ছেড়ে অন্য বস্ত্র চাই। যোগীন্দ্র ভাগবতধর্মের যে 
লক্ষণ করলেন, শ্ীজীবগোস্বামিপাদ বলেছেন, এটি ভক্তিধর্মে 
প্রবেশের ধা । দরজাকে তো ঘরই বলতে হবে; অতএব 
এটিও ভাগবতধর্ম । শুভ-অশুভ যে কোন কর্ম করা যাক ন৷ 
কেন, কোন নিষেধ নেই । এতদিন কর্ম করে যেত, আজ নৃতন 
করে অর্পণ করতে শিখল । কিন্তু কর্মার্পণের এমনই মহিমা! যে 


৮৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


অর্পণকারীর চিত্ববৃত্তির পরিবর্তন ঘটবেই । অর্পণ করতে করতে 
মনে হবে, ভগবানকে অর্পণ করছি । তাকে কি খারাপ জিনিষ 
দেওয়া চলে? তখন তার স্বভাবের সঙ্গে ঝগড়া চলতে থাকে। 
যে ফুল দেবতার পূজায় চলে না, সে ফুল তুলে লাভ কি? 
শ্রীচক্রবত্তিপাদ বিচার করেছেন, দস্তধাবন, স্নান, গাত্রমার্জন 
প্রভৃতি শারীরিক চেষ্টা ভাগবতধর্ম কেমন করে হবে? বিষয় 
ভোগের জন্ত লোকে এই সব করে । এর ওপরে যাগযভ্ঞাদি 
করবার জন্যও এসব কায়িক কাজ করে, আবার ভক্তজনেরও এ 
শারীরিক চেষ্টা দেখা যায় কৃষ্ণ আরাধনার জন্ত । কৃষ্ণ আরা- 
ধনার জন্য করে বলেই এর নাম ভাগবত ধম | যে ব্যক্তি সেবার 
জন্য ফুল তুলে দেয়, মাল। গাঁথে বা চন্দন ঘষে, যে গাভী সেবার 
জন্য ছুধ দেয়--এরা সকলেই ভক্তির অংশ পারে । সকলে তে 
সব কাজ করতে পারে না। যে করে তার আনুকুল্য করতে 
পারলেও লাভ আছে । কুষ্*-আরাধনার জন্য যদি পুত্রোৎ্পাঁদন 
চেষ্টা হয় তাহলে সেটিও ভাগবতধর্মের মধো পড়বে । ভগবৎ- 
ভজ্ন-গ্ীতিই মেরুদণ্ড । এর থেকে সরে এলে চলবে না । 
সংসার থেকে ভাক্তের ভীত হবার কোন কারণ নেই। 
অপুবদেহেন্দ্িয় সংযোগের নামই সংসার । যেমন বনের পাখীর 
খাচার সঙ্গে সংযোগ হয় । এইটিই আসল সংসার । আর স্ত্রী 
পুত্র নিয়ে বাস হল নকল সংসার । আসল সংসার ভাঙতে 
পারলে তবে নকল সংসার ভাঙবে । পুত্র জন্মের সঙ্গে সঙ্গে 
মৃত্যু নিয়ে জন্মায় । কথাটি রূঢ় কিন্তু সতা-_-পিতামাত। পুত্রের 
কল্যাণ করতে জানে না। গোবিন্দভজন দিতে পারলে ব 


নবযোগীন্দ্রমংবাদ ৮৭ 


দেওয়াতে পারলে স্বজন হবার দাবী করা যাবে। কৃষ্ণে উন্মুখ 
বাক্তির সংসারবন্ধন নেই, কুষ্ণবিমুখ জনেরই সংসার । 

ভক্তের সংসার হতে ভয় নেই । ভক্তিধর্মে যেব্যক্তি প্রবত্িত 
হয়েছে, তার ভয় স্বতূই অপসারিত হয়। দ্বিতীয় বস্তূতে 
অভিনিবেশের নাম ভয়। আমি অর্থাৎ আত্ম! ছাড়া আর 
যা কিছু সবই দ্বিতীয়। চতৃিংশতি তত্ব সবই আত্মার 
অতিরিক্ত আত্মা নয়। এ হল আত্মার উপাধি। এই 
উপাধিতে আত্মার অভিনিবেশ হয়েছে । কিন্তু লাঁঠিতে ঘুন 
ধরলে আমি কেন ঘুন ধরি? সংসার ভয় মানে জন্মমরণ 
ভয়। যে ব্যক্তি ঈশাদপেত অর্থাৎ ঈশ বিষুখ, তারই 
ভয়, ঈশ উন্মুখের ভয় নেই। মহারাজ নিমির ত্বরফ থেকে 
স্বামিপাদ প্রশ্ন করেছেন, অজ্ঞানের ফলে ভয়ের উৎপত্তি। 
তাহলে জ্ঞানের দ্বারাই তো সে অজ্ঞানের নিবৃত্তি হবে । তবে 
ভয়নিবৃত্তির জন্য পরমেশ্বরের ভজন বিধান হল কেন? কারণ 
এর আগে যোগীন্দ্র অচ্যুতের পাদপদ্ন উপাসনাই ভয় নিবৃত্তির 
হেতু বলে স্থাপন করেছেন । অন্ধকারে রজ্জব দেখলে সাপ বলে 
মনে হয়। এই সাপ দেখা থেকে ভয়ের উৎপত্তি। আলো! 
এলে যখন রজ্জুজ্ঞান হল তখন সর্পভয় নিবৃত্তি হল । আমাদের 
স্বব্ূপের বোধ নেই । এই অজ্ঞান থেকে মায়িক দেহ-ইক্দ্রিয়তে 
আমর! আমি বোধ করেছি । সত্যকার আমি যে নিত্যশুদ্ববুদ্ধব- 
মুক্ত স্বভাব এই স্বভাব ভুল হয়েছে । ভয় বলতে জন্ম মরণ 
রোগ শোক মোহ ইত্যাদি । আত্মজ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার ফলে 
এই অবস্থা । জ্ঞানালোকের ফলে এই অজ্ঞান চলে যাবে। 


৮৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তবে আবার পরমেশ্বরের ভজন বিধান করলেন কেন? জীবের 
বন্ধন ঘটেছে মায়ার দ্বারা । মায়ার দ্বারাই এই স্বরূপবিস্থতি-_ 
যার নাম দিয়েছেন যোগীন্দ্র অস্মতি । শ্রীল কবিরাজ গোস্বামি- 
পাদ অন্থবাদ করেছেন £ 
জীব নিত্য কৃষ্ণদাস তাহা ভূলি গেল । 
তে কারণে মায় পিশাচী তার গলায় বাঁধিল। 

এখন প্রশ্ন হতে পারে, জীব যদি নিত্যদাসই হয়, তাহলে 
আবার ভুলবে 'কেমন করে ? একটি উদাহরণ দিলে কথাটি 
স্পষ্ট হবে। যঙ্ুবাবুর ছেলে পাগল হয়েছে জন্মাবধি। তাই 
পিতার নাম জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে না যা তা বলে। 
কিন্ত সুস্থমস্তিক যাদের তার! জানে যে সে যছুবাবুর ছেলে । 
তেমনি ভগবানের সন্তান জীব পাগল হয়েছে । তাই সে বলতে 
পারে না যে, সে নিত্যকৃষ্জদাস। জিজ্ঞাসা করলে সে য। তা 
বলে। অহং ধনী মানী কুলীন পণ্তিত। কিন্তু সাধু শাস্ত্র গুরু 
বৈষ্ণব এর! সুস্থ্মস্তিফ লোক, তার! জানেন জীব নিত্যকৃষ্*দবাস। 
মাতার কাছে যেমন পিতার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি বেদ- 
মাতার কাছে পরমপিতা শ্রীগোবিন্দের পরিচয় পেতে হবে । 
জীব অংশ, গোবিন্দ অংশী--তাহলে গোবিন্দের সঙ্গে জীবের 
দাসসম্বন্ধ। আগে দাসতসন্বন্ধ ঠিক হোক, পরে অন্য সম্বন্ধ 
আসবে । অণু সব সময় দাস, আর বিভূ যে সে প্রভূ । জগতের 
প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই দেখা যায়। অণু দাস ভাব নিয়ে বিভূর 
কাছে যায়। বিষ্ঠা, জ্বান, সঙ্গীত, চিত্রাঙ্কন এ সব বিষয়ে 
যে অণু সে বিভুর দাসত্ব করে। জীবশরীরকে ক্ষেত্র এবং 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ৮৯ 


জীবাত্মাকে ক্ষেত্রজ্ক বল! হয়েছে । ক্ষেত্রজ্ঞ পরবান্‌ সদ! । 
জীব পরবান্‌ অর্থাৎ “দাস” । কার দাস? পদ্নপুরাণ বললেন, 
“দাসভূতো৷ হরেরেব নান্যস্তৈব কদীচন? | শ্রীহরিরই দাস, অন্য 
কারও নয়। তাহলে জীব অণু এবং ঈশ্বর বিভূ হওয়ায় দাস 
এবং প্রভূ সম্বন্ধটি পাক! হল। যার যে বিষয়ে অভাব আছে, 
অর্থাৎ অণু যে সে বিভূর কাছে দাসত্ব করে। বিভু তার দাসত্ব 
গ্রহণ করে পারিতোষিক দেয়। তেমমি সখের অভাবে, 
আনন্দের অভাবে অণু জীব দাসত্ব নিয়ে বিভূ গোঁবিন্দের কাছে 
যাবে। গোবিন্দ তার দাসত্ব গ্রহণ করে নিজ পাদপন্মসেবা 
পারিতোধষিক দেবেন । জীব অনাদি কৃষ্ণবিমুখ । এই বিমুখতাই 
জীবকে গোবিন্দের কাছ থেকে বিচ্যুত করে ' পুথক করে 
রেখেছে । অনাদিবদ্ধ জীবের এই অনাদি বিমুখতা কৃষ্ণদাসী 
মহামায়া লক্ষ্য করেছেন । গোবিন্দ ইচ্ছা করেই মহামায়াকে 
আদেশ করলেন, জীবকে একটু শীসন কর । গোবিন্দ-ইচ্ছাতেই 
মহামায়া জীবকে শাসন করে। গোবিন্দ আজ্ঞা দিলেন, এমন 
শিক্ষা দাও, যাতে জীব উন্মুখ হয়। এটি গোবিন্দ-গুণই বলতে 
হবে। জীবের প্রতি মায়ার দণ্ড ভগবানের প্রতি উন্মুখতারই 
হেতু হবে । মায়! জীবকে বেপরোয়াভাবে দণ্ড দিয়েছে। কিন্তু 
যেমনটি আদেশ ছিল, সে রকম দণ্ড দেয় নি। দণ্ডের পরিমাণ 
এত বেশী হয়ে গিয়েছে যে, মায়া আর গোবিন্দের সামনে 
দাড়াতে পারছে না, লজ্জা পাচ্ছে। যেমন গৃহশিক্ষকের ওপর 
অভিভাবকের আদেশ দেওয়া থাকে, ছেলেকে শাসন করবার ; 
কিন্তু রাগের মাথায় শাসনের মাত্র! বেশী হয়ে গেলে গৃহশিক্ষক 


৯০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


যেমন অভিভাবকের সামনে যেতে লজ্জা পায়, মায়ার 
অবস্থাও তাই। দণ্ড দেওয়ার উদ্দেশ্য হল সংশোধন করা, 
আর যাতে সে কোনদিন অন্যায় না করে। কিন্তু দণ্ড বেশী 
দিলে সে ছ্যাঁচড়া হয়ে যায়। আমাদের অবস্থাও তাই। 
একে মায়ার দেওয়া পুত্র, অর্থ, লাভ, পূজা, প্রতিষ্ঠা পেয়ে আমরা 
গৌরগোবিন্দ তুলে আছি। কিন্তু এ দণ্ডেও আমরা সন্তুষ্ট নই। 
আরও দণ্ড পেতে চাই। বেশী করে, অর্থ বিত্ত প্রার্থন! করি, 
যাতে কোনও দিন গৌরগোবিন্দ বলতে না পারি। এখন প্রশ্ন 
হতে পারে মহামায়া গোবিন্দের আদেশের অতিরিক্ত শাস্তি 
জীবকে দিলেন কেন ? অজ্ঞ ষে সে যথাদেশে কাজ করতে পারে 
না, অতিরিক্ত করে ফেলে, কিন্তু মহামায়া তে। অজ্ঞ নন। 
নহামায়। শিক্ষয়িত্রীর কাজ করেছেন। কিন্তু গোবিন্দের 
আদেশের অতিরিক্ত দণ্ড জীবকে দিয়েছেন_ কেন? শ্রীজীবপাদ 
বলেছেন, _জীবানামনাদ্দিভগবছৈমুখামসহমান! । মহামায়া হলেন 
শ্রীগোবিন্দের দাসী, কাজেই তার প্রভুকে জীব অনাদি কাল 
থেকে ভুলে আছে, _এ বিমুখতা মহামায়া সহ করতে ন! 
পেরে জীবকে কঠোর শাস্তি দিয়েছে। জীবের অনাদি- 
বিমুখতার ছুরবস্থা মায়া সহ্য করতে পারে নি। হিতৈষিণী 
শিক্ষয়িত্রীর মত জীবকে শাষনের স্বরে বলেছেন, সারা 
দিনটা গেল, একবারও বই নিয়ে বসলি না। গোবিন্দকে 
একবারও ডাকলি না, যেমন গোবিন্দকে ভূলে রইলি তেমনি 
ভুলেই থাক ৷ কিছুতেই যেন আর মনে না পড়ে । এই বলে অর্থ, 
বিশ্ব পুত্র, লাভ, পূজা, প্রতিষ্ঠার মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৯৬ 


মায়া জীবকে ছুটি চাবুক দিয়েছে--একটি অস্থৃতি অপরটি 
বিপর্যয় । মায়া আক্রমণের পূর্বে জীব কৃষ্ণবিমুখ ছিল । কিন্তু 
আত্মঙ্গান তার লোপ পায়নি। আত্মা যে নিত৷ শুদ্ধ বুদ্ধ 
মুক্ত স্বভাঁব--এ জ্ঞান তার ছিল । কিন্তু মায়া আক্রমণের পর 
জীবকে সে আরও বেশী করে ভুলাল, অর্থাৎ তার আত্মজ্ঞান 
হরণ করে নিল। এই আত্মস্বরূপ ভুল হওয়ার নামই অস্মতি 
আর এরই ফলে দ্বিতীয় চাবুক এল বিপর্যয়। আত্মজ্ঞান 
থাকতেই মায়ার আক্রমণ হয়েছে। কাজেই আত্মজ্ঞান ফিরে 
পেলেও মায়া আক্রমণের বাধা হবে না। মায়া আত্মজ্ঞানের 
খাতির রাখে না। “হা গোবিন্দ বলে গৌবিন্বপাদপদ্ধে 
শরণাগতির খাতির রাখে । হাতে লাঠি থাক। অবস্থায় ডাকাতে 
আক্রমণ করে লাঠি কেড়ে নিয়ে তাকে বেঁধেছে । তাই 
যদি সে লাঠি ফিরে পাঁয়ও তাহলে তার বন্ধন-্দশার নিবৃত্তি 
হবে না। দ্বিতীয় চাবুক হল বিপর্যয়। বিপর্যয় হল-- 
অতন্মিন্‌ তদ্দ্ধ অনাত্মনি, অর্থাৎ দেহাদিতে আত্মবুদ্ধি। দয়ার 
তিনটি গুণ- সত্ব রজঃ তমঃ। রজোগুণ থেকে স্থি সত্বগুণে 
স্থিতি এবং তমোগুণে সংহার । রজোগুণের বৃত্তি প্রকৃতি । এই 
প্রকৃতিই জীবের জ্ঞান নষ্ট করে । তমোগুণ থেকে অবিদ্যাবৃত্তির 
জন্ম। প্রকৃতি জীবের জ্ঞান নষ্ট করে অবিদ্ভাকে আদেশ করলেন 
এইবার আত্মজ্ঞানশূন্ত জীবকে মায়িক দ্রব্য গছিয়ে দাও । জ্ঞান 
হারালে জীবকে দিয়ে যা খুশী তাই করানো! যাবে । এই অবিদ্যা- 
কুহকিনী জীবের কাছে নানা ছাদে মনোমুগ্ধকর অবস্থায় 
দাড়ালেন। বড় নুন্দররূপে চুরাশি লক্ষ দেহের ডাল সাজিয়ে 


৯২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


জীবের কাছে ধরলেন__স্বৈরিণী রমণী যেমন বিচিত্রফুলের মালা 
গেঁথে পুরুষের কাছে ধরে । অবিদ্যা জীবকে প্রলুব্ধ করে__ এই 
মায়িক দেহ গ্রহণ কর, এতে ইন্দ্রিয় আছে, শব্দ স্পর্শ রূপ রস 
শন্ধ ভোগ করতে পারবে । যত ইচ্ছা বিষয় ভোগ করতে পারবে, 
খুব আনন্দ পাবে । জীব এতে মুগ্ধ হয়ে অবিদ্ভার কুহকে পড়ে 
মায়ার দেহ গ্রহণ করল এবং তাকে যখন আমার বলে গ্রহণ 
করল, তখনই জীবের মৃত্যু-_“তিদন্ত সংস্থতিবন্ধঃ । এই হল 
মায়ার কাজ। এই মায়ারোগের চিকিৎসা কি? ভগবন্ভজনই 
মায়ারোগের চিকিৎসা । এ ছাড়া রোগ নিবুত্তির অন্য কোন 
উপায় নেই । গীতায় ভগবান বলেছেন £ 
“মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরস্তি তে । গীতা ৭১৪ 
শর্তিও বলেছেন £ 
তমেব বিদিত্বাহিতিমৃত্ামেতি নান্তঃ পন্তা বিদ্যাতেহয়নায় । 
-_শ্বেতাশ্বতর উঃ 
মায়াকে না ভজে যার মায়! তাকে ভজলেই এই মায়ার হাত 
থেকে নিষ্কৃতি । “মামেব যে প্রপদ্যন্তে__ এখানে “মাম” পদের 
দ্বারা ভগবান নিজেকে দেখিয়ে বললেন, শ্যামস্থন্দর যশোদানন্দন 
নন্দনন্দনই আশ্রয়ের বিষয়। আত্মছর্ণত বস্ত দিয়ে গোবিন্দপূজা 
করতে হবে। সমস্ত দ্রব্যে যেমন বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভেজাল 
দেওয়া হয়, তেমনি আমাদের ভজনেও ভেজাল আছে । ভজন 
করি- শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ বন্দন-_যা কিছু করি না কেন, তার 
মধ্যে প্রার্থনা মেশান থাকে । আমার গৃহ, বিত্ত, দেহ, 
দৈহিক সব কিছুর আরও শ্্রীবুদ্ধি হোক । ভগবানকে ভি 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৯৩ 


কিছু আদায়ের জন্য, প্রেমে ভজি না। এই ভজনে 'প্রপদ্ঠমান' 
কথাটি সঙ্গত হল না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে 'প্রপগ্ভমান' হলে 
তবে মায়! ছাড়বে, তার আগে না। জাল তেখিয়ে স্থৃতো 
দিয়ে তৈরী । তাই জালে পড়া। পাখী যদি নিজে জাল থেকে 
পালাবার চেষ্টা করে তাহলে আরও জড়িয়ে যায়। কিন্ত 
মুক্তির জন্য যদি কাতর হয়ে ব্যাধের শরণাগত হয়, তাহলে 
মুক্তি পেতে পারে । তেমনি জীবের মুক্তিও নিজের সাধনে 
হয় না। গোবিন্দচরণে শরণাগত হলে তবে মায়া ছাড়ে। 
বুধ অর্থাৎ বুদ্ধিমান তাকে ভজবে। শ্রীগুরুচরণপ্রসাদাৎ 
লব্ধবিবেকঃ। শ্রীগুরুপাদপদ্যোন্ন করুণায় যার বিবেক লাভ হয়েছে 
সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান। কেমন করে অর্থাৎ কি দিয়ে ভজবে ? 
একয়া ভক্ত্যা অর্থাৎ অব্যভিচারিণী কেবল! শুদ্ধাভক্তির দ্বারা 
ভজবে । গ্রীগুরুদেবে দেবতা এবং প্রিয়তম বুদ্ধি করে । এই 
শুদ্ধা ভক্তিতে গ্রীগোবিন্দ ভজলে মারার হাত হতে নিষ্কৃতি | 
গোবিন্দ বলে আলো জ্বাললেই মায়ার অন্ধকার নাশ হবে। 
এই ভক্তিমহাঁরামীর চৌধ্টি প্রকার অঙ্গ । তার মধো নয়টি 

অঙ্গ প্রধান ঃ 

চৌষট্রি অলের শ্রেষ্ঠ নববিধা ভক্তি । 

তারা কৃষ্ণ প্রেম কৃষ্ণ দিতে ধরে মহশিক্তি 
প্রহলাদজীর বিধান অনুযায়ী ঃ 

শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণেঃ স্মরণং পাদসেবনম্‌। 

অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্‌ ॥ ভা. ৭৫1২৩ 
শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, বন্দন, পাদসেবন, অরিন, দান্তয, সধ্য 


৯৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আত্মনিবেদন--এই নয়টি অহ থেকে যোগীন্দ্র প্রধান ছুটি অঙ্গ 
নিয়েছেন--শ্রবণ এবং কীর্তন । জগতে যেমন দেখা যায় আগে 
জম! পরে খরচ, তেমনি আগে শ্রবণ করে জম! করতে হবে, পরে 
খরচ অর্থাৎ কীর্তন | শ্রবণে আবার ক্রম আছে, নাম রূপ গুণ 
লীলা, কীর্তনের বেলাতেও তাই । সাধুর! ভক্তিলম্পট ৷ শ্রীজীব- 
পাদ বিধান দিয়েছেন প্রথমে নাম শ্রবণ | এ নামকোথায় পাওয়া 
যায়? মহত্মুখ নির্গলিত নামই একমাত্র শ্রবণযোগ্য এবং এই 
নামই কৃপা করতে সক্ষম, অন্ত নাম নয়। যেমন দুধ বলকারক 
সন্দেহ নেই, কিন্তু তা যদি সপ্পোচ্ছিষ্ট হয় তাহলে তা বলসঞ্চারের 
পরিবর্তে বিষক্রিয়। করবে এবং তা' মৃত্যুর কারণ হবে । বৈষ্ঞব- 
মুখ নির্গলিত নামই আস্বাদনের বস্ত । সকল মহাজনই বর্ণনা 
করেছেন, শ্রীশুকমুখনির্গলিত শ্রীমস্ভাগবতই শ্রবণযোগ্য | 
শ্রীমন্মহা প্রভৃও বলেছেন, “ভাগবত পড় গিয়া! বৈষ্বের স্থানে 1: 
যোগীন্দ্র ভক্তি অঙ্গ যাজনে শ্রবণ কীর্তন ছুটি অঙ্গ বললেন। 
তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে স্মরণাঙ্গ ভক্তিকে বাদ দিলেন । 
কারণ ম্মরণ মনের কাজ। মনের কাজ করা কঠিন। মনের 
রুচি আগে হবে না। শ্রবণ কীতন করতে করতে অর্থাৎ 
কান ও বাক্যের কাজ করতে করতে মনের রুচি আসবে । 
মনের রুচি একবার হয়ে গেলে তখন আর ভাবনা নেই। 
শ্রবণ করে করে ভাগারে জমলে তখন গায়ন্--শৃধন্‌ ও গায়ন্‌__ 
ছুটিতেই শত্‌ প্রত্যয় দেওয়া হয়েছে । এর দ্বারা নিত্য বর্তমানতা 
দেখান হয়েছে । অর্থাৎ সব সময়ের জন্যই কোন না কোনটিকে 
বর্তমান করে রাখতে হবে । একটিকেও ছাড়। চলবে না। বক্তা 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৯৫ 


থাকলে শ্রবণ, শ্রোত। থাকলে কীর্তন, আর যেখানে বক্তা এবং 
শ্রোতা ছই-এরই অভাব সেখানে গৃণন্‌। এইভাবে অসঙ্গ হয়ে 
বিচরণ করবে । অসঙ্গ অর্থাৎ বস্তৃস্তরাসক্তিশৃন্য । ভক্তি হলেন 
জননী এবং বৈরাগ্য তার পুত্র। জ্ঞানবৈরাগ্য হতে ভক্তির 
জন্ম নয়, ভক্তি হতে জ্ঞান-বৈরাগ্যের জন্ম । শ্রীস্তমুনির বাক্য ঃ 
বাস্থুদেবে ভগবতি ভক্তিযোগঃ প্রযোজিত; । 
জনয়ত্যাশড বৈরাগ্যং জ্ঞানঞ্চ যদহৈতুকম্‌ ॥ ভা. ১২৭ 

ভগবানের যে কোন নাম অর্থাৎ যে দেশে যে নাম প্রচলিত তা 
উচ্চারণ করলে ব৷ শুনলেও কাজ হবে । যেমন ক্ষণ বলতে বা 
শুনতে যদি কহ, কানড়, কান বলা যাঁয় বা শোনা যায়, তাহলে 
ফল হবে । শ্রবণকীর্তন অপেক্ষা স্মরণাঙ্গ৷ ভক্তি প্রধান হবে না। 
দেবধষিপাদ নারদ একথা গোপকুমারকে বলেছেন । ভক্তি-অঙ্গের 
মধ্যে কোন্টি প্রধান বিচার হবে কি করে? ভগবানের সামনে 
বসে যে অঙ্গ সাধন কর! যায় সেইটিই প্রধান বলে ধরতে হবে । 
দেখা গেল এক কীর্তনাঙ্গা ভক্তি ছাড়া অন্য কোন অঙ্গই 
ভগবানের সামনে বসে করা যায় না। , অতএব কীর্তন অঙ্গটি 
সকল অঙ্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । 

যোগীন্দ্র যদিও বললেন, অসঙ্গ অর্থাৎ নিস্পৃহ হয়ে শ্রবণ 
কীর্তন করবে। কিন্তু নিস্পৃহ হয়ে শ্রবণ কীর্তন করব, এ মনে 
করলে আর কোনদিন করা হয়ে উঠবে না। স্পৃহা নিয়েই শ্রবণ 
কীর্তন করতে হবে । শ্রবণ কীর্তন করতে করতে স্পৃহা কমবে । 
যেমন উদরে অন্ের গ্রাস যতই দেওয়া যাবে ততই ক্ষুধার নিবৃত্তি 
হবে। আত্মার খাগ্ হল একমাত্র ভগবানের নাম, চিৎ খাদ্য । 


৯৬ নবষোগীন্দ্রসংবাদ 


আত্ম! মায়ার খাছ অন্ন জল কিছুই গ্রহণ করে না_ মান্থুষ যেমন 
গোরুর খাগ্ঠ বিচুলি খায় না। যেমন সীতার শিখতে হলে আগে 
জলে নামতে হবে, তেমনি ভজন করতে আরম্ভ করলে তবে 
মিথা। ছাড়বে |. মিথ্যা ছেড়ে ভজন করা যাবে না । সত্যকে 
আশ্রয় না করলে মিথ্য। ছাড়বে না । 

শ্রীযোগীন্দ্র শ্রবণ কীর্তনের কথা বলে পরে বলেছেন, শ্রবণ 
ছেড়ে শুধু কীর্তনও আবার নামকীর্তন _ লীলাকীর্তন নয় । 
স্বপ্রিয়নামকীর্তনের দ্বারাই প্রেমলাভ হবে । ভগবানের যে 
নামটি সাধকের প্রিয় সেইটি উচ্চারণ করলেই কাজ হবে। 
নবযোগীন্দ্র ভক্তিযোগের বিধান করছেন । সাধক ছুই প্রকার-_ 
মুক্তিসাধক ও প্রেমসাধক | যুগধর্মের আচরণের দ্বারা মুক্তি 
সাধন পর্যন্ত হয়। কিন্তু প্রেমসাধক মুক্তি পর্যন্ত চায় না। 
শুধু যুগধর্ম আচরণে প্রেমসাধন হয় না । ভক্তি আশ্রয় না করলে 
হবে না। কলিষুগের সুবিধ। হল, যেটি যুগধর্ম, সেইটিই ভক্তিধর্ম 
অর্থাৎ নামসন্কীর্তন কলিযুগৌচিত ধর্ম, আবার এটি ভক্তিধর্মও 
বটে। কাঁজেই এই নামসঙ্কীত্নকে আশ্রয় করলে ছুটি কাজই 
হবে। যুগধর্মও পালন করা হবে, আবার ভক্তি আচরণ করাও 
হবে। মুক্তিসাধন প্রেমসাধন দুই-ই হবে। মুক্তি প্রেমভক্তিতে 
ক্রোড়ীকৃত হয়ে আছে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রেমভক্তি লাভ 
করেছে, মুক্তি তার পাওয়া হয়ে গেছে। স্বপ্রিয়নাম বলতে এর 
পিছনে একটু কথা আছে-_সাধকের কোন নাম প্রিয় হতে 
পারে না । শ্রাগুরুদেব তার নিজের প্রিয়তা কৃপা করে সাধককে 
দান করেন। তখন শ্রীগুরুদেবের প্রিয় নামই সাধকের প্রিয়, 


নবযোগীক্রসংবাদ ৯৭ 


হয়ে ওঠে । নামকীর্তন করতে করতে যখন সাধকের প্রেম 
হয়, তখন তার সংসারের অতীত চেষ্টা দেখা যায় । প্রেম যার 
হৃদয়ে আবিভূতি হয়, সে জানে না, কিন্তু বিজ্ঞ সাধু গুরুবৈষ্ণব 
জানেন। যার হৃদয়ে যত প্রেম, তার দর্শনের উৎকণ্ঠা তত। 
দর্শনৈর উৎকঞা-অগ্রিতে চিত্তন্বর্ণ গলে যায়। শ্রীচক্রবতিপাদ 
বললেন, 'দর্শনোতকণ্ঠাগ্রিদ্রতীকৃতচিত্জান্ুনদ । প্রেমের 
বিক্রিয়ায় তখন সাধক হাসে কাদে নাচে গায়। ক্ষুধা 
থাকলে যেমন অন্নদর্শনের জন্য উৎকণ্ঠা হয়, প্রেম থাকলেও 
তেমনি ভগবৎদর্শনের জন্য উৎকণ্ঠা হয় । ভক্ত হাসে কাদে 
কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে শ্রীজীবপাদ সংক্ষেপে বলেছেন, 
'হাসাদীনাং কারণানি ভক্তিভেদানস্ত্যাদনস্তান্যেব 'জ্বেয়ানি? | 
শ্রীচক্রবতিপাদ এ বিষয়ে দিগদর্শন করেছেন_ কৃঞ্জের নিত্যকর্ম 
আছে £ 


বৎসান্‌ মুধ্চন্‌ কচিদসময়ে ক্রোশসঞ্জাতহাস; | 

স্তেয়ং স্বাদত্যথ দধি পয়ঃ কল্পিতেঃ স্তেযযোগৈঃ। 
মর্কান্‌ ভোক্ষ্যন বিভজতি স চেন্নান্তি ভাণ্ডং ভিনত্তি। 
দ্রব্যালাভে স গৃহকুপিতে যাত্যুপক্রোশ্ঠয তোকান্‌ ॥ 


ভা, ১০।৮1৩০ 


অসময়ে বাছুরের গলার দড়ি খুলে দেওয়া সঙ্গীদের নিয়ে পাড়া 


প্রতিবেশীর ঘরে ঢুকে মাখন চুরি করা, ঘুমস্ত শিশুদের চিমটি 
কেটে কাদিয়ে জাগিয়ে দেওয়া, এসব গোপালের নিত্যকর্ম। 


জরতী বুড়ী বাধা দিতে গেলে তার মুখেচোখে গোপাল ননী 


৯৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মাখিয়ে দিয়ে তাকে নাজেহাল করে । সাধক যখন প্রভুর এ 
বাল্যলীল। স্মরণে ডুবে যায় তখন আনন্দে উচ্ছলিত হয়ে হেসে 
ওঠে । প্রভুর দর্শন না পেয়ে উৎকণ্ঠীয় রোদন করে, চিৎকার করে 
কোথায় তুমি, একবার দেখা! দাও, তোমার দর্শন ছাড়া প্রাণ যে 
বাঁচে না। ভক্তবংসল ভগবান ভক্তের অনিতে দেখা না দিয়ে 
পারেন না। কাছে এসে মৃছুমধূর হেসে বলেন_এই তো আমি 
এসেছি আর তোমার ছুখ কিসের ? প্রীণপ্রিয়ের দর্শন পেয়ে 
প্রাণবল্লভকে বুকে ধরে সাধক আনন্দে গান করে, নৃত্য করে। 
ঠিক যেন উন্মাদের আচরণ । কিন্তু উন্মাদ নয়, উন্মাদবং । উন্মাদ 
অবস্তকে বস্ত্র জ্ঞান করে । আর ভক্ত বস্তৃকেই বস্তু জ্ঞান করে, 
গ্রহগৃহীতের মত, লোকের হাস্ত প্রশংসাকে অপেক্ষা না করেই 
নৃত্য গীত করে । বঁড়শীবিদ্ধ মাছ যেমন অন্ত মাছের মত জলের 
মধ্যে সাতার দিলেও যে বঁড়শীবিদ্ধ করেছে দে জানে যে মাছটি 
তাঁর হাতে তেমনি এই প্রেমিক ভক্ত সংসারের মাঝে আর পাঁচ- 
জনের মত চললেও সাধু গুরু বৈষ্ণব বোঝেন, এটি সংসারের 
জীব নয়। তৃষ্ণার্তের কাছে অমৃতসাগর যেমন, প্রেমোৎকগ্ার 
কাছে কৃষ্ণদর্শন তেমনি । প্রেমিক ভক্ত প্রেমে সর্বত্র তার ইট্ট 
দেবতাকে দর্শন করেন। 

স্থাবর জঙ্গম দেখে ন! দেখে তার মুত 

সর্বত্র হয় যে তার ইষ্টদেব স্কৃতি 

ধাহা ধাহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণ স্কুরে। 
এইটিই প্রেমের খাটি লক্ষণ। 

এর পরে নিমিরাজের পক্ষ থেকে স্বামিপাদ, প্রশ্ন করেছেন, 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ৯৯ 


যোগার্‌ঢ ব্যক্তি বু জন্মের সাধনাতেও যা পায় না, একমাত্র নাম 
সন্বীর্তনের ফলে তা কেমন করে সম্ভব হবে? এর উত্তরে 
যোগীন্দ্র বললেন ; 
ভক্তিঃ পরেশান্ুভবে। বিরক্তিরন্থাত্র চৈষ ত্রিক এককালঃ 
প্রপদ্মানস্য যথাশ্বতঃ ন্য্্টিঃ পুষ্টিঃ ক্ষুদপায়োইন্ঘাসম্‌॥ 
ভা. ১১।২।৪২ 
যেমন যেমন ভজন তেমনি তেমনি প্রাপ্তি । ঠিক ভোজনের মত । 
যেমন যেমন ভোজন তেমনি তেমনি ক্ষুধার নিবৃত্তি। ক্ষুধার্ত 
ব্যক্তির যেমন তুষ্টি, পুষ্টি, ক্ুন্িবৃত্তি-- এই তিনটি বন হারিয়ে 
গেছে, তেমনি আমাদেরও তিনটি বস্তু হারিয়ে গেছে। ভক্তি, 
ঈশ্বরানুভূতি এবং সংসারে বৈরাগ্য-তুষ্টি, পুষ্টি, ক্ুন্িধবত্তি ফিরে 
পাওয়ার একমাত্র উপায় হল ভোজন করতে আরম্ভ করা । আর 
ভক্তি, ঈশ্বরান্ভূতি ও সংসারে বৈরাগ্য ফিরে পাওয়ার একমাত্র 
উপাঁয় ভজন আরম্ভ কর!। প্রতিটি গ্রাসে শুধু নয়, প্রতিটি অন্নে 
যেমন তুষটি, পুষ্টি, ক্ষুন্নিবৃত্তি অংশ আছে, তেমনি প্রতিটি নামো- 
চ্চারণই সফল । সবই কাজে লাগবে, একটিও বিফল হবে না। 
পারা খেয়ে যেমন হজম করা যায় না, তেমনি সংসারের বস্তু 
গৌর-গোবিন্দের নাম হজম করতে পারে না । আধপেটা খাওয়া 
হলে তুষ্টি, পুষ্ট, ক্ষুনিবৃত্তির যেমন কিছুটা বুঝা যায়, ছু'এক গ্রাস 
অন্ন পেটে গেলে বুঝা যায় না, তেমনি অনাদি কালের উপবাসী 
আত্মার আধাআধি ভজন হলে তবে ভক্তি, ঈশ্বরান্থভৃতি ও 
সংসারে বিরক্তির চেহারা কিছুটা ফুটবে, তার আগে পর্যস্ত 


কিছু বুঝ! যায় না । 


১০৩ নবযোগীন্দ্রসংবা'দ 


ভান, ফোগ যেমন সাধনের সিদ্ধিদশায় কল দান করে, সুখ 
দান করে, ভক্তি কিন্তু তা নয়__এখানে সাধনদশাতেই স্ুখ- 
প্রাপ্তি । ভক্তিসাধনের সাধনকালে এত আনন্দ যে অন্য সাধনের 
সিদ্ধিকালেও সে আনন্দ নেই। ভজন ও ভোজন-_ছুটির মধো 
তফাৎ হল, বনু ভোজন করা যায় না, কিন্তু বু ভজন কর 
যায়। যত ভজন কর! যায় শ্রীগুরুকপায় তত ভজনস্পুহা 
বাড়ে। এই ভজনস্পৃহা বাড়ায় শ্রীনাম-সঙ্কীর্তন | শিশুকে 
যেমন প্রথমে ছুধ খাইয়ে সব খাদ্য খাওয়ার যোগ্য করা হয়, 
তেমনি নামসম্কীতন করতে করতে ভজন-ক্ষুধা বাঁড়ে। তখন 
সব সাধন করবার শক্তি লাভ হয়। শ্রবণ কীর্তন অপ্রাকৃত 
খাছ্য,যত খাওয়া যায়,ততই ক্ষুধা বাড়ে । শ্রীষোগীন্দ্র বললেন, 
অনুবৃত্তিতে ভজন করতে হবে_ ভক্তি, ঈশ্বরানুভৃতি ও বৈরাগা 
এই তিনটি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যস্ত ভজন করতে হবে। এর 
বিরাম দিলে চলবে না। তারপর পরাশাস্তি সাক্ষাংভাবে লাভ 
হবে । মায়ার জগতে যে শাস্তিলাভ তা অসাক্ষাৎ শাস্তি । কারণ 
তাতে দ্রব্যের আবরণ থাকে । সুখ-সাধনে প্রবৃত্তি হলে সাক্ষাৎ 
শীস্তি লাভ হয় না। খাগ্য বস্্ প্রভৃতির আবরণে শান্তিতে বাধা 
পড়ে। কিন্তু শ্রবণ কীত্তনাদি ভক্তিঅঙ্গ-যাজনে মায়ার আবরণ না 
থাকায় আনন্দেতেই প্রবৃত্তি এতে সাক্ষাৎ শাস্তিলাভ হয়। 
আতি করে ভজন করলে কোন অমঙ্গল আসতে পারে না। 
একবার নাম করলেই সকল পাপ ক্ষালন হয় বটে, কিন্ত তবু বার 
বার নাম করতে হবে । একটি প্রদ্দীপ জ্বাললে যেমন শতবছরের 
অন্ধকার নিঃশেষে নাশ হয়, কিন্তু যদি সেই প্রদীপ নিভে যায়, 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১০৬ 


তাহলে আবার অন্ধকার আসে। তাই প্রদীপকে নিভতে 
দেওয়া চলবে না, অবিরত জ্বালিয়ে রাখতে হবে । গোবিন্দনামের 
প্রদীপ জিহ্বায় নিরম্তর ধরে রাখতে হবে । প্রাকৃত জগতে 
ক্ষুধা নিবৃরত্তর জন্য যেমন তাড়াতাড়ি ভোজন করতে হয়, তেমনি 
ভবক্ষুধা নিবারণের জন্য তাড়াতাড়ি ভজন করতে হবে । কিন্তু 
যদি মনে করা যায় এটিও তো কৃপা-সাপেক্ষ, ভজন তো কৃপা 
ছাড়া হয় না, তাহলে আমার আর কি করবার আছে? এটি 
কেবল প্রবঞ্চনা ৷ কৃপা চাইবার চেহারা দেখাতে হবে । দরিদ্রের 
সাজ সেজে চেহারায় ভিক্ষুকতা ফোটাতে হবে, আতি জানাতে 
হবে । ব্যাকুলতা বাঁড়াতে হবে । খোলাম কুচির হরির লুট দিতে 
হবে । তা দেখে কোনদিন কোন দয়ালু ব্যক্তি সত্যকাঁর হরির লুট 
কিনে দেবেন । নিজের প্রচেষ্টাই কপাময়ের কপা আকর্ষণ করবে । 
নিজের প্রচেষ্টা থাকলে তা দেখে সাধু গুরু বৈষ্ণব সত্যকার 
টাক! দিয়ে হরির লুট কিনে দেবেন ৷ তাই শ্রীযোগীন্দ্র বললেন, 
অনুবৃত্তিতে ভজন করলে আর কখনও ভয় স্পর্শ করবে না। 
মূলে নিমিরাজের যে প্রশ্ন ছিল-_তাগবতধর্ম কাকে বলে এবং 
আত্যস্তিক মঙ্গল কার নাম-_এ ছুটি পৃথক প্রশ্ন নয়, একটিই 
প্রশ্ন । এ প্রশ্নের সমাধান শ্রীষোগীন্দ্র করলেন । এ ভাগবতধর্ম 
যাজনে একমাত্র ভাগবতজনই অধিকারী | 


দ্বিতায় প্রশ্ন 


মহারাজ নিমি দ্বিতীয় প্রশ্ন তুলেছেন £ 


অথ ভাগবতং ব্রত যদ্ধর্মো৷ যাদৃশে। নৃণাম্‌। 
যথা চরতি যদ ব্রুতে যৈলিক্ৈর্ভগবৎপ্রিয়ঃ ॥ ভা. ১১।২1৪৪ 


ভাগবত লক্ষণ জানতে চেয়েছেন নিমিরাজ। ভাগবত বলতে 
ছু'জনকে বুঝায়_ এক ভাগবত শাস্ত্র আর এক ভক্তিরসপাত্র। 
নিমিরাজের প্রশ্ব__ভাগবতধর্ম ধীরা যাজন করেন তারা কেমন ? 
প্রশ্নটি যুক্তিযুক্ত । ভক্তকে কি কি লক্ষণে চিনতে পার! যাবে ? 
তার স্বভাব কেমন ? তার কায়িক, বাঁচিক এবং মানসিক চিহ্ন 
কি কি যার দ্বারা তার ভগবপ্রিয়তা বুঝতে পারা যায়? বস্তবর 
সত্ত|। কায় মন এবং বাকা তিনটি ভাবে অভিব্যক্ত হয়। মন 
যা করে তা দেহ এবং বাক্যের ছটায় ফুটে ওঠে । ভক্তের 
লক্ষণ কি এ প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন দ্বিতীয় ষোগীন্দ্র শ্রীহরি | 
প্রশ্নটি দ্বিতীয় এবং উত্তরও দিয়েছেন দ্বিতীয় যোগীন্দ্র হরি । 
ভগবান ভক্তের গুণ গাইবেন এবং ভক্ত ভগবানের গুণ গাইবেন 
__এইটিই হল শোভা । ভক্ত নিজের গুণ নিজে গাইতে পারেন 
না। গাইলেও ভাল দেখায় না বা শোনায় না। যোগীক্দের 
নাম “হরি? হলেও হরি নামটি তো৷ ভগবানের । অতএব ভগবান 
ভক্তের লক্ষণের উত্তর দিচ্ছেন, ভগবানের শ্রীমুখে ভক্তের মহিমা 
কীর্তন বড় মানায়। 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১০৩ 


ভক্ত তিন প্রকার ; উত্তম, মধ্যম, এবং কনিষ্ঠ অথবা 
প্রাকৃত। ভক্ত কখনও অধম হয় না। উত্তম ভক্তের লক্ষণ 
যোগীন্দ্র বললেন £ 

সবভূতেষু যঃ পশ্যেদ্‌ ভগবন্ভাবমাত্বনঃ | 
ভূতানি ভগবত্যাত্মন্তেযু ভাগবতোত্তমঃ ॥ ভা. ১১২৪৫ 

সর্বপ্রাণীর মধ্যে যিনি পরমাত্মার ভগবংভাব অর্থাৎ ষড়েশ্বর্ষ 
ভাবকে দর্শন করেন এবং ভগবানের মধ্যে যিনি সর্বভূতকে দর্শন 
করেন, তিনি ভাগবতোত্বম অর্থাৎ উত্তম ভাগবত | পুবে 
স্বামিপাদ বলেছেন, এই আত্মার ভাব অর্থাৎ ব্রচ্গজ্ঞান দর্শন 
করে, তারপর আবার যদ্বা করে অন্য অর্থ করলেন । দীপিকা- 
দীপনকার বললেন, স্বামিপাদের এ যদ্বা কেন উত্তর হল 
'আতনিম্বন্তায়াঁপত্তে? । আত্ম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা হলে যেমন নিম্ব 
সম্বন্ধে উত্তর সমীচীন নয়, তেমনি নিমিরাজ প্রশ্ন করেছেন, 
“অথ ভাগবতং ব্রত” তার উত্তরে ত্রহ্মজ্ঞান হবে কেন? ত্রহ্ম- 
জ্তানে জীব ব্রন্ম ভেদ স্বীকার করা হয় না। তাই ক্রহ্ 
জ্ঞানের প্রসঙ্গে ভক্ত সংজ্ঞাই হয় না। তাহলে উত্তম ভক্ত 
কেমন করে হয়? অক্ষর-নিরুক্তিতে আত্মা শব্দের অর্থ “হরি 
পাওয়া যায়। 'আততাচ্চ মাতৃত্বাৎ ৮ আত্মা এব পরমে। 
হরি; | ভগবানের যে ষড়েশ্বর্ধ-_সমগ্র এন্বর্, সমগ্র বীর্য, সমগ্র 
যশঃ, সমগ্র শ্রী, সমগ্র জ্ভান, সমগ্র বৈরাগ্য, সমগ্র বলতে 
যার সমান বা যার চেয়ে বেশী অন্য কোথাও দেখা যায় না, এই 
ষড়েশ্বর্ধশালিতা যিনি সর্বভূতে দর্শন করেন, তিনি উত্তম ভক্ত । 
সর্বপ্রাণীতে পরমাত্স! বন্ধুর মত রয়েছেন । জীব যখন কর্মবশে 


১০৪ নবযোগীন্্রসংবাদ 


কৃমি কীট দেহ পায়, তখনও পরমাত্বা তাকে ত্যাগ করেন ন!। 
প্রতিভূতে পরমাত্বা যেমন আছেন তার ষড়েশ্বর্যও আছে। 
অগ্নিকে দেখলে যেমন তার দাহিক। শক্তিকে দেখা হয়ে যায়, 
তেমনি সর্বভূতে যে বাক্তি পরমাত্মাকে দর্শন করেন, তিনি 
পরমাত্মার ষড়েশ্বর্ষও দর্শন করেন । এখন যোগীন্দ্র বলেছেন, 
'সর্বভূতেষু যঃ পশ্যেৎ | দৃশ, ধাতুর একটি অর্থ যদিও জানা 
(জ্ঞান) হয়, এখানে কিন্তু শুধু জ্ঞান অর্থ নিলে হবে না । কারণ 
শাস্্জ্ঞ ব্যক্কিমাত্রেই জানেন। তাই বলে তাকে ভক্ত বলা 
চলবে নাঁ। এখানে দৃশ, ধাতুর অর্থ চোখে দেখা । সবভতে 
যিনি ভগবানকে চোখে দেখেন তিনি উত্তম ভক্ত। আর 
ভগবানের মধ্যে যিনি সর্বপ্রাণীকে দর্শন করেন তিনিও উত্তম 
ভাগবত। মশক কৃমি কীটের মধ্যেও যিনি ভগবানকে চোখে 
দেখেন তিনিই উত্তম ভক্ত । সরবভূতেষু বলতে চেতনা-চেতনেঘু 
স্থাবরজঙগমেযু-_চেতন হল ক্ষুট চৈতন্য, অচেতন হল অস্ফুটচৈতন্য 
-সকলের মধ্যে ভগবানকে দর্শন__ 
স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তার মৃতি। 
সধত্র হয় যে তার ইষ্টদেব ক্ষুতি ॥ 

অচেতন স্ষটিকস্তন্ভে প্রহলাদজী ভগবানকে দর্শন করেছেন, 
প্রহনাদজী নিজ উপাম্যকেই দর্শন করেছেন, নরসিংহ মৃন্তি নয়। 
ব্রহ্মা প্রভৃতির বাক্য সত্য করবার জন্য ভগবান পরে নরসিংহ 
মৃতিতে আবিভূতি হন । 

শ্রীজীবপাদ অর্থ করেছেন, আত্মনি স্বচিত্তে, নিজের চিত্তে ষে 
ভগবান ক্ফুরিত হন, নিজ চিত্তে স্করিত ভগবানের আশ্রিতভাবে 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১০৫ 


ঘিনি সবভূতকে দর্শন করেন, তিনি ভাগবতোত্তম । বুন্দাবনের 
তরুলতা কৃষ্ণপ্রেমে সমৃদ্ধ, পুষ্প ফলভারে অবনত, শাখা 
প্রশাখা সম্তানসম্ততির মত প্রণত হয়েছে । মধুধারা-ছলে 
প্রেমাশ্র বর্ণ করছে, অঙ্গে তাদের রৌমোদগম, অঙ্ক্রছলে 
তারা রোমাঞ্চ ধারণ করেছে । ব্রজের গোপরমণী কৃষ্ণপ্রেমে 
মাতোয়ারা হৃদয় নিয়ে তাদের দর্শন করে এই ভাবই প্রকাশ 
করেছেন । শ্রীযমুনার মধ্যেও গোপবালারা নিজেদের কৃষ্ণপ্রেম 
লক্ষ্য করেছেন। কৃষ্ণের বেণুনাদ শুনবার পরে মদন বিকারে 
শীযমুনার আবর্তছলে গতি মন্থর হয়েছে । তরঙ্গবাহু দিয়ে 
মুকুন্দচরণ যুগলকে আলিঙ্গন করে নিজ বক্ষের স্বুরভি্ভ কমলরাজি 
প্রেমে উপহার দিয়েছে । গিরিরাজ গোবর্ধনের মধো নিজ 
প্রেম দর্শন করেছেন। এ দৃষ্টি উত্তম ভক্তের । 

উত্তম ভাগবতের আর একটি লক্ষণ, ভগবানের মধ্যে 
সবভূত দর্শন, নিজ উপাস্তে যিনি সর্বভূতের সত্তাকে দর্শন 
করেন-_যেমন মা যশোমতী কৃষ্ণের মৃত্তক্ষণলীলাতে তার বদন 
নগুলে বিশ্বত্রহ্মাণ্ড দর্শন করেছিলেন । শ্রীবিশ্বনাথ চত্রবতিপাঁদ 
অর্থ করেছেন, “পশ্যেৎ পদে দেখছে, এ অর্থ নয়। কিন্ত 
তাদের কৃষ্ণদর্শনের যোগ্যতা আছে এইটিই বুঝতে হবে । 
অর্থাৎ দর্শনের ইচ্ছা করলে যে কোন সময় দর্শন করতে 
পারবে । তারা যে সবসময় কষ্ণদর্শন করে তা নয়। তাহলে 
নারদ, ব্যাস, শুক, এদের ক্ষেত্রে অব্যাঞ্ধি হয়। অর্থাং তার! 
যদি সর্বদা! ভগবৎ দর্শন করেন, তাহলে তাদের আর উপদেশ 
করা চলে না। আর তা ছাড়া ভগবৎ-দর্শন কারো বাঁধা 


১০৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


থাকে না। রাধারাণী যে কুষ্কপ্রেমরাজ্যে সবচেষে ধনী তারও 
বিরহ আছে। বিরহ না থাকলে মিলন মধুর হয় না। সবত্র 
সর্বদা যদি কৃষ্ণদর্শন হয় তাহলে তো! কৃষ্ে অরুচি হয়ে যাবে। 
তাই কৃষ্ণকে স্বর করবার জন্যও ভক্তের কাছে কৃষ্ণ সময় 
সময় দুর্লভ হন। বিপ্রল্ত ঘোগেই শ্বঙ্গাররসের পুষ্টি । 
কৃষ্ণও তেমনি ভক্তদের কাছে নিজেকে স্ুরস করবার জন্য মাঝে 
মাঝে দুলভ করেন । কুষ্জনিজে গোপবালাদের কাছে বলেছেন, 
ভক্তকে দর্শন না দিলে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু তবু তাদের 
দর্শন দিই না, কারণ তাতে তাদের অনুরাগ কমে যাবে । 
ভগবানের এই স্বভাব সবত্র, এমন কি গোগী পর্যস্ত। ভক্তের 
সর্বত্র ইষ্টদর্শনের যোগ্যত। আছে । কিন্তু উৎকণ্ঠ। যখন অত্যন্ত 
বেশী, তখন দর্শন করে। কামুক বাক্তি যেমন জগৎকে 
কামিনীময় দেখে, ধনকামী যেমন ধনময় জগৎ দেখেন তেমনি 
ভগবতদর্শনোৎস্থক ভক্ত সমস্ত জগৎকে ভগবন্ময় দর্শন করেন । 
উত্তম ভক্ত আত্মবৎ সর্বভূতানি পশ্যেৎ। উত্তম ভাগবত সমস্ত 
জগৎকে ভাবেন সকল ভূতবর্গই আমারই মত ভগবানে 
প্রেম করে । 

মধ্যম ভাক্তের লক্ষণে শ্রীষোগীন্দ্র বলেছেন, ঈশ্বরে অর্থাৎ 
ভগবানে মধ।ম ভক্ত প্রেম করবে এবং তদধীনে এখানে তস্য 
অধীন, “তদধীন" এভাবে ব্যাখ্যা করা চলবে না। তাহলে তার 
সকল স্থষ্টকে বুঝায় । কিন্তু এইভাবে অর্থ করতে হবে, স অধীন; 
যেষাম্‌, ভগবান ধাঁদের অধীন অর্থাৎ ভক্তজন-__ভক্তে মৈত্রী, 
বালিশ জনে অর্থাৎ ভক্তিহীন জনে কৃপা এবং বিষুবৈষ্বদেষ্টাতে 


নবযোগীজ্দ্রসংবাদ ১০৭ 


উপেক্ষা- এইরূপ ভেদ ছুটিই মধ্যম ভক্তের চরিত্রে দেখা যায়। 
উত্তম ভক্তে এরকম কোন ভেদবুদ্ধি নেই, তারা সকলের মধোই 
ইষ্ট দর্শন করেন। ভগবানে এবং ভক্তজনে ধারা বিদ্বেষ ভাব 
পোষণ করেন, তাদের প্রতি মধাম ভক্তের থাকবে উপেক্ষা । 
অর্থাং তাদের উক্তিতে চিত্ত ক্ষুব্ধ হবে না, অথচ উদাসীন 
থাকবে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে চিত্ত বিক্ষুব্ধ হবে না কেন? এই 
যে বিষু-বৈষ্ণবদ্েষী তারাও তো ভগবতভক্তিহীন্ন। কাজেই 
তারাও বালিশ ; আর বালিশ বলে তাদের ওপরেও'কৃপা আছে, 
কৃপা আছে বলেই চিত্ত ক্ষুব্ধ হয় না। হিরণ্যকশিপুর ওপরে 
যেমন প্রহ্লাদের ভাব। হিরণ্যকশিপু প্রহলাদের ওপরে কত 
পীড়ন করেছেন__পিতাঁকে বিষুবৈষ্ণববিদ্েষী জেনে তার প্রতি 
প্রহলাদ ক্ষুব্ধ হন নি, অজ্ঞ জনে যে নিজের বলদাতা, অশ্রদ্দাতাকে 
চেনে না, তার সম্বন্ধে ক্ষোভ করে লাভ কি? এখানে বলবার 
তাংপধ হল, ভগবানে এবং ভক্তকে যারা ছ্বেষ করে তাতে 
অভিনিবেশ না থাকা দরকার । এদের উত্তম ভক্তের মত সবত্র 
প্রেমের স্ষৃতি হয় না । এইজন্যই মধ্যম বলা হয়েছে । 
প্রীবিশ্বনাথ চক্রবতিপাদ বলেছেন, ঈশ্বর বলতে নিজের 
উপাস্য দেবতা, তাতে মধ্যম ভক্ত নিষ্ঠাবান হবে । অনেকে বলে 
থাকেন, আমাদের বুদ্ধি সঙ্কীর্ণ নয়, আমরা সকলকেই ভজি। 
কিন্তু সকলকে ভজ। ভক্তির লক্ষণ নয়, এতে ব্যভিচারিতাই 
প্রকাশ পায় প্রেম সর্বত্র হতে পারে না । প্রেম একজায়গাতেই 
হয়, পতিত্রতা স্ত্রীর যেমন। এই প্রেম ঘনীভূত হয়ে পাঁচটি 
আকার ধারণ করে- শান্ত, দাস্ত, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর । প্রেম 


১০৮ নবযোগীক্্রসংবাদ 


ঘন ন! হলে এ চেহারা হয় না। ছুধ দিয়ে তো নাড়ু তৈরী হয় 
না, ক্ষীর দিয়েই নাড়ু, তৈরী হয়। 

পূর্বের পূর্বেরটি পরের পরের চেয়ে ছূর্বল। শান্তরস অপেক্ষা 
দাস্যরসের উৎকর্ষ । দাস্তরস হতে সখ্যরসের, সখারস হতে 
বাৎসলারসের, বাৎসলা হতে মধুর রসের উৎকর্ষ । মধুর রসে 
সকল রসের অবস্থিতি। অতএব মধুর রসই সর্বশ্রেষ্ঠ । প্রেম 
অর্থাৎ আসক্তি, আসক্তি না হলে মজা যায় না, না মজলে ভজন 
হয় না। মজ। অবস্থায় ভজন আর ন1 মজা অবস্থায় সাধন । 
সাধন হল জোর করে ইন্দ্রিয়কে টেনে নিয়ে যাওয়া আর ভজন 
হল লোভে পড়ে ইন্ড্রিয়ের স্বতঃস্ফুর্ত গতি । ভগবানে আসক্তির 
অর্থ কি? ভগবানের রূপ, গুণ লীলায় ইন্দ্রিয়সহ আত্মাকে 
জড়িয়ে নেওয়াই আসক্তি । মধ্যম ভক্ত যে বালিশ জনে কৃপা 
করবে, কেমন করে কৃপা করবে? জগৎ ভরেই তো মূর্খজন, 
ভক্তিহীন জন, এর সংখ্যা তো বহু । তাঁদের সকলকে ধরে ধরে 
কি কৃপা করবে? কিন্তু রাজষি ভরত, আচার্য বেদব্যাস, 
দেবষিপাদ নারদ, আজন্পমুক্ত শ্রীশুকদেব, গোস্বামি পাদ, 
এদের তো সকলকে কৃপা করতে দেখা যায় নি। এখানে 
সিদ্ধান্ত হল, যে সকল ভক্তিহীন অর্থাৎ বালিশ পাত্রে কৃপা! স্বয়ং 
উদ্দিত হবে, সেইখানেই কৃপা হবে । এখানে কৃপা স্বয়ং কত্র। 
শ্রীক্রবতিপাদ বলেছেন, পাহাড়ের এক জায়গায় ঝরণা ঝরে, 
অন্যত্র শুফ, এর যেমন কারণ নির্ণয় করা যায় না, তেমনি 
মহাজনের কৃপা ঝরণাও যে কোথায় ঝরবে, আর কোথায় ঝরবে 
না বল। যায় না; কৃপার ধারাই এই রকম। ভগবানে যারা 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ৬০৯ 


দ্বেষ করে, তাদের উপেক্ষা করতে হবে। এখানে কৃপা করা 
চলবে না বরং দূর থেকে তার মঙ্গল চিন্তা করাই সদাচার । 
এখানে একটি প্রশ্ন হতে পারে, কৃপা করার লক্ষণ তো! মধাম 
ভক্তে বলা হয়েছে । তাহলে কি উত্তম ভক্ত কৃপা করবে না ॥ 
তার উত্তরে বলা যায়, উত্তম ভক্তুও কৃপা করবে যেমন দশম 
শ্রেণীতে যে পড়ে, তার ভেতরে যেমন ৮ম বা নবম শ্রেণীর 
ছাত্রের জ্ঞান তো আছেই, উপরন্তু ১০ম শ্রেণীর নিজস্ব জ্ঞান 
আছে। তেমনি উত্তম ভক্তের মধো মধ্যম ভক্তেক্স লক্ষণ তো 
আছেই, উপরন্ত সর্বভূতে ইঠ্টদর্শনরূপ যে উত্তম ভক্তের নিজস্ব 
বৈশিষ্ট্য সেটিও আছে। কাজেই মধ্যম ভক্তের কৃপা করা 
স্বভাবটি উত্তম ভক্তের মধোও আছে । উত্তম ভক্ত তগবৎদর্শনের 
উৎকণ্ঠায় তন্ময় হয়ে সর্বভূতে চেতনাচেতনে ইস্ট দর্শন করে। 
এ জগতেও দেখা যায়, পুত্রের জন্য মায়ের অত্যন্ত উত্কণ্ঠায়, যে 
কোন ব্যক্তি এলেই পুত্র আসছে বলে মনে করেন। কিন্তু 
সে ব্যক্তি পুত্র হয় না, কারণ এ জগতের তন্ময়তা মিথ্যা । 
আর ভগবানের দর্শনের উৎকণ্ঠীয় ভক্তের সব্ভৃতে ভগবৎদর্শন 
হয় কারণ ও জগতের তন্ময়তা সত্য । লোহা কালে এবং 
কঠিন । তার এ গুণের কিছুতেই পরিবর্তন হয় নী। একমাত্র 
অগ্নিতে যদি লোহাকে নিক্ষেপ কর! যায়, তাহলে লোহার কাল 
রংকঠিনত্ব চলে গিয়ে লাল ও তরল হয়, তেমনি আমাদের এ 
প্রাকৃত মায়িক ইন্দ্রিয় লোহার মত। তাকে যদ্দি সচ্চিদা- 
নন্দময়ী ভক্তি অগ্নিতে নিক্ষেপ করা যায়, তাহলে ভক্তি অগ্নির, 
সচ্চিদানন্দের স্পর্শ তাতেও লাগবে । তখন আমাদের প্রাকৃত 


১১০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ইক্জ্িয়ও সচ্চিদানন্দময় হয়ে উঠবে । অমৃতসাঁগরে স্সান করতে 
পারলে সব জ্বাল! জুড়িয়ে যায়। কিন্তু স্ান করাই কঠিন। 
মায়িকত। ছেড়ে আমরা! থাকতে পারি না। উত্তমতা আমাদের 
সয় না। ঝিষ্ঠার কৃমিকে গোলাপে স্থান দিলে সে তা সহা 
করতে পারে না, সরে গিয়ে আবার বিষ্ঠাতেই বসে। অগ্নি 
যেমন সর্বভূক্‌, কোন কিছু গ্রহণ করতে তার বাধে না, 
তেমনি সচ্চিদানন্রময়ী ভক্তিও সব জিনিষকেই, যা কিছুই তার 
সংস্পর্শে আস্থক না কেন, সকলের ওপরে নিজের বরণ ধরিয়ে 
দেয়। যে ভক্তের সর্বভূতে ভগবৎ-দর্শন-যোগ্যতা গুণটি 
এখনও প্রকাশ পায় নি, অথচ এই চারিটি লক্ষণ প্রকাশ 
পেয়েছে, সে হল মধ্যম ভক্ত। উত্তম ভক্তে মধ্যম ভক্তের 
চারটি লক্ষণ তো! দেখা যায়ই, উপরস্ত সর্বভূতে ভগবৎ দর্শন 
লক্ষণটি তার নিজন্ব আছে। মধ্যম ভক্তে যখন সর্বভূতে 
ভগবৎ-দর্শনযোগ্যতা প্রকাশ পাবে, তখন সে-ই হবে উত্তম 
ভক্ত। নারদ, ব্যাস, শুক প্রভৃতি এই উত্তম ভক্তের 
উদাহরণ । 

এইবার শ্রীযোগীন্দর কনিষ্ঠ ভক্ত বা! প্রাকৃত ভক্ত সম্বন্ধে 
লক্ষণ করছেন । ভক্তের স্তরবিচারে উত্তম, মধ্যম এবং কনিষ্ঠ 
অথবা প্রাকৃত-_কায়ণ ভক্ত কখনও অধম হয় না। গৌরগোবিন্দ 
পদাশ্রিত ব্যক্তি কখনও অধম হতে পারে না-_হরিবিমুখাঃ 
অধমাঃ। কনিষ্ঠ তক্ত প্রতিমাতে হরি অর্চনা করেন, কিন্তু ভক্ত 
বা তদ্‌ ভক্তের আরাধনা করেন না । প্রকৃতি প্রারস্ত অর্থাৎ 
অধুনা প্রারস্ত ভক্তি। এই প্রাক্কৃতভক্তই শীত্র উত্তম ভক্ত 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১১১ 


হবে। কনিষ্ঠ ভক্তের প্রতিমাতেই শ্রদ্ধা, অন্যত্র শ্রদ্ধা নেই। 
অন্তর শ্রদ্ধা একথার অর্থ কি? শ্রীমন্মহাপ্রভুর বাক্য 
আছে £ 
ব্রাহ্মণ আচগ্ডাল কুকুরাম্ত করি 
দণ্ডবৎ করিবেক বনু মান্য করি । 
এই সে বৈষ্ণব ধর্ম সবারে প্রণতি 
সেই যে ধর্মধবজী যার ইথে নাহি মতি || 
আরও বলেছেন, 'জীবে সন্মান দিবে জানি কষ অধিষ্টান? | 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাকৃত ভক্ত সেটি করে না কেন 1 শ্রীজীব- 
গোম্বামিপাদ বলেছেন__ভগবপ্রেমাভাঁবাৎ ভক্তমাহ্থাস্বা-জ্ানা- 
ভাবাচ্চ। তাদের এখনও ভগবানে প্রেমসম্পন্তি লাঁভ হয় নি। 
ভগবানে প্রেম হলে তবে ভক্তমহিমা জান! যায় কনিষ্ঠ ভক্তের 
ভগবানে প্রেম হয় নি। তাই ভক্তমহিমাও জানেন না। 
তূর্বাসা খষি সুদর্শন চক্রের তাপে তপ্ত হয়ে সমগ্র ব্রহ্গাণ্ড 
ঘুরে কোথাও স্থান পেলেন না। পরে বৈকুগ্ঠনাথের কাছে 
কৃপা পেয়ে যখন মহারাজ অন্বরীষের কাছে ফিরে এলেন, 
তখনই ভক্ত অন্বরীষের মহিমা! জানতে পারলেন ৷ খষি বলছেন ; 
অহো৷ অনম্তদাসানাং মহত্বং দৃষ্টমগ্য মে | 
কৃতাগসোহপি যদ রাজ্বন্‌ মঙ্গলানি সমীহসে ॥ ভা. ৯৫1১৪ 
আহা আজই আমার অনস্তদাসের মহিম দৃষ্টিগোচর হল-". 
বৈষ্ণব দেখলেই বৈষ্ব চেন! যায় না, ভগবৎকৃপা হলে বৈষ্ঞব 
চেনা যায়। 
সকলকে আদর করাই ভক্তের গুণ। প্রাকৃত ভক্তের এই 


১১২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


লক্ষণটি এখনও প্রকাশ পায় নি। গোলাপের কুঁড়িতে 
গোলাপের সৌন্দর্য সুরভি সব প্রকাশ পায় না। উদীয়মান 
ন্দ্রনূর্যে পূর্ণ প্রকাশমান চন্দনের দীপ্তি সম্ভব নয়, কিন্ত 
কিছুক্ষণের মধোই তা প্রকাশ পায়। শিববাক্যে আছে ঃ 
আরাধনানাং সবেষাং বিষ্কোরারাধনং পরম্‌। 
তম্মাৎ পরতরং দেবি তদীয়ানাং সমর্চনম্‌ ॥ 

সকল দেবতার আরাধনা অপেক্ষা বিষ্ণুর আরাধনা বড়। 
আবার তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ আরাধনা! আছে দেবি-_-সেটি হল 
তার ভক্তের আরাধনা । ঈশ্বর-আরাধনায় সিদ্ধিলাভ হবে 
কি না, তাতে সন্দেহ আছে। কিন্তু ভক্ত-আরাধনায় যে 
সিদ্ধিলাভ হবেই এটি নিশ্চিত। ঠাকুরের ঠাকুর আমার 
বৈষ্ণব গোঁসাই। ইন্দর্ায়রাজা বিষু-আরাধনায় রত ছিলেন । 
এমন অবস্থায় অগস্ত্য মুনি অতিথি হলেন । রাজ! বিচারে 
ভুল করেছেন, পুজা সেরে তারপর অতিথির জমাদর করতে 
এসেছেন, তাতে তার অপরাধ হয়েছে । যার ফলে রাজার 
হস্তি গজেন্দ্র জন্ম হল। শিব জগদগুরু, তিনিও কৃষ্ণের অভিন্ন 
তত্ব সঙ্কর্ষণ ভক্ত-তন্ব পূজা করেন, সন্কর্ষণ পুজে শিব তাই তে৷ 
তার অঙ্গে সর্পের ভূষণ । পারতী নিত্য অবুদ নারী নিয়ে 
পাভালে যান সক্কর্ষণ পূজা করতে । ইহ্ট-বিস্থৃতি যাতে না হয়, 
তাই সর্পধারণ, ইষ্ট-বিস্থৃতিই মৃত্যু । ইষ্ট যেন কখনও বিস্মরণ 
না হয়। এরই নাম বুদ্ধিমত্ত । 

ভক্তদেহে ভগবানের গুণ সঞ্চারিত হয়। কনিষ্ঠ ভক্তের 
ভক্তি সবে মাত্র আরম্ভ হয়েছে। তাই এখনও তার সকল 


টস 


নবযোগাক্দ্রসংবাদ ১১৩ 


£৭ আরম্ভ হয় নি। শ্রদ্ধাপূর্বক হরি অর্চনা করেন কনিষ্ঠ ভক্ত । 
এ শ্রদ্ধা শাস্ত্রার্থাবগতির ফলে নয়। তা যদি হত তাহলে এই 
কনিষ্ঠ ভক্তে অর্চা শ্রদ্ধার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তে আদর লক্ষণটি প্রকাশ 
পেত। কনিষ্ঠ ভক্ত তাহলে এ শ্রদ্ধা কোথায় পেল? এ শ্রছ। 
লোকপরম্পরা প্রাপ্ত ৷ যে ব্যাক্তর ভগলানে প্রেম জন্মায় নি,অথচ' 
শাস্ত্রীয় শ্রদ্ধাসম্পন্ন তাকে মুখ্য কনিষ্ঠ ভক্ত বল। হবে। আর 
ধার শাস্ত্রীয় শ্রদ্ধা নয়, কেবল মাত্র লোকপরম্পরাপ্রাপ্ত শ্রদ্ধা 
তান হলেন কনিষ্ঠের কনিষ্ঠ ভক্ত । ভক্ত আদর কক ছাড়। 
ভক্তিরসের আব্বাদন হয় না । 

ভক্তের তিনটি স্তর বিচারের পর দ্বিতীয় স্ক্নেগীক্দ্র উত্তম 
তক্তের আরও কয়েকটি লক্ষণ বলেছেন । জগতে শব্দ, স্পর্শ, 
রূপ, রস গন্ধ-_এই পাঁচটি বিষয় আছে । তার আঁবার বিভিন্ন 
প্রকার । আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় এই পাঁচটি বিষয়কে নিরম্তর 
গ্রহণ করছে । কর্মফল যার যেমন সে তেমনি বিষয় ভোগ পায়। 
পিপাসা কিন্তু কারও মেটে না। বিষয় না পেলেও মনে মনে 
বিষয় ভোগ হয়- উত্তম ভক্ত প্রায়শঃ ইন্দ্রিয়ের দ্বার বিষয় 
গ্রহণ করে না। যদি কেউ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয় গ্রহণ না করে 
মায়ার রাজ্য থেকে সরে যেতে চায়, তখন মায় তার কাম 
ক্রোধাদি শক্রকে তার কাছে পাঠিয়ে দেয়। মায়ার রাজ্য 
যাতে অটুট থাকে সে ব্যবস্থা করবার জন্য মায়ার রাজ্যে 
রূপাদি পঞ্চক ছড়িয়ে রাখা হয়েছে । উত্তম ভক্তের চিত্ত 
আীবাস্থদেবে আবি তাই তার! ইন্ড্রিয়ের দ্বারা বিষয় ভোগ করে 
না। মন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যোগ হনে তবে বিষয় ভোগ হয় ॥ 

৮ 


১১৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


উত্তম ভক্তের মন বান্ুদেবে লেগে আছে । অমৃতসাগরে মন 
ডুবে গেলে সে মন যেমন সেখান থেকে তুলে প্রাকৃত মরুর 
তপ্ত বালুকায় দেওয়া যায় না, তেমনি শ্রীবাস্দেবাবিষ্ট চিত্তও 
উত্তম ভক্ত তুলে নিয়ে বিয়ভোগে লাগাতে পারে না । তাহলে 
এইটিই সাবাস্ত হল যে, উত্তম ভক্ত ইন্ড্রিয়ের দ্বারা বিষয় ভোগ 
করে না। আর যদি বা কখনও করতে দেখা যায় তাহলে 
সেখানে বিষয় গ্রহণের যে স্বাভাবিকত। তার খণ্ডন করা হচ্ছে । 
ইব্দ্রিয়ের দ্বার! বিষয় গ্রহণ করলে হয় দ্বেষ, না হয় তোষ, ছুটির 
একটি হবেই । বাসনা পুরণ না হলে দ্বেষ এবং পুরণ হলে তোৰ 
অর্থাৎ সন্তোষ হবেই । কিন্তু উত্তম ভক্তের ইন্দ্রিয়ের দ্বার 
বিষয় গ্রহণ হলেও তার দ্বেষ বা তোষ হয় না। কিন্তু এটি 
কেমন করে হয় ? আগুনে হাত দিলে হাত তো! পুড়বেই । উত্তম 
ভক্তের যে দ্বেষ বা তোষ হয় না, তার একটিমাত্র কারণ হল-_ 
তারা ভালভাবেই জানে যে এই জগতের সবই বিষ্ণমায়া ৷ 
তাই জেনে কিছুতেই বস্তবুদ্ধি করে না। বস্তবুদ্ধি না হলে 
দ্বেষ বা তোষ হয় না মৃদ্গজভানবৎ। মৃত্তিকার হাতীতে 
যেমন অজ্ঞ শিশুই বস্ত জ্ঞান করে প্রলুব্ধ হয়, বিজ্ঞজন কিন্তু তাকে 
অবস্ত বলে জানে, তেমনি উত্তম ভক্ত জগতের সকল বস্তুকেই 
ত্যাজ্য বলে জানে । এগুলি যে বস্ত নয়, সে বোধ তার আছে। 
কাজেই সেটি পেলেও তোষ হয় না, না পেলেও রোব হয় না। 
তবে যেসে বিষয় গ্রহণ করে সে কেবলমাত্র জাগতিক লোক 
ব্যবস্থার জানবার জন্য । প্রহ্লাদজী দৈত্যবালকদের কাছে 
বলেছেন £ 


নবযো গীন্্রসংবাদ ১১৫ 


অসারসংসারবিবর্তনেষু মা যাত তোষং প্রসভং ব্রবীমি । 
অসার সংসারে সার বুদ্ধি করাটি পেপে গাছে জল ঢেলে তক্ত। 
করবার আশা করার মত। অসারে সার বুদ্ধি করেই স্ত্রীপুত্রাদির 
প্রতি কর্তব্য বোধ এসে পড়ে । কতব্য পালন করে পরে 
দেখ যায় সংসার কেবল ফাঁকিই দিয়েছে । এ জগতের সবটাই 
দুঃখের ছবি, সখের রঙ দিয়ে কেবল চোখে ধরা হয় । সবই 
দুখের এই মনে করে সবটাই ত্যাগ করতে হবে । উত্তম ভক্তের 
কোন আসক্তি নেই, আসক্তিই তো বা রোবের কারণ । তাই 
তাদের তোষ বা রোষ কোনটাই হয় না। গুরণময্মী বহিরঙ্গা 
মায়ার রঙ্গ হেয়। বহিরঙ্গা মায়াশক্তিতে মঙঞ্জে থাকলে 
অন্তরঙ্গ শক্তির আব্বাদ হয় না। উত্তম শুক্ত এই বহিরঙ্গা 
মায়াশক্তির আসক্তি ত্যাগ করেছে । তাই অন্তরঙ্গা শক্তির 
আম্বাদে সে বিভোর হয়ে আছে । এই কারণেই তাকে উত্তম 
ভক্ত বলা হয়। 

সংসার ধর্মের দ্বারা এ জগতে সকলেই মোহগ্রস্ত হন । 
কিন্তু যিনি হন না, তিনিই ভাগবতপ্রধান। তাদের চিত্ত 
শ্রীহরির স্মরণ দ্বারা আবিষ্ট। তাই তারা মুগ্ধ হন না। যেমন 
মন্ত্রের দ্বারা গা বাঁধা থাকলে সাপের কাছে গেলেও সাপে 
ছোবল মারতে পারে না, তেমনি শ্রীহরিন্মরণে গা বাঁধা থাকলে 
সংসারধর্মরূপ সর্প দংশন করতে পারবে না । ফলে তার মোহও 
হবেনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সংসারধর্ম কাকে বলে? সংসার ধর্ম 
হল রোগের উপসর্গের ৷ উপসর্গ কৃষ্ণবিমুখতা৷ অনাদিকালের। এটি 
হল আদি রোগ। তার ফলে মায়ার আক্রমণ, কৃষ্ণপাদপপ্প অনা 


১১৬ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


ছাড়া মায়া ছাড়ে না। সংসারধর্ম বলতে স্ত্রী, পুত্র, পরিবার 
নিয়ে গৃহে বাস করা । দেহ, ইন্ত্রিয়। মন, প্রাণ, বুদ্ধি এদের 
কাঁজের নামই সংসারধর্ম । দেহের কাজ জন্ম এবং মৃত্যু, প্রাণের 
কাজ ক্ষুধা পিপাসা, মনের কাজ ভয়, বুদ্ধির কাজ তৃষ্ণা । 
আর ইন্দ্রিয়ের কাজ শুধু পরিশ্রম করা । ইন্দ্রিয় তো নিজে 
ভোগ করতে জানে না, মন ভোগ করে, ইন্দ্রিয় বিষয় গ্রহণ 
করে পরিশ্রম করে মাত্র । এরই নাম সংসারধর্ম। এর 
কোনটির দ্বারা যে ব্যক্তি মুহামান হন না তিনিই উত্তম ভক্ত । 
উত্তম ভাগবত মনে করেন_ সুখ ছৃঃখ, শুভ অশুভ ছুইই ভগ- 
বানের দান । হিতৈষী পিতা যেমন সময়ে পুত্রকে নিমপাতার রস 
খাওয়ান, আবার সময়ে যেমন ক্ষীরের বাটি মুখে ধরেন, তেমনি 
বিশ্বপিতা ভগবান জীব-সম্তানকে কখনও দণ্ড দেন আবার 
কখনও পুরস্কার দেন। এ জগতে পুরস্কার আমার পাওনা নয়, 
যদি কখনও পুরস্কার পাওয়া যায়, সেটি করুণার দান । 

ভক্তের জন্মমৃত্যু গতাগতি কৃষ্ণ ইচ্ছায়। জন্বমত্যুর র্রেশ 
ভগবদ্পাপকে সহ্া করতে হয় না। মহাজন প্ররেমানন্দ দাস 
বলেছেন £ 


প্রেমানন্দ কহে এই মরিলে না মরে সেই 
কৃষ্ণ কৃষ্ণ সদা ধার মুখে । 
কোথা তার কর্মবন্ধ প্রেমে মত্ত সদানন্দ 


গতায়াত মাত্র নিজ সুখে ॥ 
শ্রীবলদেব বিস্ভাভৃষণ মহাশয় উদাহরণ দিয়েছেন, বিড়ালী- 


নবষোগীক্দ্রসংবাদ ৬১৭ 


ধরে নিয়ে যায়, তাতে শাবক ব্যথা তো পায়ই না, বরং শখ 
অন্নুভব করে । আবার সেই বিড়ালী যখন তার এ একই দাত 
দিয়ে ইছুর ধরে, তখন ইছুর বুঝে তার দীতে কত ধার, ইছুরেব 
দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়, তেমনি অভভ্ত জন্মমৃত্যু-যন্ত্রণা৷ ভোগ করে। 
ভক্ত তার এক বিন্দুও ভোগ করে না। বলা আছে--ন কর্মবন্ধনং 
জন্ম বৈষ্ণবানাং বিষ্যতে'। বিষ্ণুভক্তিতে রত ব্যক্তির সংসার 
ক্রমে ক্রমে লয় পায় । এই ক্রম শুনে হতাশ হবার কিছু নেই । 
এটি পদ্মপত্রশতভেদন্যায়ে এত দ্রুত হয় যে নিমেষমাত্রে সংসার 
লয় পায়। ভক্তের জন্মমৃত্যুতে যদি ক্লেশ থাকত তাহলে ভক্ত 
জন্মমৃত্যু নিরোধ প্রার্থনা করতেন । কিন্তু তা তো করেন নি। 
বরং জন্ম প্রীর্থনা করেছেন 2 
আসিব যাইব চরণ সেবিব। 
ভক্ত চান ঃ তুমি আর নিতানন্দ বিহরিবে যথা । 
এই কর জন্মে জন্মে ভৃত্য হই তথা ॥ 

্রীমন্মহাপ্রভৃও ভক্ত আবেশে বলেছেন £ 

মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে ভবতাৎ ভক্তিরহৈতুকী স্বয়ি । 

-_শ্রীঞ্রীশিক্ষার্টকম্‌ 

ভক্তের জন্মমৃত্যু কর্মফলের পাওনা নয়, এটি ঘটে 
ভগবদিচ্ছায়। উত্তম ভক্ত প্রভৃর স্মরণে আবিষ্ট, তাই তাদের 
মনে ভয় থাকে না। হরি-সিংহ যার হৃদয়গুহায় সর্বদা বর্তমান 
-তার তো কামাদি হস্তীর ভয় থাকতে পারে নাঁ। ভক্তের 
প্রাকৃত বিষয়ে তৃষা নেই । তাই তৃষ্ঞাতে সে মুগ্ধ নয়। এ 
জগতের ইন্দ্রিয় শুধু খেটেই যায়, কিছু পায় না, তারা ভোক্তা 


১১৮ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


নয়_-মনই ভোক্তা--কিন্তু ভক্তের সচ্চিদানন্দ তন্ৃতে সব ইন্ড্রিয়ই 
ভোক্তী। তারা প্রত্যেকেই সচেতন । তাই তার! শ্রীগোবিন্দের 
রূপরসাদি যা কিছু গ্রহণ করে তাকেই ভোগ করে । তাদের 
মারিকতা ত্যাগ করে চিন্ময়তা লাভ করে। প্রতি ইন্দ্রিয়ই 
তাদের গোবিন্দবিষয় ভোগ করে । তাই তাদের ক্লেশ নেই। 
এইভাবে দেখা যায়, সংসারধর্ম ভক্তেরও আছে, কিন্তু হরির 
স্মরণে তাদের মোহ হয় না । তাই দ্বিতীয় যোগীন্দ্র বললেন-_- 
যিনি ভাগবত-প্রধান অর্থাৎ উত্তম ভাগবত তিনি সংসারধর্মের 
দ্বারা বিমুগ্ধ হন না। দেহে অহংবুদ্ধি এবং দৈহিক বস্তুতে যাঁদের 
মমভাবুদ্ধি জাগে না তাঁরাই উত্তম ভাগবত । জন্মের দ্বারা, 
কর্মের দ্বারা, বর্ণ, আশ্রম জাতির দ্বারা দেহে অহংকার আসে। 
বর্ণ হল ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শৃদ্র : আশ্রম হল ব্রহ্মচারী, গৃহস্থী, 
বানপ্রস্কী, সন্নাসী, জাতি অন্বষ্ঠ প্রভৃতি--এ সব অহংকার দেহে 
আসে--এ অহংকার থেকে যিনি মুক্ত তিনিই উত্তম ভাগবত । 
ভক্তমাত্রই ভগবানের প্রিয়, বিশেষ করে উত্তম ভাগবত । 
ভগবানের তক্তপক্ষপাতিত্ব শান্ত 'স্পষ্টত দেখিয়েছেন । কিন্তু এ 
পক্ষপাতিত্বটি দোষ তো হবেই না, বরং পরম গুণ হবে। ভগবান 
শ্রীকষ্ণচন্দ্র এ দোবটি তার অঙ্গের ভূষণ করেছেন। যেমন 
রাধারাণী গুরুগঞ্জন৷ কৃষ্ণকলম্ককে নিজ অঙ্গের ভূষণ করেছেন । 
ভাগবতোত্তম সম্বন্ধে আরও বেশী কথা হল যার চিত্তে কাম, কর্ম, 
বীজ জন্মায় না-_-অহংকার তার দেহে লাগেই না । শ্রীজীবপাদ 
বলেছেন, এতাভিস্ত অন্মিন দেহে অহংভাঁবে। ন সঙ্জতে কিন্তু 
ভগবৎসেবৌপয়িকে সাধ্যে দেহে এব সঙ্জতে । এই প্রাকৃত 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১১৯ 


দেহে অহংভাব লাগে না বটে, কিন্তু সাধকের ধ্যানে যে চিন্ময় 
দেহ আছে তাতে এই অহংকারটি লেগে থাকে যে, এই সিদ্ধ 
দেহটি আমার দেহ, এই দেহ দ্রিয়ে ভগবৎসেবা করব-"-ইত্যাদি । 
প্রাকৃত দেহে জন্মকর্মাদির দ্বারা যে অহংকার লিপ্ত হয়, তা নিত্য 
নয়, কারণ দেহান্তে সে অহংকার আর থাকে না। কিন্তু সেবার 
উপযোগী যে সাধ্য চিন্ময় দেহ তাতে যে অহংভাব তা নিত্য । 
সে দেহের বিনাশ হয় না। এখন প্রশ্ন হতে পারে, সাধ্য দেহ 
তো! চিন্ময়, জীবাত্ম৷ অণুচৈতন্য, কিন্তু সাধ্য দেহ তৈরী করতে যে 
পরিমাণ চিৎ প্রয়োজন, অণুচৈতন্য জীবাত্মা সে চিৎ কোথায় 
পাবে? ধার কাছে চিতের ভাণ্ডার তিনি যদি দান করেন, 
ভাহলে জীব এ চিৎ পেতে পারে । চিৎ-এর ভাগারী হলেন 
শ্রীগুরুপাদপপ্প । তিনিই কৃষ্ণনান গৌরনাম দান করেন-- 
এইটিই চিৎসম্পর্ক। নাম এবং স্বরূপ অভিন্ন, তাই নামের 
সম্পর্কেই চিৎ ভগবংস্বরূপের সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে যায় । এইভাবে 
যতবার কুষ্ণনাম. গৌরনাম উচ্চারণ কর! যায়, ততই চিৎ জম। 
হয়। যত বেশী এই নাম করা যাবে ততই চিৎ সংগ্রহ হাবে 
সাধক এই প্রাকৃত দেহে থেকে নাম উচ্চারণের দ্বারা এই 
দেহের ভিতরে ভিতরে একটি ভগবতসেবোপযোগী সাধ্য চিন্ময় 
দেহ তৈরী করে নেন সকলের অলক্ষ্যে । মা যেমন সকলের 
অলক্ষ্যে সম্তানের দেহটি নিজের রসরক্ত দিয়ে ধীরে ধীরে পুষ্ট 
করে তোলেন। লোকের দৃষ্টির আড়ালে এই কাজটি হতে 
থাকে, পাছে লোকের দৃষ্টি পড়লে তাতে অনিষ্ট হয়। এইভাবে 
মাতৃগর্ভে শিশুর দেহ খন সম্পূর্ণ পুষ্ট হয়ে যায়, তখন মায়ের 


১২০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


দেহ থেকে সেটি পৃথক হয়ে পড়ে । মায়ের দেহ এবং শিশুব 
দেহ, ছুটি আলাদা হয়ে যায়, তেমনি সাধকের এই প্রাকৃত 
দেহের মধ্যে যখন চিন্ময় দেহ সম্পূর্ণ পুষ্টিলাভ করে তখন এই 
প্রাকৃত দেহের আবরণ ভেডে সে বেরিয়ে পড়ে । প্রাকৃত 
দেহ ভাঙা অর্থাৎ দেহের প্রাকৃতত্বের সম্পূর্ণ বিনাশ হয়ে সম্পর্ণ 
চিন্বয়ত্ব লাভ করা । সাধকের এই চিন্ময় দেহের গঠনও সকলে 
অলক্ষ্যে ঘটে। অন্তের দৃষ্টিতে তার ব্যাঘাত হতে পাবে। 
সাধক যখন সাধনপথে অগ্রসর হয় তখন কিছুটা অগ্রসর হ ওয়ান 
পরেই তাতে রও ধরে, যেমন কাচা আমে সবুজ রং থাকে, তাতে 
যখন জোষ্ঠ মাসের তাপে রং ধরে, তখন তাকে আর কাচা বল। 
যায় না- সে পাকাই অবশ্ঠ সম্পূর্ণ পাকা না হলেও পাকবাৰ 
পথে । একদিন সে সম্পূর্ণ পেকে যাবে, সাধকের অবস্থাও ঠিক 
একই রকম । ছুই প্রকারের সাধক আছেন, অসিদ্ধ ও সিদ্ধ । 
সিদ্ধ দেহলাভ করে ধার! এই প্রাকৃত দেহ ত্যাগ করেন তারা 
আবার পরে বখন জন্মগ্রহণ করেন তখন চিন্ময় দেহেই জন্মগ্রহণ 
করেন । আর ধাদের অসিদ্ধ অবস্থাতেই দেহত্যাগ হয়, তারা 
যখন আবার জন্মগহণ করেন, তখন পুবজন্মে যতটা সিদ্ধ হয়েছেন 
তার পর থেকে অগ্রসর হন। পূর্জন্মের সাধন তার বিফল হয় 
না। এই দেহেই মানুষের মধ্য চলে ফিরে বেড়ান বটে, কিন্ত 
তারা এ জগতের মানুষের মত নন। প্রাকৃত দেহে থাকার 
সময় সাধকের সিদ্বেহের ভাবনা নিরন্তর থাকে এবং সেই 
সিন্ধদেহেই ভগবংসেবা-যোগ্যতার অহংকার থাকে । 

ভক্ত সম্বন্ধেই হরির প্রিয়তা বিধান করা হয়েছে । কোন 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১২১ 


ধাতুকে ঢালাই করতে গেলে আগে একটা মাটির ছাচ তৈরী 
করতে হয়। ধাতু গলিয়ে সেই মাটির ছাচে ঢেলে দেওয়া হয় 
এবং ঘতক্ষণ সেই ধাতুপাত্রটি শক্ত ন! হয়, ততক্ষণ তাকে তোল। 
হয় না। যখন শক্ত হয়ে যায়, তখন বাইরে থেকে মাটির 
ছাচকে ভেডে ফেল! হয় এবং ধাতুপাত্রকে বার করে নেওয়া হয়। 
সাধনের ব্যাপারেও তেমনি শ্রবণ-কীত্ন-স্মরণ-বন্দনের দ্বারা যে 
চিন্ময়ত লাভ-_ এটি এখনও তরল আছে, অর্থাৎ অপক্ক অবস্থা 
মাটির ছাচরূপ এই প্রাকৃত দেহে ঢেলে দেয় সাধক । যতক্ষণ সে 
চিন্ময়তা ঘন ব। জমাট না হয়, ততক্ষণ এই প্রাকৃত্ব দেহ যায় না। 
যখন ভেতরে সেই চিন্ময় দেহ জাম জমাট হয়ে যায়, তখন 
বাইরের আবরণ এই প্রাকৃত দেহের বিনাশ ঘটে ( অর্থাৎ তখন 
সাধকের প্রাকৃতত্ব একেবারে চলে যায়। তখন তার দেহ, 
ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার সব চিন্ময় হয়ে যায়। 
এই চিন্ময় দেহের অহংকার নিত্য | 

ষে ব্যক্তির সম্পদে অথবা দেহে আপন পর ভেদ নেই, 
সম্পদ--“ইদং মম নেদং তব-_অর্থা২ আপন বিত্বে পর বুদ্ধি 
কিন্ত পরবিত্তে আত্মবুদ্ধি নয়, আর পরের শরীরেও নিজের 
শরীরের মত 'গ্রীতি । উত্তমভক্তের সর্বভূতে সম দৃষ্টি । প্রহলাদজী 
বলেছেন, জগতে হাতি, ঘোড়া রাজা, প্রজা এ পুথক্‌ দৃষ্টি তো 
থাকবেই ; তাহলে তারা সমান হবে কেমন করে? উত্তম 
ভাগবত সর্জীবে আপন অঙ্গবৎ বুদ্ধি করে তাই তাদের পর বুদ্ধি 
একেবারেই নেই। সকল জীবে তার নিজের অঙ্গের মতই 
'আদর-। উত্তম ভাগবত শাস্ত অর্থাৎ যাঁর ছোটাছুটি বন্ধ হয়েছে। 


১১২ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


বাসনায় তাড়িত হয়ে যে ব্যক্তি স্বর্গাদির লোভে লুব্ধ হয় না. 
এইরকম লক্ষণ ধাঁর প্রকাশ পেয়েছে তিনিই উত্তম ভাগবত । 
ভগবৎপাদপদ্নযুগল থেকে ধার চিত্ত অর্ধনিমেষকালও সরে 
আসে না, শাস্ত্র বললেন, তিনি উত্তম ভাগবত । এখন প্রশ্ন 
হচ্ছে চিত্ত সরে আসবে কেন? ত্রিভুবনের বৈভব যদি তাদের 
দান কর! যায়, তাহলে তাদের চিত্ত বিচলিত হয় না। ত্রিভুবন 
বলতে উধ্ব, মধ) এবং অধোলোক অথবা স্বর্গ, মত্য, পাতাল । 
শ্রীজীবগোস্বামিপাদ বলেছেন, ত্রভুবনবিভবায় কিমুত তদ্ধেতবে' 
ইত্য্:। ত্রিভুবনের এ্বর্য অথবা! তার হেতু যদি আসে, তাতেও 
উত্তম ভক্তের ভগবংস্ৃতি কুষ্টিত হয় না। জাগতিক মুখছুঃখে 
আমাদের কুষ্ণধ্যান কুহঠিত হয়। ধ্যান কোনও রকমে একটু 
লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে পাতলা হয়ে যায়। আর উত্তম ভক্তের 
কাছে ত্রিভুবনের এশ্বর্ধও যদি “আমায় গ্রহণ কর" বলে প্রার্থী 
হয়ে দীড়ায়, তাহলেও হার চিত্ত ভগবৎপদারবিন্দ থেকে মুহূর্ত 
কালেব জন্যও বিচলিত হয় না । কারণ উত্তম ভক্ত বিচারে স্থির 
করেছেন যে ভগবৎপদারবিন্দ ছাড়া এ জগতে অন্ত কোন সার 
বস্তু নেই। হীরের বস্তা পেলে তাম্র খণ্ডের লোভে যেমন কেউ 
ছোটে না, এও তেমনি । কুষ্ণপাদপদ্মধ জগতে জবাপেক্ষ। 
মূল্যবান বস্ত । তার কাছে জগতের যে কোন বস্তু তুচ্ছ । এই 
বোধই প্রকৃষ্ট বোধ। ভগবান উদ্ধবজীকে বলেছেন, _এএষ 
বুদ্ধিমতাং বুদ্ধিঃ । এ জগতে মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি হচ্ছে 
কেমন করে সবচেয়ে বড়লোক হব। তা সে যেমন করেই 
হোক, ঠকিয়ে হোক | বঞ্চনা করে হোক | ভগবান মানুষের এ 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ১২৩ 


বৃত্বিটির প্রশংসা করেন । সবচেয়ে বড়লোক কেমন করে হওয়া 
ধায়, এ বৃত্তিটি ভাল | তবে সবচেয়ে উত্তম সম্পদটি কি, এটি 
জানবার জন্য আমাদের নৈমিষারণো যেতে হবে ৷ ষাট হাজার 
ঝধষির সামনে সেখানে বলা হয়েছে, কৃষ্ণপাদপদ্মই একমাত্র 
সবচেয়ে উত্তম বস্তু । এটি যদি কেউ লাভ করতে পারে তাহলে 
তার মত বড়লোক আর কেউ হবে না। এখানে কাকে ঠকিয়ে 
বড়লোক হবে! মায়াকে ঠকিয়ে কৃষ্ণপাদপদ্ম অধিকার করে 
সবচেয়ে বড়লোক হতে হবে । এতদিন মায়া ঠকিয়েছে, এখন 
নায়াকে ঠকাঁতে হবে। কল্পতরুর কাছে গিয়ে কেউ যদি 
সোনা দানা চায় তাঁকে যেমন মূর্খ বলা হয়। গীতাবাকো বলা 
আছে ঃ 
যেহি সংস্পর্শজা ভোগা ছুঃখযোনয় এব তে। 
আগগ্যস্তবস্তঃ কৌন্তেয় ন তেধু রমতে বুধঃ ॥ গীতা ৫1২১ 

প্রাকৃত যে কোন বিষয় হোক না কেন-_ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, 
গন্ধ প্রভৃতি সবই সান্ত এবং সাদি অর্থাৎ তার উৎপত্তি এবং 
বিনাশ আছে ; কোনটিই অনস্ত এবং আগ্ভ নয় এবং সবই 
দুখশোকপ্রদ। কাজেই বুধ অর্থাৎ বুদ্ধিমান ব্যাক্তি তা নিয়ে 
আনন্দ করেন না। কিন্তু গোবিন্দবিষয়রসভোগ ্বপ্রকাশ, 
তাতে ইন্দ্রিয় দিয়ে গ্রহণের দরকার হয় না। তাই সংস্পর্শজ 
ভোগ নয়। অতএব এতে ছুঃখের স্থান নেই এবং এটি অনস্ত। 
কারণ সূর্য ষেমন স্বপ্রকাশ, গোবিন্দবিষয়ভোগ তেমনি স্বপ্রকাশ, 
সাধনগম্য নয় । বূর্য দেখতে হলে যেমন সূর্যের আলো দিয়েই 
দেখতে হয়, অন্য আলো দিয়ে দেখ। যায় না, তেমনি ভগবৎ 


১২৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


স্বরূপের যে কোন ভোগ ভগবানেরই কৃপ। দিয়ে ভোগ করতে 
হবে) অন্য কোন সাধন দিয়ে তাকে দেখা বা পাওয়া যায় না। 
ভগবানের কাছে চাইতে যদি কিছু হয় তাহলে এমন জিনিবই 
চাইতে হবে যাতে আচল ভরে যায়, আর অন্য ছুয়ারে আচল 
পাততে না হয়। মহাজন বলেছেন 2 
কৃষ্ণ যদি মনে করে ব্রহ্মপদ দিতে পারে 
হেন কৃষ্ণ ভূল কি কারণে 
দেখ ধার শ্লীচরণ ধাঁন করে পঞ্চানন 
তথাপি প্রত্যয় নাহি মনে । 

শ্লীমন্তাগবতে শ্রীশুকদেব মাঝে মাঝে ভক্তচরিত্র বণনা 
করেছেন। এর অভিপ্রায় কি? ভক্ত ভগবান উভয়কে নিয়েই 
ভগবানের ভগবত্বা। ভক্তকে বাদ দিয়ে ভগবানের ভগবত্বা 
ফোটো না--ভগবাঁন সলীল ৷ লীল' রসাশ্রিত ব্রহ্মই ভগবান । 
ভগবততত্ব ভক্তের মধো অস্তর্গত। তাই ভাগবতে ভক্তকথা 
বললেন ৷ শ্রীরাসলীলাঁতেও দেখা যায় ভগবানের ( কৃষ্ণের । 
চেয়ে ভক্তের ( গোগীদের ) কথাই বেশী বলা হয়েছে । শাস্ত্র 
সিদ্ধান্ত যা কিছ ভক্তচরিত্রেই ফুটে ওঠে । ভক্তমাল গ্রন্থ 
নরসী ভক্তের উপাখান আছে। নরসী বাবা আশুতোষের 
কাছে অন্য কোন সম্পদ প্রার্থনা করেন নি। বলেছিলেন-_ 
বাবা তোমার বিচারে যেটি শ্রেষ্ঠ সম্পদ সেইটি আমাকে দাও। 
ভোলানাথ তাকে সকলের চেয়ে উত্তম বস্ত্র কৃষ্চভক্তি দান 
করেছিলেন। উত্তম ভাগবতও তেমনি ঠকে বুঝে শিখেছে যে, 
ভগবৎ পদারবিন্দের চেয়ে উত্তম বস্তু আর কিছু জগতে নেই । 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১২৫ 


তাই ত্রিভুবনের এশ্বধ অথবা! সে এশ্বর্য লাভের হেতুও যদি এসে 
উ হয়, তাহলেও তার চিত্ত লব নিমিষার্ধকালও ভগবৎ- 
প্দারবিন্দ থেকে চ্যুত হয় না। 
উত্তম ভক্তের চিত্ত যে বিচলিত হয় না_-তার কারণ কি? 
বন্তু যখন হাক্কা হয়, তরল হয়, তখনই তা নড়ে । বিষয়বাঁসন! 
অগ্নির দ্বার চিত্ত সন্তপ্ত হলে চিত্ত হাক্কা হয়, তরল হয়, তখন চিত্ত 
নড়ে। কিন্তু চিত্ত শীতল হয়ে গেলে আর নড়ে মা । জল 
যেমন তরল তপ্ত অবস্থায় চঞ্চল কিন্তু হিমশীতল বরফ অচঞ্চল। 
উত্তম ভাগবতের চিত্ত অচঞ্চল। এই শীতলতা তারা কোথায় 
পায়? ভগবানের নখরমণির যে তাপহারিণী দ্বীপ্ি, সেই 
চক্দ্রিকায় তাদের চিত্ত শীতল হয়ে গেছে, শান্ত হয়েছে, তাই 
কামনা-অগ্নি সেখানে আর তাপ দেবে কেমন করে? যেমন 
মাকাশে যখন পুণিমার চাদ ওঠে তখন দিনের প্রখর স্ুর্ষের 
তাপ আর কষ্ট দিতে পাবে নাঁ। জগতের বাসনা হল কুহকিনী । 
এর হাতে যে পড়েছে তার ভরাডুবি । বিষয়ের সন্ধানে জীব 
নিরস্তর এই বাসনার পেছনে ছুটছে । উত্তম ভাগবতের পক্ষে 
এই বাসনার তাপ নিবে গেছে । সে নিষ্কাম, ছোটাছুটি তার 
বন্ধ হয়েছে, কৃষ্ণতক্তের অন্তরে কোন কামনা নেই । ভগবৎ- 
পাদপদ্মের ধ্যানে তার চিত্ত শান্ত হয়ে গেছে। অন্তকেরও অস্তক 
স্রীকফ্ণপাদপন্প । কোন ভাগ্যবান যদি ভগবানের চরণের এই 
শীতলা দীন্তির স্পর্শ অনুভব করেন, তখন তার আর অন্ত বস্তুতে 
আসক্তি থাকে না । আমাদের সে পাদপন্মের সঙ্গে পরিচয় 
নেই। ভাই অন্ত বস্তুতে বে-জায়গায় হাত পড়ে। ভূত গ্রস্ত, 


১২৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


বাক্তি যেনন স্বরূপে থাকে না, ফলে অখাগ্ মড়ার কয়ল। খাচ্ছ 
বলে গ্রহণ করে, আমরাও তেমনি অবিষ্ভা-ভূতাবিষ্ট। তাই 
প্রাকৃত রূপরসাদি অখাগ্ঠ গ্রহণ করি, প্রকৃত খাদ যে হরিগুণ- 
গান, তা গ্রহণ করি না । 

উত্তম ভাগবতের শেষ লক্ষণটি যো গীল্দর বললেন-_ভক্ত কৃষণ- 
পাদপন্ ত্যাগ করে না। এ তো অনেক দূরের কথা৷ _হবি স্বয়ং 
যার হৃদয় সাক্ষাংভাবে কখনও ত্যাগ করেন না, যে হরির নাম 
অবশে উচ্চারণ করলে অনাদিকালের পাপরাশি সমূলে বিনষ্ট 
হয়, অন্যমনক্ধ হয়েও যদি হরির নাম উচ্চারণ করা যায় তাহলেও 
সমস্ত পাপ চলে যায়, অন্যমনস্ক হয়ে আগুনে হাত দিলে যেমন 
হাত পুড়ে যায়-_এও তেমনি । মহাঁজনও বলেছেন, “সর্বমহা- 
প্রায়শ্চিত্ত যে প্রভুর নাম।” স্ত্রী পুত্রের নাম উচ্চারণচ্ছলে, 
পরিহাসচ্ছলে, গানে আলাপে, হেলায় শ্রদ্ধায় যিনি যেমন করেই 
ভগবানের মাম উচ্চারণ করুন না কেন, তাতেও সবপাপের 
বিনাশ হবে । 

এখন কেউ বদি প্রশ্ন করেন, বহুদিনের বহু সঞ্চিত পাপ 
একবার মাত্র নাম উচ্চারণে ক্ষালন হবে কি করেঃ অনেক 
দিনের জমা অন্ধকার দূর করতে যেমন অনেক দিন ধরে 
আলো জ্বালতে হয় না, একবার আলে! জ্বাললেই বহুদিনের 
সঞ্চিত অন্ধকার দূর হয়ে যায়, তেমনি বহুদিনের সঞ্চিত পাপ 
একবার নাম উচ্চারণেই নষ্ট হয়ে যায় । কিন্তু অন্ধকার যাতে 
আর ঘরে প্রবেশ না করে এজন্য ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে 
হবে। আলো নিবতে দিলে চলবে না। তেমনি পাপ-অন্ধকার 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১১৭ 


আর যাতে হুদয়-ঘরে প্রবেশ না করে সেজন্য জিহ্বার নামের 
প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হবে । 

ভগবান হরি যার হৃদয় থেকে সাক্ষাৎ সরে যান না, তিনিই 
উত্তম ভাগবত । এখানে “সাক্ষাৎ কথাটির সার্থকতা হল, ভক্ত 
সাক্ষাৎ ভাবে সবদা চিত্তে ভগবানের স্ফৃতি উপলব্ধি করবে । 
ভগবান অসাক্ষাতে তে। কারো হুৃদয়ই ত্যাগ করেন না' সেটি 
ভক্ত বা অভক্ত বলে কোন কথা নেই, কিন্তু ভক্তন্ৃদয়ে ভগবান 
সাক্ষাংভাবে স্কৃতি পান এবং প্রতিক্ষণে ভক্ত তা উপলব্ধি 
করেন। ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের লোভ লেগেছে--তাই ভক্ত- 
হৃদয় ভগবান কখনও ত্যাগ করতে পারেন না। ভগবানই 
যখন ছাড়তে পারেন না, তখন কল্মষকুঞ্জরাণাং' কা বাতা? 
কল্মবকুঞ্জর কেমন করে সেখানে স্থান পাবে? 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভক্তহ্ৃদয় ত্যাগ করে ভগবান চলে যান না 
কেন? ভগবান তো৷ যেতে চানই না, তার ওপর ভক্ত তাকে 
প্রেম রজ্জুতে বেঁধেছে । পরস্পর পরস্পরের প্রতি আসক্তি, 
কেউ কাউকে ছাড়তে পারে না। ভক্ত তো ভক্তিমান বটেই, 
এটি ভক্তের স্বাভাবিক অবস্থা! কিন্তু “ভগবান ভক্তো তক্তিমান? | 
ভগবানের এটি নৃতন বিশেষণ। এ বিশেষণ ভগবানের একমাত্র 
শ্রীমস্তাগবতশান্্রই দিয়েছেন, অন্য কেউ দেয় নি। শ্ররীবিশ্বনাথ 
চক্রবত্তিপাদ বলেছেন; অবশে হরি উচ্চারণেরই এত ফল, আর 
যারা সরসে হরির নাম উচ্চারণ করে, তাদের না জানি কত ফল! 
ভগবান জগতের তাবৎ জীবকে মায়ার শ্ৃঙ্খলে বেঁধেছেন । 
এখন তিনি ষেন তাদের বলছেন, তোমরা আমাকে বাধ। কি 


১২৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 

দিয়ে বাধবে__প্রেমশৃঙ্খলে বাঁধ। জীব অণুচৈতন্ত--তাই তাঁকে 
মায়া-শৃঙ্খলে বাঁধা যায়। কিন্তু ভগবান বিভুচৈতন্ত তাই 
তাঁকে প্রেমশৃঙ্খলে বাধতে হয়। মা যশোমতী ঠাব নীলমণি 
নয়নের মণিকে প্রেমরজ্জ দিয়ে উদুখলের সঙ্গে বেধেছিলেন । 
ভগবান প্রেমের বশ, এই প্রেমরজ্জুতে যিনি ভগবানের চবণপন্ 
বাঁধেন, তিনিই উত্তম ভাগবত | ভক্ত অনুভব করবেন ভগবান 
নিত্য তার হৃদয়ে স্ফৃতিমান। এইটিই উত্তম ভক্তের সার 
লক্ষণ । 


তিতায় প্রশ্ন 


উত্তম ভক্তের লক্ষণগ্রসঙ্গে মহারাজ নিমি যোগীন্দ্রের কাছে 
শুনেছেন উত্তম ভক্ত বিষয় গ্রহণ করেও অবিক্ষুব্ধ-চিত্ত থাকেন, 
দ্বেষ বা আনন্দ হয় না, কারণ তারা প্রতিটি বস্তুকেই মায়া অর্থাৎ 
মিথ্যা বলে জানেন । বিষয় গ্রহণ করলেই তার ম্বাভাবিকত৷ 
হল হয় দ্বেষ না হয় আনন্দ । এ জগতের এইটিই নিয়ম। কিন্তু 
উত্তম ভাগবত তা করেন না। কারণ তিনি জানেন যে, এ 
জগতের কোনটিই বস্তু নয়, সবই অবস্ত। তারা বস্ততে বস্তু 
বুদ্ধি করেছেন। কাজেই অবস্ত গ্রহণে দ্বেষ বা রাগ কোনটিই 
তাদের হয় না। সবটাকেই তারা মায়া বলে জানেন । তাই 
তাতে আসক্ত হন না। জগতের অবস্তকে আমর৷ বস্ত্র বোধ 
করি। তাই তাতে আসক্ত হই, রাগ দ্বেষ অনুভব করি। মায়া 
বলে উত্তম ভক্ত মনে করে বা জানে তা নয়, মায়া তারা চোখে 
দেখে । বিষ্ঞোর্মীয়ামিদং পশ্যন্- _এন্দ্রজালিকের টাকা দেখে 
যেমন বুদ্ধিমান ব্যক্তির আনন্দ হয় না, তেমনি এ জগতের সুখের 
সামগ্রী বা ছুঃখের সামগ্রী কোনটিতেই উত্তম ভক্ত আসক্ত হন 
না। আসক্তি না থাকলে দ্বেষ বা গ্রীতি কিছুই হয় না। 
নিমিরাজের উত্তম ভক্তের এই মায়াদর্শকতার লক্ষণ থেকে 
জানতে ইচ্ছা হল, এ মায়া কি? তৃতীয় যোগীন্দ্র অন্তরীক্ষ 
এর জবাব দেবেন । মহারাজের আজ মায়া জানতে লোভ 
হয়েছে । কারণ উত্তম ভক্তের লক্ষণে রাজা দেখেছেন, তীরা। 
৪ 


১৩০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মায়া চেনেন, জানেন । তাই মায়াকে দূরে সরাতে পেরেছেন। 
আর সরাতে পেরেছেন বলেই তার! উত্তম ভাগবত হয়েছেন। 
রাজার লোভ কেন? মায়া যদি চিনতে পারি, তাহলে তাকে 
সরাতে পারলে আমিও উত্তম ভাগবত হতে পারব । মায়া 
জীবের স্বরূপ-বিচ্যুতি ঘটিয়েছে । মায়াকে জানতে পারলে তো 
কাজ মিটে গেল। ছুধে জলে মেশান থাকলে, জল চিনতে 
পারলে ছুধ থেকে জলকে আলাদ। করা যায়। তেমনি চিৎ ও 
জড় (মায়া) এ জগতে মেশামেশি হয়ে আছে । কাজেই মায়াকে 
চিনতে পারলে চিৎ থেকে জড়কে বাদ দিয়ে চিৎ (ভগবান ) 
নিতে পারা যাবে । এই মায়া কার? 
অন্তরীক্ষ যোগীন্দ্র উত্তর দিলেন £ 
পরস্য বিষ্ঞোরীশস্ত মায়িনামপি মোহিনীম্‌। ভা. ১১।৩।১ 
শ্রীগোবিন্দও গীতাবাক্যে বলেছেন £ 

দৈবীহোষা গুণময়ী মম মায়! ছুরত্যয়া । গীতা ৭1১৪ 
মায়া হতে যিনি ভিন্ন তারই মায়া হবে। মায়া মুগ্ধ যে, মায়া 
তো তার হতে পারে না। ছাতা লাঠি কাঁপড় গয়না যেমন 
আমার বল! হয়, অর্থাং আমার থেকে ভিন্ন, তেমনি ভগবানের 
মায়া অর্থাৎ মায়া ভগবানের থেকে ভিন্ন। বিষ তাই মায়াধীশ। 
তিনি ঈশ্বর সর্বনিয়ন্তা_জীব চৈতন্যও তো. সেই পরমেশ্বরের, 
ভগবানের অংশ । তাহলে সেও তো মায়ার অতীত । কিন্তু 
তা নয়, জীব মায়াবশ-_মায়াধীশ নয়। শ্রীমন্ভাগবতশাস্ত্রের 
তৃতীয় স্কন্ধের কপিল ভগবানের বাক্যের টাকায় স্বামিপাদ 
বলেছেন_ পুরুষ ছুই প্রকার; জীব ও পরমেশ্বর ৷ প্রকৃতিকে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৩১ 
অধীন করেন যিনি সর্বনিয়ন্তা, তিনি ঈশ্বর । আর প্রকৃতির 
অধীন হয়ে যে “সংসরতি', পুনঃপুনঃ জন্মমৃত্যু-কবলিত হয়ে 
গতাগতি করে, সে হল জীব। এ মায়া যে শুধু জীবকে মুগ্ধ 
করে তা নয়, মায়ীরও মোহিনী । দেবতা, যক্ষ, রাক্ষস, অস্থুর, 
শিব, ব্রন্মা--সকলেরই মায়া আছে। তাই সকলেই মায়ী, কিন্ত 
বিষ্মায়া এদেরও মুগ্ধ করে। ব্রন্ষা শিবকেও বিষণমায়৷ মুগ্ধ 
করে। শিব বিষুমায়ায় মুগ্ধ--এ কথা শিব ঝষি ছুবাসাকে 
জানিয়েছেন “বিদাম ন বয়ং সবে যন্মায়াং মায়য়াইবৃতাঃ | 
বিঞুমায়। বিভিন্ন প্রকার_যে বিষ্ুমায়া শিব ব্রন্মাকে মুগ্ধ করে 
সে মায়া জীবকে মুগ্ধ করবার জন্য দরকার হয় না। যার যেমন 
দাম তাকে সেই রকম দিতে হয় । কেউ হয় ত চার পয়সা পেলে 
খুশি হয়, কাউকে আবার সাম্রাজ্য দিয়েও তুষ্ট করা যায় না। 
কষ্ণমায়। কৃষ্ণতত্ব বলদেবকেও মুগ্ধ করে। বিষ্ুরমায়া ছুই প্রকার 
_ যোঁগমায়া এবং গুণময়ী মায়া। কৃষ্ণবিমুখ জীবকে মুগ্ধ করা 
মহামায়া বা গুণময়ী মায়ার কাজ। আর কৃষ্ণ-উন্মুখকে মুগ্ধ 
কর! যোগমায়ার কাজ। যে যেমন অধিকারের জীব তাকে 
বশীভূত করতে সেই প্রকার মায়া প্রয়োজন । শিবকেও 
বিষ্ুমায়া মুগ্ধ করে। আর সামান্য জীবকেও মায়া যুদ্ধ করে। 
তাই জীব আর শিব এক--এ কথা বলা চলবে না। কারণ 


মায়ার তারতম্য আছে, এই মায়াকে জেনে নিতে পারলে তবে 
জীবের নিষ্কৃতি | 


যোগীন্দরের শ্রীমুখ থেকে হরি কথারূপ অমৃত সেবা করছেন 
মহারাজ নিমি । তারা হরিকথা ছাড়া অন্য কোন কথা বলেন 


১৩২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


না। সেই স্বভাবে মহারাজের যে প্রশ্ন, "মায় কি” এর উত্তরেও 
যোগীন্দ্র যা বলবেন, তাতেও হরিকথাম্বতই মিশ্রিত থাকবে । 
তৃতীয় যোগীন্দ্র শ্রীঅস্তরীক্ষ মায়া কাকে বলে এ প্রশ্মের 
জবাঁব দেবেন। অস্তরীক্ষ শব্দে আকাশকে বুঝায়, অর্থাৎ যেটি 
ভূলোক ও হ্যলোকের মাঝখানে অবস্থিত । অর্থাৎ যার! মায়া- 
কবলিত নয়, আর যারা নিত্য অথবা সিদ্ধি লাভ করে পার্ষদ- 
শ্রেণীতুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠাদি ধামে গমন করেছেন, তারাও নন। 
এঁদের মধ্যে কেউ উপদেশ করতে পারবেন না। ভগবানের 
নিজের পক্ষেও নিজের কথা উপদেশ করা সম্ভব নয়। মায়া 
কবলিত ধার! তারা মায়ার মধ্যে থাকেন, কাজেই মায়ার কাজ 
তারা জানেন না । অতএব এই ছই-এর মাঝামাঝি ধারা রয়েছেন, 
তাদের পক্ষে মায় কাকে বলে এ উপদেশ করা সম্ভব। তাই 
অস্তরীক্ষ যোগীন্দ্র মায়া কাকে বলে এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন । 
মায় নিরূপণ কাজটি অসম্ভব । ঘট পট বাস বিছানা যেমন 
দেখান যায়, মায়াকে সেই ভাবে এইটি মায়া, এই রকম করে 
দেখান যায় না। কাজেই স্থগ্টি, স্থিতি এবং লয় কাঁজের দ্বার 
বর্ণন৷ করতে হবে। স্থষ্টি স্থিতি লয় কাজের দ্বারা রজঃ সত্ব এবং 
তমোগুণকে বুঝা যাবে এবং গুণকে বুঝলে গুণময়ী মায়াকে বুঝা 
যাবে। এখানে অস্তরীক্ষ যোগীল্স স্থপ্টির গৃঢ় কথা বলেছেন : 
এভিতূতিনি ভূতাত্মা মহাভৃতৈর্মহাভূজ । 
সসর্জোচ্চাবচান্তাগ্ঃ স্বমাত্রাত্মবপ্রসিদ্ধয়ে ॥ ভা. ১১।৩।৩ 


ভূতাত্মা মহাভূতের দ্বারা ভূত স্থষ্টি করলেন, ভূতাত্মা অর্থাৎ 
সর্বাস্তর্যামী তিনি আছ্ভ। বলা আছে-_'জগৃহে পৌরুষং 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৩৩ 


রূপমাদৌ লোকসিস্থক্ষয়া ।' ভগবান প্রথমে লোক সৃষ্টির মানসে 
পৌরুষরূপ গ্রহণ করলেন। পৌরুষরূপ অর্থাৎ পুরুষের গঠন । 
'জগৃহে" পদের দ্বার! সন্দেহ হতে পারে যে ভগবানের পৌরুষরূপ 
ছিল না স্থপতি কাজের জন্য তিনি সে রূপ গ্রহণ করলেন। 
তাহলে বেদাস্ত যা বলেছেন, সেইটিই সত্য বলে মনে হয় 
'সাধকানাং হিতার্থায় ব্রহ্মণে! রূপকল্পনা । সাধকের হিতের 
জন্য ব্রন্মের রপ-কল্পনা, এ রূপ মায়িক,কি্ত স্থষ্টি অনাদি, অর্থা 
এর গোড়া খুঁজে যাওয়া যায় না। কেবলমাত্র মহাপ্রলয়ের 
পরে স্থষ্টি বলে আছ শব্দ বসান হয়েছে। তা না।হলে সৃষ্ট 
অনাদি। আর ভগবান যে পুরুষরূপ গ্রহণ করলেন, বস্ত যদি 
না থাকে, তাহলে তার গ্রহণ হয় কেমন করে? আঅবিদ্যমানস্ত 
বস্তনঃ গ্রহণাসম্ভবাৎ। কাঁজেই বুঝতে হবে পুরুষরূপ ছিল, 
ভগবান লোক স্যপ্টির মানসে সে রূপ গ্রহণ কবলেন। ভগবানই 
স্্িকর্তী- মায়া এই স্থষ্টির উপাদান_কর্তী নয়। মায়! 
উপাদানকারণ, ভগবান নিমিত্তকারণ। নিমিত্ত কারণ সর্বদা 
চেতন হবে-_কার্ধ পেলে উপাদাঁনকারণকে নিশ্চিত পাওয়া 
যাবে, কিন্ত নিমিত্তকারণকে পাওয়া যেতেও পারে নাও পারে। 
তাই মায়ার কার্য জগতের যে কোন জিনিষ পেলে মায়া উপাদান- 
কারণ পাওয়া যায়, কিন্তু নিমিত্তকারণ ভগবানকে পাওয়া যায় 
না--বহিরঙ্গী মায়াশক্তিই উপাদানকারণ। ঘট ধরলে যেমন 
উপাদানকারণ মাটিকে পাঁওয়া যায়, কিন্ত নিমিত্তকারণ কুস্তকারকে 
পাওয়! যায় না। তেমনি জগতের বস্তব পেলে মায়া পাওয়া যায় 
বটে, কিন্ত নিমিত্তকারণ ভগবানকে পাওয়া যায় না। 


১৩৪ নবযোগীক্মসংবাদ 


এই স্থষ্টিততৃপ্রসঙ্গে শ্রীতৃতীয়ে বলা হয়েছে- ক্ষতি 
প্রকৃতিতে কারণার্ণবশাফী প্রথম পুরুষাবতার স্থষ্টির বীজন্বরপ 
ঈক্ষণ নিক্ষেপ করলেন- উচ্চাবচ, দেব, তির্যক ইত্যাদি । স্থটি- 
কাল মহত্তত্বরকে বিকৃত করে অহঙ্কারতত্বে পরিণত করল । এই 
অহঙ্কারতত্ব আবার ত্রিবিধ- সাত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক। 
তামসিক অহঙ্কীর থেকে শব্দাদির স্যগ্টি- শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, 
গন্ধ। এই পঞ্চমহাভূত ঈশ্বর স্থষ্টি করলেন। মহারাজ 
নিমিকে অস্তরীক্ষ যোগীন্দ্র বলছেন__স্ষ্টির তাৎপর্য জীবকে 
ভগবৎ প্রাপ্তি করান। ভগবানের স্থষ্টিকাজের হেতু দেখান 
হয়েছে স্বমাত্রাত্ম প্রসিদ্ধয়ে প্*' পদের দ্বারা জীবকে বুঝাচ্ছে। 
কারণ স্বাংশ, ভগবানের অংশ, হল জীব। মাত্রাপ্রসিদ্ধি এবং 
আত্মপ্রসিদ্ধি__মাত্রা বলতে বিষয়কে বুঝায়, অর্থাৎ বিষয়" 
প্রসিদ্ধি, অর্থাৎ বিষয়ভোগ এবং ভগবংপ্রাপ্তি__ এই ছুটি কাজের 
জন্য জীব্থট্টি। আব্রন্গস্তম্ব পর্যস্ত, অর্থাৎ ব্রহ্মলোক থেকে 
আরম্ভ করে তৃণ-গুল্স পর্যন্ত যে কেউ যে কোন বিষয়ভোগ করুক 
না কেন পঞ্চ বিষয়ের মধো পড়ে । শব স্পর্শ রূপ রস গন্ধ-_ 
এই পাঁচটি তার ভোগ্য বিষয় । এখন কথা হচ্ছে জীব তে৷ 
চিংকণ-_সে কেমন করে বিষয় ভোগ করবে? জীব তো অগণু- 
চৈতন্য । তার দেহ, ইন্দ্রিয় মন বুদ্ধি কিছুই নেই। তার কোন 
অঙ্গ নেই। কারও সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নেই। তার পক্ষে বিষয় 
ভোগ তো সম্ভব নয়। ভগবান পরম দয়ালু। তাই করুণ! 
করে জীব স্থষ্টি করে তার দেহ ইন্ড্রিয় মন বুদ্ধি দান করলেন 
বিষয়ভোগের জন্য | 





নবযোগীক্দ্রসংবাদ ১৩৫ 


এখন প্রশ্ব হতে পারে জীবের এ বিষয়ভোগের প্রয়োজন 
কি? ভগবান তো ইচ্ছা করেন জীব তাকে লাভ করুক। 
বিষয়ভোগ করে বিষয় ত্যাগের জন্য তাগাদা কেন? একেবারে 
বিষয়ভোগ ন! করলে কি ক্ষতি ছিল ? পাঁকে নেমে পা ধোওয়ার 
কি দরকার ? একেবারে পাকে না নামলেই হয়। 'প্রক্ষালনাদ্ধি 
পন্বত্ত দুরাদস্পর্শনং বরম্*জীবকে মায়াপন্কে নামানোর কি 
দরকার ছিল? ঈশ্বর যদি অজ্ঞ এবং অকরুণ হতেন তাহলে না 
হয় এটি করতে পারতেন। কিন্তু তা তো নয়, ঈশ্বর তো সবজ্ঞ। 
জীবের কি প্রয়োজন তা তিনি খুব ভাল জানেন। আর জীবের 
প্রতি ভগবান অযাচিত কূপাকারী । এই সবজ্ঞতা এবং কারুণ্য 
ছুটি গুণই ভগবানের আছে বলে তাকে ভজন না করে উপায় 
নেই। এ জগতে দেখা যায় হাত পা ভেঙে গেলে মিস্ত্রী কাঠের 
হাত পা তৈরী করে দেয়। কিন্তু মিস্ত্রী খুব স্থুদক্ষ নয় বলে কাঠের 
হাত পা শরীরের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে দিতে পারে না, কাঠের 
হাত পা বলে বুঝা যার। কিন্তু তাই দিয়ে কাজ করতে করতে 
অভ্যাস হয়ে যায় এবং নিজেরই হাত পা বলে মনে হয়। কিন্ত 
অবিদ্য। মায়ার মিস্ত্রী কাঠের হাত পায়ের মত মহাভূতনিগিত 
হাত পা এমন করে চিৎ আত্মার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন যে? আর 
বুঝধার উপায় নেই যে, এগুলি আমার নয়। এমন নিখুত 
করে মেশান যে তাই দিয়ে বিষয়ভোগ করে মনে হয়, আমিই 
বিষয় ভোগ করছি । এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জীবের এই বিষয়- 
ভোগের কি দরকার? জীবকে বিষয়ভোগ করান যদি দোষের 
হয়, তাহলে ঈশ্বরকে দোষী বলতে হয়। জীশ্বর জীবকে মায়ার 


১৩৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মধ্যে ফেলে আবার মায় থেকে উঠবার তাগাদা দিয়েছেন 
কেন ? ভগবানের উপদেশ বাণী £ 

সর্বধর্মীন্‌ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ত্রজ | গীতা৷ ১৮৬৬ 
আরও বলেছেন £ 

মামেব যে প্রপদ্ন্তে মায়ামেতাং তরস্তি তে । গীতা ৭১৪ 
জীবকে মায়ার মধ্যে ডুবিয়ে আবার মায়া হতে উদ্ধারের তাগাদা 
কেন? ভগবান জীবকে দিয়ে ধীরে ধীরে চুরাশী লক্ষ জন্ম ধরে 
যে বিষয় ভোগ করিয়েছেন, তার ভিতর একটি গভীর উদ্দেশ্ঠ 
আছে। সগ্যোজাত শিশুকে যেমন শুধু ছুধ খাওয়ান হয়-_কারণ 
ছুধের মধো সকল খাছযের সার দেওয়া আছে। ছুধ খাইয়ে 
খাইয়ে ছ'মাস বয়স পর্যস্ত তাকে অন্যান্য খাগ্ গ্রহণের উপযোগী 
পাকস্থলী তৈরী করিয়ে নেওয়া হয়। ছ'মাস বয়সের আগে তার 
কাছে সব খাগ্ই গুরুপাক। তখন তার পাকস্থলী কোন খা্যই 
নিতে পারে না। আস্তে আস্তে হুধ খেতে খেতে সমস্ত খাছের 
সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারপর অন্নপ্রাশনের দিন তাকে অন্ন 
দেওয়া হয়, কিন্তু সেদিনও থাল! ভরে তাকে অন্ন দেওয়া হয় না। 
তেমনি জীবাত্মার পক্ষে অন্ন হল হরিগুণকীর্তন। ভগবানের 
আম্বাদ যদি জীবকে প্রথমেই দেওয়া যায়, তাহলে জীব তা গ্রহণ 
করতে পারবে না; জীব সগ্যোজাত শিশুর মত। তার পাক- 
স্থলীর পক্ষে ভগবানের আন্বাদ চিদানন্দ আস্বাদ বড় গুরুপাক । 
তাই ছুধের মত পঞ্চবিষয় তাকে চুরাশী লক্ষ জন্ম ধরে ভগবান 
গ্রহণ করিয়ে করিয়ে ভাকে বিষয় গ্রহণের বোধ করিয়ে 
দিয়েছেন ৷ এগুলি মায়ার বিষয় বটে, কিস্তু জীবাত্মা তো নিত্য 


নবযোগীন্্রসংবাদ ১৩৭ 


শুদ্ববৃদ্ধমুক্ত স্বভাব--তার তো কোন বিষয়গ্রহণের বোধ ছিল 
না, বিষয়ের আত্বাদ সে জানত না । বিষয়-আ্বাদ যদি না জানে 
তাহলে গোবিন্দবিষয় কেমন করে গ্রহণ করবে? রসের বোধ 
করাবার জন্য ভগবান যে জীবকে মায়ার বিষয় দান করেছেন, 
এটিও জীবের প্রতি মহান উপকারই করা হযেছে । মায়ার 
বিষয় ভোগ করে করে জীবের রসবোধ হচ্ছে এর পরে সে 
রসময়কে ভজবে | চুরাশী লক্ষ জন্মের পরে যে মনুষ্য জন্ম, এইটি 
অন্পপ্রাশনের দিন। যে ব্যক্তির ক্ষুধা হয় নি, সে ষ্বেমন অন্নকে 
ভজে না, তেমনি রসবোধ না হওয়া পর্যস্ত জীব রসমস্নুকে ভজবে 
না। সেই রসবোঁধকে জাগানোর জন্যই ভগবানের মায়ার 
বিষয় দান। | 


মহাপ্রলয়কালে কারণীর্ণবশায়ী ভগবানের অঙ্গে অসংখ্য 
জীবচৈতন্য অস্ফুট অবস্থায় থাকে, তারা তখন মুছিত অবস্থায় 
থাকে, তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে । বাতাস-জল দিয়ে কে তার 
ুঙ্ছী ভাঁউবে ? ঈশ্বর-করুণাই তার মূর্ছা ভাঙ্গাবে। স্থাবর 
জঙ্গমাদি ভ্রমণ করান হল বাতাস-জল দেওয়া । অন্য সব দেহে 
একটু একটু রসান্ুভব পেয়ে যখন জীব মানুষ হয়েছে তখন 
জঙ্গম অবস্থায় সে স্ফুটচৈতন্য । অস্ফুটচৈতন্য থেকে ক্ষুটচৈতন্ে 
আন! বড় দয়ার কাজ । রসবোধের চৈতন্য ফুটিয়ে তুলবা'র জন্য 
চুরাশী লক্ষ যোনি জীবকে ঘোরান হয়েছে। সরকারী চাকরিতে 
যেমন আগে চারিদিকে মফন্বলে ঘুরিয়ে শেষে রাজধানীতে এনে 
রাখা হয়, এও তেমনি চুরাশী লক্ষ দেহ ঘুরিয়ে শেষ পরধস্ত মনুয্য- 


১৩৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


দেহরূপ রাজধানীতে রাখা হয়েছে শ্রুতিস্তরতির পূর্বে শ্রীশুকদেব 
বলেছেন £ 

বুদ্ধীক্দ্রিয়মনঃ প্রাণান্‌ জনানামস্থজৎ প্রভুঃ | 

মাত্রার্থঞ ভবার্থঞ্চ আত্মনেই কল্পনায় চ॥ ভা. ১০।৮৭।২ 
ঈশ্বর যে জীবকে এই বুদ্ধি,ইন্দ্রিয় মন প্রাণ দিয়েছেন, এই মায়িক 
স্্টিও কত উপকারে লেগেছে । অস্ফুটচৈতন্তের স্বরূপ মায়ার 
দ্বারা আবৃত, তাকে জাগাতে হবে । কি জন্য? (১) মাত্রার্থম্‌, 
অর্থাৎ বিষয়ভোগের জন্য । (২) ভবার্থঞ, ভব মানে জন্ম অর্থাং 
জন্মের জন্য । এর লক্ষ্য হল কর্ম, অর্থাৎ বেদবিহিত কর্মের জন্য । 
(৩) আত্মনে, অর্থাৎ স্থবখভোগের জন্য । (৪) অকল্পনায়, অর্থাৎ 
কল্পনা-নিবৃত্তির জন্ত। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু শেষের কারণটিই 
আসল কারণ যার জন্য জীব স্থষ্টি হয়েছে । জীবের যে আত্মবুদ্ধি 
হারিয়ে গেছে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য স্যষ্টি। কল্পনা-নিবৃত্তি, 
অর্থাৎ মুক্তি লা, অর্থাৎ ভগবং-প্রাপ্তির জন্যই যদ্দি জীবের স্থৃটি 
হয় তাহলে পূর্বের ৪টি কারণ বলা হল কেন? কারণার্ণবশায়ী 
ভগবানের দেহে জীব লীন আছে বটে,কিস্তু সে ভগবানকে পায় 
না, যেমন আমাদের দেহে অসংখ্য কৃমি কীট আছে কিন্তু তার!' 
আমাদের রসের খবর রাখে না, এও ঠিক তেমনি । মহাপ্রলয়ে 
আৌতের টানে অসংখ্য জীব ভগবানের ( কারণার্ণবশীয়ী ) দেহে 
আশ্রয় নিয়েছে বটে, কিন্তু ভগবানের তত্ব-রস সম্বন্ধে তাদের 
জানা সম্ভব হয় নি, কারণ ভজন না করলে মায়া নিবৃত্তি হয় না। 
ভজন করলে তবে মায়! নিবৃত্তি হয়। ব্রঙ্গাণ্ড-ভাণ্োদরে কোটি 
কোটি জীব থেকেও মুক্ত হয় না। ভজনেই ভগবানের প্রতি 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৩৯ 


ভালবাস! হয়। ভজন করে ভগবানকে ভালবাসলে তবে জীবের 
মুক্তি । নিজেকে জানাবার জন্যই ভগবানের জীবকে নিজ অঙ্গ 
থেকে পুথক করতে হল ; মায়ার সাগরে তাদের ফেলতে হল। 
ভজন করলে তবে কল্পনা নিবৃত্তি হয় । ভগবান ভিন্ন যে কোন 
জাগতিক বস্তু-_যেমন আয়ু, গৃহ, ধন, বিষ্ভা, স্ত্রী, পুত্র__সবই হল 
ভগবানকে বাদ দিয়ে সুখের কল্পনা। আব্রন্ষস্তস্ব পর্যস্ত এই যে 
স্থখকল্পন। এটি যখন নিবৃত্ত হবে তখনই মুক্তি । সুখ নামে যে 
বস্তুটি সেটি ভগবানের পাদপ্ম ছাড়া আর কোথাও থাকবে না 
বলে চুক্তি করেছে । তাই ভগবানকে বাদ দিয়ে আমর যে 
কোন বস্তুকে সুখ বলে ধরতে যাই না কেন, ন্ুুখ পাই না। 
'বাস্দেবঃ সবম্*_এই বোধ যখন হবে তখনই আসল মুক্তি! 
মায়িক বস্তুতে যখন মায়াবুদ্ধি হবে তখনই মুক্তি | 

জীব নিজেকে বড় বুদ্ধিমান মনে করে, কিন্তু সে বুদ্ধিমান 
তে নয়ই বরং বড় মূর্খ । কারণ যদি প্রকৃত পক্ষে বুদ্ধিমান হত 
তাহলে সবচেয়ে ভয়ের বস্ত যে মৃত্যু তাকে নিবারণের চেষ্টা 
করত। মৃত্যুকে নিবারণ না করা পর্যস্ত নিস্তীর নেই। ক্ষণ- 
ভঙ্গুর বস্ত্র দিয়ে কখনও স্থুখভোগ হয় না । তাহলে দেখা যাচ্ছে, 
কল্পনার নিবৃত্তিই স্থস্তির তাৎপর্য । মৃত্যু-নিবারণ ন৷ হলে সুখ 
হয় না । হিরণ্যকশিপু তাই মৃত্যুর পথ বন্ধ করতে গিয়েছিলেন । 
এখন কথা হচ্ছে মৃত্যু নিবারণের উপায় কি? যার মৃত্যু নেই, 
তাঁর আশ্রয় নিতে হবে। মৃত্য একমাত্র গোবিন্দ হতেই ভয় 
পায়, গোবিন্দান্‌ মৃত্যুবিভেতি । এ জগতের কোনটিই সুখ 
ভোগ নয়। মিছরির সরবতে কাচের টুকরো মেশান থাকলে 


১৪০ নবযোগীব্্রসংবাদ 


যেমন সেটি হুঃখেরই কারণ হয়, তেমনি এ জগতের যে কোন 
স্থখ ভোগে (যাকে আমরা সুখ বলে মনে করি ) মৃত্যুর কণ্টক 
মেশান আছে । তাই সেটি সুখের না হয়ে ছুঃখেরই কারণ হয়। 
ধন, পুত্র, মান, মর্ধাদাী কোনটিই সুখের হয় না, কারণ তাতে 
মৃত্যুর কাটা মেশান আছে। এ জগৎ সুখের কল্পনা দিয়ে তৈরী, 
স্থখ দিয়ে তৈরী নয়। তাহলে চারিদিকে এই যে মায়ার বিষয় 
ভোগের মধ্যে ভগবান জীবকে রেখেছেন- তাহলে জীবকে কি 
তিনি ঠকিয়েছেন? জীব এ জগতে সুখের কল্পনার পেছনে 
ছোটে। জীব সুখ খোঁজে, পুত্রকে সখ বলে ভাবে কিন্তু পুত্রকে 
পায় না পুত্রের কল্পনাকে পায়। পুত্রের কল্পনা যদি না থাকত 
তাহলে পুত্রগত মুখলিগ্সপা হত না। পুত্রের মধ্যে সখ খুঁজে 
খুঁজে যখন জীব সেখানে সুখ তো! পায়ই না বরং আঘাত পায়, 
তখন আঘাত খেয়ে খেয়ে সে যশোদার পুত্রকে ভালবাসতে 
যায়। জগতের মায়িক সুখের কল্পনা, সত্যকার রূপ-রসাদি যা! 
মৃতাকবলিত নয়, তার সন্ধানে উৎস্থক করবে । জগতে সুখের 
কল্পনার আস্বাদ না থাঁকলে নিত্য শাশ্বত সুখের অনুসন্ধান হত 
না। ভগবানকে পুত্র, সখা, প্রাণপতি, সুহ্ৃৎ, ভাতা--সকল 
সম্বন্ধই করা যাঁয়। 

জীব তো অসঙ্গ--তার তো পতিপুত্র কোনও সন্বন্ধের বোধ 
নেই। ভগবান তাই এই সম্বন্ধের বোধ জাগাবার জন্য জগতে 
মাতা-পিতা, পতি-পুত্র দিয়েছেন । জগতের পতি-পুত্রের ভাল- 
বাসায় আবদ্ধ হবার জন্য পতি-পুত্রের স্থস্তটি নয়। কিন্তু তাদের 
ভালবাস! বুঝে নিয়ে সেই ভালবাস! ভগবানে দেবার জন্যই 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৪১ 


তগবানের এই বিভিন্ন সম্বন্ধের স্যষ্টি। গহনার 086810906-এ 
হার চুড়ি বাঁলার ছবির নমুন। আকা থাকে । তার নীচে ঠিকানা 
লেখা থাকে, কোথায় সেই গহন পাওয়া যাবে । কিন্তু সেই 
আকা-গহনার নমুনা অঙ্গে পরা তো! যাবেই না, পরতে গেলে 
ছিড়ে যাবে, উপরন্তু ঠিকান! পর্যন্ত ছিড়ে যাবে। প্রকৃত হার 
পেতে হলে আকা-হারটি নিয়ে ঠিক ঠিকানায় যেতে হবে তবে 
পাওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু গহনা কিনতে হলে তো! মূল্য চাই। 
এখানে মূল্য কি? মহাজন বলেছেন, লৌল্যমেব মূল্যমেকলম্‌। 
জগতের সুখে কোথাও তৃপ্তি নেই। ঘিনি জগৎ স্ৈরী করেছেন, 
তিনি কি তাকে নিত্য শাশ্বত করে তৈরী করতে গ্রারতেন না? 
পুত্রকে কি চিরজীবী করে রাখতে পারতেন না? নিণ্টক 
পুত্রনুখ রাজ্যন্থখ ভোগ করাতে পারতেন না? পারতেন, কিন্তু 
করেন নি। ভগবান মহামায়াকে আদেশ দিয়ে রেখেছেন, 
জগতের প্রত্যেকটি স্ুখভোগের সামগ্রীতে কাটা ফুটিয়ে রাখবে । 
কারণ জগতের সুখ যদি নিষ্ষণক হত তাহলে ভগবানের স্থষ্টির 
উদ্দেশ্য সিদ্ধ হত না। জগতের কোনটিই সুখ নয়, সুখের 
আভাস অর্থাৎ স্থখ বলে মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে সখ নয়। 
নুখাভাস কখনও নিখু'ত হয় না। এখানকার স্থখ নিখুত হলে 
তাতেই চিত্ত লুব্ধ হয়ে যাবে তখন আর ভগবৎপাদপদ্ম কেউ 
ভজবে না। জীবের হৃদয়ে ভগবানকে মনে পড়াবার জন্য 
ভগবান জগতের স্ুখকে নিখুত করেন নি। কৃষ্ণ-আস্বাদনের 
স্থখ তো কখনও ফুরাবে ন|। “সুখময় কৃষ্ণ করেন সুখ আম্মাদন।' 
শ্রীবন্দাবন সুখধাম কৃষ্ণের নিত্য বসতিভূমি । কোথাও না 


১৪২ নবযো গীন্দ্রসংবাঁদ 


কোথাও রূপের জ্ঞান না হলে কৃষ্ণরূপ বা গৌররূপ শুনবার 
জন্য মন লুন্ধ হবে না। মাত্রার্থ অর্থাৎ বিষয়ভোগটি পরবর্তী 
ভবার্থ অর্থাৎ বেদবিহিত কর্মের হেতু । বিষয়ভোগজাত সুখ 
অত্যন্ত ক্ষণিক বোধ হয়েছে তাই সে বিষয়ভোগে তৃপ্ত হয় নি। 
সেই ভোগজনিত আনন্দকে দীর্ঘস্থায়ী করবার জন্য জীবের 
বেদবিহিত কর্মে প্রবৃত্তি । বেদবিহিত কর্ম করে, বন্ধ পুণ্য অর্জন 
করে, স্বর্গে গিয়েও তৃপ্তি হল না। পুণ্যক্ষয়মাত্রে আবার তার 
পতন হল। মুখ লাভ আর হল না, ছুঃখই পেল। ব্ব্গীদি 
স্বখ ভোগও স্থায়ী নয়__সেখান থেকেও তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু 
ভগবৎ পাঁদপদ্ম কখনও কাউকে তাড়িয়ে দেয় না। ভগবান 
নিজেই তার ধামের নিত্যত্বের পরিচয় দিয়েছেন £ 
যদ্‌ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। গীতা ১৫।৬ 

ভগবান কাউকে তো কখনও তাড়ান না, বরং সর্বদ! ইচ্ছা করেন 
কে তার কাছে কখন আসবে । তাহলে দেখ গেল জগতের কল্পন। 
নিবৃত্তি অর্থাৎ অবস্তরতে, মায়িক বস্ততে মায়িক বুদ্ধি হলেই 
তারই নাম কক্পনানিবৃত্তি। ভগবানের জীব স্প্টির এইটিই মুখ্য 
তাঁৎপর্ষ যে জীবকে মায়িক বস্তুতে মায়িক জ্ঞান করিয়ে ভগবৎ 
পাদপন্সম ভজন করান । 

মায়াস্থষ্ট দেহে মীয়া-রোগগ্রস্ত জীব রয়েছে । স্ষ্টিতে জীবের 
এই দেহধারণে ছুটি ফল আছে-_একদিকে ভগবৎ-বিস্মৃতির দণ্ড, 
অপর দিকে ভগবংপাদপদ্ন লাভের জন্য ঈশ্বরানুগ্রহ । জীবের 
দেহ, ইন্দ্রিয়। দণ্ড, ভোগ্য সবই মায়ার, কিন্তু মায়ার এই 
দণ্ড জীব ত্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে_ একটি সুন্দর পুরস্কার 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৪৩ 


পাবার আশায়। সেটি হল ভগবৎপাঁদপদ্লাভ। অন্যান্য দেহে 
জীব কত কদর্য ভক্ষণ করে, এটি মায়ার দণ্ড, কিন্তু অপরদিকে 
ভগবং অনুভূতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে-_রসানুভূতির দিকে 
অগ্রসর হচ্ছে । স্থাবর দেহ থেকে জঙ্গম দেহে যাওয়া অর্থাং 
অস্ফুট থেকে ক্রমশঃ স্ফুট হওয়া । এইটি অনুগ্রহ । একজন 
লোককে যদি বলা যাঁয একশত টাকা বেতন দেওয়া হবে, কিন্তু 
তাকে সেজন্য প্রহার করা হবে। বেতন পাবার আশায় সে 
যেমন প্রহার সহ্য করতে রাজী হয়, মায়ার দ্বেতেও তেমনি 
নানাবিধ তিরস্কার প্রহার আছে । এগুলি হল রোগ, শোক, 
ক্ষুধা, পিপাসা, ভয়, শোক, মোহ প্রভৃতি । দোষ-থাক আর ন৷ 
থাক জীবকে এ মায়ার তিরস্কার সম্য করতেই হয়। এতে 
বেতন পাঁওয়! যাবে, সেইটিই লাভ- বেতন হল গৌর 
গোবিন্দ বলা। 

এই দেহেতে সাধন করে ধীরা ভগবানের পাদপদ্ধ লাভ 
করেন সেটিও শ্রীগোবিন্দের দান আর অসাধনে ধীরা লাভ করেন 
সেটিও কৃষ্ণের দান । এখন প্রশ্ন হচ্ছে সাধন করেই যদি পেতে 
হয়, তাহলে তাকে কৃপা কি করে বলা যাবে? আদেবধিপাদ 
নারদ শ্রীবৃহন্ভীগবতাম্ৃত গ্রন্থে উদাহরণ দিয়ে বলেছেন_ কোন 
অতিথিশালায় অতিথি এসেছেন । দাতা তাকে হাড়ি, কাঠ, 
চাল, ডাল, তেল, নুন সব দিয়ে রান্না করে খেতে বললেন । 
এসব উপকরণই দাতার দান । আর এক জন এসেছেন- অতি 
ক্ষীণ, দুর্বল, নিজে রান্না করে খেতে পারবেন না। দাতা 
করুণাপরবশ হয়ে তাকে নিজের ভোগ্য ষে তৈরী অন্ন তাই দান 


১৪৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


করলেন। তিনি খেয়ে পরমানন্দ লাভ করলেন। তিনি আশ্রিত 
হয়ে দাতার ছুয়ারে পড়েছিলেন, ব্যাকুলভাবে তার কৃপা প্রার্থনা 
করেছিলেন, তাঁতেই দাতার দয়া হল। তেমনি এই দেহ হল 
অতিথিশালা । এখানে সাধন করবার সামর্থ্যও ভগবানেরই 
করুণার দান, রান্নার উপকরণ দানের মত। আর ধার! সাঁধন 
করবার মত সমর্থ নন শুধু ব্যাকুলভাবে তার কৃপা! প্রার্থনা করে 
তার ছুয়ারে পড়ে থাকেন, তাকে তিনি নিজের ভোগ্যবস্তু 
প্রেমামৃত দান করেন। তিনি তা পান করে পরমানন্দ লাভ 
করেন । শ্রীগুরু পাদপন্মরূপে ভজন অন্ুকূলতা সব তার দেওয়া! । 
সাধনে পাওয়া কি রকম? জিহ্বাতে নাম হাড়ি বসাতে 
হবে, গদগদ ভাষ নয়নজলে অন্ন সিদ্ধ হলে, সেই সিদ্ধ অন্ন 
ভোজন করতে হবে । আর অতি রুগ্ন ক্ষীণ যে, নিজে রাাধতে 
পারে না -হা গোবিন্দ যা কর- এবার আমি তোমার হলাম-_ 
“হা গৌরহে যা কর? বলে দাতার দরজায় পড়ে থেকে কাতর হয়ে 
প্রার্থন৷ জানালে দাতা নিজের আম্বাদ দান করেন । বাবু ষিনি 
হবেন তিনি দেখবেন খেতে বসবার আগে দরজায় কেউ অতিথি 
আছে কি না। দরজা বন্ধ করে খেতে বসা বাবুর পরিচয় নয়। 
ছুটিই দান, কিন্তু এ দানের ভঙ্গি মাত্র যেমন ছুই ভিখারী হাত 
পেতেছে। কাউকে চার পয়সা, কাউকে বা এক টাকা দাতা 
দিলেন-__এটি দাতার খেয়াল। স্ষ্টির মধ্যেও তেমনি ছুটি খেলা 
-_এ স্য্টি কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ভগবংপ্রাপ্তি। কারণ স্থির 
প্রতি আর কোন প্রয়োজন নেই। পাদপদ্পপ্রান্তিই উদ্দেশ্য । 
জীবের দেহ হল তার উপায় মানুষ ছাড়া অন্য কোন দেহ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৪৫ 


শান্-উপদেশ শুনবে না । আর মানুষের মধ্যেই বা কজন শোনে? 
ভগবানের নিজের পক্ষেও এই জীব-উদ্ধার কাজটি বড় কঠিন। 
একটু একটু করে অনুগ্রহ দিয়ে দিয়ে চুরাশী লক্ষ দেহ স্থৃ্টি 
করেছেন । ভগবানের পাদপদ্ন জীব একেবারে ভূলে গেছে। 
তাকে মনে করতে হবে । জগতেও দেখা যাঁয় স্মতি ফিরিয়ে 
আনা কঠিন। সাধু; শাস্ত্র, গুরু, অনুকূল অবস্থাঁ_সব দিয়ে 
জীবকে নিজের পাদপন্ম ভজাবার জন্যই ভগ্গবানের এই 
নটি কাজ। 

যে গরু ছুধ দেয় তার লাথি যেমন সহ্য করা যায়, তেমনি 
এই দেহে গৌরগোবিন্দ বলা যায় তাই কাম ক্রোধাদির লাখিও 
সহা করতে হয়। 

মানুষকে শাস্ত্র দেখান হল । পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মের অভ্যাস 
মনুষ্যদেহে আছে । এত জন্মে কর্মের অভ্যাস, মন্ুষ্যদেহে কর্মের 
সংস্কারের মার্জন। কর্মহীন অবস্থায় কেউ থাকতে পারে না। 
নিদ্রিত অবস্থাতেও কর্ম চলে । মনুষ্যদেহে কর্মসংস্কারের মার্জন 
হচ্ছে। এতে বিমুখতা৷ দোষ নষ্ট হচ্ছে। যত আলে! জ্বলবে 
তত অন্ধকার দূর হবে। মনুষ্যদেহেই সাক্ষাৎ পাদপন্প ভজনের 
সংস্কার। স্থষ্টি কাজটিও ভগবানের লীলার মধ্যে পড়ে । আচার্ধ 
বেদব্যাস স্ৃত্র করেছেন-_লোকবত্তু লীলাকৈবল্যম্ ৷ সৃষ্ট 
কাজের কোন হেতু নেই। আনন্দে যে কাজ করা যায় তার নাম 
লীলা ; এটি স্বৈর আনন্দের বিলাস । মহারাজের কন্দুক ক্রীড়ার 
মত। আচার্য মধ্ব বললেন মত্তজনবৎ | ত্রষ্টা শ্রোতা-বিহীন 
অবস্থায় মত্তজন যেমন নাচে, গান করে, ভগবানের লীলাও 

১৩ 


১৪৬ নব্যযাগীন্দ্রসংবাদ 


তেমনি_-কারণবিহীন। শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ মহাশয় বিচার 
করেছেন, মত্তজন যে কাজ করে তা মস্তিফবিকৃতির পরিচয় । 
কিন্তু ভগবানের কোন মস্তিবিকৃতি নেই । কারণ তিনি সবন্ঞ। 
বলদেব তাই বললেন__ভগবানের এ স্ৃট্টিলীল। স্ুখোন্মত্তজনবৎ। 
আনন্দঘন বিগ্রহ আপনি নাচেন, আপনি গান। মহাজন 
বলেছেন-_-'নিতাই আমার আগে নাচে আগে গায়।” ভগবানের 
নিজের বিলাসই হল প্রধান । আনুসঙ্গে জীব উদ্ধার কাজ হয়ে 
যায়। যেমন পরশমণি তার নিজের কাজে পথ দিয়ে চলে 
যাচ্ছে, পায়ের তলে লোহা পড়ে গেলে পরশমণির স্পর্শে তা 
সোন। হয়ে যায়, তেমনি জীব উদ্ধার করা ভগবানের স্থষ্টির 
উদ্দেশ্য নয়। আন্ুসঙ্গে জীব উদ্ধার হয়ে যায়। উতদ্দশ্য তার 
নিজ বিলাস আব্বদন। এর মাঝে যদি জীব উদ্ধার হয় তো 
হয়ে যাবে । ভক্তকে আনন্দ দেবার জন্য তার স্যষ্টি। ভক্তকে 
আনন্দ দিলে নিজে আনন্দ পান। আনন্দ কখনও এক ভোগ 
করা চলে না। আনন্দ ভোগ করতে গেলে দিয়ে ভোগ করতে 
হয়। প্রাকৃত আনন্দও দেখা যায়, না দিনে আম্বাদন হয় না। 
যেমন কেউ যদি গান গেয়ে আনন্দ পেতে চায়, তাহলে সে গান 
শুনে শুধু নিজে আনন্দ পাবে না, আর পাঁচজনে শুনে আনন্দ 
পাবে। তখন তার নিজেরও আনন্দ পাওয়া হয়ে যাবে। 
শ্রীজীবপাদ বলেছেন, পৃবকল্পে যে সকল ভক্তের ভজন সিদ্ধ হয় 
নি, সেই সব অসিদ্ধ ভক্তদের উদ্ধারের জন্য এই স্থ্টির ব্যবস্থা । 
অন্য জীবের দেহ প্রাপ্তি আন্ুসঙ্গে হয়ে যায়। চিত্ত হতে কামাদি 
সম্ভতাপ যত সরে যাবে, ততই ভগবানের লোভ জাগবে, সেখানে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৪৭ 


থাকবার জন্য । ভক্তিধৃপে সুরভিত গৃহে থাকতে তার বড় ভাল 
লাগে। ভক্তের জন্যই ভগবানের স্বস্তি, এইটিই সতা কথা । 
লোভ ছাড়া কাজ হয় না । ভক্ত নাম করছে, নয়নে অশ্রু ঝরছে 
_এতে ভগবানের ভারী লোভ। ভারী আনন্দ। সূর্য কারে 
ঘরে নিমন্ত্রিত হলে আন্ুসঙ্গে যেমন অন্য লোকও স্্যাকিরণ 
পেয়ে যায় তেমনি ভক্তের জন্ সৃষ্টি হলেও অভক্তও পেয়ে যায়। 

জীব সৃষ্ট দেহ পেয়ে প্রাকৃত সম্পদ ভোগ করে। ভোগ 
করে করে জীবের স্থুখের নেশ! হয়। নেশা যায় বেশী হয় 
সে পাকা নেশাড়ীর কাছে পরামশ নেয়, কেমন করে এই 
নেশাকে স্থায়ী করা যায়। সাধু-গুরু-বৈষ্ণব পাক। নেশাখোর । 
তারা বললেন, গৌরগোবিন্দপাদপদ্নমধূ নিরস্তুর পান কর, তাহলে 
সখ আর কখনও তোমাকে ছাড়বে না। ভগবানের পাদপদ্মই 
সকলের চেয়ে উৎকৃষ্ট বস্ত। ভগবান বলেছেন__“মত্তঃ পরতরং 
নান্যৎ কিঞ্চিদিস্তি ধনঞ্জয়। বিষয়ভোগ কৃষ্ণপ্রাপ্তি করায় না 
বটে, কিন্তু বিষয়ভোগ রসবোধের লাল! জাগিয়ে দেয় । তাই 
সাক্ষাৎ না হোক পরম্পর! সম্পর্কে বিষয়ভোগের কুষ্খপ্রাপ্তিবিষয়ে 
হেতৃতা রয়েছে । তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃত জগতের স্থুখের 
নেশাও উপকার করেছে । তাই শ্রীযোগীন্দ্র জীবস্থষ্টির হেতু 
দেখাতে গিয়ে বললেন, “ন্বমাত্রাত্ব গ্রসিদ্ধয়ে' । 

সৃষ্টির পরে স্থষ্ট জগতে ভগবান প্রবেশ করছেন__“তৎ সৃষ্ট 
তদন্ুপ্রাবিশৎ । তাই অসৎ জগংকেও সং-এর মত দেখায় । 
ভগবান সংমাত্ররূপে এ জগতে প্রবেশ করেছেন ; কিন্তু যুরলী- 
ধারীরূপে প্রবেশ করেন নি। ভগবান জগতে প্রবেশ ন৷ 


১৪৮ নবযোগীন্্রসংবাদ 


করলে জগৎ বাঁচে না । বুদ্ধিমান ব্যক্তি যেমন ছধ থেকে মাখন 
তুলে নেয়, ভূমি থেকে শম্ত উৎপন্ন করে, তেমনি করে মনীষী 
ধারা তারাও এ জগতরূপ দুগ্ধ থেকে ভজনমন্থনের দ্বারা হরি- 
পাঁদপন্রূপ নবনীত আহরণ করেন । মানুষকে অনুদান করলে 
সে কিসে করে খাবে ? তার জন্য যেমন থালা বা পাতা দেওয়। 
হয়, তেমনি ভগবান জীবকে ভোগ করবার জন্য বিষয় দিলেন? 
কিন্ত ভোগ করবার পাত্র তো চাই। এখানে পাতা বা থাল। হল 
মন এবং দশটি ইন্দ্িয়। মন-ইন্দ্রিয় যদি তিনিই নিজে হয়ে 
থাকেন তাহলে তাদের আবার প্রকৃতির স্থৃষ্ট বলা হবে কেমন 
করে? ভগবান তার চিচ্ছক্তির আভ। মন-ইন্ড্রিয়তে দিয়েছেন! 
এইটিই মনের ক্ৃত্ব। মন এবং ইন্দ্রিয়ের বিষয়ভোগ করবার 
শক্তি পরমাত্মা দিয়েছেন। এই তাৎপর্ষে বল! হল, পরমাত্মা 
নিজে দশটি এবং একটি বিষয় ভোগ করেন। পরমাত্মার চিৎ 
সত্তাবূপ সংযোগে অচেতন মন-ইন্দ্রিয়ও চেতনের মত কাজ 
করে। সুইচ (5৮/10]7) টিপলে যেমন আলো জ্বলে, পাখা 
ঘোরে, 5৬100 ০2 করলে অচেতন পাখা আর ঘুরবে না, 
আলো আর জ্বলবে না, তেমনি এই দেহ হতে £ 
পরমাত্মা ভগবান যবে হবেন অস্তরধান 
ভম্ম কীট কৃমি অবশেষ । 

হরিকে বাদ দিয়ে শুধু দেহ নিয়ে যে আনন্দ, হরিপাদপদ্ম বিস্মৃত 
হয়ে দেহভোগ, তার ফলে পুনঃপুনঃ গতাগতি । এ জগতে মুখ 
হয় না। তাই ছুখকে সুখের গুড়ি মাখিয়ে জীবের কাছে 
সুখ রলে ধরা হয়েছে-_5৫£91-০09090 001181)-এর' মত। 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ১৪৯ 


জীব বাসনাযুক্ত কর্ম করতে করতে মায়ার রাজো ভ্রমণ করছে। 
তাই সংসার বেঁচে আছে । জীবকে এইভাবে বনু অমঙ্গলবাহী 
জন্মকে গ্রহণ করতে করতে মহ্হাপ্রলয় পধস্ত থাকতে হয়। 
জন্ম-মৃত্যুকে অবশ হয়ে গ্রহণ করতে হয় । 

প্রকৃতির সত্ব রজঃ তমঃ- এই ত্রিবিধ গুণ থেকে যে ত্রিবিধ 
কর্ম, শুরু লোহিত এবং কৃষ্ণ-_মনে রাখতে হবে এ সবই প্রাকৃত। 
তবে তমঃ বা রজঃ অপেক্ষা সত্ব ভাল । কিন্তু প্রাকৃত সত্বও 
ভগবানের কাছে যাবে না, একেও ত্যাগ করতে কবে । তাই 
যোগ-মাগে প্রাকৃত সত্ব শুদ্ধি করার বিধান দেওয়া ায়েছে । এর 
পরে হবে ঞ্রুবা স্মৃতি । তমোগুণে তিধ্যক যোনি, র্জোগুণে উত্তম 
কর্মী, সত্বগুণে দেবদেহ, আব যদি কেউ দেবদেহ বরণ করতে না 
চান, তাহলে তিনি সত্বগুণের দ্বারা প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেন । 
'সত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানম ।' বাবহারিক জগতে সবটা সাত্বিক 
হয় না, প্রতি জীবের মধ্যেই তিনটি গুণ আছে। তবেযার 
মধ্যে যে গুণটি বেশী থাকে, তাকে সেই গ্রপপ্রধান বলা হয়। 
থাগ্য, চিন্তা, সঙ্গ, আলাঁপ- এ সকলের দ্বারা সত্তগুণ বাড়ে। 
উপবাসের ছারা বৃদ্ধি হয়। সত্বগুণ পালন-কাজ করে, স্ডিতি- 
কাজ সত্বগুণের দ্বারা সাধিত হয়। এই সত্বগুণই জগতকে 
বাচিয়ে রাখার উপায়। জগতে সকলেই চায় যেন বেশীদিন 
বাঁচতে পারি। সত্বগুণের দ্বারা পরমায়ু বাড়ে। তাই মানুষ 
যদি শুধু বেঁচে থাকতে চায়, তাহলেও এই সত্বগ্ণ বাড়াতে হবে । 
কর্মফল নদীতে বনু অমল বয়। বৈতরণী নদী যেমন রক্তপু্ণ, 
পার হওয়া কষ্টকর, এও তেমনি_-বছ অমঙ্গলপ্রবাহ কর্মগতি । 


১৫০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


দেবযোনিও অমঙ্গলপ্রবাহ ৷ দেবদেহও মঙ্গল নয়, কারণ মঙ্গল 
হল একমাত্র ভগবৎ-উন্মুখতা । আর ভগবদিমুখতাই হল অমঙ্গল । 
কমিদেহ এবং দেবদেহ ছুইই সমান হবে, যদি তাতে ভগবদি- 
মুখতাই থাকে । মৃত্যুকালে জীবের কর্মানুগ চিত্তবৃত্তির কোন 
স্বাতন্ত্র থাকে না। এরই নাম অবশ অবস্থা । মৃত্যু অথবা 
রোগের যন্ত্রণায় ভগবানের নাম উচ্চারণ করতে পারছি না, তা 
নয়। পেরে উঠছি না, ইচ্ছা আছে, মনে মনে এ আক্ষেপও 
তখন থাকে না, তখন কর্ম অনুযায়ী বিপরীত বুদ্ধি হয় যে নাম 
উচ্চারণের প্রয়োজন নেই । চিত্তকে ভজনকর্মের বশীভূত করতে 
হবে। তাই মহাজন বলেছেন__“হরে কৃষ্ণ রাম নাম এই বেলা 
রসনায় রট'। চিত্ত তখন এরই বশীভূত হবে। ভক্তির সংস্কার 
চিত্তে হয়ে গেলে তখন সেই ভক্তিবশে চিত্ত কাজ করবে। 
রাজার জিহবা সাবাটি জীবন সুস্বাহ খাগ্গ্রহণেই অভ্যস্ত । তাই 
অন্তকাঁলে তাকে কৃষ্ণনাম উচ্চারণ করতে বললে সে তা পারে 
না; কারণ জিহব৷ ভক্তিকর্মের বশীভূত নয়। যা খাওয়া যায় 
তারই উদগার ওঠে । অন্তকালে সারাজীবনের খাচ্চগ্রহণের 
উদগার উঠবে । এইভাবে যোগীন্দ্র স্থিতির ব্যবস্থা করলেন। 
এর পরে মহাপ্রলয়ের কথা বলেছেন । 

বেদাস্তদর্শন বলেছেন__এতম্মাৎ আত্মনঃ আকাশঃ সম্তৃতঃ 
আকাশাৎ বায়ু১ বায়োরগ্রিঃ অগ্নেঃ জলম্‌ *-*। এতেও স্থৃপ্তির 
ক্রম ভাল বুঝা গেল না। শ্রীমদ্তাগবতে স্থষ্টির ক্রম ভাল করে 
বল! হয়েছে। প্রকৃতি হতে মহত্ত্ব, মহত্বত্ব থেকে ত্রিবিধ 
অহঙ্কার সাত্বিক, রাজসিক ও তামসিক । সাত্বিক অহঙ্কার 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৫১ 


থেকে মন, দেবতাবর্গ, রাজসিক অহঙ্কার থেকে বুদ্ধি জ্ঞানেন্দিয়, 
কর্মেক্দ্িয়, তামসিক অহঙ্কার থেকে শব্দাদি পঞ্চতন্মাত্র এবং পঞ্চ 
মহাভৃত আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী । কালকে অনাদি- 
নিধন বলা হয়েছে । অব্যক্ত প্রকৃতি ব্যক্ত জগতের আশ্রয়, 
বিকৃতির ওপরে আকৃতি তৈরী হয়। তাই অনেকে সন্দেহ 
করেন, ভগবানের যখন আকৃতি আছে তখন তাও প্রকৃতির 
বিকৃতি । অতএব ভগবানের দেহ প্রাকৃত । 

মহাপ্রলয়ে জগংকে প্রকৃতির দিকে আকর্ষণ করছে। 
কালশক্তি, কালের চেষ্টা, এ ভগবানেরই চেষ্টা । দ্রব্য এবং গুণ 
অর্থাৎ শুরু, লোহিত, কুষ্ণ সবই অব্যক্তে অর্থাৎ প্রকতিতে আকৃষ্ট 
হচ্ছে। কুর্ম যেমন করে নিজের অঙ্গ গুটিয়ে নেয়, তেমনি প্রকৃতি 
তার নিজের মধ্যে সকলকে প্রতিলোমে আকর্ষণ করেন। 
প্রকৃতি একাকী এ কাজ করতে সমর্থ নন। প্রকৃতি ব্রহ্মাণ্ড 
প্রসবের সময়ও কা'রণার্ণবশীয়ী ভগবানের ঈক্ষণকে অপেক্ষা 
করেন । আবার সংগোপন করবার সময়ও কালকে অপেক্ষা! 
করেন। 

এখন মহা'প্রলয়ের ক্রম দেখান হচ্ছে । পৃথিবীতে শতবংসর 
উন্বণা অনাবৃষ্টি হবে । বর্ধিত সূর্য জগৎকে উত্তপ্ত করবে । তার 
ফলে জগৎ নীরস হয়ে যাবে । এর পরে পাতাল থেকে সন্কর্ষণ 
মুখ হতে অনল নির্গত হবে । মহারুদ্র লেলিহান জিহবায় সব দগ্ধ 
করবে। বায়ুর দ্বারা প্রেরিত হয়ে সেই অনল চতুর্দিকে বিস্তার 
লীভ করবে । এরপরে প্রলয়কালীন সন্বর্তক মেঘ হস্তীর শুড়ের 
পরিমাণ ধার। বর্ণ করবে । এই মেঘকে ইন্দ্র ডেকেছিলেন যখন 


১৫২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তিনি ত্রজবাসীর গোবর্ধনপূজায় কুপিত হন। তখন বিরাট 
অর্থাৎ এই সমগ্র জগৎ সলিলে লয় পাবে । এই জগৎ হল 
বিরাট এবং জগতের সমষ্টি বৈরাজ পুরুষ। যেমন দেহ হল 
বিরাট, জীবাত্বাকে বৈরাজ বলা হয়। বিরাজ না থাকলে 
বৈরাজ থাকে না । মহাপ্রলয়ে ব্যণ্টি জীবের অবস্থা কি? 
সমষ্টি জীব ব্রহ্মা । ব্যগ্টি জীব, প্রথমেই সমষ্টি জীবে ব্রহ্মাতে লয় 
হয়ে যায়। এখন ব্রহ্মা কোথায় যাবেন? অগ্নিতে যতক্ষণ কাঠি 
দেওয়া যায় ততক্ষণ অগ্নিকে দেখা যায়; কিন্তু যখন কাঠ 
আর দেওয়। হচ্ছে না তখন অগ্নি কোথায় যায়? চোখের 
সামনে অগ্রিকে আর দেখা যায় না। কাঠ এখানে উপাধি । 
বৈরাজ পুরুষ, ব্রচ্মাও তেমনি নিরিন্ধন অগ্নির ন্যায় অব্যক্তে, 
সৃন্ষ্ম পদার্থে লীন হয়। কিন্তু এখানে একটি কথা আছে। 
অব্যক্ত মানে যদি প্রকৃতি হয় তাহলে ব্রহ্ম। প্রকৃতিতে লীন হন 
বললে শ্রতিবাক্ঃর সঙ্গে বিরোধ হন। ব্রহ্মা, শিব এদের 
অবস্থান হল যাবৎ অধিকারম্১। তাই এদের আধিকারিক 
দেবতা বল! হয়। সংহার হয়ে গেলে শিব আর থাকেন না 
চলে যান। যেমন যাত্র! হলে দল চলে যায়, তেমনি শিব ব্রহ্মা 
এদের কাজ হয়ে গেলে সকলে মুক্তিধামে চলে যান। শান্ত 
বলা আছে “ব্রহ্মার সঙ্গে মুক্তপুরুষগণ হরিপাদপদ্ধে যায়।' 
শ্রীচক্রবতিপাদ ও শ্রীন্বামিপাদ এখানে অব্যক্ত শব্দের অর্থ 
করেছেন- মুক্তিধাম, নিরাকার ব্রহ্ম অথবা বৈকু্ঠ। ব্যক্ত 
করা যায় না যা তাই অব্যক্ত । কর্মী, জ্ঞানী, ভক্ত ভেদে 
রক্ষা তিন প্রকার । নিজের ধর্ম যদি একশত বংসর সুষ্ঠুভাবে 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৫৩ 


কোন জীব পালন করে, তাহলে সে ব্রহ্মার পদ পেতে পারে, 
তাকে কর্মী ব্রহ্মা বল! হয়। এইরকম জ্ঞানী ত্রন্মা হতে পারে, 
ভক্তও ব্রহ্মা হতে পারে, যেমন গোপকুমার হয়েছিলেন । যে 
কল্পে ব্রহ্মা হবার মত যোগা জীব পাওয়া যায় না, তখন কৃষ্ণ 
নিজ অংশে ব্রহ্মা হন। স্বাংশ ব্রন্মা। কম ব্রহ্মা হলে তিনি 
প্রকৃতিতে লীন হন। তার পুনরাবৃত্তি হয়। জ্ঞানী ব্রহ্ম! হলে 
নিরাকার ব্রন্মে লীন হন, আর ভক্ত ব্রহ্মা হলে প্রেমলক্ষণ। 
বৈকুণঠ-পার্দ্গতি প্রাপ্ত হন। কর্মীর ফল পুনরাবৃত্তি, জ্ঞানীর 
ফল মুক্তি, আর ভক্তের ফল পার্ধদ্গতি। কর্মী ব্রহ্মার 
পুনরাবৃত্তিকে লক্ষ্য করেই ভগবান বলেছেন £ 

আব্রহ্গভূবনাল্লোকা পুনরাব্তিনোইর্জন | গীতা ৮1১৬ 

এই ব্রহ্মা আবার ফিরে আসেন। পঞ্চভূত ত পড়ে আছে। 
সব গুটিয়ে প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায়। শ্রীবলদেব বলেছেন, 
বনলীনবিহঙ্গবৎ । বনের পশুপাখী যেমন রাত্রিকালে সুপ্ত 
অবস্থায় থাকে, তাদের দেখ। যায় না, সকাল হলে আবার তারা 
কোলাহলমুখর হয়ে ওঠে, এও সেই রকম । দোকানদার যেমন 
রাত্রিতে জিনিষপত্র গুটিয়ে রাখে আবার সকালে দোকান সাজিয়ে 
দেয়। স্্টিও তাই মহাপ্রলয়ে সব গুটিয়ে নেয়, আবার স্থ্টিতে 
প্রকাশিত হয়। এর পরে যোগান্দ্র বললেন ক্ষিতি, অপ, তেজ; 
মরুৎ ব্যোম ব্যুতক্রমে প্রকৃতিতে লীন হয়। প্রথমে পৃথিবী 
সমন্বর্তক বায়ুর দ্বারা হৃতগন্ধ হয়ে জলে বিলীন হয় এবং জল 
হৃতরস হয়ে জ্যোতিরূপে কল্পিত হয় । আবার অন্ধকারে হৃতরূপ 
হয়ে জ্যোতিঃ বায়ুতে লীন হয় এবং আকাশের দ্বারা হৃতস্পর্শ 


১৫৪ নবযোগীব্দ্রসংবাদ 


হয়ে বায়ু আকাশে প্রবেশ করে । পরে কালের দ্বারা হাতগুণ 
(শব্দ ) আকাশও তামস অহঙ্কারদূপ আত্মাতে লীন হ'ব । এর 
পরে সকল ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি-__এর। বৈকারিকগুণের সঙ্গে সাত্বিক 
অহংকার ও মহত্তত্বে বিলীন হবে । 

এই হুল ভগবানের স্য্টি-স্থিতি-বিনাশকারিণী ত্রিবর্ণা মায় । 
এইভাবে মায়ার স্বরূপ ষোগীন্দ্র নিরূপণ করলেন । 





চতুর্থ প্রশ্ন 
মহারাজ নিমির সভায় তৃতীয় যোগীন্দ্র শ্রীঅন্তরীক্ষ মায়ার 
স্বরূপ নিরূপণ করে প্রশ্ন করলেন-__-“মহারাজ ! এর পরে আপনি 
আর কি শুনবার বাসনা করেন ? যোগীন্দ্ের এই প্রশ্ন রাজাকে 
ছন্দিত করেছে । জীব কৃষ্ণবিমুখ, তাই জগতের স্থিতি। 
জীব উন্মুখ হলেই জগতের লয়। যাতে জীব এই মায়ার 
কারাগার থেকে চলে যেতে না পারে, তার ব্যবস্থা শ্বভাবতঃ 
মায়ার। সব কাজেই মায়ার হস্তক্ষেপ। কেৰল মায়৷ যখন 
বুঝতে পারে এ জীবটি একান্তভাবে ভগবানের পাদপদ্সে 
শরণাগত, তখন মায়া তাকে ছেড়ে দেয়। ভঞ্জনপথে চলতে 
চলতে মায়] বিত্ব ঘটায় । সাধক তখন ভজন থেকে চ্যুত হয়ে 
পড়ে, কিন্তু এ চ্যুতি প্রকৃতপক্ষে চ্যুতি নয় । মায়া ভক্তিনিষ্ঠাকে 
ঘুরিয়ে দেয় নিষ্ঠাকে মজবুত করবার জন্য ৷ মায়া খুঁটি নাড়িয়ে 
দেখে চিত্ত শক্ত হয়েছে কি না। মালিক যেমন বাগানের 
মালীকে বলে আম পাকলে আমার কাছে নিয়ে এসো | মালীও 
আম পাকা দেখলে মালিকের কাছে পাঠায়। ভাল করে পাকা 
না দেখলে পাঠায় না। ত্রিবর্ণী মায়া । মায়ার সত্ব রজঃ তমঃ 
--এই তিনটি গুণের বর্ণ যথাক্রমে শুক্র (শুভ্র), লোহিত 
এবং কৃষ্ণ । রাজা তো! একে তৈরীই ছিলেন, এর পরে আবার 
যোগীক্দ্র নিজে প্রশ্ন করে উৎসাহ দিয়েছেন । রাজা বললেন £ 


যখৈতামৈশ্বরীং মায়াং হুস্তরামকৃতাক্মভিঃ | 
তরস্ত্যঞ্জঃ স্থলধিয়ো! মহর্য ইদমুচ্যতাম্‌॥ ভা. ১১।৩।১৮ 


১৫৬ নবযোগীন্্রসংবাদ 


স্থলধী অকৃতাত্মা, মূর্খ ব্যক্তিও এই দুস্তরা এশ্বরী মায়াকে যাতে 
অনায়াসে উত্তীর্ণ হতে পারে, তার উপায়টি কৃপা করে বলুন । 

এখানে অকৃতাত্মা৷ অর্থে যদি অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি ধরা যায়, 
তাহলে ঠিক হবে না। কারণ তাহলে কি বুঝতে হবে জিতাত্মা 
অর্থাৎ জিতেক্দ্রিয় যারা! তারাই কি অনায়াসে মায়া জয় করতে 
পারে? জিতৈক্দ্রিয়ের চিত্তও তো মায়ামুগ্ধ হতে দেখা যায়। 
শ্রীশ্রীচগ্তীবাক্যে বলা আছে £ 

জ্ঞানিনামপি চেতাংসি দেবী ভগবতী হি সা। 
বলাদাকৃষ্য মোহায় মহামায়া প্রষচ্ছতি ॥ 

এ জ্ঞানী বলতে আত্মজ্জানসম্পন্ন বাক্তিকে বুঝাচ্ছে। কারণ 
আত্মজ্জানের খাতির মায়া রাখে না। অনাদি ভগবতবিমুখ জীব 
-এই অপরাধেই মায়া তাকে আক্রমণ করে । মায়া আক্রমণের 
আগে পর্যস্ত জীবের আত্মজ্ঞান, অর্থাৎ স্বরূপ-স্মৃতিটি থাকে । 
সে যে নিত্যশুদ্ববৃদ্ধমুক্তত্বভাব, এ ভ্গ্রান তার লোপ পায় না। 
মায়া আক্রমণ করে তার এই আত্মচেতনাকে লোপ করিয়ে দেয়। 
তখন তার আত্মজ্ঞানও চলে যায়, অর্থাৎ অস্মৃতি হয় এবং তার 
ফলে বিপর্যয়, অর্থাৎ দেহে “আমি” এবং দৈহিক বস্ততে “আমার' 
এই বুদ্ধি জাগে । তাহলে দেখা যাচ্ছে জ্ঞানবানকে মায়া জ্ঞান- 
হীন করেছে। জীবাত্বা তো ণচিং-এর অংশ। তাকে জড় 
মায়া কেন আক্রমণ করতে সাহস করে? যেমন অন্সির 
কণিকাকেও তো! কাঠ ভয় করে। ভন্মীভূত হওয়ার ভয়ে 
কাছে যেতে চায় না। জীবের চিত্ত বড় ছুবল। কারণ সে 
অনাদিকাল থেকে কৃষ্পাদপন্মে বিমুখ । আত্মজ্ঞান থাকতেই 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৫৭ 


মায় তাকে আক্রমণ করেছে, তাই আতজ্ঞান ফিরে পেলেও 
কোন কাক্ত হবে না । জীবের ব্যাধি হল কৃষ্ণবিমুখতা। তাই 
কৃষ্ণ-উন্মুখতাই হবে চিকিৎসা । আত্মজ্ঞান ফিরে পাওয়াটা 
চিকিৎসা! হবে না । এই মায়ার গুর হলেন শ্রীশ্রীহরিদাসঠাকুর । 
মায়! আন্রমণের আগেই যদি আত্মজ্ঞান লোপ হত তাহলে মায়! 
আক্রমণের ফলে অস্থৃতি হয়েছে এ কথা বল৷ যেত না । ভগবান 
বললেন £ 
মামেব যে প্রপদ্ন্তে মায়ামেতাং তরস্তি তে । ' গীতা ৭।১৪ 
জিতেক্দ্িয় হলে মায়া জয় করা যায় না--“প্রেমে কুষ্তাস্বাদ হলে 
ভব নাশ পায়।” ভগবানে একান্ত শরণাগতিই মায়া তরণের 
একমাত্র উপায়। এই মায়াকে পার হওয়। সইজসাধ্য নয়। 
মদ্নদেব নরনারায়ণ খষিচক বলেছেন, কামনার হৃস্তর সাগর 
পেরিয়ে কেউ কেউ ক্রোধের গোম্পদে ডুবে মরে। ক্রোধের 
কোন ফল নেই। কামনাতে তনু কিছুক্ষণ বিষয় ভোগ করতে 
পারে। ক্রোধে কেবল অন্ুতাপ। তাদের কষ্ট করে অঞ্জিত 
তপস্তা বৃথ। নষ্ট করে। না খেয়ে জমান টাকার হাড়ি জলে 
ডুবিয়ে দিতে হলে তা৷ যেমন ভোগে অথবা দানে কিছুতেই লাগে 
না, তেমনি তপস্তা প্রভৃতি যা কিছু কষ্টাজিত সঞ্চিত ফল 
ক্রোধের বশে উচ্চারিত অভিশাপাদি বাক্যে বৃথা নষ্ট হয়। 
জিতেক্দ্রিয় ব্যক্তি মায়া জয় করে এ কথা৷ কোথাও বল! হয় নি। 
মদনদেবের বাক্যটি হল £ 
কৃতৃট্ত্রিকালগুণমারুতজৈহব্য শৈশ্মযা 
নম্মানপারজলধীনতিতীর্য কেচিং। 


১৫৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ক্রোধস্থ যান্তি বিফলম্য বশং পদে গো 
মজ্জন্তি তুশ্চরতপশ্চ বুথোৎন্থজস্তি | ভা. ১১।৪1১১ 
বাকৃপতি ব্রহ্মার বাক্য আছেঃ 
যেষাং স এব ভগবান্‌ দয়য়েদনস্ত সবাত্মন।শ্রিতপদে। 
যদি নিব্যলীকম্‌। 
তে ছুস্তরামতিতরস্তি চ দেবমায়াং নৈষাং মমাহমিতি ধী: 
শ্বশৃগালভক্ষ্যে । ভা” ২1৭৪২ 
ভগবৎ পাদপন্মে একান্ত শরণাগতি _এইটিই মায়া তরণের 
একমাত্র উপায় । তার শ্রীচরণে অকপটে সব দিয়ে ধরতে 
পারলে তিনি দয়া করেন। কুকুর শৃগালের ভক্ষ্য যে এই দেহ 
"তাতে “আমি” এবং দৈঠিক বস্ততে “আমার” এই বুদ্ধি যাদের 
আছে, তাদের মায়৷ জয় হয় না। ভগবান খষভ দেবের বাক্য £ 
'্রীতিন যাবন্ময়ি বান্থুদেবে ন মুচ্যতে দেহযোগেন তাবৎ । 
_-_ভা. ৫৫1৬ 
মায়ার দেওয়৷ বস্ত না স্পর্শ করলেও চলবে এই বুদ্ধি যখন আসবে 
তখনই মায়। জয় হবে। জগতে অনেক কাজে তে। বীরত্ব দেখান 
হয়, কিন্তু এই বীরত্ব দেখাতে হবে যে মায়ার দেওয়া বস্ত্র স্পর্শ 
করব না-_তা৷ হোক্‌ নী কেন সে ইন্দ্রপদ ব! ব্রহ্মার পদ। 
“অকৃতাত্মভি পদের তাই প্রকৃত অর্থটি বলা হচ্ছে। অকৃত 
অনারাধিত আত্ম হরি যৈঃ তে। যাদের দ্বারা হরি আরাধিত 
হন নি, তারা, সেই সব স্ুলধী ব্যক্তিও যাতে অনায়াসে হুস্তরা 
মায়াকে পার হতে পারে তার উপায় বলুন। এই স্ুলধী ব্যক্তি 
কারা, তাদের পরিচয় দেবফিপাদ দিয়েছেন £ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৫৯ 


এতদ্ধযাতুরচিত্তানাং মাত্রাম্পর্শেচ্ছয়া মুই । 
ভবসিদ্ধুপ্নবো দৃষ্টো হরিচর্যানুবর্ণনম্‌॥ ভা. ১৬1৩৫ 

টবষিপাদ নারদ আচার্য বেদব্যাসকে বলছেন-_-আগচার্ধ, তুমি 
জীবকে ধর্ম জানাতে এসেছ অর্থাৎ সংসারসাগর পার হবার 
উপায় বলতে এসেছ,তাহলে নৌক। করে দেবে, এইটাই হবে ধর্ম। 
ভবসাগর পারের নৌকা কঠিন। কিন্ত সে নৌকা আমি চোখে 
দেখেছি, আমি শোনা কথা কই না, দেখা কথা কই । যে জীব 
আতুরচিত্ত_একটু বিষয়ভোগের জন্য কাঙালের মত বসে আছে 
_শব্দ,স্পর্শ,রূপ, রস গন্ধ-_এই পঞ্চ বিষয়ের দ্বারে ছ্বারে অতাস্ত 
লোলুপ হয়ে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে একটু বিষয়ভোগের লালসায় 
ঘোরে, তাদের ভবপাবের নৌকা হল শ্রীহরির চর্া অর্থাৎ লীলা 
বর্ণন।। বিষয়াসক্ত, কর্মাসক্ত সুলধী ব্যক্তির যদি এটি উপায় 
হয় তাহলে সুক্ষ্রধীর ক। কথ! । 

যোগীক্্র মহারাজ নিমিকে প্রশ্ন করলেন মহারাজ ! মায়া 
তরণের উপায়টি আপনি আবার নৃতন করে জানতে চাইছেন 
কেন? কারণ পূর্বে কৰি যোগীন্দ্র তো “তন্মায়য়াতো বুধ 
আভজেত্তং ভক্তোকয়েশং গুরু দেবতাত্মা” এই বাক্যে বলেছেন যে 
একমাত্র অব্যভিচারিণী ভক্তির দ্বারা ভগবানের পাদপদ্ম ভজলে 
মায় জয় করা যায়, তাহলে পুনরায় এ প্রশ্ন কেন? মদান্ধ ইন্দ্র 
কুপিত হয়ে ব্রজবাসীকে গাল দিয়েছিলেন; কমী যারা তারা৷ 
বৃথা অভিমানী- কর্মময় নৌকা দৃঢ় হলেও তা নামে নৌকা কাজে 
নয়, অর্থাৎ কর্মমার্গ আসল সাধন নয়, এর দ্বার পার হওয়া যায় 
না, ডুবে যেতে হয়, কারণ কর্মজনিত পাপ অথবা! পুপ্য__ছুই-ই 


১৬০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ডুবিয়েই দেয়, পার করে না। ইন্দ্র দেবরাজ, তিনি কুপিত হলেন 
কেন? বিষয় সম্পর্কই ভগবদ্ধিমুখতা স্থষ্টি করে। পৃথুরাজার 
উপাখ্যানে বলা আছে কুকুরের লেজ ধরে সাগর পার হওয়ার 
চেষ্টার মত হল কর্মমার্গ অবলম্বন করে ভবসাগর উত্তীর্ণ হওয়া । 

নিমিরাজের সভায় যে সব যাজ্ঝিক কর্মবাদী ব্রাক্মণগণ 
ছিলেন তাদের দিকে লক্ষ্য রেখে অস্তরীক্ষ যোগীল্দ্র বললেন-__ 
অকৃতাত্মভিঃ অর্থাৎ স্থল অনুষ্ঠঠনেই যার রুচি স্ুক্ম ভক্তিতে তার 
রুচি নেই । রাজার প্রশ্নটি কটাক্ষমূলক । মানুষ অবশে বিষয়চিন্ত 
করে, টেনেটুনেও তাকে বিষয় চিন্তা ছাড়িয়ে কৃ্ণ-চিন্তা করান 
যায় না। তাই মায়া জয় করা যায় না। এমন যদি হয় শ্রীগুরু- 
কৃপায় কুষ্ণচিস্তাই অবশে স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে আর বিষয়চিন্তা 
টেনেটুনে জোর করে করতে হচ্ছে তখনই মায় জয় করা হয়েছে 
বুঝতে হবে । বিষয়সেবী বাক্তির মায়া জয় কেমন করে হবে 
তার উত্তর প্রবুদ্ধ যোগীন্্র দেবেন। প্রকৃষ্ট বুদ্ধ--তাই তার 
নাম প্রবুদ্ধ' তিনিই তো মায় জয়ের কথা বলবেন । 

শ্রীপ্রবুদ্ধ যোগীন্দ্র বললেন, শ্রীন্ামিপাদ টীকায় বলেছেনঃ 
ভক্তি ব্যতিরেকে মায়া তরণের আর দ্বিতীয় উপায় নেই। “নাস; 
পন্থ৷ বিদ্যতেহয়নায়' ৷ ভক্তি ছাড়া মায়া তরণ হয় না। জ্ঞনের 
দ্বারা মায়াতরণের কথা যে জ্ঞানবাদীর। বলেন এ জ্ঞানও ভক্তি । 
ভক্তি সম্পক ছাড়া জ্ঞান বা যোগ কোন কাজ করে না। কন্যাকে 
সম্প্রদান করতে হলে যেমন সালঙ্কারা কন্যা দান করতে হয় 
তেমনি, ভক্তিকেও গ্রহণ করতে হলে সসাধন৷ ভক্তিকে গ্রহণ 
করতে হরে। ম্বামিপাদ বললেন-_“তত্র প্রথমং বৈরাগ্যদ্ারা 


নবযোগীজ্রসংবাদ ১৬১ 


গরূপসত্তিমাহ ৷ গুরু পদাশ্রয়ের উপকরণ হল বৈরাগ্য। এখন 
প্রশ্ন হতে পারে ভক্তিরাজ্যে বৈরাগ্যর প্রয়োজন কি? জ্ঞানাঁদি 
সাধনে বৈরাগ্য প্রয়োজন বটে, বৈরাগ্যের প্রয়োজন সবত্র 
আাছে। প্রাকৃত বিষয়কে ত্যাগ করার নামই বৈরাগ্য। 
আমাদের কথা হল কৃষ্ণ পেতে আপত্তি নেই কিন্তু জগতের 
অর্থ সম্পদ ধন জন স্ত্রী পুত্র গৃহ মান মর্যাদা যা পেয়েছি তাদের 
ছেড়ে নয়, সে সব থাক, মাঝ থেকে যদি কৃষ্ণ পাওয়া যায়, মন্দ 
কি? এই হল আমাদের মনোবৃত্তি। আমাদের যেখানে ব্যথ! 
শাস্সকার ঠিক সেইখানটিতে ধরেছেন । ছুরি না বঙ্গালে যেমন 
বিস্ষেটক ভাল হয় না তেমনি তীব্র বৈরাগ্যরূপ ছুক্িকাঘাত না 
করলে অবিষ্ঠা বি-্ষাটক ভাল হবে না। জ্ঞান্নাদি সাধনে 
অধিকারী নির্বাচন আছে। সেই ব্যক্তিকে প্রথমত: অখিল 
বেদের অর্থ আপাততঃ জানতে হবে । কাম্য এবং নিষিদ্ধ কর্ম 
তাগ করতে হবে। নিত্যনৈমিত্তিক প্রায়শ্চিত্ত উপাসনা 
( শাগ্ডিল্যস্থত্রাদি) এই চতুবিধ কর্মের দ্বারা চিত্ত শুদ্ধ করে 
তাকে নিতান্ত নির্মল হতে হবে এবং সাধন চতুষ্টয় জানতে 
হবে। নিত্যানিত্যবস্তুবিবেক, ইহাযুভ্রফলভোগবিরাগ, শমদমাদি 
সাধন সম্পর্দ অর্থাৎ শম, দম, উপরতিঃ তিতিক্ষা, সমাধান 
( সম্যক আধান ) এবং শ্রদ্ধা আর মুমুক্ষুত্ব আছে এইরূপ ব্যক্তি 
হবেন প্রমাতা অর্থাৎ জ্ঞান উপদেশ গ্রহণের অধিকারী | জ্ঞানের 
মত ভক্তির ক্ষেত্রে বৈরাগা আগে বল! হয় নি, এখানে কিছু 
ছাড় দেওয়া! হয়েছে । 

শাস্রকার বলেছেন, এ জগতে হরিভক্তি স্ুহ্র্লভা | জ্ঞান 

১১ 


১৬২ নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ 


অপেক্ষা ভক্তি যদি সাধনের দিক দিয়ে বেশী স্ুতুর্লভ হয় তাহঙ্গে 
স্বভাবতই এটি বুঝতে হবে যে ভক্তির যিনি অধিকারী তাঁর 
পক্ষে অধিকার আরও বেশী হওয়া চাই, কিন্তু ভক্তি মহারাণীর 
এমনই মহিমা! যে সেখানে ভক্তকে চেষ্টা করে এ সব অধিকার 
আয়ত্ত করতে হয় না। ভক্তির কাছে এলে আপন! হতেই ভক্তি 
ও সব অধিকার তৈরী করে দেন। অন্ধকার যদি কোনও 
রকমে একবার সূর্যের কাছে পৌছাতে পারে তাহলে সে আলে৷ 
হয়ে যায়, এও তেমনি । জ্ঞানযোগ সাধন অধিকার নিবাচন 
করেছেন কিন্তু ভক্তির ক্ষেত্রে কোন অধিকার নিবাচন কর! হয় 
নি। মানুষ মাত্রেরই ভক্তিতে অধিকার । 

এখন প্রশ্ন হতে পারে যদি মানুষ মাত্রেরই অধিকার থাকে 
তাহলে আবার বৈরাগ্যের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা আছে, এ কথা 
বল! হল কেন? জ্ঞান অথবা! যোগমর্গেব বৈরাগ্য ও ভক্তির 
বৈরাগ্য এক নয়। জ্ঞানীর বা যোগীর বৈরাগ্য হল সব ত্যাগ 
করে এলে তবে জ্ঞান অথবা যোগ উপদেশ, কিন্তু ভক্তির বৈরাগ্য 
তা নয়, ভক্তি এলেই এ বৈরাগ্য আসে- যেমন অন্ন এলে ক্ষুধা 
চলে যায়। শ্্রীবিশ্বনাথ চক্রবতিপাদ বলেছেন- ভক্তি জননী । 
তার সন্তান হল বৈরাগ্য । বৈরাগ্য জনক ভক্তি সন্তান তা নয়, 
অর্থাৎ এ বৈরাগ্যের জন্ম তক্তি থেকে, বৈরাগ্য থেকে ভক্তির জন্ম 
নয়। প্রাকৃত ক্ষুধা চলে যাওয়ার নামই বৈরাগ্য। ভক্তির 
ফলে যখন বৈরাগ্য আসে তখন ভক্তের চোখ প্রাকৃত রূপ দেখে 
না, কান প্রাকৃত শব্দ শোনে না, জিহবা প্রাকৃত কথা বলে না; 
তখন তার এ প্রাকৃত খাগ্ে পেট ভরে না, তখন সে অপ্রাকৃত 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৬৩ 


খবান্ঠ খায় । জ্ঞানী উপবাস দিয়ে ক্ষুধা বিনাশ করে, ভক্ত খেয়ে 
খেয়ে পেট ভরিয়ে ক্ষুধা নাশ করে। ভক্তের বৈরাগা অযতুসিদ্ধ, 
চেষ্টা করে করতে হয় না--ভক্তের ভক্তির কাছে বিষয়বাঁসনা 
স্থান পায় না । ধাহ! রাম তাহা নেহি কাম-_রবি রজনী নাহি 
মিলে এক ধাম। জ্ঞান যৌগ বলে আগে অন্বাকার দূর কর 
তারপর আলো জ্বালা হবে। আর ভক্তি বলে অন্ধকার দূর 
করবার জন্য পরিশ্রম করতে হবে না, ভক্তি আলো জ্বাললে 
অন্ধকার আপন! থেকেই চলে যাবে। গৌরগোবিন্দে রুচি 
লাগলেই প্রাকৃত রুচি আপনিই চলে যাবে। মহাবিষুঃ অবতার 
শ্রীল অদ্বৈত আচার্ধ প্রভু শ্রীশ্রীমন্মহা প্রভৃকে আবদার করে 
বলেছিলেন তুমি সন্গ্যাস নিলে কেন? প্রিয়াজী, মাতা শচী 
দেবী, নদীয়ার ভক্তবৃন্দ কেউ তো তোমার কৃষ্চভজনের বিরোধী 
ছিল না।” তার উত্তরে মহাপ্রভু বললেন £ 


শ্যামামৃতআোতসি পাতিতং বপু স্তস্তৈব তুঙ্গেন তরঙ্গ রংহস| | 
যাং যাং দশামেতি শুভাশুভাহথব। স! চৈব মে প্রেমচরী করোতি | 
- চৈতন্যচন্দ্রোদয় 


কৃষ্ণচভক্তির খরক্রোতে পড়ে গেলে কোথায় বাসনাবসন খসে 
যাবে আর মনে থাকে না 'বাসো যথা পরিহিতং মদিরামদান্ধঃ। 
মদিরা পানে মত্ত হলে যেমন কটিদেশের বসন কখন পড়ে যায় 
জানতে পারা যায় না এও সেই রকম। জগতে সকলেই গুছিয়ে 
গুছিয়ে বিষয় ভোগ করে-শ্রীযো গীন্দ্র বললেন- কৃষ্ণভক্তি-মুধা 
পান করলে বাসনাবসন কোথায় যাবে তার কোন ঠিকানা নেই 


১৬৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


--এই কৃষ্ণভক্তি মদ পান করবার ইচ্ছা তে! চাই--কোথায় এ 
মদ পাওয়া যায়? ঠিকানা! জানতে হবে-_তাই শ্রীগুরুপদাশ্রয় 
একান্ত প্রয়োজন । শ্রীবলদেব বিছ্যাভৃূষণ মহাশয় তার 
প্রমেয়রত্বাবলীগ্রন্থে বলেছেন-__জ্ঞানবৈরাগ্যপূর্বাশ! ফলং স্ধ: 
প্রকাশয়েৎ।” ভক্তির ফল অবশ্যই ফলবে। ভক্তি কখনও ব্যর্থ 
যাবে না-_-অমোঘা ভগবন্তক্তি । ভক্তি-অগ্নি বাসনা-কাঠকে 
ধ্বংস করবেই কিন্তু কাঠ যদি বাসনা-জলে ভেজীন থাকে তাহলে 
আগুন ধরতে দেরী হবে বৈরাগ্য-রোদে চিত্ত শুক্ষ হলে তাতে 
তক্তি-অগ্নি সংযোগ তাড়াতাড়ি হবে। ভক্তের বৈরাগ্য হল 
কৃষ্ণেতর বস্তুতে স্পৃহাহীন অবস্থা--আর জ্ঞানীর বৈরাগ্য হল 
বিষয়মাত্র ত্যাগ । ভক্তের পক্ষে সেইটিই ত্যাজ্য যেটি কৃষ্ণপ্রিয় 
নয়__ দেবদেহও কৃষ্তপ্রিয় নয় বলে ত্যাজ্য। ভগবৎ সম্পর্কিত 
ণ] হলে ভক্ত কোন বস্ত গ্রহণ করে না। শ্রুতি বাক্য আছে 
'তেন ত্যক্তেন তূঙ্ধীথাঃ' কৃষ্ণত্যক্ত অর্থাৎ তার অধরামূত হলে সে 
বস্ত ভক্তের গ্রান্, অধরামৃত বলে বস্ত গ্রহণ করতে হবে, এতে 
বস্ত বোধ থাকবে না, কৃষ্ণে নিবেদিত হয় নি এমন বস্তু ভক্ত 
কখনও গ্রহণ করবে না, এরই নাম ভক্তের পাতিত্রত্য। গান্ধারীর 
চোখ বাঁধা ছিল, তার পুত্রমুখ দেখবার লালসা ছিল না৷ তা নয়, 
কিন্তু স্বামী জন্মান্ধ, তার প্রতি নিষ্ঠাবশতঃ তিনি চোখে কাপড় 
বেঁধেছিলেন ৷ হনুমানের পাতিত্রত্য সুবিখ্যাত, তিনি রামচন্দ্র 
ছাড়া আর কিছু দেখেন নি। যাতে রাম নেই সে'বস্ত তিনি 
গ্রহণ করেন নি। এ বৈরাগ্য একবারে পাওয়া যায় না। ক্রমে 
ক্রমে অভ্যাস করতে হয় । 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ১৬৫ 


যারা প্রাকৃত বিষয়ে নিরবেদকে লাভ করেছে তাদের জন্য 
জ্ঞাযোগ আর যারা প্রাকৃত বিষয়ে বৈরাগ্য লাভ করে নি 
তাদের জন্য কর্মযোগ, আর যে বাক্তি অত্যন্ত নির্বেদ প্রাপ্ত নয়, 
অথচ বিষয়ে অত্যন্ত আসক্ত নয় তাদের জন্য ভক্তিযোগ । 
শ্রীভগবানের উদ্ধবজীর প্রতি বাক্য £ 

যদৃচ্ছয়া মংকথাদৌ জাতশ্রদ্্ত যঃ পুমান্‌। 


ন নিবিপ্লো নাতিসক্তো ভক্তিযোগোহস্য সিদ্ধিদঃ ॥ 
ভা, ১১।২০।৮ 


তাহলে ভক্তিকে যে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে এ বিচারে তো৷ ভক্তি 
মধ্যম স্তরে পড়ল। না, তা বলা যাবে না, কারণ. ছুই পাশে ছুই 
শিশু পুত্র নিয়ে পিতা চলেছেন, ভাতে পিতা কি মধ্যম স্তরে 
পড়েন? এখানে পিতা মধ্যম হয়েও শ্রেষ্ঠ । জ্ঞান এবং কর্ম 
শিশু সন্তানের মত, মাঝখানে ভক্তি উভয়োরভ্য হিতত্বাং। 
হেতুতেই উত্তমতা ধরা পড়বে । জ্ঞানীর হেতু বৈরাগা, কর্মীর 
হেতু বিষয়াসক্তি, তাহলে মাঝখানের বৈরাগ্যের হেতু কি! 
জ্কানীর বৈরাগ্যের প্রতি হেতু হয়েছে, নিক্ষাম কর্মে চিততশুদ্ধি 
হয়েছে, তার ফলে বৈরাগ্য । আর বিষয়াসক্তির প্রতি হেতু 
অনাদি অবিষ্ঠা। আর ভক্তিপথের অবস্থা হল পালাতে পারে 
না, মরেও না। এ এক যাতনাময় অবস্থা! ! বিষয়ভোগ ছাড়তে 
পারে না অথচ ভোগের প্রতি মুহুর্তেই কাটা ফোটে । ব্যাধের 
বাণের মত বাণে বিদ্ধ পশু এখনও প্রাণ হারায় নি অথচ বাণবিদ্ধ 
থাকায় যন্ত্রণায় ছট্ফটু করছে, এখানেও সেই একই অবস্থা । 
এখানে বাণ কি? মহৎ কপারূপ বিশেষ বাণ মারা হয়েছে 


১৬৬ নবযোগীক্মসংবাদ 


এমন ব্যক্তির পক্ষেই ভক্তিযোগ সিদ্ধিদাত।। কেন? কারণ 
নির্বেদ-প্রাপ্ত বাক্তি অহঙ্কারী হয় । ভক্তিধর্ম অর্থাৎ পায়ে ধরা 
ধর্ম তাদের পোষায় না, আর অত্যন্ত বিষয়ীসক্তের বিষয়- 
নিমুক্তির কোন প্রয়োজনবোধ নেই। মাঝখানের লোকই 
ভাঁগ্যবান। ভক্তিমার্গ অবলম্বীর হেতু হল মহতকৃপাঁ। এইটিই 
সাধকের সবৌত্তম অবস্থা । যখন তাঁর নিজের আতি এসেছে 
তখনই জীব গোবিন্দ-পাদপদ্মে শরণাগত হয়। ভক্তিপথের 
সাধক ইঙ্গিতে বৈরাগ্য ছু'য়েছে। তবু যে তার সংসার দেখা 
যায় সে হল লাউ গাছের শিকড় ইছুরে কাটার মত অবস্থা । 
ইদুরে তলায় তলায় ম1টির ভিতরে শিকড় কেটে দিয়েছে অথচ, 
কাটবার সঙ্গে সঙ্গেই গাছটি শুকিয়ে যায় না- কিছুক্ষণ টাটকা 
থাকে, কিন্ত শীঘ্রই শুকিয়ে যাবে। তেমনি মহৎকপ। ভক্তের 
সংসার-মূল কেটে দিয়েছে__তাঁরও সংসার করা দেখাচ্ছে বটে__ 
কিন্তু সে আর বেশীদিন থাকবে না, শীঘ্রই শুকিয়ে যাবে। 
ংসার অসার বুদ্ধি নাহলে তে ছাড়া যাবে না--এই বোধ 
নিয়ে গুরুপাদপন্মে শরণ।গত হলে বড় সুন্দর । 
শপ্রবৃদ্ধ যোগীন্দ্র নিমিরাজকে বললেন__“মহারাজ ! এ 
সংসারে মান্ুয় মিথুনীচারী হয়ে অর্থাৎ স্ত্রী-পুরুষ মিলিত হয়ে 
সংসার করতে আরম্ত করে স্ুখপ্রাপ্তি ও ছুঃখনিবুত্তির আশায় 
কিন্তু সংসার করতে করতে দেখে বিপরীত ফল ফলেছে; 
ছুঃখই প্রাপ্তি হয়েছে আর সুখের নিবৃত্তি হয়েছে। কারণ এ 
জগতের বিত্ত সম্পদ হল নিত্য আতিদ, ছুর্লভ এবং আত্মমৃত্যুর 
কারণ, কাজেই গৃহ, অপত্য, পশ্ু-যা যা সাধনে পাওয়া যায়, 


নবযোগীক্দ্রসংবাদ ১৬৭ 


সবই অস্থির । তাদের দ্বারা কখনও সুখ হতে পারে না । এমন 
অর্থ রাখতে হবে যাতে কোনও রকমে দিন চলে যায়, যাতে 
অনয়াসে গোবিন্দ ভজতে পারি। সেই জন্য অর্থের যেটুকু 
দরকার সেইটুকু রাখতে হবে, অর্থ সুখের কারণ নয়। যাঁকিছু 
সাধন করে পাওয়া যায়-_কর্মের দ্বারা যা পাওয়া যায় তা বিনাশ । 
যা উৎপাগ্ঠ তারই বিনাশ আছে। কুস্তকার ঘট তৈরী করেছে 
সে ঘট একদিন না একদিন ভাঙবেই, তেমনি জীব কর্মফলে যে 
অর্থ বিত্ত তৈরী করেছে তাঁর বিনাশ একদিন না একদিন হবেই। 
এ জগতে যাতে যাতে প্রিয় সম্বন্ধ তাতেই শোকের শেল--পরে 
তাঁর জন্য কাদতে হবে; তার চেয়ে প্রাকৃত জগতে প্রিয় সম্বন্ধ 
না করাই ভাল । 

ভক্তি আম্বাদক-_ভগবান আম্বান্চ। ভক্তির করুণ হলে 
ভগবানকে আম্বাদন করা যাবে । কুষ্ণপিপাসা জাগলে ভর্তি- 
জলাশয়েই যেতে হবে । বিষয়ভোগ কেউ ছাড়তে পারে না, 
যখন ছাড়ায় তখন ছাড়ে। অনুরাগ-বাঘ যখন হৃদয়বনে প্রবেশ 
করে তখনই বিষয় ছাড়ায় । এ জগতেও দেখ! যায় লোকে যখন 
প্রথম মদ খেতে শেখে তখন এদিক ওদিক তাকায়, কেউ দেখছে 
কি না দেখে, দোকানে পর্দার আড়ালে খায়, আবার বাইরে এসে 
চারিদিকে তাকার কেউ দেখছে কি না। কিন্তু যখন মাতাল হয়ে 
রাস্তায় পড়ে থাকে তখন আর কোনদিকে দৃষ্টি থাকে নাঁ। তেমনি 
যখন কৃষ্ণভক্তিমদিরা একটু একটু পান করতে আরম্ত করা যায় 
তখন সাধক চারদিকে চেয়ে দেখে কেট দেখছে কি না, লকিয়ে 
সাধন করে কিন্তু তীব্র অনুরাগে যখন মাতাল হয় তখন আর 


১৬৮ নবযোগীন্্রসংবাদ 


কোনদিকে লক্ষা থাকে না। কাঁল শেষ হলে এ জগতের সব 
বন্ত চলে যাবেঃ কাজেই তাতে অশনন্দ পাওয়ার কোন কাব 
নেই, আনন্দ যদি করতে হয় শাশ্বতকে নিয়ে আনন্দ করতে 
হবেঃ যা কোনওদিন ফুরাবে না। এ জগতের মত স্বর্গাদি 
লোকের স্থখভোগও কর্মনিমিত বলে নশ্বর! পুণাও কর্মনিষিত 
তাই নশ্বর । একমাত্র ভক্তি কর্ম নয়, একে নৈক্র্ম বলা হয়েছে- 
অতএব ভক্তির দ্বারা যা পাওয়৷ যায় তা নশ্বর নয়। শ্রীগোপাল- 
তাপনী শ্রুতি বলেছেন__ভক্তিরন্ত ভজনম্‌। তৎ ইহামুত্রোপাধি- 
নৈরাশ্যেন অমুশ্মিন (গোঁপালে ) মনঃকল্পনম__এতদেব নৈক্র্মমূ। 
চিরশাশ্বত, চিরানন্দস্বরূপ গৌরগোবিন্দকে নিয়ে মনের যা কিছু 
সঙ্কল্প বিকল্প করতে হবে-এর না ভজন । ভক্তিকর্ম_ শ্রবণ 
কীর্তন, স্মরণ, বন্দন প্রভৃতি কর্মের মত দেখতে হলেও এ কর্ম 
নয়, এ অপ্রাকৃত কর্ম। প্রাকৃত কর্ম বন্ধন ঘটায়, আর ভক্তিক্ম 
বন্ধন মুক্ত করে। 

এর পর নিমিরাজ বলেছেন-ন্ব্গম্ুখ ভঙ্গুর হয় হোক কিন্ত 
যতক্ষণ ভোগ করা যাবে ততক্ষণ তো সুখ আছে। তার উত্তরে 
যোগীন্দ্র বললেন যখন স্বর্গস্থখ ভোগ কর] হচ্ছে, তখনও নিরঙ্কুশ 
সখ নেই, তাতেও জ্বালা আছে। 

সতুল্যাতিশয়ধ্বংসং যথা মগ্ডলবততিনাম্‌। ভা. ১১৩২০ 
স্বর্গে সান সমান সুুখভোগ যারা করছে তাঁদের সঙ্গে স্পর্ধ৷ 
আছে, ভিতরে জ্বালার অন্থভব হয় আর বেশী সুখ যারা ভোগ 
করছে তাদের প্রতি অস্ুয়া' হয়_-আর একজনের পুণ্যক্ষয়ে স্বর্গ 
হতে পতন দেখে নিজেরও ভবিষ্যতের ধ্বংস- পতনের আশঙ্কা 


নবষোগীন্দ্রসংবাদ ১৬৯ 


ভীতি থাকেই, তাই ব্বর্গেওড সুখ নেই, স্বর্গম্খ শুনতে ভাল কিন্তু 
গ্রহণ করবার মত নয়। আত্মা বোবা তাই কথা কয়ে বলতে 
পারে না মেকি চায়। বোবা ছেলে যেমন কি চায় বলতে 
পাঁরে না- কিন্তু মা যদি তার মন বুঝে তার মনের মত জিনিস 
দিতে পারেন তাহলে সে যেমন আনন্দিত হয় তেমনি আত্মাও 
প্রকৃতপক্ষে চায় সং চিৎ এবং আঁনন্দ__এই ইন্দ্রিয় সমন্বিত 
মহুষ্যাদেহ মা যদি বোবা আত্মাকে বলতে পারে তুই কি নিবি? 
গৌরগোবিন্দ পাদপদ্ম নিবি? তখন আর আত্মার উল্লাসের অস্ত 
থাকে না, সে তে তাই চায়, সে এমন আনন্দ চায় যা সং অর্থাৎ 
চিরকালের স্থখ এবং যা চিৎ অর্থাৎ স্বপ্রকাশ -র্থাংযা আপনি 
আসবে, কষ্ট করে পেতে হবে না। জীবাস্বা আনন্দ চায়, যে 
আনন্দ নিত্য এবং স্বপ্রকাশ কিন্তু বোবা বলে বুঝিয়ে বলতে 
পারে না, তাই খুঁজে বেড়ায় কোথায় সেই আনন্দ আছে। এই 
চুরাশী লক্ষ জন্ম সে যাতায়াত করছে হারানো সখ খুঁজছে, 
মন্ুযুদেহে এখন খোজার দায়িত্ব এসেছে । এখন আর তাকে 
ঠকান উচিত নয়, এইবেলা মন্ুৃষ্দেহ থাকতে থাকতে, আয়ু-রবি 
অন্ত যেতে না যেতে, হারান জিনিষ খুঁজে নিতে হবে ! জীবাত্া! 
তুমি কি চাও ? কি তোমার কল্যাণ? সেই কল্যাণ খু'জে নাও। 
এ জগতের এবং ও জগতের নশ্বরতা যখন বুঝা গেল তখন সে 
মুখের চেষ্টা নিরর্থক-_কারণ তা ভঙ্গুর, ভন্কুর সুখে চেষ্টা কেন? 
সখের জন্য চেষ্টার দরকার নেই। ছুঃখ যেমন স্বয়মাগত হয়, 
নিষেধ করলেও নিবৃত্ত হয় না, তেমনি ছুঃখের মত সুখের চেষ্টা না 
করলেও সুখ কমবে না। সুখও দুঃখের মত আপনি আসবে। 


১৭০ নবযোগীন্দ্রমংবাদ 


কালনদীতে জীবের কর্মফল ভাসান হয়েছে, যে ঘাঁটে যতটুকু 
পাওনা দে ঘাটে ততটুকু স্থখ ছুঃখ দিয়ে যাবে। 

ভক্তিদ্বারা ভগবানের পাদপদ্ম আরাধনা করলে তবে 
মায়ার হাত হতে নিষ্কৃতি, এখন ভক্তি পাওয়ার উপায় হল 
ছটি__কৃষ্ণকপয়া তণ্তক্তকৃপয়! বা । তার মধ্যে সাক্ষাৎ কৃষ্ণকপায় 
ভক্তি লাভ-_এটি প্রায়ই হয় না, কিন্তু ভক্তকৃপায় কুষ্ণভক্তি 
লাভের বহু দৃষ্টান্ত আছে। এই ভক্তকৃপাঁও বিচারে কৃষ্ণকৃপাই 
বলতে হবে । কারণ বল! আছে £ 

কৃষ্ণ যদি কৃপা করেন কোন ভাগ্যবানে । 
গুরু অন্তরধ্যামিরপে শিখান আপনে ॥ 

শ্রীগুরুরূপে কৃষ্ণকৃপা তত্বের অবধি । শ্রীপগুরুপদাশ্রয়ই ভক্তি 
লাভের একমাত্র উপায়। তার শ্রীচরণ আশ্রয় করলে সকল 
জাল।য নিবৃত্তি, তাই প্রবুদ্ধ যোগীন্দ্র বললেন £ 

_ তম্মাদ্‌ গুরু প্রপন্েত জিজ্ঞাস্থঃ শ্রেয় উত্তমম্‌। 

শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্ষণ্যুপশমাশ্রয়ম্‌ ॥ 
ভা. ১১৩২১ 

ভক্তিকেই মায়াতরণী বলা হয়েছে। মানুষ যেমন স্ত্রী, পুত্র 
গৃহ সম্পদে আসক্ত হয়ে থাকে জীবাতা তেমনি এই দেহে 
পঞ্চকোশে আবদ্ধ হয়ে আছে। তাই জীবাম্রাকে মায়ামুক্ত 
করতে হলে পঞ্চকোশকে আগে সরাতে হবে। একেবারে 
সরালে হবে না--বুঝিয়ে বুঝিয়ে সরাতে হবে । কপিল ভগবান 
বলেছেন £ 

জরঘত্যাশড যা কোশং নিগীর্ণমনলো যথা ॥ ভা. ৩।২৫।৩৩ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৭১ 


তবজ্ঞানের পর এই পঞ্চকোশ- অন্নময়। মনোময়, প্রাণময়,, 
বিজ্ঞানময় এবং আনন্দময় ; এদের জীর্ণ করতে ব্যথা ল।গবে না। 
এই সাধনের নামই ভক্তি । অন্যত্র বীজনির্ঠরণকে যোগ বলা 
হয়েছে, কিন্তু দেবধষিপাদ নারদ ভাগবতধর্মকেই উত্তম উপায়, 
বলেছেন £ 

তত্রোপায়সহকআ্রাণাময়ং ভগবতোদিতঃ | 

যদীশ্বরে ভগবতি যথা বৈরঞ্জস রতি: ॥ 

- ভা. ৭৭1২৯ 
প্রাকৃত বস্ত সরিয়ে নিলে আত্মা ব্যথা পাবে না, এমন করে 
বুঝিয়ে বুঝিয়ে সরাতে হবে । যেমন ভাঙ্গা বোতলকুঁচি সরিয়ে 
তার জায়গায় যদি কাউকে টাকা দেওয়া যায় তাহলে যেমন 
কারে! প্রাণে ব্যথা লাগে না তেমনি পঞ্চকোশ জীর্ণ করিয়ে 
যদি সেই শুন্য জায়গায় শ্রীগৌরগোবিন্দ পাদপন্ম দিয়ে পূর্ণ 
করিয়ে দেওয়া যায় তাহলে আর পূর্বের বস্তু হারানোর ব্যথা 
অনুভব কর! যায় না; আর তত্ব না জানলেও তো মায়ার হাত 
হতে নিষ্কৃতির অন্য কোন উপায় নেই। শ্রুতি বললেন £ 

তমেব বিদিত্বাইতিমৃত্যুমেতি নান্তঃ পন্থা খিছ্য:তহয়নায় । 

_ শ্বেতা. উপনিষং 
এই তত্ব জানার নামও ভক্তি। জানা হল শুধু জানা আর 
ভক্তি হল বিশেষ জানা । “কৌরব শব্দবিশেষে পাণুব 
শব্দবং বোধ্যঃ। পাগুবদেরও কৌরব বলতে পারা যায় কিন্ত 
তাদের কৌরব না বলে যেমন বিশেষভাবে পাগুবই বলা হয়, 
তেমনি ভক্তিকেও জ্ঞান বল! যায় কিন্তু শুধু জ্ঞান না বলে বিশেষ 


১৭২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


জ্কান বুঝাবার জন্য ভক্তি বলা হয়। জ্ঞান হল পতিত্যক্তা 
পত্ীর মত আর ভক্তি হল অশেষ গুণান্বিত যুবতীরতুবত। 
জান! হল শুধু তত্বজ্জান আর ভক্তি হল সাক্ষাৎ পাদপন্পসেব! 
লাভ। ভক্তি সংসারতারণী এবং গোবিন্দ-প্রাপণী। ভক্তি 
পেলে সব পাওয়া যায়। অভিরাম গোপালের একমাত্র পুত্রকে 
হরণ করে গোপাল তার পুত্র হয়ে বসলেন__অন্তরে ব্যথা 
লাগতে দিলেন না। গোবিন্দ ছুঃখ দূর করে প্রকৃত সুখ দান 
করেন । কৃষ্তকৃপার চেহারা তাই__ 
কৃষ্ণকুপার হয় এক স্বাভাবিক ধর্ম । 
রাজ্য ছাঁড়ি করায় তারে ভিক্ষুকের কর্ম ॥ 

এক রাজাকে এক সাধু মন্তরদীক্ষা দান করে গোপাল বিগ্রহের 
সেবা! দিলেন । গুরুবাক্য লঙ্ঘন না করে রাজা সেবা করতে 
'লাগলেন-ক্রমে ক্রমে রাঁজার একমাত্র পুত্র, রাণী, রাজ্য এমন 
কি নিজের স্বাস্থা পর্বন্ত গেল-_কিন্তু তবু গোপালসেবা ছাড়েন 
না। গুরুবাকা পালন করতে করতে তার চিত্তে দৃঢ়তা এসেছে । 
কৃষ্চভজন বড় কঠিন। রাজার এঁহিক সর্বনাশ যতই হচ্ছে তত 
কিন্ত তিনি আনন্দিত কারণ গুরুবাক্য পালনের আনন্দে তার 
হৃদয় ভরপুর হয়ে আছে। পরে রাজা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন 
এবং শ্রীগুরুদেবের অপ্রকট কালেও সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করে 
শ্বীগুরদেব এবং গোপালের সঙ্গে শ্রীবন্দাবনধামে চলে গেলেন 
সম্পন যে ছুঃখদায়ক এটি বুঝিয়ে বুঝিয়ে ভগবান সম্পন্‌ হরণ 
করেন। জীবকে সম্পদ দান এবং হরণ ছুই ভগবানের কৃপা 
বলে বুধতে হবে। বলিরাজের সম্পদ্‌ প্রয়োজনে হরণ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৭৩ 


করেছিলেন আবার প্রয়োজনে রব, প্রহ্লাদ, মহারাজ অশ্বরীঘকে 
রাজ্য দিয়েছিলেন । শ্রীজীবপাদ বলেছেন সাধন দশাতেও ভক্তি 
সুখ দান করেন, শ্রবণ কীর্তনাদি যখন ভক্তি অঙ্গ যাজন করা 
যায় তখনও তাতে স্ুখ--ভক্তিই আমাদের মুখ্য প্রয়োজন, 
আপাততঃ প্রয়োজন হল সংসার উত্তীর্ণ হওয়া । মায়া-কবলিত 
জীবের মুক্তি প্রার্থনা! কতদিন? যতদিন তভৃক্তিস্থখ না আসে। 
মহাজন বলেন-- 

দেহম্মতি নাই ধার সংসার কূপ কীহা তার। 
অর্থাং এই মায়ার জগতে বাস করলে দোষ নেই-_-আসক্তি যদি 
না থাকে তাহলে কোন বন্ধন হবে না। আসক্তির ওপরে কথা 
বল! হয়েছে-ভক্তি মন্থে গা বাধা থাকলে মহামায়ার রাজ্যে 
ভয় হয় না, যেমন সাপের মন্ত্রে গা বাঁধা থাকলে বনের মাঝেও 
সাপের ভয় থাকে না । জগতের বস্ত ত্যাগ এটি খুব বড় কথ! 
নয়, বস্তু যে ত্যাজ্য এইটি বুঝে নেওয়াই হল কাঁজ। শ্রীএকা দশে 
ভগবান উদ্ধবজীকে বলেছেন £ 

বাধ্যমানোইপি মন্তক্তঃ বিষয়ৈরজিতেক্ডিয়ঃ | 

প্রায়ঃ প্রগল্ভয়া ভক্ত্যা বিষয়েনাভিভূয়তে ॥ 

__ভা. ১১।১৪।১৮ 

ভক্ত বিষয় ভোগ করছে কিন্তু বিষয়ভোগ তাকে পরাভূত 
করতে পারছে না। কৃষ্ণপাদপদ্ম ভজনশীল ব্যক্তি মায়ামুক্ত। 
ভগবদ্ধাম কখনও মায়া-কবলিত নয়। ভক্তি ছাড়া অন্য ষে 
কোন সাধন শুধু মুক্তি পর্ধস্ত দেয়, কিন্ত ভক্তি গোবিন্দকে 
পাইয়ে দিতে পারেন -_এবং গোবিন্দকে পেতে গেলে মাঝপথে 


১৭৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মুক্তির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবেই-যেমন নগরীতে যেতে হলে 
মাঝপথে গ্রাম দেখা হয়েই যায়। গোবিন্দের কাছে যাবার 
পথে মুক্তি দাড়িয়ে আছে । ভক্ত ভজন করছে-_তার অর্থ হল 
ভক্তি তাকে গোবিন্দ পাদপদ্মে নিয়ে যাচ্ছে । ভক্ত কিন্তু নিজে 
এটি বুঝতে পারে না। কারণ বুঝতে পারলে তার আর ভজন 
এগুবে না। যেমন ভিক্ষুকের ঘরে যদি হাড়িতে চাল ভর! থাকে 
তাহলে মে আর ভিক্ষায় বেরুবে না। ভক্তও তেমনি নিজের 
ভক্তি সম্বন্ধে সচেতন হলে আর ভিক্ষুকের মত গোবিন্দ বলে 
কাদবে না। তাই ভক্তের স্বভাবে যত ভক্তিরস আস্বাদন তত 
দীনতা। যেমন কুপের যত বেশী গর্ত হয় তত বেশী জল জমে। 
তেমনি দীনতা-গর্ত যত গভীর হবে ততই ভক্তি-বারি বেশী 
জমবে। ভক্তের যে ভক্তি গভীরতা লাভ করেছে এটি বুঝা যাবে 
কি করে? প্রাকৃত বস্তুতে রুচি কমে যাবে । এইটিই ভক্তি 
বৃদ্ধির লক্ষণ। মেয়ে যখন বাপের বাড়ীতে থাকে তখন প্রায় 
নিরাভরণা রুক্ষ অবস্থায় থাকে, দেখে মনে হয় মা বাপ বুৰি 
তাকে আদর করে না, কিন্ত বাপ মায়ের যে কত আদর ত৷ বুঝা 
যায় যখন তাকে বাক্স ভরে সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ী পাঠায়; তেমনি 
ভক্ত যখন এ জগতে আর পীচজনের মধ্যে থাকে, তখন তাকে 
দেখে বুঝা যায় না, সে কাঁঙালের মত থাকে কিন্তু ভক্ত যখন 
পতির কাছে শ্রীগৌরগোবিন্দ পাদপদ্মে যাবে তখন ভক্তি-মা 
তাকে এমন বেশতৃষায় সাত্বিক বিকার অলঙ্কারে অন্ুরাগবসনে 
সাজিয়ে দেবেন যে তাকে দেখে গৌরগোবিন্দ মুগ্ধ হবেন। এই 
ভক্তিলাভের একমাত্র স্থান হল শ্রীগুরুপাদপদ্ন । 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৭৫ 


শ্রীগুরূপাদপদ্মে সাধকের জিজ্ঞাসা হবে-এ জীবনে উত্তম 
কল্যাণ কাকে বলে? চতুঃশ্লোকী ভাগবতে ব্রহ্মাকে ভগবান 
বলেছেন £ 
এতাবদেব জিজ্ঞাস্তং তত্বজিন্ঞাস্থনা ত্বনঃ | 
অন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং যং স্তাং সর্বত্র সর্বদা ॥ 

_-ভা. ২।৯।৩৫ 
ভগবান বলছেন; আমার তত্ব জিজ্ঞাস যারা তারা এইটিই 
জিজ্ঞাস! করবে অন্বয় বতিরেক দ্বারা সর্বত্র এবং সর্বদা কোন 
বস্তটি থাকে? ভগবান যেটি জিজ্ঞাস। করতে হবে এই কথা 
মাত্র বললেন, লক্ষণ মাত্র বললেন__বস্তটি কি তার নাম করে 
বললেন না। যোগীন্দ্র এখানে সেই শ্রেয়টিকে লক্ষা করেছেন। 
এখানে শ্রেয় বস্তুটি কি এই নিয়ে বাদী-প্রতিবাদীর বিবাদ 
লেগেছে । জ্ঞানী বলছেন জ্ঞান, যোগী বলছেন যোগ, আর 
ভক্ত বলছেন ভক্তি । 

শ্রীজীবপাদ বললেন, বিবাদের প্রয়োজন নেই-_-বিচার 
রর। যদি শ্রেয় পদের দ্বারা জ্ঞান ধর! যায় তাহলে জ্ঞান 
সবদা অভ্যাস করবে, এ কথা কোথাও বল! হয় নি। অস্বয়- 
মুখে জ্ঞান পাওয়া গেল না, ব্যতিরেকমুখেও জ্ঞনি পাওয়া 
যায়না; কারণ জ্ঞান না অভ্যাস করলে প্রত্যবায় হয়, তাও 
কোথাও বলা হয় নি। জ্ঞানচর্চা সদ! সর্বত্র হয়-_মাতৃগর্ড 
থেকে আরম্ভ করে মুক্তিধামে স্থিতি পর্যন্ত কেউ জ্ঞানচর্চা 
করেছে এমনটি শোনা যাঁয় নি। বরং মুক্তিতে জ্ঞান ত্যাগ 
কররে এইটিই বলা হয়েছে। 


১৭৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


এবং গুরূপাসনয়ৈকভক্ত্যা বিছ্যাকুঠারেণ শিতেন ধীরঃ। 
বিবৃশ্চ জীবাশয়মত্রমত্তঃ সম্পদ্য চাত্মানমথ ত্যজান্তম্‌ ॥ 
ভা. ১১।১২।২৪ 
জ্ঞানচ্চা সর্বত্র সর্বদা হতে পারে না_ অধিকারী নিবাচন আছে । 
তাহলে য৷ জিজ্ঞাস তার লক্ষণ ভগবান যা করলেন তাঁর সঙ্গে 
জ্ঞান বা যোগ মিলল না কারণ যোগাভ্যাস এও সবত্র সবদা 
এবং সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। এখন দেখা যাক ভক্তি এই 
লক্ষণে মেলে কিনা' অন্বয়মুখে ভক্তিকে পাওয়া যায় £ 
“্মর্তব্যঃ সততং বিষু 
বিুকেই সদা স্মরণ করা উচিত-_স্মরণ ভক্তিরই এক অঙ্গ । 
ব্যতিরেকমুখেও ভক্তিকে পাওয়া যায় । 
“বিন্মর্তব্যো ন জাতুচিৎ, 

বিষ্ুকে কখনও বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। আর তাছাড়। 
এই ভক্তি যাজনে সকলে অধিকারী । ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল 
পর্যন্ত, ধনী হতে দরিদ্র, রাজা হতে প্রজা, পণ্ডিত থেকে মূর্খ 
সকলেই ভক্তি যাজন করতে পারে । এখানে কুলের গরব নেই, 
বৃমাত্রস্য অধিকারিতা বলা হয়েছে । ভক্তি যাজন সবত্র অর্থাৎ 
দেশকাল নিয়ম নেই--সর্সিদ্ধি হয়। যেখানে বসেই কৃষ্ণ 
বলা যাক না কেন দেশে বিদেশে, ঘরে বাইরে সেখানেই কাজ 
হবে। ভক্তি যাজন সবদা হতে পারে, মাতৃগর্ভ থেকে আরম্ভ 
করে মুক্তি পর্বস্ত। মাতৃগর্ভে প্রহনাদ, বাল্যে পরব প্রহ্নাদ, 
যৌবনে মহারাজ অন্বরীষ, বার্ধক্যে যযাতি মহারাজ, মুমৃষু 
অবস্থায় অজামিল ভক্তিযাজন কবেছেন। মুমূর্ধয অজামিলের 


নবযোগীক্্রসংবাদ ১৭৭ 


এ কলা ণের কথা শুনে আজও কত লোকের কল্যাণ হচ্ছে তার 
ট্য়ন্তাী নেই। মুক্ত পুরুষের ভক্তিযাজনে প্রয়োজন নেই কিন্তু 
শ্রীহরির স্বরূপের এমনই মাধুধ যে মুক্ত পুরুষকেও তার গুণে 
আকুষ্ট করে পাদপন্ম ভজন করিয়ে নেন। এরই নাম অহৈতুকী 
ভক্তি। মুক্ত পুরুষ মুক্তির আম্বাদ লাভের জঙ্য, মুমৃক্ষু ভবব্যাধি 
মোচনের জন্য আর বদ্ধজীব কানে ও মনে ভাল লাগে বলে 
হরিকথা! শোনে বা হরিপাদপদ্ ভজে। এইভাবে দেখা যায় 
তক্তিযাজনই একমাত্র সদা এবং সবত্র করতে পারা যায়। যে 
ভক্তি বস্তুটিকে ভগবান চতুশ্লোকীতে শুধু লক্ষণের দ্বারা বুঝালেন, 
সেই ভক্তিই শ্রীযোগীক্দ্র উত্তম শ্রেয় পদের দ্বারা স্পষ্ট করে 
বললেন। শ্রীগুরুপাদপদ্মে এই ভক্তিই একমাত্র জিজ্ঞাস্য | 
এই ভক্তি সম্পদই হল একমাত্র উত্তম শ্রেয় । আর অস্বয়- 
বাতিরেকাভাম্‌ শব্দের অর্থ করা হয়েছে ভক্তির অন্বয়ে অর্থাৎ 
যোগে যোগ বা ন্ভান ফল দান করে। দেবধ্ষিপাদ নারদ 
বলেছেন- বন্গজ্ঞান যদি অদ্্যুতভাববজিত হয় অর্থাৎ ভক্তি- 
বজিত হয় তাহলে তার শোভা হয় না। আবার বাকৃপতি 
ব্রহ্মার বাক্যেও পাঁওয়৷ যায় ভক্তি ছাড়া যোগ ফল দান 
করে না। 


পুরেহ ভূমন্‌ বহবোইপি যোগিনস্বদপিতেহা নিজকর্মলবয়া । 
বিবুধ্য ভক্ত্যৈব কথোপনীতয়! প্রপেদিরেইঞ্জোইচ্যুত তে 
গতিং পরাম্‌॥ ভা. ১০।১৪।৫ 


আর ব্যতিরেকমুখে দেখান যেতে পারে জ্ঞান ও যোগকে বাদ 
১২ 


১৭৮ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


দিয়ে শুধু ভক্তি ফল দান করে; তাই বিচারে দেখা গেল 
শ্রীগুরপাদপদ্মে ভক্তিই একমাত্র জিজ্ঞাস্য । ভক্তি পেলে তবে 
গোবিন্দ মাধুর্য আস্বাদন হয়। যেমন ক্ষুধা থাকলে তবে অন্নের 
আন্বাদন হয় । ক্ষুধা না থাকলে অন্ন ঘরে থাকলেও তার সঙ্গে 
সম্পকক হয় না। তেমনি গোবিন্দ সামনে উপস্থিত হলেও ভক্তি 
মহারণীর কৃপা না হলে গোবিন্দমাধূধ আস্বাদন হয় না । তাই 
গোবিন্দ প্রাপ্তি প্রয়োজন নয়। প্রয়োজন হল ভক্তি প্রাপ্তি। 
অন্ন আম্বাদনের জন্য যেমন ক্ষুধা রোজগার করতে হয়, গোবিন্দ- 
মাধুষ আন্বাদন করতে তেমনি ভক্তি রোজগার করতে হবে। 
ভক্তিই ভগবানের আনন্দ এনে দেয় । মহাভাবের গুণের ব্যগ্ঠি- 
রূপ হল ভক্তি । 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে গুরুপাদপদ্মের কাছে ভক্তি জিজ্ঞাসা 
করতে হবে সে গুরুত্বরূপ কেমন হবেন? যার শান্ত্রজ্ঞান আছে 
এবং ভগবং-তত্বের উপলব্ধি আছে এমন ব্যক্তি গুরু হবেন। 
কথায়-বাতায় আলাপ-আলোচনায় সাধক না হয় বুঝতে পাঁরে 
তার শাস্ত্রজ্ঞান আছে কিন্তু তত্ববোধ আছে কি না সাধক কেমন 
করে জানবে? এটি তো ভিতরের কথা । যোগীক্্র বললেন-_ 
তিনি উপশমাশ্রয় হবেন-__অর্থাৎ কামক্রোধলোভের বশীভূত 
হবেন না। সচ্চিদানন্দ ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধ ধীর হয়েছে তিনি 
কাম ক্রোধ লোভাদির দ্বারা বশীভূত হন না। এমন ব্যক্তিকেই 
গুরুপদে বরণ করতে হবে ৷ গুরুর যদি শাস্ত্রজ্ঞান না থাকে 
তাহলে শিত্তের সংশয় শাস্ত্রযুক্তিতে ছেদন করতে পারবেন না 
তাতে শিষ্যের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধার হ্রাস হবে। আর গুরুর যদি 


নবযোগীন্দসংবাদ ১৭৯ 


ভগবংতত্বের উপলব্ধি না থাকে তাহলে তার কৃপা কলবতী হবে 
না। ভগবানের কুপা গুরুপাদপ্ম-দ্বারে জীবের কাছে আসে। 
এ জগতে সকলেই গুরু । প্রথমে জীবের গুরু মাতা পিতা । 
জাগতিক শিক্ষা দিচ্ছেন, ক্রমশঃ জীবকে উন্নত করা হচ্ছে, তার 
সংস্কার তৈরী হচ্ছে_-এরও পরে শিক্ষকেব কাছে শাস্ত্রীয় সংস্কার 
তৈরী হচ্ছে, তারপর শ্রীগুরুপাঁদপদ্ন সম্পর্কে এলে সাক্ষাৎ ভগবং 
সম্বন্ধ হল। জগতের সঙ্গে কেমন করে চলতে হবে তা শেখান 
মাতাঁপিতা, শাস্ত্রের সঙ্গে কেমন করে চলতে হবে তা শেখান 
শিক্ষক আর ভগবানের সঙ্গে কেমন করে চলতে হবে তা শেখান 
প্রীপ্তরুদেব। শাস্ত্রে যে গুরুর লক্ষণ দেওয়। হল তা হয় ত অনেক 
সময় বুঝা যায় না, কিন্তু শিষ্য ঘখন অনেক প্রশ্নের সমস্তা নিয়ে 
ধার চরণে সমাগত হয়ে বিনা প্রশ্নেই তার কথাবার্তার মধ্যে 
প্রশ্নের মীমাংসা পেয়ে যান, সমস্যার সমাধান হয়ে যায়ঃ তাকে 
অনায়াসে গুরুপদে বরণ কর! যায়। আবার ত্রিতাপানলে 
অহনিশ হৃদয় জলে যাচ্ছে-যার কাছে গেলে সেই জ্বালার 
নিবৃত্তি হয়ে পরম চরম শান্তিতে হৃদয় ভরে ওঠে, তার শ্রীচরণে 
অকাতরে অনায়াসে বিকিয়ে যেতে পারা যায়, তিনিই 
শ্রীপুরুত্বরূপ । তার চরণে আত্মসমর্পণ করতে হবে। 

প্রীগুরপাদপন্মের কাছে ভক্তিধর্ম শিক্ষা করতে হবে এবং 
গুরুম্বরূপকে ভগবানের সঙ্গে অভিন্ন বুদ্ধি ও প্রিয়তম বুদ্ধি 
করতে হবে__এই গুরুত্বরূপের অকপটে সেবা করতে পারলে 
স্বয়ং ভগবানও এত সন্তুষ্ট হন যে তিনি ঠিজেকে পর্যস্ত সেই 
গুরুসেবাকারী ব্যক্তির কাছে বিকিয়ে দেন। 


১৮০ নবযোগীল্দ্রসংবাদ 


প্রথমতঃ সকল বিষয় থেকে মনটিকে সরিয়ে এনে সাধুসঙ্গ 
করতে হবে এবং ক্রমে ক্রমে দীনহীন লোকের প্রতি দয়া, সমন 
লোকের সঙ্গে মিত্রতা এবং নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যার! তাদের প্রতি 
সন্মান করতে হবে । এর সঙ্গে দেহের এবং মনের শুচিতা রক্ষা 
করা প্রয়োজন । মৃত্তিকা ছারা মার্জন এবং জল দ্বারা ধৌত 
করে দেহের শুচিতা রক্ষা আর দস্ত অভিমান, অহঙ্কার পরিত্যাগ 
করে অন্তরের শুচিতা রক্ষা করতে হবে । এর পরে স্বধমীচরণ, 
ক্ষমা, মৌন অর্থাৎ প্রাকৃত কথ! ত্যাগ, অধিকার অন্্যায়ী 
নিয়মিত বেদাধ্যয়ন, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা এবং শীত উ্ণ 
প্রভৃতি সহ্য করা শিক্ষা করতে হবে | 

এর পরে ভাগবতধর্ম প্রসঙ্গে আরও কিছু শিক্ষণীয় আছে। 
সবত্র সচ্চদানন্দস্বরূপ আত্মদর্শন--তাঁকে নিয়স্তারূপে ভাবনা, 
নির্জন প্রদেশে বাস, গৃহে সম্পদে স্ত্রী পুত্র পরিজনে অনীসক্তি, 
বন্ধলাদি ধারণ- অর্থাৎ অতি সাধারণ পরিধেয় বসন গ্রহণ এবং 
যথালাভে সর্বদা! সন্তুষ্ট থাকতে হবে । | 

ভগবত প্রতিপাঁদক শান্ত্ে সুদৃঢ় বিশ্বাস (শ্রদ্ধা ) এবং অন্য 
শাস্ত্রে অনিন্ুক হতে হবে । কায়মনোবাঁক্যে দণ্ড গ্রহণ করতে 
হবে, প্রাণায়ীমের দ্বারা মনের দণ্ড, মৌনভাবের দ্বারা বাক্যের 
দণ্ড এবং কর্মত্যাগের দ্বার শরীরের দণ্ড গ্রহণ করতে হবে, সত্য 
কথা বলতে হবে, সত্য আচরণ করতে হবে এবং শম অর্থাৎ 
অন্তরিক্দ্িয় মনকে সংযত করতে হবে । আর দম অর্থাৎ বাইরের 
কর্মেন্্িয__বাক্‌, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ ও জ্ঞানেক্দরিয় চক্ষু,কর্ণ, 
নাসিক, জিহবা, ত্বক-_-এদের সংযত করতে শিক্ষা করতে হৰে। 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৮১ 


স্বং ভগবান হরির নাম রূপ গুণ লীলা শ্রবণ, কীতন এবং 
ধান করতে হবে এবং যাঁকিছু কাজ কর! যাবে সব যেন হরি 
সম্পকিত হয়। ইষ্ট, দান, তপস্তা, জপ, সদাচার, নিজের যা 
কিছু প্রিয়বস্ত স্ত্রী, পুত্র, গৃহ, প্রাণ সবই পরমেশ্বর শ্রীগোবিন্দে 
নিবেদন করতে হবে । ইষ্ট শব্দে বিষণ সন্প্রদ্ধানক যাগ, দণ্ড শব্দে 
বিফ্ুবৈষ্ণব সম্প্রদানক দান, তপস্তা শব্দে একাদশী প্রভৃতি ব্রত, 
জপ শব্দে বিষ্ুমন্ত্র জপ এবং নিজের প্রিয়বপ্ত যা কিছু আছে 
সকলকে ভগবংসেবায় নিযুক্ত করতে হবে| 

এইভাবে কৃষ্চভক্ত সঙ্গ করে তাদের সঙ্গে মৈত্রী করতে হবে 
এবং স্থাবরে জঙ্গমে পরিচর্যা, বিশেষতঃ মানুষে, তার মধো 
স্বধর্মীচরণকা রী ব্যক্তিতে, তাব মধো আবার সাধু ব্যক্তিতে সেব। 
করতে হবে । ভক্তমঙ্গ লাভ এ জীবনের পরম সম্পদ, ভক্ত 
সঙ্গে ভগবৎ-কথ। প্রসঙ্গ, পরস্পর গীতি, এটি এ জগতের ছুঃখে 
নিবৃত্তির পরম উপায় । 

এইভাবে সাধন ভক্তি করতে করতে একদিন সাধক 
সাধ্যভক্তি অর্থাৎ প্রেমলন্দণা ভর্তির সন্ধান পাবে। শ্রীল 
নরোতম ঠাকুর মশাই বলেছেন ? 

অপকে সাধন গতি পাকিলে সে প্রেমভক্কি 

ভকতি লক্ষণ তত্ব সার । 

সাধন ভক্তি ভক্তির অপর দশ! এবং ভক্তির পরু দশাব নাম 
প্রেমভক্তি । এ পন বা অপরু অবস্থাটি ভক্তির গায়ে লাগে না, 
এটি সাধকের কাচা, পাকা অবস্থা বিচার করে বলা হয়েছে । 
সাধক যখন প্রথম সাধন করতে আরম্ভ করেছে, ইন্দ্রিয়কে যখন 


১৮২ নবযো গীন্দ্রমংবাদ 


জোর করে ভক্তি-যাজনে লাগিয়েছে তখনকার অবস্থা হল অপকক 
আর সেই ইব্দ্রিযই যখন লোভে পড়ে রুচি করে ভজন করে 
তখন হল পরু অবস্থা । যেমন গায়ক যখন প্রথম গান চ61 করে 
তখনকার তার কণ্ঠে যে রাগিণীর অবস্থা তার নাম অপকু অবস্থা, 
আর সেই গায়ক যখন ওস্তাদ হয় তখন তার কণ্ঠের রাগিণীর 
পক অবস্থা । যখন সাধক (প্রেমলক্ষণ! ভক্তির অধিকারী হবে, 
অর্থাৎ প্রেমিক ভক্ত হবে তখন তার প্রেমের আম্বাদনে হৃদয় 
ভরপুর হয়ে থাকবে । ফলে বাইরেও তার কিছু বিকার প্রকাশ 
পাবে। অঙ্গে পুলক, নয়নে অবিরত “হা কৃষ্ণ বলে আতিতে 
অশ্রু বিসর্জন, কখনও ব৷ ইষ্ট দর্শনে সেই পরমানন্দ অনুভূতিতে 
হাস্য, কখনও আহ্লাদিত হয়ে গদগদভাষ, অস্ফুট বাক্য উচ্চারণ, 
কখনও আনন্দে নৃতা, গীত, কুষ্ণকথা-প্রসঙ্গ আবার কখনও বা 
স্তব্ধত1--এই বিবিধ সাত্বিক বিকার দেখা যায় । 

এইভাবে শ্রীগুরপাদপন্মে ভক্তিধর্ম শিক্ষা করে এবং 
প্রেমভক্তি লাভ করে শ্রীমন্নারায়ণের আরাধনা করতে পারলে 
শ্রীগোবিন্দে একাস্ত শরণাগতির ফলে ভগবানের ছুস্তরা মায়ার 
হাত হতে অনায়াসে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় । গীতায় ভগবান 


এই উপায়টি অজুনদেবের কাছে বলেছেন 2 
দৈবীহোষা গুণময়ী মম মায়া ছুরতায়া । 


মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরস্তি তে॥ গীত৷ ৭১৪ 
শ্রীভগবানে প্রকৃষ্ট শরণাগতি ছাড়। মায়াতরণের আর দ্বিতীয় 
পথ নেই । এই শরণাগতির খাঁটি চেহারাটি ভগবান খবভদেৰ 
জগতের কাছে ধরে দিয়েছেন ঃ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৮৩ 


“গ্রীতি ন যাঁবন্ময়ি বাস্থুদেবে ন মুচ্যতে দেহযোগেন তাবৎ_ 
শরণাগতি ঘন হলে সেইটিই ভগবানে ভালবাসায় পরিণত হবে । 
ভগবানে 'ীতি, শ্রীগোবিন্দ প্রেম-_এইটিই জগতের আচগালে 
বিনামূল্যে বিতরণ করবার জন্য রসরাজ প্রীগ্োবিন্দ ব্রজের নিকুঞ্জ 
ত্যাগ করে নদীয়ার মাটিতে প্রেমাবতার শ্রীগৌরাঙ্গস্বরূপে 
আবিভূত হয়েছেন । 


পঞ্চম প্রমথ 

মহারাজ নিমি যোগীন্দ্রের শ্রীমুখে যখন শুনলেন নারায়ণ-পর 
হলে অনায়াসে মায়া জয় করা যায় তখন সেই নারায়ণের স্বরূপ 
জানবার জন্য উৎসুক হলেন । খষিদের কাছে আকুল আগ্রহে 
প্রশ্ন তুললেন £ 

নারায়ণাভিধানস্তয ব্রন্মাণ; পরমাক্মনঃ। 

নিষ্টামর্তথ নো বক্তুং যুয়ং হি ব্রন্ষবিত্তমাঃ॥ ভা. ১১1৩।৩৫ 
হে খধিগণ, আপনারা ব্রহ্মবিদ্শ্রেষ্ঠ, তাই নারায়ণ বলে ধাকে 
উল্লেখ করলেন তার পরমায্মা পরক্রন্মের স্বরূপটি কেমন সেটি 
কৃপা করে উপদেশ করুন । ব্রন্মকে ধারা জেনেছেন তারাই ব্রহ্ম 
সম্বন্ধে বলতে পারবেন । এই ভরসা নিয়েই মহারাজ প্রশ্ন 
করেছেন । এ প্রশ্সের উত্তর দিয়েছেন পঞ্চম যোগীন্দ্র শ্রীপিপ্ন- 
লায়ন। শ্রীদীপিকাঁদীপনকার বলেছেন--“পিপ্লল' শব্দের অর্থ 
হল ভগবৎবিভূতি, সেই বিভূতিকে যিনি আশ্রয় করেছেন তারই 
সে স্বরূপবর্ণনে সামর্থ্য আছে । “পিগ্ললং ভগবদ্িভূতিরয়নমাশ্রয়ে। 
যস্ত স তথেতি তত্তত্বর্ণনে তন্তৈবৌচিত্যাৎ স এবৌবাচ ইত্যুক্তম্‌ ।' 

পঞ্চম যোগীন্দ্র শ্রীপিপ্ললায়ন বললেন--মহারাজ ! একমেব 
পরং তত্বম্‌ ত্রিধা আবিভূতম্‌ ইতি অবেহি।' তত্ব বস্তু একটিই__ 
তারই তিনটি প্রকাশ, যেমন অন্তঃকরণ একটিই তার বৃত্তিভেদে 
চারটি নাম _মন, বুদ্ধি,চিন্ত, অহংকার এও তেমনি ; যেমন যেমন 
কার্ধ তেমনি তেমনি প্রকাশ । ব্রহ্ম হলেন কেবল বিশেহ্য, 


নবযো গীল্দ্রনংবাদ ১৮৫ 


পরমাত্বা অন্তর্যামিস্বপ, ইনিই মায়ার প্রেরক আর নিজের 
বিলাস-লীল! বজায় রেখে যিনি স্থিতি প্রভৃতির কারণ হন তাঁকে 
বল! হয় ভগবান । 
অদ্বয়জ্ঞানতত্ব ব্রজে ব্রজেন্দ্র নন্দন | 

অদ্বয়ঙ্ঞানই তত্ব, একই তত্বের ত্রিবিধ প্রকাশ । উপাসকের 
উপলব্ধি ভেদে একই তত্ববস্তুর বিভিন্ন নাম ও প্রকাশ হয়েছে । 
শ্রীজীবপাদ বলেছেন-_-অনভিব্যক্ত-শক্তিক হলেন ব্রঙ্গ। তত্ব 
যখন তখন সং চিৎ আনন্দ শক্তি ত তাব সঙ্গেই আছে কিন্তু যে 
অবস্থায় এই শক্তির প্রকাশ নেই--সেই অবস্থায় ইনি ব্রহ্ম । 
যেমন একজন গায়ক যখন নিদ্রিত অবস্থায় আছেন তখন তার 
গীতশক্তির. প্রকাশ নেই, গীতশক্তি তখন স্তৃপ্রভাবে আছে । 
ব্রন্মের অবস্থাও তাই--শক্তি তার স্ুপ্তভাবে আছে, প্রকাশ 
নেই। এই শক্তি যখন কিঞ্চিং অভিবাক্ত তখন তিনি হলেন 
পরমাস্মা, যেমন গায়ক যখন বন্ধুবান্ধবের মাঝে কথা-প্রসঙ্গে রত 
তখন তার শক্তির কিছু প্রকাশ থাকলেও গীতশক্তি সম্পূর্ণ 
প্রকাশিত হচ্ছে না। আর শক্তি যখন সম্পূর্ণ প্রকাশিত তখন 
তিনি হলেন ভগব।ন, যেমন গায়ক যখন আসরে শ্রোতার মাঝে 
উচ্চগ্রামে তার গীতশক্তির পরিচয় দিচ্ছেন অর্থাৎ গান গাইছেন 
তখন তার গীতশক্তি সম্পূর্ণ প্রকাশিত । যেমন কুঁড়ি, আধফুটন্ত 
এবং সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপ। আবার ভগবানেরও শক্তি 
বিকাশের তারতম্য আছে। সম্পূর্ণ শক্তি বিকাশ করেন যিনি 
তাঁরই জয়। যেমন অর্থ হয় ত অনেকেরই আছে, কিন্তু যিনি 
সবচেয়ে বেশী দান করেন তারই অর্থের জয় দেওয়া হয়। যে 


১৮৬ নবযোগীক্দমসংবাদ 


ভগবান প্রেম দান করে জীবকে নিজ পাদপদ্ো উন্মুখ করেন সেই 
ভগবানেরই জয় সবচেয়ে বেশী । ভগবান নিজে নিত্য বিলাসময় 
হয়ে আছেন । অন্যের দিকে তার দৃষ্টি নেই, আনন্দিনী শক্তির 
অভাব বলেই দানে অসমর্থ । 
রসিকশেখর কৃষ্ণ পরমকরুণ 
এই আনন্দের মাত্রা যেখানে যত বেশী তার করুণার মাত্রাও তত 
নেশী, রসিকশেখর কষে আনন্দের প্রাধান্য, তাই করুণারও 
প্রাচু্। নিজের আনন্দ থাকলে তবে পরকে করুণা করতে 
পারা যায় । নৃত্যরত অবস্থায় নতককে দেখতে পারলে যেমন 
আনন্দ হয় তেমনি বিলাসময় রসময় ভগবানকে বিলাসপরায়ণ 
অবস্থায় দেখলে তবে আনন্দ । শ্রীল কবিরাজ গেন্বামি পাদ 
বললেনঃ 
জ্ঞান যোগ ভক্তি তিন সাধনের বশে । 
ব্রহ্ম পর-আত্ম। ভগবান ত্রিবিধ প্রকাশে ॥ 

জ্ঞানসাধনে ব্রন্ষ, যোগসাধনে পরমাত্া এবং ভক্তিসাধনে 
ভগবানকে দর্শন করা যায়। উপাসনা শব্দের অর্থ হল তত্বের 
নিকট যাওয়!। শ্রীগুরুপাদপদ্মের নিকট হতে উপাসন। নিতে হবে। 
উপাসনা হল তত্ব ধরার ফাদ। পাখা ধরতে হলে ফাদে যেমন 
চার দিতে হয়, পাথী কোথায় আছে জানা নেই, চার দিয়ে ফাদ 
পেতে বসে থাকলে পাখী আপনিই আসবে, তেমনি প্রেমের চার 
দিয়ে শ্রবণ-কীতন ফাঁদ পেতে সাধক বসে থাকলে তত্ব আপনিই 
আসবে । কারণ তত্ব কোথায় আছে জান। তো নেই। নিরক্ষরের 
কাছে যেমন শাস্ত্র বন্দরে তেমনি সাধন অভাবে ভগবান আমাদের 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৮৭ 


কাছ থেকে বহুদূরে । শাস্ত্র বললেন-- ভগবান সবত্র আছেন । 
দুধের সবত্র যেমন নবনীত আছে, মন্থন করে যেমন সে নবনীত 
আহরণ করতে হয় তেমনি সবত্র ছড়ান ভগবানকে সাধন মন্থনে 
তুলতে হবে। সাধক থেকে ভগবানের দুরহ্ব পথের দৃবন্ব নয়, কিন্ত 
সাধনের দূরত্ব অনুভবের দুরত্ব । এই দুরত্ব খণ্ডন করবাঁর জদ্াই 
উপাসনা | এই উপাসনাপদ্ধতি তিন প্রকার £ জ্ঞান, যোগ, ভক্তি | 
জগতে দেখা যায় সু দুরে থাকলেও তাকে দেখ। যাঁয়__ 
শুধু জ্যোতি দেখা যায়, কিন্তু সপ্তাশ্ববাহন স্্যাকে দেখা যায় ন| | 
তেমনি জ্ঞানী কেবলমাত্র জ্যোতি দর্শন করেন । যোগী দেখেন 
তত্বকে সাকার সাবয়ব, আর ভন্ ভক্তিচক্ষতে বড়ৈশ্বধশালী 
লীলাময় শ্রীবিগ্রহ দর্শন করেন। ভক্তি ভক্তকে ভগবানের 
অস্তঃপুরে নিয়ে যান । এও অনেক কম করে বলা হল। অ!রগ 
স্ক্ম করে বলতে গেলে বলতে হয়, মস্তুপুরসহ তত্ব মহাশিয়কে 
ভক্তের ঘরে নিয়ে আসেন ভক্তি মহারাণী ৷ শ্রীজীবগোম্বামিপাদ 
সিদ্ধান্ত করেছেন ভগবানই তত, ব্রঙগ এবং পরমাত্মা তার মধ্যে 
ক্রোড়ীকৃত হয়ে আছেন । এ নিয়ে বিবাদ করে লাভ নেই, 
বিচার করলেই বুঝা যাবে। ব্রহ্ম যদি খাটি তত্ব হন তাহলে 
পরমাত্মা এবং ভগবান তার নাম হবে-ঘেমন করেই হোক 
একজন মূল অন্য ছুটি তীর প্রকাশ! 

ভক্ত যে ভগবানকে দর্শন করেন-কি রকম করে দর্শন 
করেন ? ভগবান যদি দেহী না হন তাহলে তাকে দেখা পাওয়ার 
কথ! নয়, কিন্তু কপ করে দেখ! দেন । তাহলে প্রশ্ন হতে পারে 
ভগবান কি নিরবয়ব ? তিনি নিরবয়ব নন.__সাবয়ব | তবে দেহী 


১৮৮ নবযোগীন্্রসংবাদ 


নন_-দেহীর মত । সাধারণ দেহীর যেমন আত্মা দেহ থেকে ভিন 
বলে দেহী বলা হয়। ভগবানের কিন্তু তা নয়, দেহ হতে আত্মা 
ভিন নয় দেহ ও আত্মা অভিন্ন। তাই দেহ ধরলে. আত্ম 
পাওয়ার ব্যবস্থা হয় শ্রীগুরুকপায়। আঁচার্ধ বেদব্যাস “ুদ্র 
করলেন £ 


অরূপবদেব তত প্রধানত্বাৎ। বর সূ 


অদ্বৈতবেদান্তীর গুরু আচার্য শঙ্কর ভাষ্য করলেন তিনি অরূপ, 
কারণ রূপ আমরা যা! কিছু দেখি সবই প্রাকৃত বস্তুতে । কিন্তু 
ব্রন্ষে পণ থাকতে পারে না ব্রন্মের বিগ্রহ আত্মার সঙ্গে যুক্ত 
নয়, বিগ্রহই ব্রহ্ম ব্রহ্মই বিগ্রহ । বিগ্রহ এব আত্মা_আ'ত্মা এব 
বিগ্রহ। ভগবানের অঙ্গকান্তি ব্রহ্ম, অংশ পবমাত্মা--এইটিই 
বিচারে ধ্াড়াল; ভগবান গীতায় বললেন £ 


উত্তমঃ পুরুষত্তন্যঃ পরমাত্তেত্যুদাহৃতঃ | 

যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভত্যব্যয় ঈশ্বর; ॥ গীতা ১৫।১৭ 
ব্রহ্ম পরমাত্মা সকলে উত্তম পুরুষ কিন্তু আমি এদর থেকেও 
উত্তম । তাই আমি পুরুষোত্বম, ভগবান বলেছেন__ব্রহ্গ,পরমাত্ম৷ 
এই ছুই পুরুষ হতে আমি ভিন্ন, তাই বিচারে দেখা গেল ভগবানই 
তত্ব। ইন্দ্রিয়ের মধ্যে যেমন একটি ইন্দ্রিয়ের একটি বিষয় গ্রহণের 
সামর্থ), একটি অপরের বিষয় গ্রহণ করতে পাঁরে না, কান যেমন 
ছুধের শুত্রতা গ্রহণ করতে পারে না, চোখই যেমন শুভ্রতা বুঝতে 
পারে তেমনি জ্ঞান, যোগ ভগবানকে সম্পূর্ণ করে বলতে পারে 
না__তক্তিই তাকে সম্পূর্ণ করে বলে। 


নবযোগান্দ্রসংবাদ ১৮১ 


ভগবানই সবাংশী, তিনিই পরম তত্ব, এই তৎকে যে জেনেছে 

তাঁর কোন কিছু থেকে ভয় নেই । 

নারায়ণপরাঃ সবে ন কুতশ্চন বিভ্যতি | 

স্বর্গাপবর্গনরকেদপি তুলার্৫ঘদশিনঃ ॥ ভা, ৬।১৭1১৮ 
শক্তিরসে চিত্ত ডরবানো থাকলে সেখানে প্রাকৃত সুখ বা দুখে 
কোনটিই স্পর্শ করে না। প্রাকৃত যত স্থখই থাকুক না কেন 
একটি “প্রাকৃত” নাম সব তাতে লেগে আছে । সন্ত রজঃ তম; 
গুণের পাকে সব স্থুখই তৈরী, কাজেই সব স্ুখই পরিণামে ছুঃখ । 
যেমন ঝুঁড়ি, ছড়ি, পাখা, পুতুল যাই হোক না কেন সবই চিনির 
পাঁক। এই 'অতৎ-এর গণন। হয় না। শাস্ত্র ষদি প্রাকৃত বস্থ 
করণীয় বলতেন তাহলে তো কোন কথাই ছিলনা । একে তো 
জীব 'প্রবৃত্তিমার্গে ছটে চলেছে, এর ঞপর শাস্স যদি আবার সেই 
প্রবৃত্তিমার্গেরই পথ দেখাত তাহলে ত জীব কেবল তাই গ্রহণ 
করত। তাই অতৎ কতবা-এ কথা বললে চলবে না, তৎ 
নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে--তৎ বস্তুই পরতরম, এইটিই শ্রীমন্মহা- 


প্রভুর চরম সিদ্ধান্ত । অয় জ্ঞান লাভ করতে হবে । 
মহারাজ নিমি প্রশ্ন করছেন-কেমন প্রকাশে কোন তত্ব হয় 


বলুন। যোগীন্দ্র উত্তর দিচ্ছেন__তত্মাত্রই সচ্চিদানন্দ। দ্রব্য 
থাকলেই তার শক্তি থাকবে | মাটি বস্ত হাতে পাওয়া যায়। 
সৎ শক্তিকে মনে পাওয়। যায় । বাহু এবং মন ছুইই ইন্জ্রিয় | 
জগতের সব জ্ঞানই সোপাধিক | নিরুপাধিক জ্ঞান এ জগতে 
নেই। এখানে জ্ঞান মাত্রই বিশেষণযুক্ত । এ জগতের জ্ঞান 
বা আনন্দ যাই হোক না কেন সবই সবিশেষ, নিবিশেষ জ্ঞান, 


১৯৪ নবযোগীন্্রসংবাদ 


আর আনন্দ খুঁজতে হবে। এইটিই সাধন-জগতের কাঠিন্ত। 
এ জগত সং, চিৎ, আনন্দ সবই মেশান ; খাঁটি সৎ খাঁটি চিৎ 
খাঁটি আনন্দ নেই, খাঁটি অগ্নি এখানে নেই | দেবলোকে খাঁটি 
অগ্নি আছেন, তার পত্বী স্বাহা আছেন । গোবিন্দের রাজো 
খাঁটি সং, খাটি চিৎ, খাঁটি আনন্দ__সৎ চিৎ আনন্দ তিনটি 
বিশেষগুণের যথাক্রমে তিনটি শক্তি, সন্ধিনী, সংবিৎ এবং 
হলাদিনী। গুণের শক্তি, এটি বলবার জন্য বলা হয়, তা না 
হলে সৎ ও সন্ধিনী অর্থাৎ গুণ এবং তার শক্তি অভিন্ন । চাঁদ 
এবং জোৎনা, প্রদীপ এবং তার প্রভা, অগ্নি এবং তার দাহিকা 
শক্তি যেমন বন্তৃতঃ অভিন্ন । অভিন্ন হলেও দূরে দেখা যায়। 
চক্দ্রিমা দেখে তারপর আমরা টাদ দেখি, শক্তি দেখেই গুণ বুঝা 
যাঁয়। তেমনি সং চিৎ আনন্দ নিজের কক্ষায় থেকেও আনন্দিনী 
শক্তিকে জগতের কাছে ছড়িয়ে দেয়, সাধকের কাছে এসে 
আনন্দ দেয়। এইটিই করুণা, এইটিই সাধনের সিদ্ধি। 
আনন্দিনী রাধাকৃষ্ণ সঙ্গে অভিন্ন থেকেও ভিন্নরূপে প্রতীয়- 
মানা--এটি লীলাশক্তির প্রকাশ । সং চিৎ আনন্দ ভগবানের 
স্বরূপশক্তি। স্বরূপ যা স্বরূপশক্তিও তাই, তাই শক্তিকেও 
তত্ব বল! হয়েছে । রাধারাণী কৃষ্ণের স্বূপশক্তি বলে তিনিও 
তত্ব হয়েছেন। তাই শ্রীরাধাঠাকুরাণী উপাস্তা। রাধারাণী 
অন্তরঙ্গ স্বরূপশক্তি বলেই উপাস্তা হয়েছেন, তা না হলে শুধু 
গোবিন্দই উপাস্ত হতেন। বহিরঙ্গ৷ শক্তি কখনও উপাস্য হতে 
পারেন না। 

এই পরম তত্ব জগতের স্ষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের হেতু । 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৯১ 


ইনিই জাগ্রৎ, স্বপ্ন, স্ুযুপ্তিকালে ও সমাধিতে বর্তমান, আর 
দেহ, ছন্দ্িয়, মন প্রভৃতি এরই দ্বারা চালিত হয়ে ক্রিয়াশীল 
হয়। এই তত্ববস্তকে জানার জন্য যোগীন্্র নির্দেশ দিলেন, 
বললেন-_-'তদ্বেহি পরং নরেন্দ্র। অবেহি অর্থাৎ জান। ক্রিয়া 
হলেই তার বিষয় থাকবে | কিন্তু ব্রহ্ম তো নিবিষয়, তার সঙ্গে 
তো কোন ক্রিয়ার যোগ হতে পারে না, ব্রন্মের বিষয়তাকে তো 
নিষেধ কর! হয়েছে, তাহলে “অবেহি' কখাটি কেমন করে 
লাগবে ; যোগীন্দ্র বললেন £__ 
নৈতণ্মনে বিশতি বাগুত চক্ষুরাক্মা প্রাণেন্দ্িয়াণি চ 
যথাঁনলমচিষঃ স্বাঃ। 
শব্দোইপি বোধকনিষেধতয়াত্মমূলমর্থোক্তমাহ 

যদৃতে ন নিষেধসিদ্ধিঃ॥ ভা. ১১৩৩৭ 
শব্দ দিয়ে যদি ব্রহ্মকে বুঝা যায় তাহলে ব্রহ্ম তো শব্দবিষয় 
হয়ে যায় । কারণ বস্তবোধক একমাত্র শব্ই। শ্রুতি বললেন, 
ব্রক্ম তো শব্দপ্রতিপাছ্য £ 

তং তু ওপনিষদং পুরুষং পুচ্ছামি। 

ব্রন্মের নিঃশ্বাস হল বেদাদি শান্ত্র। কার্য কারণকে প্রকাশ 
করে, এটি এ জগতে দেখা যায়; শ্রুতিও ব্রহ্মকে প্রকাশ 
করে। শব্দ বা শ্রুতি যে ব্রহ্মকে প্রতিপাদন করছে তা 
বোধকনিষেধতয়া প্রকাঁশয়তি । মন, ইন্দ্রির এরা বস্তকে 
বুঝায় কিন্তু শ্রুতি বললেন__ মন তাকে বুঝতে পারে না অথচ 
মন যার প্রেরণায় মনন করে ; বাক্য তাকে প্রকাশ করতে পারে 
না। অথচ বাক্য ধার দ্বারা প্রকাশিত হয়; চক্ষু তাকে দর্শন 


১৯১ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


করতে পারে না, অথচ চক্ষু ধার দ্বারা দৃষ্টি শক্তি পায়। এই 
ভাঁবে কোন ইন্দ্রিযই তাকে জানতে পারে না । এখন কথ। 
হচ্ছে ব্রহ্ম চিৎ, আর মন ইন্দ্রিয় সবই তো! জড়, জড় কেমন 
করে চিৎকে প্রকাশ করবে ? কোন বস্তরকে জানবার উপায় তো 
মন, ইন্ড্রিযর_তাই দিয়েই যদি ব্রহ্মকে জানা না যায় তাহলে 
ব্রহ্মকে জানবার উপায় কি? অথচ ব্রহ্মকে তো জানতেই 
হবে। শ্রুতি বললেন_স্ক কিমপি বোধকং নাস্তি নদ্বন্গ ।' 
ব্রহ্মাকে শব্দ দিয়ে--“এইটি ব্রহ্ম” এই রকম করে যখন বলা গেল 
না তখন অর্থাৎ উক্তম্‌, অর্থতঃ উক্তম্‌ যথা স্তাৎ তথা । মনে করা 
যাক কারো যদি “কলসী" শব্দটি জানা না থাকে অথচ তাকে 
বুঝাতে হবে তখন উপায় কি? গলাসরু পেটমোটা যাতে জল 
আনা যায়,মাটির ব! ধাতুর পাত্র,এইভাবে অর্থ দিয়ে বলে বুঝাতে 
হবে। তেমনি ত্রন্মাকে শব্দ দিয়ে, বলে, বুঝাঁন যাঁয় না বটে কিন্তু 
অর্থ দ্রিয়ে বলতে হবে । আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিযও পচটি বিষয়কে 
গ্রহণ করে কিন্তু সেই রকম কোন ইন্দ্রিয় বা মন বলতে পারে 
না “ইদং তত, অর্থাৎ “এই সেই ব্রহ্ম” তাই শ্রুতি ব্রন্মকে 
অর্থত প্রকাশ করলেন। শ্রুতি বলেছেন “তদ্দিদ্ধি' এবং যোগীন্দ্ 
বললেন “অবেহি' এই ছইএর মধ্যে সামঞ্জস্ত আছে । শ্রীবৃহদারণ্যক 
উপনিষদ বললেন £ 
আত্ম। ব' অরে মৈত্রেষি দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো 
মন্তব্যে নিদিধ)াসিতবাঃ | 

আত্মাকে দেখতে হবে, শুনতে হবে, মনন করতে হবে- দেখা 
শোন! এবং মনন-এর দ্বারাই বস্ত বুঝা যাঁয়। কিন্তু পঞ্চ-ইন্দ্রিয 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৯৩ 


অথবা মন কেউই তো তাকে দেখতে শুনতে বা মনন করতে 
পারেনা । পারতে হবে অথচ যারা পারবার উপায়রূপে আছে 
তারা পারছে না, তবে পারবে কে? যোগীক্দর “অবেহি? 
বললেন- অথচ শ্রুতি উপায়ের নিষেধ করলেন, এইখানেই 
অসঙ্গতি । তাঁহলে বিচারে এইটিই দাড়াল যে, ব্রহ্মকে জানবার 
জন্য আমাদের মন বা ইন্দ্রিয় যখন কাজে লাগল না, অসমর্থ হল 
তখন জানবার জন্য নূতন লোক চাই। শ্রুতিরও এইটাই 
অভিপ্রায় । বিজাতীয় বস্তু বিজাতীয় গ্রহণ করে না, তাই 
শ্তি বলেছেন--দেবো ভূত্বা দেবং যজেৎ। প্রকৃতি জড়া 
আর ব্রহ্ম চিং_কাঁজেই একটি অপরটিকে কেমন করে গ্রহণ 
করবে? শিশুর যখন হাতে খড়ি হয় তখন শিশু নিজে লিখতে 
জানে না, গুরুমশাই যেমন তার হাত দিয়ে লেখান তেমনি 
জীব যখন গোবিন্দ বলে তখন সে নিজে বলে ন' শ্রীগুরুদেবই 
তার মুখ দিয়ে বলেন, কান দিয়ে শোনেন, মন দিয়ে চিন্তা 
করেন। তাহলেই যোগীন্দ্রের অবেহি" পদটি সঙ্গত হবে। 
শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবতিপাদ প্রশ্ন তুলছেন, এ তো৷ শ্রুতির 
বল। হল না শ্রুতি ব্রন্মকে বলেন নি-_-এই কথাই বল, 
তাহলে অর্থ দিয়ে বললেন__ এটি কেন বললেন? তা বলা 
যাবে না_কারণ ব্রহ্ম যদি না থাকেন তাহলে নিষেধগুলি সিদ্ধ 
হয়.না; ব্রহ্মকে বাদ দিলে নিষেধগুলি দাড়াতে পারে না, 
মনো ন মনুতে, চক্ষু ন পশ্যতি ইত্যাদি নিষেধ বাঁচে না, 
যদি শ্রুতি ব্রহ্গবস্তকে লক্ষ্য না করেন। চালে-ডালে অথব৷ 
খইএ-ধানে মিশিয়ে শাশুড়ীম। যেমন বউমাকে বাছতে বলেন, 


১৩ 


১৯৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


একটিকে চেনা থাকলে অপরটি থেকে সেটিকে আলাদ। করা 
যায়, তেমনি প্রকৃতি শাশুড়ি এ জগতে চিৎ আর জড়কে মিশিয়ে 
দিয়েছেন । শ্রুতি “তৎ ন'-কে বলে কিন্তু তত বলতে পারে না; 
কারণ তৎ বস্তু অত্যন্ত বৃহৎ। ব্রন্মকে লক্ষ্য না করলে, ব্রহ্ম 
চেনা না থাকলে নিষেধ সিদ্ধি ভয় না। রামকে চেনা থাকলে 
তবে রাম ভিন্ন অন্ক বালক দেখলে বল যাবে এ রাম নয়। 
শ্রুতি বললেন-_-'যতো৷ বাচে। নিবর্তস্তে অপ্রাপ্য মনস। সহ 
বল। যায় না ত1 নয়, সাকল্যে বলা যায় না । এই অর্থে বলা 
হচ্ছে যে বলা ষায় না। যার যত অনুভব মে তত বলে 
আমার কিছ হল না। এ কথাটি বাস্তবিক সত্য। সানি- 
পাতিক বিকারী রোগীর পিপাসার মত, কলসী কলসী জল 
খেয়েও মনে করে জল কখনও খাই নি। রাধারাণীর কৃষ্ণতৃষ্ণ 
এই রকম | নিরন্তর কৃষ্ণ-মিলিত তবু মনে হয় কৃষ্ণ চেনেন না। 
যার যত অধিকার তার তত অভাববোধ । সমুদ্র পার হবার 
জন্য কেউ সীতার দিতে নেমেছে, তীরের লোকেরা দেখছে সে 
সীতরে অনেক দূর গিয়েছে কিন্ত যে সাতার দিচ্ছে সে ভাবছে, 
আমার কিছুই সাতার দেওয়া হল না, সামনে অনস্ত জলরাশি । 
শ্রুতি ব্রহ্ম নিরূপণ করে নি, এ কথা বললে শ্রত্যর্থের ব্যভিচার 
হয়। তবে শ্রুতি যে সাকল্যে বলতে পারেন নি, অর্থাৎ সমগ্রভাবে 
বলতে পারেন নি, একথা সত্য । ব্রহ্ম সম্বন্ধে জেনে সব শেষ 
করেছি, আর কিছু নেই, এ কথা বলতে পার! বায় না। ব্রহ্ম 
সম্বন্ধে যে কথা গৌরগোবিন্দ সন্বন্ধেও এ একই কথা। 
জগতের সকল জিনিষই উচ্ছিষ্ট হয় এবং উচ্ছিষ্ট হলে ক্রমশ সে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৯৫ 


বন্তর স্বাদ.কমে যায়; কিন্তু ব্রহ্মকে গৌরগোবিন্দকে আজ 
পর্যন্ত কত লোকেই তো আব্বাদন করলেন কিন্তু তারা 
কখনও উচ্ছিষ্ট হন না বা তাদের আম্বাদও কখনও কমে না, 
বরং উচ্ছিষ্ট হলে বেশী আম্বাদ। যেমন শ্রীশুকমুখোচ্ছিষ্ 
শ্রীনস্ভাগবতে রসের আম্বাদ বেশী হয়েছে । তেমনি শ্রীগুরুদেবের 
উস্চিষ্ট অর্থাৎ আন্বাদিত গৌরগোবিন্দ নামের আত্ম।দ বেশী। 
তামার শুদ্রা এবং সোনার গিনি মিশে গেছে । সোন। চেনা 
থাকলে তামা ফেলে সোন। নেওয়া যাবে--তেমনি জগতে চিৎ 
জড় মিশে গেছে-চিৎ চেনা থাকলে জড় ফেলে চিৎ নেওয়া 
যাবে। জগৎ তো 'তন্নতে ভরে আছে । এই “তত ন' বাদ 
দিলে কি অবশিষ্ট থাকে, গীতা বললেন £ 

ইন্দ্িয়ানি পরান্যানুরিক্দিয়েভ্যঃ পরং মনঃ | 

মনসন্ত পরাবুদ্ধি ধে। বুদ্ধেঃ পরতস্তর সঃ ॥ গীতা ৩।৪২ 
স্থলদেহ হতে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ট, ইন্দ্রিয় হতে মন, এবং মন হতে বুদ্ধি 
শ্রেষ্ট । যিনি দেহাদিবুদ্ধন্ত সকলের অভ্যন্তরে তিনিই বুদ্ধির 
্রষ্ট পরমাত্মন্বরূপ | 

“তন্ন” বাদ দিলে যা থাঁকে তা হল আত্মা, শ্রুতি এই কথাই 
অর্থত বলেছেন। যা স্থল নয়, সুল্প্স নয়, যা দীর্ঘ নয়, হুন্ব 
নয়, যা নাম নয়, রূপ নয়, রস নয়, গন্ধ নয়, শব্দ নয়, স্পর্শ নয়, 
০৭০০ তিনিই ব্রহ্ম। এই ত্রহ্মকে বুঝাবার মত কেউ বোদ্ধা 
নেই, অথচ বুঝতে হবে । এই শুন্য ফাক পূরণ করতে হবে। 
শ্রুতি বললেন £ 

তমেব বিদিত্বাইতিমৃত্যুমেতি নান্তঃ পন্থা বিছ্ভতেইয়নায়। 


১৯৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তাকে জান! ছাড়া মায়াতরণের অর্থাৎ মুক্তিলাভের আর দ্বিতীয় 
পথ নেই। তাই মাঝখানে কোন লোক আস দরকার-- 
ইনিই শ্রীগুরুপাদপদ্ন । 

এখন প্রশ্ন হতে পারে শ্রুতি যদি ব্রহ্মকে নাই বলতে পারেন, 
ব্রহ্ম অবাঁডমনমোগোচর, ত্রন্মকে বাঁকা ও মনের দ্বারা বিষয় করা 
যায় না, তাহলে শ্রুতি বলেছেন কেন? ত্রন্মা গুতিপাদন করতে 
না পাঁবলে তো শ্রুতির ব্যর্থতা হয়। তাই যোগীন্দ্র বললেন, 
শ্রুতি ত্রহ্গকে সাক্ষাৎ বলতে পারেন নি-বোৌধকনিষেধতয়া । 
বলেছেন- অর্থাৎ ব্রহ্ম না থাকলে নিষেধ অনর্থক হয়ে যায়। 
অভিধ! দিয়ে ব্রন্ম নিরূপণ করতে পারেন নি বটে, কিন্তু তাৎপধে 
নিরূপণ করেছেন । ব্রহ্ম যদি শ্রীগোবিন্দের অঙ্গজ্যোতি হয় 
তাহলে ব্রহ্ম মনের বিষয়ীভূত হন না কেন? সুর্যের কিরণ 
কান্তি কি আমরা দেখি না? ভগবানের অঙ্গজ্যোতি যে ব্রহ্ম 
এ জ্যোতি মায়িক তেজ (ক্ষিতি, অপ, তেজ:), এ তৃতীয় মহাভূত 
নয়। কিন্ত মায়াতীত সচ্চিদানন্দর্ূপ। আমাদের বাক্য, মন 
সবই প্রকৃতিজাত, তাই তা কেমন করে ব্রহ্মকে বিষয় করবে? 
ব্রহ্মকে যদি মনের বিষয় করা না যায়, চক্ষু প্রভৃতি ইন্ড্রিয়ের 
বিষয় করা না যাঁয়, তাহলে ঘনীভূত ব্রহ্ম যে ভগবৎবিগ্রহ তাঁকেই 
বা কেমন করে মন বা ইন্ড্রিয়ের বিষয় করা যাবে? আর যদি 
বিষয়ই করতে না পারে, তাহলে সাধক ভজে কোন ভরসায়? 
ভগবৎবিগ্রহ তো ব্রন্ষের চেয়েও কঠিন, ঘনীভূত ব্রহ্ম। ব্রন্মই 
যদি হজম না হয়, তাহলে ত্রহ্মঘন তো হজম হওয়া কঠিন। ব্রহ্ধ 
উপণাসকের চেয়ে ভগবানের উপাসক এ জগতে বেশী।. ব্রহ্ম 


নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ ১৯৭ 


উপাসক তো তবু ব্রহ্ষকে মন দিয়ে উপলব্ধি করে তৃপ্ত, ভগবানের 
উপাসকের আবদার আবার আরও বেশী । ভক্ত শুধু মন দিয়ে 
বুনে তৃপ্ত হয় না, চোখে দেখতে চায়, হাত দিয়ে চরণ সেবা 
করতে চায়, সেবা করবে কাছে থাকবে । তাহলে কি সাধকের 
এই মনে করতে হবে যে ভগবানকে পাবার আশা নেই? 
শ্রীক্রবত্তিপাদ বলেছেন- _ভগবদিগ্রহ যদ্দিও সচ্চিদানন্দ তবু 
স্ববিধা আছে । ভগবানের কপাশক্তি দ্বারা ভগবানের বিগ্রহও 
প্রাকৃত লোকের নয়নগোচর হয়। শ্রীগোবিন্দের অঙ্গকাস্তির 
উপমা দেওয়া হল, নীলোৎপলদলন্ঠাঁম, অথবা নবনীরদনিন্দিত 
কান্তিধর--এ নীলোৎপল বা নীরদ এ জগতে! বস্তু নয়, সেটি 
অপ্রাকৃত। অপ্রাকৃত বস্তুর সঙ্গে তো আমাদের পরিচয় নেই, 
তাই প্রাকৃত বস্তর রং এর সঙ্গে আমরা তুলনা করি । কিন্তু সে 
যে নীলোংপল, সে চিন্ময় সরোবরে চিংজলে চিৎকমল। সাধকের 
ধান প্রাকৃত বস্তর সঙ্গে মিলিয়ে হয়, আর ভগবান অপ্রাকৃত 
চিন্ময় । তাই ধ্যান ভগবানকে স্পর্শ করে না, কারণ ছুটি 
বিজাতীয় বস্ত । ধ্যান যদি ভগবানকে স্পর্শ ই না করে তাহলে 
ভগবৎ প্রাপ্তির সম্ভাবনা কোথায়? আর প্রাপ্তিই যদি না হয়, 
তাহলে ধ্যান করেই বা লাভ কি? পাবার তো আশা নেই। 
সাধকের ধ্যানের কথা ভগবানকে জানিয়ে দেন এমন লোক 
আছেন, এরা ভগবানের নিজ জন। ভগবানের কৃপাশক্তি 
সাধকের পক্ষপাতিনী | এক কৃপাশক্তি ছাড়া ভগবানের অন্যান্য 
শক্তি সব ভগবানের পক্ষপাতিনী। এই কৃপাঁশক্তি গোলোক 
বৃন্দাবনে বন্ধ্যা, কৃপাশক্তি হলেন শক্তিসম্রাজ্জী। তার কাজ হল 


১৯৮ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


পতিতে করুণা করাঁ। কৃপাশক্তি তাই সাধকের পক্ষপাতিনী 
হয়ে ভগবানকে বলে, 'প্রভু, তোমাকে পতিতের জগতে যেতে 
হবে, আমাকে সক্রিঘ্র করতে হবে । পতিত জীব, তারা তো 
তোমাকে দেখে নি, তোমারই অভিন্ন প্রকাশ শ্রীগুরূদেব 
সাধককে তোমার সম্বন্ধে উপদেশ করেছে । সাধক যদি তোমার 
দর্শন না পায় তাহলে গুরুবাক্য ব্যভিচারী হবে। তাতে 
তোমারই অপমান |, তাই ভক্তের ধ্যানে ভগবান কৃপাশক্তির 
প্রেরণায় সাড়া দেন। গ্রীগুরদেবের উপদেশ রক্ষার জন্য 
অতর্কয়া করুণয়া আবির্ভবতি | ব্রহ্ম উপাসকের সাধনেব 
পরিপাক দশায় ভগবানের অনুগ্রহ, ব্রন্মাকার হৃদয়ে ব্রহ্ম 
অন্ুভূতি। শ্রুতির মধ্যে পরস্পরবিরুদ্ধ বাক্য পাওয়া যাচ্ছে__ 
“মনো ন মন্্ুতে' আবার “দৃশ্ঠতে ্বগ্রয়াবৃদ্ধ্যা' । অনুগ্রহই এটি 
সমাধান করেন। চিত্ত ভাবনার বস্তর আকারে পরিণত হয়। 
মূলে সাধকেরই চেষ্টা থাকে, তাই দেখে ভগবানের অনুগ্রহ হয়। 
শ্রীবালগোপালের দামবন্ধনলীলাতে ছুই আঙ্গুল রজ্জু কম 
হয়েছিল। এর তাৎপর্ধ হল সাধকের ভজনের পরিশ্রম ও তাই 
দেখে ভগবানের অনুগ্রহ । মাকে উপলক্ষ্য করে সমশ্ সাধক 
জগৎকে ভগবান শিক্ষা দিয়েছেন, সাধনই যদি করিস তাহলে 
ছু” আঙ্গুল কম করে করিস না। ভগবানকে বাঁধবার ইচ্ছা 
থাকলে নিষ্ঠাপূর্বক ভজনের পরিশ্রম করতে হবে, তাই দেখে 
ভগবানের অনুগ্রহ হবে । চোখ দিয়ে তাকে দেখা বা মন দিয়ে 
তাকে ভাবা, এতে চোখের ব! মনের কোন দাম নেই, ভগবানের 
করুণারই দাম। ভগবানের করুণ! দিয়েই ভগবানকে দেখা যায় 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৯৯ 


এইটিই চরম সিদ্ধান্ত, চোখ বা মন দিয়ে তাকে দেখা বা জানা 
যায় না গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজার মত । সূর্য ব! চন্দ্র দেখতে হলে 
যেমন তাদের কিরণ দিয়েই তাদের দেখা যায়, অন্য প্রদীপ জ্বেলে 
দেখতে হয় না, তেমনি ভগবানকে দেখতে হলে ভগবানেরই 
করুণ! দিয়ে তাকে দেখতে হয়, এ ছাঁড়। অন্ত কোন উপায় নেই। 
সার্বভৌম ভট্টাচার্য যখন গোপীনাথাচার্ষকে প্রশ্ন করেছিলেন, 
মহাপ্রভৃ যে ভগবান তার প্রমাণ কি? গোগীনাথ জবাঁব 
দিয়েছিলেন- প্রমাণ দিয়ে ঈশ্বর বুঝ! যাঁয় না, কৃপা হলে বুঝা 
যায়। অগ্রিকণ! যেমন অগ্রিপুঞ্জকে প্রকাশ বা অতিক্রম করতে 
পারে না, পুত্র যেমন পিতাকে অতিক্রম করতে পারে না, তেমনি 
পরমেশ্বর থেকে এসেছে যে মন ইন্দ্রিয় তা দিয়ে তাকে জানা 
যায় না। প্রত্যক্ষ, অনুমান, এঁতিহ্া প্রমাণগুলি ব্রহ্ম সম্বন্ধে 
খণ্ডিত হয়েছে, যোগীন্দ্র শব্দ প্রমাণকেও প্রায় খণ্ডন করেছেন, 
বেদশাস্্ও এই নিষেধ মুখে ব্রন্ম প্রতিপাদন করেছেন । 

মহারাঁজ নিমি প্রশ্ন করেছেন_-ত্রন্মকে যদি কেউ বলতেই 
না পারে, তাহলে তিনি যে অস্তি এ কথ! কে বলবে? আনন্দ 
আছে, ছুঃখ আছে-__এ কথা মন বলে। বায়ু আছে এ কথা 
ত্বগিক্দ্িয় বলে; কিন্তু ব্রহ্ম আছে এ কথা কে বলবে? যদি 
শ্রতিও এ জবাব দিতে না পারেন, তাহলে ব্রহ্ম তো৷ নান্তি হয়ে 
যায়। তাই ব্রন্ষের অস্তিত্ব প্রতিপাদক বাক্য যোগীন্দ 
বললেন : 

সত্বং রজস্তম ইতি ত্রিবৃদেকমাদৌ সুত্রং 
মহানহমিতি প্রবদস্তি জীবম্‌। 


২০৯ নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ 


জ্ঞানক্রিয়ার্থফলরূপতয়োরুশক্তি ব্রন্মৈব 
ভাঁতি সদসচ্চ তয়োঃ পরং যত ॥ ভা. ১১।৩।৩৭ 
সমগ্র বৈষ্ুবদর্শন অন্টালিকার ভিত্তি স্থাপন করেছেন '্রীজীব 
এই শ্লোকে । এই শ্রীজীব টীকাটি বুদ্ধিতে ধরে রাখতে পারলে 
সমগ্র বৈষ্ঞবদর্শন সম্বন্ধে আর কোন অস্পষ্টতা থাকবে না। 
যোগীন্দ্র যেন মহারাঁজকে বলছেন, ব্রন্ম বিষয়ে প্রমাণ পাচ্জেন না 
মহারাজ, না? জগতের দৃশ্য, অদৃশ্ঠট যা কিছু আছে সবই 
ব্রন্মেরই প্রকাঁশ। তাহলে সেই ব্রহ্ম সম্বন্ধে কি কোন প্রমাঁণের 
অভাব আছে? মাটির বাঁসনের দোকানে যেখানে সব জিনিষই 
মাটি দিয়ে গড়া, সেখানে গিয়ে যদি কেউ বলে মাটি পাওয়া যায় 
না_এ কথ] যেমন অসম্ভব, এও তেমনি । ব্রন্মের আবার প্রমাণ 
কি? জগতের সবই তো ব্রন্মের প্রকাশ | প্রমাণ যা প্রমাকে 
প্রমাণ করে । কাজেই প্রমাঁণ এবং প্রমা ভিন্ন হওয়া চাই। 
প্রম হল কর্ম আর প্রমাণ হল কর্তা । ব্রন্দ প্রমা কর্ম আর 
প্রমাণ কর্তা । ব্রন্মকে কর্ম করতে পারে, এমন যদি কেউ থাকে, 
তাহলে তাকে ব্রন্ষের প্রমাণ অর্থাৎ কর্তা বলা যাবে; কিন্তু 
মজা! এমনই যে ব্রহ্মকে কর্ম করতে পারে এমন কোন কর্তা 
নেই। কাজেই ত্রক্ষের কোন প্রমাণ নেই। স্বামি-টাকাঁর 
সিদ্ধান্ত ব্রহ্ম কোন প্রমাণকে অপেক্ষা করে না। গোম্বামি- 
পাদগণ যে কাঁজ করে গেছেন, তা হল আমাদের রুচি স্যষ্টি 
করবার জন্য । অর্থাৎ কেউ যদি ভজন করতে চায় তার সিড়ি 
গেঁথে দিয়েছেন । ব্রহ্ম জগতে প্রতিটি বস্ত্ররূপে বিরাজিত। 
স্বামিপাদ বলেছেন, সং অর্থাৎ স্থূল কার্ধ, অসৎ সুক্ষ অর্থাৎ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২০১ 


কারণ-_সবই ব্রহ্ম। এ সম্বন্ধে প্রমাণ কি? কার্ধ-কারণের 
অতীত অবস্থায় তিনিই ছিলেন, তখন আর কেউ ছিল না__ 
তিনিই সৎ তিনিই অসৎ । মহারাজ নিমির পক্ষ থেকে স্বামিপাদ 
যেন প্রশ্ন করছেন-_এক ত্রহ্ম বুর কারণ হয় কি করে? নন 
কথমেকং বহুবিধস্ কাঁরণম্? জগতে তো দেখ! যায় প্রত্যেক 
কার্ধের কারণ ভিন্ন ভিন্ন। যেমন মাটি ধাতুর কারণ হতে পারে 
নাঁ_-তার উত্তরে যোগীক্দ বললেন, ব্রহ্ম উরুশক্তি। অনেক 
শক্তিমান বলে তিনি এক হলেও জগতের বহু কার্ষের কারণ । 
ভগবানের শক্তি বহুরূপী-ত্রিগুণাত্মিকা মায়া ব্রন্মের শক্তি । 
আদিতে যে ব্রহ্ম এক ছিলেন-_একমেবাদ্বিতীয়ম-_-সেই ব্রহ্ম 
সত্ব রজঃ তমঃ ত্রিবৃৎ হলেন (ইনিই প্রধান বা! প্রকৃতি )। 
প্রত্যেকের মধ্যে কার্যকারিতা শক্তি হল স্থত্র এবং জ্ঞানশক্তির 
দ্বারা মহৎ তত্ব, অহমিতি অহঙ্কারের দ্বারা উপাধি জীক্ঘ, সব 
সেই এক ত্রহ্ম। তারপর জ্ঞানক্রিয়ার্থকলরূপতয়া, জ্ঞানশবের 
দ্বারা দেবতা, ক্রিয়। ইন্দ্রিয় এবং অর্থ পঞ্চবিষয়, ফল সুখ ছুঃখ-_ 
এ সব রূপে ব্রহ্মই বিরাজিত। স্বামিপাদ যোগীন্দ্রের পক্ষ 
অবলম্বন করে বলছেন, যে ব্রহ্ম সকলরূপে দৃশ্যাদৃশ্যরূপে স্বত; 
ভাসমান, সেই ব্রন্মের সিদ্ধির জন্য অন্য কোনও প্রমাণের 
অপেক্ষা নই । 

শ্রীজীবগোন্বামিপাদ বলেছেন, তস্য ব্রহ্মণঃ শক্তিঃ স্বাভাবিক- 
রূপম্‌, ব্রদ্মের শক্তি আগন্তক বা ওপাধিক নয়--অদ্বৈতবাদীর 
যুক্তি দিয়েই বেদাস্তদর্শন ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। অদ্বৈতবেদাস্তীর 
মতে ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দময়-_নি্ডণ, নিরাকার, নিঃশক্তিক | 


২০২ নবযোগীন্দ্রলংবাদ 


তাদের মতে ব্রন্মের শক্তি স্বীকার করলেই এই শক্তিটি হবে 
ওপাধিক। ব্রন্ম যখন ধন্ুর্ধারণ করে রাম অবতার হয়েছেন, 
তখন ব্রহ্ম উপা ধিগ্রন্ত হয়েছেন গপাধিক শক্তিকে স্বীকার করে, 
ব্রহ্ম কৃষ্ণ হয়ে গিরিধারণ করেছেন । তারা বলেন ব্রন্মের শক্তি 
স্বাভাবিক নয় গুপাধিক । তাদের যুক্তি হল, ব্রন্দের শক্তি 
স্বীকার করলে বিকার আসে। বিগ্রহ থাকতে পারে, তাই সেই 
ভয়ে অদ্বৈতবাদ ব্রন্মের শক্তি স্বীকার করেন নি। কোন 
আকারও ত্রন্মের তারা স্বীকার করেন না; কারণ কোন আকার 
স্বীকার করলেই বিকারকে স্বীকার কর! হল। যেমন সুবর্ণ 
থেকে কুগ্ডল, অন্বথারূপের নামই বিকার । বিকার না করলে 
আকার হয় না, আর বিকার হলে তো খাঁটি হয় না। ব্রহ্গ 
বিকৃত বস্তু নয়, ব্রন্মের যদি শক্তি স্বীকার করা হয়, তাহলেই 
এই বিকার আসে । তাই অদ্ৈতবেদাস্তী ব্রন্মের শক্তি স্বীকার 
করেন নি। প্রবাদ আছে, আচার্য শঙ্কর একসময় বেদাস্তস্ত্রের 
ভাষ্ত রচনা করছিলেন । তাতে ব্রন্মের নিঃশক্তিক অবস্থা 
প্রতিপাদন করেছেন । এমন সময় দশাশ্বমেধ ঘাটে সান করতে 
গিয়ে পড়ে যান, উঠবার ক্ষমতা থাকে না। তখন স্বয়ং শক্তি 
একটি বালিকার রূপ ধারণ করে এসে বললেন__-আচার্য ওঠ” । 
আচার্য বললেন আমার উঠবার শক্তি নেই। বালিকা! বললেন 
--কেন আচার্ধ, তোমার তো শক্তির প্রয়োজন নেই। তবেই 
বুঝতে পারছ, শক্তি না থাকলে কোন কাঁজই হয় না। অতএব 
ব্রন্মের যে শক্তি আছে এটি তৃমি মনে প্রাণে অন্ততঃ স্বীকার 
কর। বাইরের জগংকে ভুলাবার জন্য যাই প্রচার কর না কেন 


নবযোগীক্্রসংবাদ ২০৩ 


মনে প্রাণে কিন্তু বিশ্বাস কর যে ব্রন্ষের শক্তি আছে এবং সে 
শক্তি স্বাভাবিক ।, অদ্বৈতবেদাত্তী ব্রন্মের কোন ক্রিয়া স্বীকার 
করেন না। গুণ শ্বাকার করেন না। তারা বলেন, গুণ য! 
কিছু ত৷ প্রকৃতির | শ্রীজীবপাদ এ জায়গায় দৃষ্টি দিয়ে বলেছেন 
_ ব্রন্মের শক্তি স্বাভাবিক । ত্রক্মকে যখনই সচ্চিদানন্দ বল! হল 
অর্থাৎ ব্র্মকে যখন সৎ চিৎ, আনন্দ বলে স্বীকার করা হল্‌, 
তখন তাঁর শক্তি আছে স্বীকার করা হল। কারণ একটি বস্তু 
কখনও তিনটি হতে পারে না । সৎ, চিৎ, আনন্দ তিনটি পৃথক 
বন্ত। প্রত্যেকটি প্রত্যেকটি থেকে পুথক। ঘট যে পট থেকে 
ভিন্ন বুঝা যায় কেমন করে? ঘটের ঘটত্বই ঘটকে পট থেকে 
পূথক করে রেখেছে । তেমনি সং এর সত্তা, চিৎ এবং আনন্দ 
থেকে পথক করে রেখেছে । তাই তার নাম হয়েছে সৎ। চিৎ 
এর ভাবও তেমনি সং এবং আনন্দ থেকে পৃথক করে রেখেছে 
বলে তার নাম চিৎ। আবার আনন্দের ভাব সৎ এবং চিৎ থেকে 
পৃথক করেছে বলে তার নাম আনন্দ । বস্তুর তদ্গত ভাব তার 
সংজ্ঞা দান করে । এর ভেদ তিন প্রকার--সজাতীয়, বিজাতীয় 
এবং স্বগত । যেমন মনুষ্যত্ব ভাব মান্ুবকে অন্ত থেকে পৃথক 
করে। সং-এর সত্তাই তাকে অসৎ থেকে পুথক করে রেখেছে। 
সৎ-এর ভাবকেই সত্তা বলে। এই ভাবেরই অপর নাম শক্তি। 
সৎ-এর শক্তি সৎ-এ, চিং-এর শক্তি চিৎ-এ, আনন্দের শক্তি 
আনন্দে আছে । সং ও সত্তা, চিৎ ও তার ভাব, আনন্দ ও 
তাঁর ভাব পরস্পর অভিন্ন এবং তৎ তৎ গুণে নিহিত । যেমন 
অগ্নির দাহিকাশক্তি অগ্নি থেকে অভিন্ন এবং অগ্নিতে নিহিত। 


২০৪ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


অগ্নির শক্তি স্বাহা। সং-এর শক্তি সন্ধিনী, চিং-এর শক্তি সংবিং 
এবং আনন্দের শক্তি হলাদিনী বা আনন্দিনী। এ শক্তি 
সচ্চিদানন্দ ব্রন্মের আগন্তক নয় । শ্রীবলদেব বিগ্ভাভৃষণ মহাশয় 
বললেন--“ওহে অদ্বৈতবাদী, তোমরা তোমাদের ব্রহ্মকে সচ্চিদা- 
নন্দ বলছ-__যে সং সেই চিৎ এবং সেই আনন্দ, অর্থাৎ একই 
বস্ত্র তিনটি__সং-ও যা চিৎ-ও তাই এবং আনন্দ-ও তাই। এ 
কথ! বললে শ্রুতি অভিধান হয়ে পড়ে,পধায়তাপত্তি এসে যায়। 
তাই তিনটি এক বস্তু বললে চলবে না । তিনটি পৃথক বিশেষণ 
স্বীকার করতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন বিশেষণ বললে তবে ব্রহ্গের 
গায়ে এ বিশেষণ দেওয়া যাবে! যেমন লাল ফুল আন বললে 
সাদা ও কাল থেকে তাকে পৃথক করা যায়, তেমনি সৎ, চিৎ, 
আনন্দও পৃথক পৃথক, তাই নিধিশেষ বলা যাবে না, সবিশেষ 
বলতে হবে। অদ্বৈতবাদীরা! এই শক্তিত্রয়কে ব্রন্মের সহিত 
অভিন্ন এবং ব্রন্মে এই শক্তি নিহিত এ কথা স্বীকার করেন না 
ভয়ে। পাছে শক্তি স্বীকার করলে ব্রন্মে বিকার এসে যায়। 
আচাধ শঙ্করের জন্ম শিব অংশে- শক্তি এবং বিগ্রহ থাকলেও যে 
ব্রহ্ম অবিকৃত হতে পারেন, এটি আচার্য প্রকাঁশ করেন নি। 
কারণ তার প্রয়োজন নেই। কিন্তু গোস্বামিপাদ তা করলেন। 
শ্রীমন্ভাগবতশাস্তে শ্রীদশমে দেবতারা স্তুতি প্রসঙ্গে বলেছেন £ 
সত্যব্রতং সত্যপরং ত্রিসত্যং সত্যস্ত যোনিং নিহিতং চ সত্যে । 
সত্তস্ত সত্যমৃতসত্যনেত্রং সত্যাত্মকং ত্বাং শরণং প্রপনা; ॥ 
__- ভা, ১০।২।২৬ 


ব্বামিপাদ টাকায় বললেন ত্রিসত্যম্‌, অর্থাৎ ত্রিষু কালেষু। অব্যভি- 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২০৫ 


চারিত্বেন বর্তমানম্__ব্রন্মের এই শক্তি অচিস্ত্য । শ্রীজীবপাদ 
বললেন, শক্তি ব্রন্ষের স্বাভাবিক রূপ । যেবস্তু নেই তাঁর নাম হয় 
নাএ কথা যে বলা হল,তা তোহয় দেখা যায় যেমন আক শিকুম্ম | 
আকাশকুন্ুম শবে আকাশ শব্দ সতা, আবার কুম্থম শব্দও সতা, 
কিন্তু ছুটি শব্দের মিলন অসত্য | ব্রহ্ম যে সং চিৎ আনন্দ বলা 
হয়েছে, সৎ চিৎ আনন্দ আছে বলেই শব্দ প্রয়োগ হয়েছে । 
তিনটি শব্দ তিনটি শক্তিকে লক্ষ্য করেই ঘ্নয়েছে। এই তিনটি 
ভিন্ন ভিন্ন স্বরূপকে বুঝাচ্ছে। ব্রন্মের সত্তা স্বীকার করে 
তাকে সং বললে তা চিৎ এবং আনন্দ থেকে পৃথক বুঝা 
গেল। এই রকম চিৎ বললে সং এবং আনন্দ থেকে পৃথক 
আবার তাকে আনন্দ বললে সৎ এবং চিৎ থেকে পৃথক । 
সং-এর ভাবই সৎ শক্তি, চিং-এর ভাবই চিৎ শক্তি, 
আনন্দের ভাবই আনন্দ-শক্তি। ব্রহ্ম উরুশক্তি, ব্রহ্মই 
প্রতিভাত হচ্ছেন। এটি কল্পিত নয়। এ সবই ত্রন্গের 
শক্তি | ব্রন্ষণ এব সা শক্তি ন তু কল্পিতা। এর পক্ষে প্রমাণ 
কি? যেহেতু ব্রহ্ষই সৎ অর্থাৎ কার্য, স্থল পৃথিবাদিরূপ । 
কারণ অসৎ সুক্ষ প্রকৃত্যাদিরূপ, অর্থাৎ কার্ধকারশরূপ । এর 
নাম বহিরজবৈভব | এর পরে তয়োঃ পরম্_ সেটি কি? এটি 
বলতে হবে স্বরূপবৈভব, অর্থাৎ বহিরঙ্গবৈভবের পরে যা তা হল 
স্বরূপবৈভব। শ্রীবৈকুগ্ঠধাম প্রভৃতি বৈভব-_-সচ্চিদানন্দশক্তি 
এবং শুদ্ধ জীবরূপ তটস্থ বৈভব। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এগুলি ষে ব্রন্মেরই তা কেমন করে প্রমাণ 
হবে? এগুলিকে যদি ব্রন্মের বলে স্বীকার করা না যায় তাহলে 


২০৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তাদের সিদ্ধি হয় না, কারণ এদের আগে তো ব্রহ্ম ছাড়া আর 
কেউ ছিল না সদেব সৌম্যেদমগ্র আসীং | মহদাদিলক্ষণ 
। জ্ঞানশক্তি, সুত্রাদিলক্ষণ ক্রিয়াশক্তি, তন্মাত্র প্রকৃতি, এ সবই তার 
সদসতরূপ, এর পরে যেটি সেটি ফলরূপ, অর্থাৎ এইটিই স্বরূপ- 
বৈভব। আচ্জা, এখন ত্রদ্মের শক্তিই যদ্দি বৈকুণঠ ( স্বরূপবৈভব ) 
এবং জগৎ ( বহিরঙ্গবৈভব ) হয় তাহলে তাদের প্রকাশ তো৷ 
এক নয়, ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ দেখা ঘায়,--শক্তির ভিন্নতায় প্রকাশ 
ভিন্ন । তটস্থ শক্তি হল শুদ্ধ জীব--তটস্থ বলা হল কেন? 
জীব ( শুদ্ধ) বস্তুতঃ চিৎ কিন্ত শ্রন্মের অন্তরঙ্গা ও বহিরঙ্গার 
মাঝখানে তাঁর অবস্থিতি বলে তাঁকে তটস্থ বল] হয়েছে । শিশুকে 
মাঝখানে দেখে যেমন একদিকে মা অন্থদিকে বাবা থাকেন। 
একদিকে পরবপিতা পরমেশ্বর চিৎঅন্য দিকে বহিরঙ্গ মায়াশক্তি 
প্রকৃতি মা। জীব ইচ্ছা করলে পরমপিতার অন্তরঙ্গ শক্তির 
দিকে দৃষ্টি দিতে পারে কিন্তু অনাদি কাল থেকে তার যে 
অবস্থান হয়ে আছে তাই আছে,বহিরঙ্গা মায়াশক্তির দিকে দৃষ্টি 
দিয়েই মায়াকে সামনে করেই সে দীড়িয়েছে, জীব অনাদি ভগবদ্ি 
মুখ, ভগবানকে পিছু করে দাড়িয়েছে । স্বরূপবৈভবকে পিছনে 
করে মায়ার দিকে সামনে করে তার অবস্থান। চিৎ পিতা 
নিজের বিলাসে আনন্দে মেতে আছেন তার জীবকে ডাকবার 
কোন প্রয়োজন নেই,তাই ডাকেন নি। তিনি নিজে না ডাকলেও 
সন্তানের জন্য তার চিন্ত। তো আছে। তাই তারই অভিন্ন স্বরূপ 
সাধু-গুরু-বৈষ্ণব তাকে ডাকেন__“ওরে জীব, এদিকে ফিরে 
তাকা। কঠোপনিষদ বলেছেন £ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২০৭ 


পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎস্বয়স্তৃস্তম্মাৎ পরাঁড, পশ্যতি নান্তরাত্মন্‌। 

_কঠ. ১১।১ 

জীবের ইন্দ্রিয় পরাঞ্চি অর্থাৎ ভগবানকে পেছনে করে 
আছে। জীব অনাদি কৃষ্ণবিমুখ, যে যেমন লোক তার তেমনি 
জামা হবে। জীব অনাদি কৃষ্ণবিমুখ, তাই তার যা উপকরণ 
দেহ, ইন্দ্রিয়, মন বুদ্ধি, তাও কৃষ্ণবিমুখতা দিয়ে তৈরী। জীব 
তাই মায়াকেই দেখছে আত্মাকে দেখছে না। শ্রীগুরুবৈষ্ণব- 
বন্ধু যদি জীবকে টেনে আত্মার সামনে দীড় করিয়ে দেন তাহলে 
সে আত্মাকে দেখে নতুবা দেখে না। এই তটস্া জীবশক্তিও 
তয়োঃ পরম্-এর মধ্যে পড়ে । শুদ্ধ জীবও তয়োঃ পরম্‌। মায়া- 
শক্তির দ্বারা জীব সম্মোহিত হয়। ত্রন্ষের স্বরূপবেভবকে 
ফলরূপ বলা হয়েছে । ফল যদি চাওয়া যায় তাহলে কার্ষ- 
কারণের অতীতের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এই ফলটি হল 
পুরুষার্থ । এই পুরুষার্থ বস্তি কি? ধর্ম, অর্থ, কাম__এই ত্রিবর্গ 
প্রকৃতির অন্তর্গত। ত্রিবর্গ বাদ দিয়ে মোক্ষ বা মুক্তিও এই 
পূরুষার্থকলের মধ্যে পড়তে পারে । এই পুরুষার্থ হল তয়োঃ 
পরম্‌ আর তদন্থগত শুদ্ধ জীবরূপ চিদ্বস্তুও এই ফলের অন্তর্গত । 
শুদ্ধজীবও ফলের মধ্যে পড়ে। আত্মারামদের জন্য এই ফল। 
যারা আত্মাতে রমণ করে তারা কার্ষকরণের অতীত শুদ্ধ 
জীবাত্বা । ভগবানের অনুগত বলে সেওফলের মধ্যে পড়ল । জীব 
নিত্য কৃষ্ণদাস_-এ স্বরূপ জেগে উঠবেই, যদি ভগবানের সঙ্গে 
তার সম্বন্ধ হয়। শুদ্ধ জীবের স্বরূপ হল সেবকম্বরূপ, সেব্যের 
সঙ্গে সম্বন্ধ হলেই তার সেবকন্ধরূপ জেগে যায়, তাই শুদ্ধ 


২০৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


জীব মাত্রই ভগবানের অনুগত । যে ত্রন্ষের শক্তি এত ভাগে 
বিভক্ত তিনি উরুশক্তি তো বটেই। 

ব্রন্মের শক্তি যে স্বাভাবিক, সেটি শ্ত্রীজীব প্রমাণ সহকারে 
বুঝিয়েছেন । আদিতে এক ব্রহ্ম ছিলেন, তার থেকেই প্রকৃতি । 
এ কোন ওস্তাদের কাছ থেকে পাওয়া শক্তি নয়,_কারণ ব্রহ্ম 
ছাড়া আর কারও অস্তিত্বই তো ছিল নাঁ। তাই এ শক্তি ব্রন্ষের 
উপাধি হতে পারে না। উপাধি হলেই সেটি দ্বিতীয় বস্তু হবে। 
বৈকুগ্ঠাদি ধাম স্বরূপবৈভব বলে ত্রন্মের সঙ্গে এ ধামও ছিল, 
কারণ স্বরূপবৈভব ব্রন্ষের অঙ্গ প্রত্যঙ্জগের মত। যেমন কোন 
ব্যক্তি থাকলে তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গও তার সঙ্গে আছে বুঝে নিতে 
হবে। ্ূর্ধ থাকলেও যেমন তার রশ্মি পরমাণুও তার সঙ্গে 
নিত্য আছে, তেমনি ব্রন্ষের রশ্মির মত বৈকুণ্ঠবৈভবও নিত্য । 
কিন্তু সূর্ধ থাকলেও যেমন রশ্মির সত্তা তেমনি ব্রন্মের সত্তায় 
বৈকুষ্ঠাদির সত্তা । ্তর্য এবং রশ্মি অভিন্ন হলেও সূর্যকে রশ্মির 
প্রকাশক বল! হয়। তেমনি ব্রন্মের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মত বৈকুণ্ঠাদি 
্রক্মধাম হলেও ব্রহ্মকে বৈকুণ্ঠের প্রকাশক বল! হয়। 

ব্রন্মের শক্তি যে স্বাভাবিক ও অচিস্ত্য, তা বিষুপুরাণে বলা 
হয়েছে-_মণি, মন্ত্র মহৌষধির কাজ যেমন অচিন্ত্য, এও তেমনি । 
ব্রহ্ম স্থষ্টি-স্থিতি-লয় কর্তা কি করে বলা যায়? বিষুপুরাণে 
বাক্য আছে ঃ 

নিপু নস্যাপ্রমেয়্তয শুদ্ধস্তাপ্যমলাত্মনঃ। 

এই বাক্যের ওপরে মৈত্রেয় খষি শঙ্কা তুলেছেন_ ব্রহ্ম যদি 

নিগণ হন তাহলে তার পক্ষে জগতকর্তৃত্ব কেমন করে সম্ভবহয় ? 


নবযোগীক্্রসংবাদ ২০৯ 


নিগুণ হওয়ার জন্য ব্রন্মে কর্তৃত্বের বাধকতা আছে, কারণ গুণ 
থেকেই স্থষ্ট্যাদি কাজ দেখা যায়। শ্রীপরাশর এই শঙ্কার উত্তর 
দিয়েছেন হে তপক্ষিশ্রেষ্ঠ মৈত্রেয়, অগ্নির যেমন উষ্ণতা শক্তি 
আছে ত্রন্মের তেমনি সমস্ত শক্তিই আছে, এইজন্য ব্রন্ষের 
হৃ্ট্যাদি কর্তৃত্ব বলা! হয়েছে । স্বামিপাদ 'ীকায় বলেছেন-__ 
সত্বাদিগুণরহিত, অপ্রমেয়, দেশকালাদির দ্বারা অপরিচ্ছিন্ন, শুদ্ধ 
অর্থাৎ সহকারিশুন্, রাগাদিশৃন্য অর্থাৎ অমলাত্মা এবং ভূতব্রহ্ম 
কেমন করে স্থষ্্যাদির কর্তা হতে পারেন? কুস্তকারের গুণ 
আছে তাই সে ঘটের কর্ত! হতে পারে। শ্রীপরাশর শঙ্কা 
পরিহার করে বলেছেন-__-তথাঁপি ব্রন্মের শক্তি অচিন্তাজ্ঞান 
গোচর । অচিন্ত্য কেন? শক্তি বস্ত্র থেকে ভিন্ন না অভিন্ন, 
চিন্তা করতে পারা যায় না, তাই অচিস্ত্য বল] হয়েছে । এখন 
প্রশ্ন হতে পারে বস্ত থেকে শক্তি ভিন্ন অথবা অভিন্ন চিন্তাই 
যদি না করা যায় তাহলে বুঝা যাবে কেমন করে, যে শক্তি 
আছে? অর্থাপত্তিতে বুঝতে হবে। গীনঃ দেবদত্তঃ অহ 
ন ভূঙক্তে, এটি অর্থাপত্তিতে বুঝতে হবে। সে গীন অর্থাৎ 
স্থল, অথচ দিনে যখন খায় না, তখন রাত্রিতে খায়। এইভাবে 
ব্রন্মেরও যে শক্তি আছে সেটিও ভাবে বুঝতে হবে। ব্রন্মের 
ষে ্ষ্ট্যাদ্দি শক্তি এটি ভাবশক্তি, অর্থাৎ স্বাভাবিক শক্তি, 
অর্থাৎ স্বরূপ হতে অভিন্ন । শ্রুতি বলেছেন £ 
পরাস্ত শক্তিবিবিধৈব শ্য়তে। 
স্বাভাবিকী জ্ঞান বল ক্রিয়া চ॥ 
এই শ্রুতিবাক্য শুনবার পরও যদি ব্রন্মের শক্তি স্বাভাবিক 
১৪ 


২১০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


স্বীকার করা না যায় তাহলে আর কি করা যাবে 1 জেগে যদি 
কেউ ঘুমায় তাহলে তাকে জাগান যায় না। জগতে দ্রবোর 
শক্তি স্বাভাবিক নয়। বাঁধা পেলে শক্তি যদি ব্যাহত হয় তাহলে 
তাকে স্বাভাবিক শক্তি বলা যায় না; সে শক্তি আগন্তক । 
ব্রন্মের স্থষ্ট্যাদি শক্তিকে কেউ ব্যাহত করতে পারে না। তাই 
ব্রন্মের এ শক্তি স্বাভাবিক | মণি, মন্ত্র, মহৌষধির শক্তিও ব্যাহত 
হয়। তাই সে শক্তিকে স্বাভাবিক বল! চলে না, কিন্তু ব্রহ্মের 
শক্তি কখনও ব্যাহত হয় না। তাহলে সিদ্ধান্ত দাড়াল যে 
ব্রন্মের এশ্বর্য নিরহ্কূশ। এতে কোন অযৌক্তিকতা৷ নেই, শ্রুতি 
পুরাণ সকলেই ব্বীকার করলেন ব্রন্মের শক্তি স্বাভাবিক | তিনিই 
মহান, তত্র, তন্মাত্র, প্রকৃতি, জগৎ, জীব, স্বরূপবৈভব- এই 
বিভিন্ন রূপে প্রকাশমান । 

গ্রীজীবপাদ্দ বলছেন, অত্র ইয়ং প্রক্রিয়া । এটি শ্রীজীবের 
নিজের মত । স্বরূপবৈভব, তটস্থবৈভব এবং বহিরঙ্গাবৈভব তিনটি 
বৈভবের উৎপত্তিস্থান ব্রহ্মই। প্রথমটি সচ্চিদানন্দ, দ্বিতীয়টি 
অণুচৈতন্য এবং তৃতীয়টিতে সচ্চিদানন্দময়তা একেবারেই নেই। 
ভগবান যে নিজমুখে বলেছেন-_ “ততঃ সর্ধং প্রবর্ততে' । এইখানেই 
বৈষ্ণবদর্শন বেঁচে আছে । সবাইকেই মানতে হবে। অদ্বৈত- 
বাদমতে “একমেবাদিতীয়ম্ । তাদের কোন বালাই নেই। 
তারা ব্রহ্ম ছাড়া আর সব বস্তকেই মিথ্যা বলে। তার! 
বলে ব্রন্ষকে জগং বলে জীব ভ্রম করেছে । অবিষ্ভাবশে ভ্রম 
হয়েছিল, আলো এলেই ভ্রান্তি চলে যাবে । বস্ত যা ছিল তাই 
'থাকবে, জ্ঞানালোকে জগৎ দর্শন থাকবে না, ব্রদ্মদর্শনই হবে । 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২১১ 


ভ্রমে যে জগংবোধ হয়েছিল, তা চলে যাবে। শ্রীজীবপা্দ 
এই মতটি খণ্ডন করেছেন । শ্রীজীবপাদ বলছেন, ওহে অদৈত- 
বাদী, তুমি তো অদৈতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে বসেছ, দ্বিতীয় বস্ত 
মানবে না। তা শুধু দ্বিতীয়বস্ত কেন, তৃতীয় বস্তু পর্যস্ত তো 
তুমি স্বীকার করেছ। রজ্জুতে যে সর্পভ্রম হবে- এখানে অন্ত 
একটি বস্ত তে রজ্ছু বলে স্বীকার করলে । আবার কার ভ্রম 
হবে? চেতন যে তারই তো ভ্রম হবে। তাহলে চেতন জীব 
একজন আছে স্বীকার করা হল । এতে তোমার নিজের মত তো৷ 
নিজেই খণ্ডন করলে । ব্রহ্ম তো একজন চেতন আছেনই । তা 
ছাঁড়া অপর একজন জীবচৈতন্ স্বীকার করা হল । এতে অছৈভ- 
বাদের হানি হল। যদি বল ব্রন্মই জীবের অবস্থায় পড়ে ভ্রান্ত 
হয়েছে, যেমন মহাকাশ ঘ:টর দ্বারা অবচ্ছিন্ন হওয়ায় ঘটাকাশ 
হয়ে যায়, তেমনি অবিষ্ঠা নিমিত্ত ঘটরূপ অস্তঃকরণে ব্রহক্মচৈতন্ 
প্রবেশ করে জীব হয়েছে । ব্রন্গ অখণ্ড হলেও ঘটাবরণে খণ্ড 
হয়েছে, তাহলে অদৈতবাদী,তোমার এই সিদ্ধান্ত দীড়ল-_ত্রহ্মকে 
কোন বস্ত দিয়ে আবরণ কর! যায়-_রজ্জু ব্রহ্ম অন্রান্ত, জীবত্রহ্গ 
ভ্রাস্ত__তাহলে তো অদ্বৈতবাদ টিকল না। জীবকে আলাদ৷ 
বলে স্বীকার করতেই হবে । বৈষ্ণবদর্শন মতে জগৎ সত্য । গীতায় 
সংসারবৃক্ষকে অব্যয় বল। হয়েছে । এই সংসারবৃক্ষ অব্যয় এবং 
অশ্বথ ছুইই । অশ্বথ মানে যেটি আগামী কাল পর্যন্ত থাকবে 
না। এ অবস্থা কখন হবে-যদা হি মহাপুরুষপুরুষ প্রসঙ্গঃ | 
জগং চিরকাল থাকবে না, কিন্তু যখন থাকবে তখন সত্য । স্বপ্ন 


২১২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মিথ্যা, কারণ এর মূলে কোন সত) নেই। কিন্তু জগৎ ধার থেকে 
হয়েছে তিনি সত্যব্ধরূপ । 

অদ্বৈতবেদান্তী বলেন-_ ব্রহ্ম নিগুঁণ, মায়াগুণ মিশ্রিত হয়ে 
সগুণ হয়ে তিনি রামচন্দ্র কষ্ণচন্দ্ররূপে অবতার হয়েছেন । খাদ 
না মিশালে যেমন খাঁটি সোনার আকার হয় না, তেমনি মায়ার 
গুণ মিশ্রণ ছাড়া দেহধারণও অসম্ভব । তবে ব্রন্মের দেহধারণের 
সময় প্রকৃতির রজঃ ও তম: গুণকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র সত্‌ 
গুণকে গ্রহণ করা হয়েছে । বৈষ্ণবদর্শনকিস্তু তাবলেন না । তাদের 
মতে নিগুণ ব্রহ্ম শ্রীগোবিন্দের অঙ্গকাস্তি। ভক্তবাৎসল্যাদি 
গুণ দ্বারা বিভূষিত হলে তাকেই সগুণ ভগবান বলা হয়। এতে 
মায়াগুণের স্পর্শও থাকে না। ভগবান মায়াতে বিচরণ করেও 
মায়া স্পর্শ করেন না, যেমন বুদ্ধি আত্মাতে আশ্রিত হলেও 
আত্মার গুণ তাতে স্পর্শ করে না। 

এতদীশনমীশস্ত প্রকৃতিস্থবোহপি তদ্গুণৈঃ। 

ন যুজ্যতে সদাত্মস্থর্থ। বুদ্ধিস্তদা শ্রয়া ॥ ভা. ১১১৩৮ 
এই মতটি মনের মধ্যে দৃঢ় হলে তবে তার পক্ষে কৃ্চকথা 
শুনবার অধিকার জন্মে । আশ্চর্য বলে মন হয় জলে নামবে 
অথচ কাপড় ভিজবে না_এ উদাহরণ জগতে পাওয়া যায় না। 
অন্বয়মুখে উদাহরণ মেলে না, ব্যতিরেকমুখে উদাহরণ তাও 
কথঞ্চিং। অচিস্ত্য প্রভাবেই ঈশ্বরত্ব । ভগবান প্রকৃতিতে স্থিত 
হয়েও প্রকৃতিকে স্পর্শ করেন না, উদাহরণ মেলে না, কারণ 
উদাহরণ যা! হবে তা তো৷ লৌকিক বস্ত্র নিয়ে। 

উপরের শ্লোকটি ভগবানের দেহরক্ষীর কাজ করেছে! 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২১৩ 


ভগবান তো! রক্ষিত হয়েই আছেন,তার পক্ষে প্রয়োজন নয়,কিন্ত 
আমাদের বুদ্ধির কাছে এটি দেহরক্ষীর কাঁজ করেছে। অর্থাৎ 
ভগবানের সম্বন্ধে কোন কথা চিন্তা করার আগে মনে রাখতে হবে 
যে কোনপ্রকার মায়াগুণ তাকে স্পর্শ করে না। ব্যতিরেকমুখে 
উদাহরণ যেমন- বুদ্ধি আত্মাকে আশ্রয় করে আছে। 

ইন্দ্রিয়াণি পরান্যাহুরিন্দিয়েভ্যঃ পরং মনঃ। 

মনসস্ত পরা বুদ্ধির্ষো বুদ্ধে: পরতস্তব সঃ ॥ গীতা ৩1৪২ 
বুদ্ধি আত্মাতে স্থিত কিন্তু আত্মার সচ্চিদানন্দমময়তা ৭ 
বুদ্ধিতে স্পর্শ হয় না। ভাগবতদর্শন মতে ব্রহ্মকে মায়া কখনও 
কোন অবস্থাতে স্পর্শ করে না, যেমন পরশমণি কখনও লোহার 
থালায় খাকে না। পরশমণি লোহা! স্পর্শ করলেই যেমন লোহ। 
সোনা হয়ে যায়, ঈশ্বরও তেমনি প্রকৃতি স্পর্শ করেন না। 
প্রকৃতিকে স্পর্শ করলেই সেটি অপ্রাকৃত হয়ে যায়। ভক্ত যখন 
ভগবদ্দর্শন করে তখন ভক্তদেহ চিন্ময় হয়ে যায়। শ্রীগৌর- 
সুন্দরের স্বরূপ তাই স্বরূপ-জাগান স্বরূপ । ব্যাত্রকে স্পর্শ করে 
তার স্বরূপ জাগিয়ে প্রেমে নাচিয়েছেন । শ্রীপাদ রামদাস বাবাজী 
মহারাজ কাঁর্তন প্রসঙ্গে গেয়েছেন £ 

ভাঁবনিধি গৌরাঙ্গ আমার অভাবের সঙ্গ করে না 

ভাবের অভাব রাখতে পারে না 
স্বভাব জাগায়ে করে পঙ্গ-_ 

ঈশ্বর সর্বদা নিগুণই আছেন, অর্থাৎ প্রকৃতিগুণস্পর্শহীন । 
বৈষ্ণব দর্শন মতে ঈশ্বরমাত্রই নিগু৭ প্রাকৃতগুণরহিত এবং 
যখন লীলাযুক্ত হন তখনই তিনি সগড৭। জলের বুদ্বুদ ব! 


২১৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তরঙ্ক যেমন জল ছাড়া কিছু নয় এবং অণুজলে তা দেখা যায় 
না। এটি বিভুজলের বিলাস, তেমনি সচ্চিদানন্দ বিভূর নিতা- 
বিলাস লীলাতরঙ্গ । ভগবং-ক্রীড়ার নামই লীলা-_-এই গণ 
এবং লীল৷ বিবিধপ্রকার । বৈষ্ণবদর্শনে ঈশ্বর মাত্রই নিগুণ 
অর্থাৎ প্রাকৃতগুণরহিত আর যখন লীলাযুক্ত হন, তখনই তিনি 
সগুণ। ব্রহ্ষকে অরূপ, অনাম বল হয়েছে । ভাগবতসন্দতে 
শ্রীজীবপাদ বিচার করেছেন, ভগবানের রূপ প্রাকৃত রূপ নয় 
তাই অরূপ, এবং ভগবানের নাম প্রাকৃত নাম নয় । তাই অনাম 
বল৷। হল, প্রাকৃত শব্দ ভগবানের নাম নয়। প্রাকৃত শব্দ 
উচ্চারণ করলে বাচ্য আসে না, যেমন “বৃক্ষ” “বৃক্ষ জপ করলে 
বৃক্ষ কাছে আসে না। কিন্তু ভগবানের নাম জপ করলে বাচ্য 
আসে, কারণ নাম এবং নামী অভিন্ন, বরং নামে ভোগ কিছু 
বেশী । নামে বাচক বাচা ছুই-ই আছে, কিন্তু নামীতে শুধুই 
ৰাচ্য। তাই নামী অপেক্ষা নাম বেশী শক্তিশালী । কৃষ্ণ, 
গোবিন্দ নাম বললে স্বরূপ পাওয়া ষায়। নামীকে নামায় বলেই 
নাম, বলা হয়। নামই তাকে নামায় । প্রাকৃত রূপের নশ্বরতা 
গোবিন্দ নেই, তাই অরূপ জগতের সব কিছুই ব্রন্ষের প্রকাশ 
স্বূপবৈভব ধাম লীলা! পরিকর-_এদের ধ্যান করলে কাজ 
হবে। কিন্তু জীব চিন্তা করে লাভ নেই, কারণ জীব অণু। অণু 
যে তার অভাব জেগেই আছে। এ জগতেও দেখা যায়, যে 
বিষয়ে অণু সে সেই বিষয়ে বিভুর কাছে যায়__অণু প্রার্থা, বিভূ 
দাতা, অণু উপাসক,; বিভু উপাস্ত । তাহলে দেখা গেল, একই 
তত্ব স্বরূপ, স্বরূপ বৈভব, তটস্থ বৈভব, জীবরূপে এবং বহিরঙ্গা 


নবযোগীক্দ্রসংবাদ ২১৫ 


বৈভব জড় জগতরূপে এই চতুধণ বর্তমান । স্বরূপ এবং স্বরূপ- 
বৈভব উপান্ত, জীব উপাসক। বহিরঙ্গা জগৎ উপাস্তও নয় 
উপাসকও নয়। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, বহিরঙ্গ। বৈভব এই 
জগতের তাহলে প্রয়োজন কি? উপাস্য ও উপাসক হলেই 
তো কাজ মিটে যায়; কিন্তু তারও প্রয়োজন আছে | মা 
সন্তান প্রসব করলেও ধাইমার কাজও তো বড় কমনয়। 
বহিরঙ্গা জগং ধাইমার কাজ করেছে । এই মায়ার জগং 
উপসৈনার উপকরণ যুগিয়েছে । আসন পাতা, জল দেওয়া, 
ফুল চন্দন যোগাড় করা-_ এগুলি মায়াশক্তিরই কাজ। মায়! 
বলছেন, আমার দেওয়া এই সব উপকরণ দিয়ে হে জীব, 
তোমরা প্রাণভরে গৌর-গোবিন্দ বল। 

ব্রহ্ষের স্বরূপ, স্বরূপবৈভব জীব এবং প্রধানরূপে যে প্রকাশ 
সেটি সূর্য, সূর্যমণ্তলের তেজ, মণ্ডলের বাইরের তেজ এব১ 
প্রতিচ্ছবির মত। সর্ষের প্রতিবিম্ব চোখ ঝলসিয়ে দেয়। 
পরমাত্সাকে বাদ দিয়ে যা প্রকাশ পায় তারই নাম মায়া । 
প্রতিবিম্ব সূর্য নয়, সূর্যের আভাস, অবশ্য সূর্য না থাকলে এই 
আভাস হয় না। দর্পণে যে প্রতিবিম্ব তা সূর্য নয়, তেমনি 
ভগবান আছেন বলেই বহিরঙ্গার কাজ আছে | জীব হল 
রষ্টা, মায়া এই জীবের বৃদ্ধিরূপ নেত্রকে ব্যাকুলিত করে, আবৃত 
করে এবং ধর্ণশাবল্য স্থষ্টি করে অর্থাৎ সত্বাদি প্রকৃতিকে ফুটিয়ে 
তুলেছে-_যার বর্ণ সাদা, লাল এবং কাল। পরে এই প্রধানই 
নানা আকারে ভ্ত্রী-পুত্ররূপে প্রকাশ পায়। চোখ বন্ধ থাকলেই 
বর্ণশাবল্য এবং মিথ্যা নানা আকারে দেখা যায়, কিন্ত চোখ 


২১৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


খুললে আর সে সব দেখা যায় না । তেমনি শ্রীগুরুকূপায় যখন 
ভক্তিচক্ষু উন্মীলিত হবে তখন আর নানা আকার দেখতে 
হবে না_-তদনুগতরূপে দেখবে । বৈষ্ণবদর্শনমতে স্বরূপ এবং 
ত্বরূপশক্তি অভিন্ন। অদ্বৈতবেদাস্ত স্বরূপ স্বীকার করে কিন্ত 
্বরূপশক্তি ত্বীকার করে না-এইখানেই উভয় মতে পার্থক্য । 
স্বরূপ এবং স্বরূপশক্তি যদিও অভিন্ন, তথাপি স্বরূপশক্তি স্বীকারে 
সৌন্দর্য বেশী হয় । যেমন গোলাপের মাধুর্য আগে পাওয়া 
যায় না, আগে কাটার আঘাত লাগে, তেমনি কেবল সৎ, কেবল 
চিৎ, কেবল আনন্দ, অর্থাৎ নিক্ক্রিয় ব্রন্মের উপাসনাতেও তেমনি 
কাটার আঘাতই লাগে । তাই ভগবান বললেন £ 


ক্লেশোহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্‌। 
অবক্তা হি গতিছু2খং দেহবন্ভিরবাপ্যতে ॥ গীতা ১২৫ 


শক্তি বিকশিত না হওয়া পর্স্ত আনন্দ নেই। বিকশিত 
শক্তির মধ্যেই ক্রিয়া আছে এবং ক্রিয়াতেই আনন্দ । তখন 
সান্নিধ্যে গেলেই আনন্দ, শক্তি না থাকলে আনন্দ পেতে পারে 
না। আচ্ছা, ব্রহ্ম তো! সবব্যাপক, তাহলে আর সাধক তার 
দিকে এগিয়ে যাবে কেমন করে? বস্তু সর্বব্যাপক হলে তার 
দিকে এগিয়ে যাবার প্রয়োজন নেই, তবে করণীয় কি ? শক্তিকে 
নিজের দিকে উন্মুখ করার চেষ্টাই হল সাধনা । ভগবংকরুণ! 
না পেলে যদি অচল অবস্থা হয়, তাহলে অনুকুল চেষ্টা করতে 
হবে । এই অনুকুল চেষ্টাই শ্রবণাদি ভক্তিযাজন। মায়ার বৃত্তি 
ত্রিবিধা_ প্রধান, বিদ্যা, অবিষ্ভা । বিষ্ণুপুরাণে বল! হয়েছে £ 


নবযোগীক্ররলংবাদ ১১শ 


বিষুশক্তিঃ পরা প্রোক্তা ক্ষেত্রজ্বাখ্যা তথাপর! । 
অবিদ্যা কর্মসংজ্ান্যা৷ তৃতীয়। শক্তিরিষ্যতে ॥ 
মায়! প্রথমে তার প্রকৃতি উপাদানে গঠিত বস্তব জীবকে দিতে 
সাহস করে নি। কারণ জী.বর স্বরূপ তো মায়া জানে, সে 
নিতাকৃষ্দাস--সে কেন এই পচা জিনিষ নেবে? আত্মজ্ঞানের 
বোধ থাক! পর্ষন্ত সে মায়ার জিনিস স্পর্শ করবে না। মায়া 
তো জানে, তাই আত্মজ্ঞান অর্থাৎ জীবের হ্বরূপটি ভোলাবার 
জন্য অবিগ্াকে জীবের কাছে পাঠাল। অবিদ্ভা জীবের আত্ম- 
স্বরূপ ভুলিয়ে দেবার পর মায়ার দেহ, ইন্জরিয়, মন, বুদ্ধি জীবকে 
গছাল। তখনই জী:বর “আমি” “আমার-এই বোধ হল। 
মায়ার তৃতীয়া শক্তি বিদ্যা-_এ শক্তি মহামায়া প্রায়ই খরচ 
করেন না। এই বিদ্যাবৃত্তি লাভের জন্যই মহামায়ার উপাসনা 
করা হয়। মহামায়ার কাছে শিশুর মত প্রার্থনা করতে হবে, 
সম্পণ আত্মসমর্পণ করতে হবে । বলতে হবে-_“মা, এতদিন তো 
তোর অবিদ্তাবৃত্তি দিয়ে আমাদের ভূলিয়ে রেখেছিস্‌, এখন তা 
সরিয়ে তোর বিগ্যাবৃন্তি আমাদের একটু দান কর । বিদ্যা জ্ঞান 
দান কর, যাতে অবিদ্ভাবন্ধন রজ্ভ্র কেটে যায়। বিদ্যাবৃত্তির 
কপা দান করে অবিদ্যাবন্ধষন ছেদন কর | এর জঙ্যাই 
মহামায়ার আরাধনা করা দরকার । অজ্ঞানতাই বহিরঙ্গার সঙ্গে 
জীবের সম্বন্ধ করিয়েছে । মায়ার দেওয়। বস্ত যে আসলে সং 
নয়, “সদ্দিব* সেটি জীব যাতে বুঝতে পারে, এর জন্য মায়া চেষ্টা 
করে। পুত্রকে জীব সৎ ভাবে, মায়া পুত্রকে মেরে ফেলে জীবকে 
বুঝায়--জীব। পুত্র তোমার সং নয়, অর্থকে জীব সং ভাবে-_ 


২১৮ শবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মায়া অর্থ নাশ করে বুঝায় অর্থ সংনয়। জীবকে প্রতি পদে 
পদে বুঝাতে চেষ্টা করছে_-মায়ার জগৎ সৎ নয়, “সদিব”__এটি 
বুঝে নিয়ে আসল সং-এর দিকে ফিরে বাও। জীবকে মহামায়ার 
এইটিই সুযোগ দেওয়া, গোবিন্দপাদপদ্ন স্মরণ করাবার ইঙ্গিত। 
কিন্তু আমরা এতই মূর্খ যে তার ইসারা আমরা .বুঝি না । স্বরূপ 
শক্তি সাক্ষাৎ উপাস্ত কিন্তু বহিরঙ্গ' সাক্ষাৎ উপাস্ত নয়। 
অতিথির মতই জীব মায়ার রাজ্যে এসেছে-_ থাকার জন্য আসে 
নি, যাবার জন্যই এসেছে । যাবার মত অবস্থ। তৈরী করে 
যেতে হবে । মহামায়া আমাদের প্রাকৃত দেহ, ইন্ড্রিয় দিয়েছেন 
এবং তাই দিয়ে আমরা কষ্ণপাদপদ্মে যাবার যোগ্যতা অর্জন 
করে নিতে পারব, এটি মহামায়ার দান__এই ভেবে মহামায়ার 
আনন্দেবুক ভরে আছে । দোষে গুণে বস্ত-_কৃষ্পাদপদ্মেযাওয়ার 
যোগ্যতা যে অংশ থেকে পাওয়া যাবে না, সংসারের সে অংশটি 
ত্যাজ্য, গৌরগোবিন্দ চিন্তার বিরোধী য৷ তা ত্যাজ্য । এক ভরি 
সোনার ডেল! এবং এক ভরি সোনার হার-_এই ছুই-এর মধ্যে 
উপভোগ্য বলে যেমন হারটিই গ্রহণীয় তেমনি ত্রহ্মবস্ত সোনার 
ডেলার মত আর গোবিন্দ হলেন হারস্থানীয়, অর্থাং ব্রহ্ম 
উপভোগ্যতা নয়; বিস্ত সলীল ভগবান তৎক্ষণাৎ উপভোগ্য । 
সোনাকে যতটা গঠন করে হার কর! ষায়, ততটা গোবিন্দের 
উপভোগ্যত। । আনন্দের গঠন এর চেয়ে বেশী হতে পারে না । 
“তত্বমসি' মহাবাক্যে অদ্বৈতবেদাস্ত বললেন--তংই ত্বম্‌ 
অথব! ত্বমই তত, অর্থাৎ জীব এবং ব্রহ্মের অভেদ। তাই যদি 
হয় তাহলে তং পূর্ণানন্দ ত্বম্‌ পূর্ণহ্খ কেন? অদৈতবেদাস্ত 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২১৯ 


বললেন-_ কোন অংশ ত্যাগ করে, কোন অংশ গ্রহণ করে “তং 
তম অসি” এই মহাঁবাক্য গ্রহণ করতে হবে। তারা জীবকে 
ব্রহ্ম করবেই। তা না হলে অদ্বৈত থাকে না। স্বপ্রে দেখা 
বনের বাঘ তাড়া করলে বাঘের তাড়া মিথ্যা হলেও কলেবর 
যেমন ঘর্মীক্ত হয়, তেমনি সংসার বনে অবিদ)1 বাঘ তাড়া করেছে 
তাতে জীব ভীত সন্ত্রস্ত । স্বপ্র ভাঙলে যে তুমি সেই তুমি । 
জহতবৃত্তি এবং অজহৎবৃত্তি ধরে যেমন স্থান, কাল, স্থুল, কৃশ, 
ধনী, দরিদ্র ভেদ সত্বেও “সোহয়ং দেবদত্তঃ বলা হয় । এই মতে 
উপাধি বাদ দিয়ে শুদ্ধ দেবদত্তপিণ্ডে লক্ষণা, এখানেও তেমনি 
শুদ্ধ চৈতন্যে লক্ষণা_তদেকান্ত জীব, স্্রীপাদ বললেন। 
সূর্যমগ্ডলের বাইরের রশ্বিস্থানীয় হল শুদ্ধজীব। একান্ত শবের 
আর্থ চৈতন্যাংশে জীব ভগবানের সঙ্গে অভিন্ন হয়েও ভিন্ন । ব্রহ্ম 
না থাকলে জীব থাকে না, কিন্ত জীব না থাকলে ব্রহ্ম থাকে । 
এই অংশে ভেদ। অণুচৈতন্ত জীবের চেতন্য দেহের সববাংশে 
ব্যাপ্ত । আচাষ বেদব্যাস বললেন-_হরিচন্দনবিন্দুবৎ, প্রদীপ- 
প্রভাব হৃদয়ে চৈতন্ত থাকে? কিন্তু চিমটি কাটলে পায়ে 
লাগে। আলোর মত গৃহের এক জায়গায় থেকেও সবত্র 
আলোকিত করে। মুক্ত দশাতেও, এমন কি ত্রহ্মসাধুজ্য 
অবস্থাতেও ব্রন্মের সঙ্গে জীবের ভেদ বর্তমান। শ্রতি 
বললেন-_'যথোদকং শুদ্ধে শুদ্ধম আসিত্তং তাদৃগেব 
ভবতি। তত্য ইব দৃশ্ঠটতে__তাৃকৃ্‌। তাদূক শবটিও 
সাদৃশ্যবাচক । তাদৃক্‌ বললেন, অর্থাৎ তার মত, তৎ বলেন 
নি। সাদৃশ্ত বলতে তাই বুঝায়_-“তৎ ভিন্নত্বে সতি 


২২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


তদ্গতভূয়োধর্মবত্বমূ।” যেমন চাদের মত মুখ, ব্রহ্ম সম ব্রহ্ম 
হল না। এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাদৃক্‌ বলছ কেন? তংই 
বল। মধ্বাচার্ধ বললেন- এক পোয়া জলে এক পোয়া জল 
মিশালে আধসের হয়, ওজন বেড়ে যায়। এক পোয়া আর 
থাকে না। বাইরে থেকে জল ( ষেটি মিশান হল ), তার পুথক 
সত্ব! প্রতিভাত হয় না বটে, কিন্তু বিচারে নিজ সত্তার ভেদ 
বর্তমান । জীবও তেমনি নিজ সত্তা বজায় রাখে । জীব ত্রন্ষের 
সঙ্গে চিদংশে অভেদ হয়েও নিত্য ভেদ বজায় রাখে । ব্যবহারিক 
জগতে তো এ ভেদ বর্তমান । রাজা এবং প্রজা উভয়ই মানুষ ; 
কিন্তু তার ভেদ বর্তমান । মানুষ অংশে মাত্র অভিন্ন । ব্রহ্ম 
সাযুজা কেমন করে হয়? বিচারে ভেদ থাকে, তবে চোখে ভেদ 
দেখা যায় না। 

যদি তম পদার্থ বুঝা যায়, তাহলে তৎ বস্তু বুঝ! যাবে। দর্শন 
শাস্ত্র মাত্রই “তৎ-কে বুঝাবে এবং এই “তৎ-কে বুঝাবে বলেই 
“ত্রমূ্‌কে' বুঝাচ্ছে ৷ গীতায় ২য় অধ্যায়ে ভগবান এই “ত্বম্‌ পদার্থ 
জীবাত্মাকেই নিরূপণ করেছেন । “হ্ম্চ না বুঝলে “তত, বুঝা 
যাবে না। কারণ ত্বম্‌ অর্থাৎ জীবাত্াই তত্বের বোদ্ধ।। তত 
বুঝতে জীবাত্মা ছাড়া আর কেউ পারে না। দেহ ইন্দ্রিয় 
চতুবিংশতি তত্ব কেউ পারে না । মনের চেতনবৃত্তি অণুচৈতন্য | 
তারা নিজেকে আলোকিত করতে পারে- সকলকে পারে না। 
সকলকে যিনি আলোকিত করেন, তিনি পরমাত্মারূপে সহস্রারে 
আছেন । শুদ্ধ ভক্তিমাগে তম্‌ খুঁজতে হবে না, “তত কৃষ্ণপাদ- 
পদ্মখু'জতে হবে । এটি খু'জতে খু'জতেই “তম পাওয়া যাবে। 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২২১ 


মহাজন বলেছেন, সোনার মোহর ও লোহার ছু'চ ছুইই 
হারিয়েছে । মোহর হল কৃষ্ণপাদপন্প এবং লোহার ছুঁ'চহল আত্ম- 
জ্ঞান । আলো জ্বালতে হবে মোহর খু'জবার জন্য, ছু'চ খুজবার। 
জন্য নয় । মোহর খু'জবার জন্য আলে। জ্বাললে ছু'চ আপনিই 
পাওয়া! যাবে। আর ছুচ যদি নাও পাওয়া যায়, তাতেও 
যায় আসে না। গোম্বামিপাদ বলেছেন,-ভক্তিপ্রেমের আলো 
জ্বাললে কৃষ্ণপাদপন্প তে। পাওয়া যাবেই আত্মজ্ঞান লাভও বাদ 
যাবে না। কারণ কৃষ্ণপাদ্পন্স জ্ঞানলাভের সঙ্গে আত্মজ্ঞান 
অন্থগতই থাকে । “ম্বতঃসিদ্ধ জীবর নাহি কৃষ্স্মতিজ্ঞান |, 
কৃষ্ণপাদপন্ন যখন পাওয়া! যাবে, তখন জীবের জ্ঞান হবে_ “কৃষ্ণ 
মোর প্রভু ত্রাতা জীবের হয় জ্ঞান'। কৃষ্ণকেই প্রতু মনে 
হলেই নিজেকে দাম বলে মনে হবে--জীব নিত্য কৃষ্দাস+_ 
এই জ্ভানটিই তো! জীবের নিজন্ব স্বরূপ । তাহলে কৃষ্ণপাদপদ্ম 
লাভ হলেই আত্মন্ানও তদন্ুগতভাবে লাভ হয়ে যায় । আমি 
কেমন 1 আমি কৃষ্ণদাস--এইটি খুজে পাওয়াই আত্মজ্ঞান 
লাভ । যেমন পাকের জন্য অগ্নি প্রজ্বলিত করলে খাগ্ভ তো 
প্রস্তুত করেই, তাতে ক্ষুধা নিবারণ হয় আবার শীত নিবারণও 
করে। যদিও শীত নিবারণের জন্য অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয় 
নি। তেমনি প্রেমখাদ্য রাধবার জন্য ভক্তি অগ্নি জাললেও 
প্রেম রান্না করে গোবিন্দ পাদপন্ধ তো মিলিয়ে দেবেই, 
উপরন্ত অবিদ্যারূপ শীতাদি জড়তাও নিবারণ করবে । যোগীন্দর 
এইভাবে অণুটৈতন্য জীবত্বাকে বুঝিয়ে বিভুচেতন্য পরমাস্মাকে 


বুঝাবেন। 


২২২ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


আত্মার জন্ম হতে মৃত্যু পর্যস্ত কোন ভাববিকারই নেই। 
জন্মাদি যা কিছু দেহ-ইন্দ্রিয়ের । এই দেহ আবার ছ্রকম-_ 
স্থল এবং সক্ষম । যেমন গাছ আছে তাতে প্রতি বছর ফল 
জন্মায়, ফুল ফোটে । তেমনি মৃত্যুর পর দেহ-ইন্দ্িয় জন্মাচ্ছে ! 
আত্মা যেমন তেমনি থাকে--তার জন্ম হয় না । দেহের, মনের 
সন্থখ-ছুঃখ আত্মার গায়ে লাগে না কারণ আত্মা সম্বন্ধে বলা 
হয়েছে সে হল অবস্থাবতাং দ্রষ্টা । অর্থাৎ দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি 
যাদের অবস্থান্তর আছে তাদের সকলকে দর্শন করে, কিন্ত নহি 
তদবস্থাং ভবতি । যেমন রোগীর কষ্টের দ্রষ্টী চিকিৎসক, তাই 
বলেরোগীর কষ্ট তো চিকিৎসক অনুভব করে না। আত্মার 
নিজের কোন অবস্থা নেই, মে দেহের অবস্থা দেখছে মাত্র। এ 
আত্মা আবনাশী, উপলব্ধি মাত্র জ্ঞানৈকরূপম্। আত্মা আত্মাকে 
বুঝে, অর্থাৎ আত্মা নিজেই কর্তা, নিজেই কর্ম_জ্ঞাতা, জ্ঞান, 
জ্ঞেয় সবই আত্মা । তখন নিমিরাজার পক্ষ থেকে স্বামিপাদ 
প্রশ্ন তুলেছেন আত্মা যদি উপলব্ধিমাত্র হয়, তাহলে তো 
ক্ষণিকপক্ষ এসে যায় । বৌদ্ধের ক্ষণিকবাদ-_প্রথম ক্ষণে উৎপত্তি, 
দ্বিতীয় ক্ষণে স্থিতি, তৃতীয় ক্ষণে বিনাশ । উপলব্ধি যে ক্ষণে হচ্ছে 
সেই ক্ষণেই মাত্র আত্মার বোধ। অন্য সময়ে আর আত্মবোধ 
নেই। না তা বল! যাবে না। আত্মা সর্বদা সর্ধত্র অনপায়ী, 
আত্মার কখনও বিনাশ হয় না! । জ্ঞান ঠিক থাকে উপাধির 
বিনাশ হয়ঃ যেমন, নীলজ্ঞানম্‌ জাতম্‌ গীতজ্ঞানম্‌ নষ্টম্‌। 
মাটির দোকানে যেমন হীড়ি-কলমী যাই ভাঙুক, মাটি ভাঙে 
নি--আকার ভাঙে, মাটি ভাঙে না। তেমনি দেহ-ইন্দ্রিয়াদি 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২২৩ 


ব্যভিচারী বস্তুর মধ্যে থেকেও আত্মা অব্যভিচারী । এই 
আত্মাকে উপলব্ধি করতে হবে। ইন্দ্রিয় বৃত্তিকে লয় করে 
আতকে জানতে হবে। এখন কথা হচ্ছে এই ইন্ড্িয়বৃত্তিকে 
লয় করবে কে? এই আত্মাকে খু'ঁজবার সুবিধা করে দেবে 
দর্শন__এইটিই দর্শনের উপকারিতা । কিন্ত এই আত্মাকে 
তো৷ আমর! অবিকারী হিসাবে দেখতে পাই না__বিকারী বলেই 
তো! তাকে উপলব্ধি করি ; যেমন, অহং পিতা, অহং মাতা, অহং 
কুলীনঃ অহং পগ্ডিতঃ--এ সবই তো বিকৃত আত্মার পরিচয় । 
দেহাদির বিকার আত্মাতে লাগবে কেন? আগুন যেমন হাড়িতে 
লাগলেও জল তো৷ গরম হচ্ছে । জীবের তিনটি অবস্থা__জাগ্রৎ, 
স্বপ্ন ও সুযুপ্তি। জাগ্রত অবস্থাতে ইন্দ্রিয় জেগে থাকে, 
স্বপ্নাবস্থায় মন-অহংকার জেগে থাকে, আর স্ুধুপ্তিতে অহংকার 
থাকে নাকুটস্থ আত্মার উপলব্ধি হয়। তখন আত্মার গায়ে 
জড়ান উপাধি ঘুমিয়ে গেছে। সুষুপ্তি অবস্থায় আত্মা হল 
উপাধিশুন্ত আত্মা, এখানে অহঙ্কার পর্যন্ত লয় হয়ে যায়। 
তাহলে আত্মা তো শূন্য হয়ে যায় না, অন্য পার্্চর সব মরে 
গেলেও আত্মা থাকে । এইটিই শুদ্ধ আঁয্মা। আত্ম! যে থাকে 
নৃষুঝ্িকালে তা কেমন করে বুঝা ঘাঁয়? কারণ নুষুপ্তি ভাঙবার 
পর অনুস্মৃতি হয় তখন আর বিশেষ জ্ঞান থাকে না 
“ম্ুখমহমন্াপ্সম_ ন কিঞ্চিদবেদিষম্‌-__'আমি খুব স্থুখে ঘুমিয়েছি, 
কিছুই জানতে পারিনি'_-এই বোধ হয় মাত্র। স্মুযুপ্তিকালে 
স্থখময় আত্ম সাক্ষী, তখন এই অন্ুতব হয়-_-পরে তারই স্মরণ 
হয়। অনুভব না থাকলে পরে স্মরণ হতে পারত না। 


২২৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


সুযুন্তিকালে স্থখের অনুভূতি আত্মাই করেছিল-_ যে অন্ৃভব 
করে সেই আত্মা । 
এখন নিমিরাজ প্রশ্ন করছেন-ন্ুুুপ্তিকাংল যদি নিত্য 
আত্মান্ভবই হয়, তাহলে জাগ্রত অবস্থায় জীব আবার 
ংসারবন্ধনে যুক্ত হয় কেমন করে ? সংসারবন্ধনই যদি পুনরায় 
হয় তাহলে এই আত্মান্ুভবের কি দাম? ন্যুপ্তকালে যে 
আত্মান্থুভব হয় এ অনুভব অস্পষ্ট। বিষয় সম্বন্ধে অস্পষ্ট। 
শ্রুতি বলেছেন _দ্রষ্টা এবং দৃশ্য ছুই-ই লোপ হতে হবে, তবে 
আত্মান্ুভব স্বচ্ছ হবে এবং স্বচ্ছ হলে বিষয়বাসন! ত্যাগ হবে। 
এই স্বচ্ছ আত্মানুভূতি কেমন করে হবে? ন্ুযুপ্তিকালে অবিদ্যা 
ও তার সংস্কার থেকে যায়। 'তাই আত্মান্থৃভৃতি স্বচ্ছ হতে পারে 
না। তখন মহারাজ নিমি প্রশ্ন করেছেন_-তাহলে কখন অর্থাৎ 
কি ভাবে আত্মানুতূতি স্বচ্ছ হবে যাতে বিষয়বন্ধনঃঅর্থাৎ সংসার 
আর থাকবে না। যোগীন্দ্র বললেন-_এর আর দ্বিতীয় উপায় 
নেই। মহারাজ, একমাত্র অজ্নাভ শ্রীভগবানের চরণে উরুভক্তি 
ব্যতীত অন্ত কোন উপায় নেই। এই উরুভক্তি মহতী ভক্তির 
দ্বারা চিত্তের গুণ এবং কর্মজনিত মলিনতা দূরীভূত হয়। কর্ম 
তিন প্রকার- -দাত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক | রাজসিক 
তামসিক কর্মের মালিন্য তো। আছেই, সাত্বিক কর্মেরও মালিম্য 
আছে। চিনির রম তো৷ সবই মিষ্টি, তবু ভাল খাদ্য করতে 
গেলে চিনির রসেরও যেমন গাঁদ ফেলতে হয়, তেমনি সাত্বিক 
কর্মজনিত মালিন্তকেও ত্যাগ করতে হবে । এই ময়লা কি? 
যা ফেলে দিতে হবে তার নামই মালিম্ত । সত্বগুণ থেকে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২২৫ 


আত্মজ্ঞান জন্মায় এটিও গাদ, এটিও মালিন্ত ; একেও ত্যাগ 
করতে হবে । ভগবান বলেছেন _“জ্ঞানঞ্চ ময়ি সন্গসেৎ। 
গোবিন্দপাদপদস্মের রসমাধুরী সন্দেশ যারা তৈরী করবে তাদের 
পক্ষে সাত্বিক কর্মের গাদ ফেলতে হবে । এই গাদ অন্য গবাদি 
পশুর খাদ্য হয়ত হতে পারে, কিন্ত সন্দেশের কারিগরের তাতে 
প্রয়োজন নেই । তেমনি সাত্বিক কর্ম জ্ঞানী, যোগী, নিষ্কাম 
কর্মীর হব্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু গোবিন্দপপাদপন্নসেবী 
ব্যক্তির পক্ষে ত৷ পরিত্যাজ্য ৷ চিত্তকে ধৌত করে নিতে হবে। 
শ্রবণ-কীর্তনরূপ জল সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। অন্ত কিছু 
দিয়ে পরিষ্কার করাায় ন1। শ্রীমন্মহাপ্রভুর বাক্য--চেতোদর্পণ- 
মার্জনম্‌”_ধাতুর ময়লা! যেমন জল দিয়ে ধুলে যায় না, আগুনে 
পোড়াতে হয়, তেমনি চিত্তসোনাকে আগুনে দিতে হবে । জীব- 
চৈতন্য তো খাঁটি সোনা । সোনা যারা চেনে তারা দেখেই 
বুতে পারে, খাঁটি সোনা না খাদ আছে | সাধুবগুরু-বৈষ্ঞব 
জীবকে দেখেই বললেন-__স্বরূপ জীবের খাঁটি সোনারই বটে ; 
কিন্ত খাদ থাকায় রঙ ঠিক ফোটে নি। অর্থাৎ অষ্ট সাত্বিক 
বিকার দেখা যাচ্ছে না। তাই তারা বললেন এতে খাদ আছে । 
উরুভক্তি অর্থাৎ অনিমিত্তা ভাগবতী ভক্তির দ্বারা এই খাদ দূর 
করতে হবে। প্রাকৃত এষণ। ত্যাগ করে গোবিন্দচরণ এষণার 
নাম উরুভক্তি। আর বণ! মানে এস না। আদর করে 
ডাকা-_-হে গোবিন্দ, এস না গোবিন্দ, তুমি না এলে আমার 
হবে না।” ভগবান উদ্ধবজীকে বলেছেন চোখের জল দিয়ে 
চিত্ব ধৌত না করলে চিত্ত শুদ্ধ হবে কেমন করে? চক্ষু 
১৫ 


২২৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


নির্ল হলে যেমন তূর্য দেখ! যায়, তেমনি গোবিন্দচরণে যদি 
উত্কাময়ী ভক্তি লাভ হয়, তাহলে তার দ্বারা কেবলমাত্র 
আত্মতত্ব উপলব্ধি করবে কেন? তাই শ্রীজীবপাদ বললেন-_ 
আত্মতবব তো অতি সামান্য, সেই বিশুদ্ধ চিত্ত দ্বারা সে 
ভগবানকে উপলব্ধি করবে । আত্মতত্ব অর্থাৎ আত্মনঃ জীবাত্বন; 
তত্বম আশ্রয়ঃ। জীবাত্বার ধিনি তত্ব অর্থাৎ আশ্রয়- অর্থাৎ 
শ্রীভগবান শ্রীগোবিন্দকেই উপলব্ধি করবে । মহতী ভক্তির 
দ্বার চিত্ত মাজিত হলে তাতে মধুন্দনের প্রতিবিম্ব পড়ে । কিন্তু 
প্রাকৃত দর্পণের প্রতিবিম্ব প্রতিবিস্বই থাকে, ছায়াই থাকে, 
কায়া থাকে ন। বস্ত থাকে না; কিন্তু সত্য বস্তুর ছায়া! প্রভিবিশ্ব 
হয় না। তাই চিত্তে প্রতিবিষ্ব পড়ে না বস্তুই পড়ে। বিশ্বই 
পড়ে, প্রতিবিম্ব নয়। বদি প্রতিবিম্ব হত তাহলে ভগবান ঠিক 
ঠিক তেমন বুঝা যেত না। কারণ প্রতিবিদ্বের নিজস্ব কোন 
স্বাধীনতা নেই__যেমন যেমন বি্ব প্রতিবিস্বের কাজ ঠিক 
তেমনি । তবে যে চিত্তকে দর্পণ বল! হল. প্রতিবিম্বের মত 
মনে হয়--ভগবান ঠিক কেমন প্রথমে বুঝা যায় না। প্রথমে 
অনুমান করা হয়, ঈবৎ অন্ৃভূতিই প্রতিবিষ্বস্থানীয় । শুদ্ধাভক্তি 
শ্ীকষ্ণনামসঙ্ীর্তন মহাদাবাগ্নি নিবাপণ করে । মহাদাবাগ্রি 
বল। হল কারণ এ আগুন জল দিলে নেবে না, এ জগতের 
জলে নেবে না, গোবিন্দ বলে ডাকার অশ্রুতে এ অগ্থি নিবাপিত 
হয়। কৃষ্ণ নিজে আজ কৃষ্ণ নামের বিশেষণ দিচ্ছেন। ভক্ত 
না হলে ভগবানের নাম বুঝতে পারে না। এই জন্যই শ্রীগৌর- 
সুন্দর আজ ভক্তাবতার হয়ে এসেছেন, ভগবদানন্দের কাছে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২২৭ 


ব্রক্ষানন্দও তুচ্ছ। ভগবানের নামকে ভগবান বোধে দয়! 
প্রার্থনা করতে হবে। নিষ্ঠাপূর্বক প্রার্থনা করতে হবে। নিষ্ঠা 
করে আশ্রয় করলে তিনি কখনও ফিরিয়ে দেন না। চন্দন 
ঘষলে যেমন সুবাস, তেমনি হরিনামকে ঘষে তার মাধুধ 
বার করতে হবে। নামকে জিহ্বাতে উচ্চারণ করার নামই 
নামকে ঘসা । কৃষ্জনাম মায়াসক্তের পক্ষে ওষধ, আবার 
সেই নামই মায়ামুক্তের পক্ষে খাদ্য বা পথা। ভগবানের 
নাম, রূপ, গুণলীল! স্বাছ স্বাছু পদে পদে।. কৃষ্ণপাদপপ্ন- 
প্রাপ্তির উৎকণ্ঠা যাতে আছে আর কিছু নেই তার নামই 
শ্রেষ্ঠভক্তি। 

এই ভক্তি সবথা অতাজা-__মুক্ত অবস্থাতেও গোবিন্দপাদপদ্ন 
সেব। ছাড় চলে না। প্রাপ্তি তো সেবা--এই সেবাই তো ভক্তি । 
ভগবানই তো ভক্তি । ভগবানই তো তত্ব, তবে তার প্রকাশ 
তিন প্রকার ব্রহ্ম, পরমাত্মা, ভগবান--“অদ্ধয় জ্ঞানতত্ব ব্রজে 
ব্রজেন্দ নন্দন" । তত্ব যদি এক হয়, তাহলে তত্বপ্রাপিকা 
সাধনও এক হবে। তাই সাধনও একাভক্তি। তত্ব এক 
ভগবান, কিন্তু প্রকাশবিশেষে, যেমন_ ব্রহ্ম পরমাত্মা তত্র, 
তেমনি সাধনও এক ভক্তি, কিন্ত প্রকাশবিশষে জ্ঞান যোগ 
হয়েছে-_-ভক্তির অঙ্গ জ্ঞান, অংশ যোগ । এর পরে ব্রহ্ষান্থুভব, 
অনুভব অর্থা২ সাক্ষাৎ অপরোক্ষ আত্মানভূতি। এই 
আত্মান্ুভৃতির পর সে ব্রহ্মভূত হয়। তখন তার শোক, মোহ, 
আকাঙ্ষা থাকে না । তখন ক্ষুংপিপাসা আত্মা থেকেই মিটবে । 
ব্রক্ষভৃত মানে এ নয় ফে,ত্রহ্ম হয়ে যায় কিন্ত ব্রন্মভূত হওয়া 


২২৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মানে ব্রন্ষের গুণ পাবে। ব্রহ্মভূত ব্যক্তি প্রসন্গাত্মা। অর্থাৎ নির্মল 
চিত্ত হবে। ন শোচতি-_ এমন বস্ত থাকবে না, যার জন্য 
শোক করতে হবে, অর্থাৎ প্রাপ্তব্য কিছু থাকবে না । সবভূতে 
সমদৃষ্টি হবে, জগতের সবই মায়িক বলে বুঝেছে, সব প্রাণীতেই 
আত্ম চিৎ এক আর দেহের যে প্রকৃৰির উপাদান তাও সম । 
তাই সমজ্ঞান ভক্তির সাহাযো আত্মান্থুভব করাচ্ছে, এখানে 
ভক্তি প্রধান হয় নি। কারণ ভক্তির ফল আত্মান্ভব নয়, 
তাই ভক্তিকে. আড়ালে রাখা হল, যে ভক্তি গোবিন্দকে 
বশীভূত করে তার ফল মাত্র আত্মান্থুভব হতে পারে না । তক্তি 
মা পুত্র জ্ঞানকে পাঠিয়ে কাজ করে, অর্থাৎ আত্মান্থভব করা৷ 
তাই ভক্তি-মিশ্র জ্ঞান, কিন্তু জ্ঞানমিশ্র ভক্তি নয়। আত্মানুতবের 
পরে জ্ঞান চলে গেল । জ্ঞান চলে যাবার পর ভক্তি থাকল 
এবং সে ভক্তি আরও পুষ্ট হল 'মন্তক্তিং লভতে পরাম্‌' । 
ভগবানের শ্রীমুখের বাক্য “ভক্ত্যা মামভিজানাতি” | ভক্তির 
দ্বারা সম্যক জেনে “বিশতে তদনন্তরম্”_বিশতে প্রবেশ করে 
_ ব্রহ্মপক্ষে ব্রহ্মসাধুজ্য, ভগবৎপক্ষে পার্দ্গতি । ব্রহ্ম যে 
ভগবানেরই অঙ্গজ্যোতি । তাই ভক্তি ছাড়া ব্রহ্মসাক্ষাৎকারও 
হবে না-_ ভক্তি থেকে উদ্ভূত গোবিন্দের জ্ঞান-_ জ্ঞান চলে যাবার 
পর ষে জ্ঞান তারই নাম ভক্তি এবং একে লক্ষ্য করেই ভগবান 
বললেন__'ভক্তা। মামাভিজানতি'--এই দিয়ে ব্রহ্ম অনুভূতি । 
এর পরে ব্রহ্মসাযুজ্য । আচ্ছা, যদি ভক্তি দিয়েই সব পাওয়৷ 
যায়, তাহলে শুধু ভক্তি আশ্রয় করলেই হয়। ভক্তির দ্বারা 
ব্রহ্ম তে। পাবেই, ভগবানকেও পাওয়া যাবে। ভক্তি বদি শুধু 


নবযোগীন্্রসংবাদ ২২৯ 


্রহ্গান্থীভব করায় তাহলে তার দাতৃত্ব যোগ্য হয় না। তাই 
তগবানের পাদপদ্মও দেয়। আত্মতত্ব অর্থাৎ জীবাত্রার আশ্রয় 
উপলব্ধ হয়-_আত্মানুভৃতি তো হয়ই। দৃষ্টি স্বচ্চ হলে যেমন 
সূর্যের প্রকাশ তাব কাছে অতি সুন্দর, তেমনি ভক্তিচক্ষুতে 
আস্মান্ুভৃতি অথবা 'আত্মাব আশ্রয় ভগবানকে উপলব্ধি 


বড় সুন্দর । 


ষ্ঠ প্রন্ন 


পঞ্চম ষোগীন্দ্র শ্রীপিপ্পললায়নের শ্রীমুখে যখন মহারাজ নিমি 
শুনলেন যে জীবেব হৃদয়ে যে গুণজাত ও কম্মজাত মালিন্ত জম৷ 
হয় তা একমাত্র অক্জনাভ শ্রীগোবিন্দচরণে শুদ্ধাভক্তির দ্বারাই 
ক্ষালন কবা সম্ভব হয়-_-অন্য কোন উপায়ে সম্যক ক্ষালন সম্ভব 
হয় না, তখন নিমিরাজ এই কর্ম কাকে বলে এটি শুনবাব 
জন্য পরম উৎস্্ক হয়েছেন । তাই ষষ্ঠ প্রশ্নটি তুললেন 
কমযোগং বদত নঃ পুরুষে! যেন সংস্কৃত; | 
বিধুয়েহাশু কর্মীণি নৈষ্কম্যং বিন্দতে পরম্‌ ॥ ভা, ১১/৩।৪২ 
হে যোগীন্দ্র ! কর্মযোগ কাকে বলে কৃপা করে বলুন-_যার দ্বারা 
মানুষ এ জন্মে কর্ম ক্ষালন করতে পারে, অর্থাৎ নৈষ্বম্য লাভ 
করতে পারে । নিমিরাজ বলছেন--পূৰে আমার পিতা 
ইক্ষযাকুর কাছে বসে রক্ধাপুত্র সনকাদি মুনিকে এই প্রশ্ন করে- 
ছিলাম। তারা আমার সে কথার কোন জবাব দেন নি । কেন 
যে তারা উত্তর দেন নি, সেটিও কৃপা করে বলুন । 
ষষ্ঠ যোগীন্দ্র শ্রীআবিহোত্র এই ষষ্ঠ প্রশ্নের জবাব 
দিচ্ছেন- শ্রীদীপিকাদীপনকার এর তাৎপর দেখিয়েছেন-_ 
“আবিঃ প্রকটং সুজ্ঞেয়ং হোত্রম্‌ অগ্নিহোত্রোপলক্ষিতং কর্মযস্ত্োতি 
নিরুক্ত্যা তথ্র্ণনে তসৈব যোগ্যত্বাং স এবোবাচেতি জ্ঞেয়ম্‌ ।" 
অর্থাৎ অগ্নিহোত্রাদি বেদবিহিত কর্মমার্গানুষ্ঠান ধীর সম্যক 
রূপে জানা আছে, সেই আবির্োত্রই তো কর্ম সম্বন্ধে পরিপাটি 
করে বর্ণনা করতে পারবেন। পিতার কাছে বসে যখন রাজা 


নবযোগীন্দসংবাদ ২৩১ 


প্রশ্ন করেছিলেন, তখন তিনি বালক, তাই বালকের শিশ- 
স্বলভ চাপল্যে কর্মযোগ বুঝবেন না । খষিরা উত্তর দেন নি। 
আর সনকাদি খষির পক্ষে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সহজ হয় 
নি কেন তার কারণটিও যোগীন্দ্র দেখাচ্ছেন । 

কর্মাকর্মবিকর্মেতি বেদবাদেো ন লৌকিক: । 

বেদস্য চেশ্বরা অবত্বাত্ত্র মুহ্যন্তি সুরয়ঃ॥ ভা. ১১।৩।৪৪ 
কমন অকর্ম বা বিকর্ম--এগুলি বেদের পরিভাষা, লৌকিক নয়। 
শাস্ত্র যা বিধান দিয়েছেন_ সেটি আচরণ করার নাম কর্ম, এ কর্ম 
বিধান কিন্তু নিজের জন্য- নিজ নিজ বর্ণ এবং আশ্রম অনুযায়ী | 
আর শান্ত্রবহিত আচরণ না| করার নাম অকর্ম এবং শান্ত্র- 
নিষিদ্ধাচরপণই বিকর্ম। বেদশ্রান্রও ঈশ্বরের স্বরূপ পুত্রের 
স্বরূপ যেমন পিতা! ছাড়া কেউ নয় তেননি বেদও ঈশ্বরের স্বরূপ । 
ঈশ্বর যেমন ছুজ্ঞেয় বেদও তেমনি ছুজ্ডেয়। বেদের উৎপত্তি 
ঈশ্বর থেকে তাই বেদও ছুরূহ। পুরুষবাকোব অর্থ বক্তার 
অভিপ্রায় থেকে বুঝা যায়, কিন্ত বেদের বাক্য অপৌরুষেয় । 
বক্তাকে দেখে তার অভিপ্রায় বুঝতে পার! যায়, কিন্ত বেদের 
বাক্যের অর্ধ বুঝতে পার! যায় না। বেদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন 
বাক্য আছে__“অক্ষয্যং হ বৈ চাতুর্মাস্তযাজিনঃ স্থকৃতং ভবতি? | 
পুনরায় বললেন 'যদ্‌ যখৈহ কর্মজিতো লোক: ক্ষীয়তে তথৈব 
পুণ্যজিতো৷ লোক: ক্ষীয়তে' । অপৌরুষেয় বাক্যের অভিপ্রায় 
জান! যায় না। ভগবততত্রজ্ঞ খষি তাৎপর্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন । 
পূর্বাপরয়ো£ পরবিধি ব্লবান্।' বিধি তিন প্রকার-_অপৃৰ, 
নিয়ম ও পরিসংখ্যা । তার মধ্যে অপূর্ব বিধিই কর্তব্য নির্দেশ 


২৩২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


করেছে। অন্ত ছুটি নিয়ম এবং পরিসংখ্যা৷ প্রবৃত্তির অনুকূলে কথা 
বলেছেন--অন্তরঙ্গা বহিরঙ্গা অপেক্ষা বলবান। স্বরূপকে 
অবলম্বন করে অস্তরঙ্গ এবং বস্তুকে অবলম্বন করে বহিরঙ্গা তাই 
বেদের বাক্য বুঝ। ছুক্ষর ৷ এই বেদতাৎপর্য বুঝতে গিয়ে অতিশয় 
বিদ্বান বক্তিও মুহামান হন । এবিছ্বান ত্রেতাষুগের, এখনকার 
কলিযুগের বিদ্বান নয় ! এখন বিদ্যা নেই। বিদ্‌ ধাতু ক্যপ. 
প্রত্যয় করে বিদ্যা শব্দ সম্পন্ন হয় । “বিদ্যা শব্দে সব লক্ষণ 
মিলিয়ে শ্রীশুকদেব বললেন- “সা বিদ্য। তন্সতির্যয়া” ৷ বস্তুগত 
জ্ঞান বিদ. ধাতুর অর্থ নয়। কৃষ্ণপাদপন্র জ্ঞানই বিদ ধাতুর 
প্রকৃত অর্থ । মহাজন বলেছেন_-হরি না জানিয়ে লাখ জানে 
যদি সে জান! কেবল ছাই । অন্য কোন জানাই খাতায় উঠবে 
না, বস্তজ্ঞান খাতায় লেখ৷ হয় না-_হরি জানাই খাতায় ওঠে । 
এখন প্রশ্ন হচ্জে বিদ্বান্‌ বক্তি এতে মোহ প্রাপ্ত হয় কেন? 
উদ্ধবজীর কাছে ভগবান প্রশ্ন তুলছেন : 
কিং বিধত্তে কিমাচষ্টে কিমনৃদ্য বিকল্পয়েৎ। 
ইত্যস্তা হৃদয়ং লোকে নান্যো মদ বেদ কশ্চন 
-_ভা. ১১/২১৪২ 
এর উত্তর নিজেই দিয়েছেন £ 
মাং বিধস্তেহভিধত্তে মাং বিকল্প্যাপোহ্যতে ত্বহম্‌। 
এতাবান্‌ সববেদার্থ: শব্দ আস্থায় মাং ভিদাম্‌ ॥ 
_-ভা. ১১।২১৪৩ 
বেদের তাৎপর্য ষে আর কেউ বুঝতে পারে-_এ কথা ভগবান 
মানেন না, তিনিই একমাত্র বেদবিদ । তাই বললেন : 


নবযোগীক্দ্রসংবাদ ২৩৩ 


বেদৈশ্চ সর্বেরহমেব বেদে 
বেদাস্তকৃদ বেদবিদেব চাহম্‌। গীতা। ১৫1১৫ 

ভগবান বললেন--বেদ আমাকেই প্রাতিপাদন করে। বেদ 
খন তত্ব প্রতিপাদন করে, তখন আমাকেই প্রতিপাদন করে । 
আবার যখন বহিরঙ্গ' মায়াকে খণ্ডন করে তখন আমাকেই খণ্ডন 
করে__“চিৎ-এর সঙ্গে মায়ার সম্পর্ক থাকায় মায়াকে খণ্ডন করা 
মানে অমাকেই খগ্ুন করা । বেদবিভাগ ব্যাসদেব করেছেন। 
তাহলে ব্যাস বেদ বুঝেন বলতে হয়--ব্যাস তো নারায়ণ 
সাক্ষাৎ | তাই ব্যাস যে বেদ বুঝেন সেটি কৃষ্তকুপাতেই বঝেন ! 
বেদের তাৎপর্য ছুজ্ঞেয় ₹- 

পরোক্ষবাদো বেদোইয়ং বালানামনুশাসনম্‌। 

কর্মমোক্ষায় কর্মীণি বিধত্তে হাগদং যথা ॥ ভা. ১১1৩।৪৫ 

বেদ হল পরোক্ষবাদসম্পন্ন | পরোক্ষবাদ হল যথার্থ 
স্বরূপকে ঢেকে রেখে অন্য স্বরূপে বলার নাম। খাষির 
এই বেদের যথার্থ তাৎপধ্য ঢেকে কথা বলেছেন । ভগবান 
বলেছেন__পরোক্ষবাদা! ঝষব:ঃ পরোক্ষবাদশ্চ মম প্রিয়ম্‌। মা 
যেমন ছেলেকে বলেন জলে নেম না, জুজু আছে, তার বয়সে 
তখন তাকে সত্য কথা বলে বুঝাবার সময় হয় নি। 
মা সন্তানকে বলেন নিমপাতার রস খাও, নাড়, পাবে এবং সময়ে 
তার হাতে নাড়্‌ দেনও। কারণ তা না হলে পুনরায় ওষধ 
পানে প্রবৃত্তি হবে না । বেদেও তেমনি কর্মের উপদেশ করেছেন 
কর্মমোক্ষ অর্থাং নৈর্যের জন্য | কর্মের ফলশ্রাতি কর্ম নয়-_ 
নৈক্র্স্য। কর্মের দ্বারা কি করে নৈষ্ষম্য লাভ হবে, তার হিসাব 


২৩৪ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


স্বামিপাদ বলেছেন । বেদ কর্মমুক্তির জন্য কর্ম করতে বলেছেন। 
নৈষ্ষম্য লাভের জন্যই প্রকৃতপক্ষে কর্মের বিধান । মাঝখানে ষে 
স্বর্গাদি ফল বলা হয়েছে তা অবাস্তর ফল। কারণ সকল ফলই 
ক্ষয়ী--নশ্বর | সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর কলি-_এই চারটি যুগ একবার 
ফিরে এলে হয় এক দিব্যযুগ। এই রকম ৭১ দিব্যযুগে এক 
মন্বস্তর । এই একটি মন্বস্তর পার হলে লোমশমুনির গায়ের একটি 
করে লোম খসে পড়বে । এমনি করে সব লোম যখন পড়ে যাবে, 
তখন তার পরমায়ু শেষ হবে। সেই লোমশ মুনির পরমায়ু 
শেষ হয়ে আসছে ভেবে তার পুত্রেরা তার পরমার্থ চিন্তার জন্ত 
কুটার তৈরী করেছেন। আর আমাদের পরমায়ু তো তার 
তুলনায় কত ক্ষীণ। যতক্ষণ আয়ু আছে ততক্ষণ হরি বলতে 
হবে_ তাতে ক্ষতি তো কিছু নেই। মা যেমন মিথ্যা জুন 
বঙ্গেন, তাতে মায়ের অপরাধ হয় না। কারণ মায়ের লক্ষ্য আছে 
পুত্রের আরোগ্যলাভ ৷ তার বাক্যে কিন্তু তা ফোটে নি। বাক্যে 
ফুটেছে নাড়, দেব। তেমনি শ্রুতিমাতার মনে মনে আছে 
নৈক্র্ম্য অর্থাৎ কর্মক্ষালন, কিন্তু বাকা দিয়ে বিধান করছেন কর্ম। 
আচ্ছা, নৈষ্ম্যে যদি পুরুষার্থ হয় তাহলে প্রথমেই কর্মত্যাগ 
হবে না কেন ? নাঃ তা হবে না । যোগীন্দ্র বললেনঃ 
নাচরেদ্‌ যন্ত্র বেদোক্তং স্যয়মজ্ঞোইজিতেন্দ্রিয়ঃ 
বিকর্মণ হ্াধর্মেণ মৃত্যোর্মৃত্যুমুপোতি সঃ। 
ভা, ১১৩৪৬ 

শ্রীব্বামিপাদ বললেন- অজিতেক্দ্রিয়: ব্যক্তি যদি অজ্ঞতাবশে 
বেদবিহিভ কর্মাচরণ না করে, তাঁহলে বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান না 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৩৫ 


করায় অধর্মের দ্বারা তাকে পুনঃপুনঃ জন্বমৃত্যু-কবলিত হতে হয়। 
শ্রীজজীবপাদ বলেছেন__ভগবান যে কর্মষোগের অধিকারীর 
লক্ষণ করেছেন : 
তাবৎ কর্মীণি কুবীত ন নিবিষ্ভেত যাবতা | 
মৎকথা শ্রবণাঁদৌ বা! শ্রদ্ধা যাবন্ন জায়তে ॥ 
ভা, ১১।২০।৯ 

অর্থাৎ ষে বাক্তি বিষয়ে বিরভ্ত অথবা যার আমার কথাতে রতি 
জম্মেছে-_-এই ছুই ব্যক্তি কর্মে অধিকারী নয়__এর! ছুজন বাদ 
দিয়ে আর সকলেই কর্মে অধিকারী । যোগীন্দ্র এখানে যে 
লক্ষণ করেছেন, তাতে ভগবানের লক্ষণটি বাঁচিয়ে লক্ষণ 
করেছেন। অজিতেক্দ্রির় পদের দ্বারা ইহামুত্র ভোগবিরক্ত 
ব্যক্কিকে বুঝাল। নিবিষ্ন বাক্তি জ্ঞানযোগে অধিকারী, আর ফে 
ব্যক্তি কর্মে রত সে ব্যক্তি অজ্ঞানে আচ্ছন্ন । জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি 
বিষয়বিরক্ত, আর অজিতেক্দ্রিয় ব্যক্তির জ্ঞানে অধিকার নেই । 
অজ্বিতেন্দ্রিয ব্যক্তি যদি বেদবিহিত কর্ম না করে তাহলে দোষ 
হবে। ভগবান বললেন-_মৎকথাশ্রবণাদৌ অর্থাৎ আমার কথ! 
অশবণে যতদিন শ্রদ্ধা না হবে, ততদিন কর্ম করুক । এখানে 
অবণের পরে “আদি' পদের দ্বারা কীর্তন এবং স্মরণকেও 
বুঝাচ্ছে। যতক্ষণ ভগবানের নাম শ্রবণে কীর্তনে অথবা স্মরণে 
শ্রদ্ধা না জাগে ততক্ষণ বেদোক্ত কর্ম করতে হবে । শ্রীএকাদশে 
ভগবান উদ্ধবজীকে বলেছেন--যারা বেদোক্ত কর্মকে আমার 
আজ্ঞা বলে জানে এবং তার গুণ ও দোষের কথাও ভালভাবে 
জানে-_জেনে ত৷ ত্যাগ করে আমার পাদপদ্ম আরাধনা করে সে 


২৩৬ নবযোগীজ্মসংবাদ 


বুদ্ধিসত্বম । এখানে ভগবান সস্তাজ্য বলেছেন, অর্থাৎ সম্যক 
ত্যাগ শুধু ফলত্যাগ নয়, কর্মত্যাগ পর্যস্ত । গীতায় ভগবান 
বলেছেন £ 

সর্বধর্মীন পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ৷ গীতা ১৮/৬৬ 
বেদের আজ্ঞা যিনি পালন করেন তিনি সং আর ধারা বেদ 
আজ্ঞা পালন করেন এবং ভগবানকে ভজন! করেন তারা সত্তর । 
আর ধার! কেবল আমার পাদপদ্ম ভজন! করেন তার! বুদ্ধিসত্বম। 
এই বুদ্ধিসত্বম বাক্তি বেদ-আজ্ঞা ত্যাগ করে। অঙ্গিতেক্জিয় 
বাক্তি অর্থাৎ যার! নিধেদ প্রাপ্ত নয়, আর যাদের ভগবানের কথা 
শ্রবণে রুচি জন্মায় নি, তাদের বুঝাবার জন্য যোগীন্দ্র বললেন 
অজ্ঞ । মত্কথা শ্রবণরূপ। ধী হল জ্ঞা। নাস্তি জ্ঞা যস্য স অজ্ঞ। 
শ্রীল কবিরাজ গোস্বামিপাদ বলেছেন £ 

শ্রদ্ধা শব্দেতে কহে স্থদৃঢ বিশ্বাস | 

শ্রদ্ধা কাকে বলে? “গুরুপদিষ্টবেদান্তবাক্যোষু বিশ্বাসঃ শ্রদ্ধা 1, 
সুদৃঢ় বিশ্বীস কাকে বলে তার বাণী দিয়েছেন শ্রীপাদ বাবাজী 
মহারাজ £ 

যার যা লেগেছে ভাল তারে ভজুক তার। গে। 

আমার চোখে লেগেছে ভাল শচীর নয়নতারা গো 


বিশ্বীম হলে কেমন হয় ভিক্ষু বলেছেন £ 
এতাং স আস্থায় পরাত্মনিষ্ঠামধ্যাসিতাং পূর্বতমৈরমহষ্ধিভিঃ | 
অহং তরিষ্যামি ছুরস্তপারং তমো মুকুন্দাজ্যি নিষেবয়ৈব ॥ 


_ ভা, ১১।২৩1৫৮ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৩৭ 


একমাত্র গোবিন্দচরণ সেবা করেই আমি ছুস্তর মায়ার সাগব 
অনায়াসে উত্তীর্ণ হয়ে যাব । 

শ্রদ্ধা না হলে ভক্তির পরীক্ষা হয় না । এই শ্রদ্ধা যার নেই, 
তাকেই যোগীন্্র অজ্ঞ বললেন। এই অজ্ঞ এবং অজিতেক্দরিয় 
বাক্তি যদি বেদবিহিত কর্ম না করে তাহলে তারা বিকর্মরূপ অধম 
আচরণ করে, মৃত্যুর পর মৃত্যুকেই প্রাপ্ত হয়। 

কমযোগের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে যোগীন্দ্র বলেছেন- কর্মের 
ফল যা হবার তাই হবে, বিশ্বাস তার উপকরণ । গীতায় 
ভগবান বলেছেনঃ 

ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসঙ্গিনাম্‌। গীতা ৩২৬ 

যারা কর্ম করছে, অর্থাৎ যারা অজ্ঞ, যাদের আত্মজ্ঞান হয় 
নি তাদের বুদ্ধিভেদ জন্মাবে না, অর্থাৎ জগতের বন্ত নশ্বর বলে 
তাদের ভক্তি ব! ভ্ৰান মার্গ উপদেশ কর না। শ্রীমদ্ভাগবতেও 
বলা আছে নিজে নিঃশ্রেয়ম অর্থাৎ পরমার্থ ( ভক্তি বা জ্ঞান ) 
জানলে তাকে কর্ম উপদেশ কর না, রোগী চাইলেও যেমন 
চিকিৎসক কুপথ্য দেয় না। শ্রেয়স্‌ শব্দে কল্যাণ অর্থাৎ জ্ঞান 
আর নিঃশ্রেয়স হল ভক্তি । আর প্রেয় বলতে জাগতিক বস্তুকে 
বুঝায় মাটির পুতুলের মত, বিজ্ঞজনের এতে 'গ্রীতি হতে পাবে 
না। কারণ এগুলি সব ক্ষণভঙ্গুর ৷ এই চৌদ্দ ভূবনের যা কিছু 
সবই প্রেয়। কেবল শাশ্বত বস্তুই জীবের প্রয়োজন নয়, শাশ্বত 
আনন্দ জীবের প্রাপ্তব্য, হুঃখ জীবের প্রাপ্তব্য নয়। শ্রেয়ঃ উত্তম 
বটে কিন্তু সম্পুর্ণ উত্তম হল ভক্তি । এর নাম নিঃশ্রেয়দ্‌। এই 
ভক্তি এবং ব্রহ্মজ্ঞান ছুটির মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ যদি বিচার কর। 


২৩৮ নবযোগীন্দ্রসংবাঁদ 


যায়, তা"হলে দেখ! ষাবে একজনকে ব্রহ্মজ্ঞান অপরজনকে ভক্তি 
দেওয়া যাক, কে বদলাবদলি করতে চায়। ষে তার নিজেরটির 
বদলে অপরটি পেতে চায়, তারটি অন্যের চেয়ে নিকৃষ্ট বুঝতে 
হবে। ব্রহ্মজ্ঞান যে পেয়েছে সে ভক্তি পেতে চায় এর বহু 
প্রমাণ আছে। আত্মারাম যুনি তাদের কোন প্রয়োজন নেই, 
তথাপি তারা ভগবানে ভক্তি করছে,কেন করছে এতে কোন হেতু 
নেই-কোন হেতু উল্লেখ করতে পারবে না--এরই নাম খাঁটি 
তক্তি। কারণ শ্রীহরির এমনই মাধুর্য যে তাকে ভক্তিরসে লুব্ধ 
করে । ব্রহ্মজ্ঞানীও ভক্তি পাওয়ার জন্য এগোয়,কিন্তভক্ত কখনও 
্রহ্মজ্ঞান চায় না। ভক্ত অপব্গ চায় না। তার! ভগবানের লীলা 
সাগরে সম্তরণ করে সুখী হয়। ব্রহ্মচ্ছান হল শ্রেয়স আর ভক্তি 
নিঃশ্রেয়স। আদি ব্রহ্মজ্ঞানী সনকাদি মুনি ধাদের ব্রহ্মজ্ঞানের 
অনুভব নিঃশ্বাসের মতই স্বাভাবিক, ভগবানের চরণকমলের চন্দন 
মিশ্রিত তুলসীর গন্ধে তাদের ব্রন্মজ্ঞান ছুটে গেল ৷ ভক্তিতে চিত্ত 
লুব্ধ হল, দাস হবার বাসনা জাগল। ব্রহ্মজ্ঞান পর্যস্ত নিজ 
সাধনে পাওয়া ষায়। শ্রবন কীর্তণ স্মরণ প্রভৃতি ভক্তিস্খ ৷ 
ষে ব্যক্তি কর্ম করছে তাকে ভক্তি বা জ্ঞানের উপদেশ করবে না, 
গীতাবাকো এইটি বলা হয়েছে । আর যে বাক্তি কর্ম করেনি 
তাকে ভক্তিধর্মের উপদেশ করবে, এটি শ্ীমন্ভাগবতবাক্যের 
তাংপর্য। কল্যাণ যার! চায় তাদের সকলের পক্ষেই বৈদিক কর্ম 
অনুষ্ঠানের যোগ্য । নুখপ্রাপ্তি এবং ছুঃখপরিহার-__এই ছুটি হল 
উপেয়। উপেয় পেতে হলে উপায় ছাড়া পথ নেই। যোগীন্দ 
এই উপায়ের পথ বললেন, বৈদিক কর্ম-অনুষ্ঠান | বেদমাতা কর্ম, 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৩৯ 


জ্ঞান, যোগ, ভক্তি, বিভিন্ন মার্গ উপদেশ কবেছেন কিন্তু উদ্দেশ্ট 
সত্তার একটাই- জীব সন্তানকে শাশ্বত স্থখ দান। জীব তিন 
প্রকার- সাত্বিক, রাজসিক ও তামসিক | তাই অধিকারভেদে 
বেদের ব্যবস্থাও তিন প্রকার । সাত্বিক জীব সহজেই শাস্ত্রবাক্য 
বিশ্বাস করে, রাজসিক জীবও কিছুটা করে; কিন্তু তামসিক জীব 
একেবারেই করে ন1। হিন্দুধর্মে বহুবিধ ভেদ । জীবের রুচি ভিন্ন, 
তাই কার্য অনুরোধে বু দেবতা । দেবতার কাছে নিবেদন 
জানানোর প্রকারও দ্বিবিধঃ (১) সাক্ষাৎ, (২) মারফৎ। গোবিন্দে 
কাছে সাক্ষাৎ দরখাস্ত দেওয়! যায়। আর তার সঙ্গে যদি চোখের 
জল থাকে তাহলে আর কেউ বাঁধা দেবে না। বেদোক্ত কম কবে 
বখন স্বর্গে গতি হবে, সেখানে দেবতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, 
ঘনিষ্ঠতা হলে জানা যাবে যে ইন্দ্রাদি দেবতাও শ্ীহরির কৃপায় 
এঁ পদ লাভ করেছেন । তীর মুখে শুনলে জীবের সুদৃঢ় বিশ্বাস 
হবে। তখন সে হরিভজন করবে । তীর্থভ্রমণের উপকারিতা ও 
এ একই কারণে । তীর্থে মহতেব সমাগম হয়। সাধুসঙ্গ হলে 
ক্ষণকালে জীবনের গতি ফিরে যায়। স্বর্গাদি কামনায় শ্রুতি 
যে যজ্ঞের বিধান দিলেন, তাতেও এ জগতের বিষয়স্থখ ত্যাগ 
অভ্যাস করতে হয় । স্বর্স্ুখকমনায় যদি হাতের কাছে পাওয়া 
সুখ ত্যাগ কর! যায়, তাহলে গোবিন্দসেবাকামনায় স্ব্গম্খ ও 
ত্যাগ করা যাবে। কাজেই শ্রুতি-মা ঠিক পথই অস্তানকে প্রথম 
থেকে উপদেশ করেছেন । ত্যাগের পথ--এই ত্যাগই যখন 
সর্বত্যাগে (গোবিন্দসেবা ব্যতীত) পরিণত হবে তখনই তো 
প্রাপ্তি শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর বাক্য “বিনা সবত্যাগং ন ভবতি ভজনং 


২৪০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


হান্থপতে:।' সবন্য ত্যাগ ন৷ হলে প্রাণপতি শ্রীগোবিন্দের পৃজা 
হয় না। আসল কথা হল “কৃষ্তকুপা বিনা কোন সুখ নাহি 
হয়। বাকা আছে £ 


বুন্দাবনেহথবা নিজমন্দিরে বা শ্রীকৃষ্$ভজনং বিনা ন সুখ 
কদাপি। মায়ের কোলে যেমন হুষ্ট শিষ্ট উভয় সম্তানই স্থান পায়, 
তেমনি শ্রতি-মাতার কোলে সকল জীবই স্থান পেয়েছে। 
শর্গত সকলের জন্য স্থান দিয়েছেন ৷ মায়ের ইচ্ছ। সকলে ষেন 
গোবিন্দ পায়। তিনি ভাবলেন সকলকে আগে কোলে নিই; 
তারপর ধীরে ধীরে শুধরে নিলেই হবে। মায়ের কোলে বসে 
যেমন ছুষ্ট ছেলে শিষ্ট হয়ে যায়, তেমনি শ্রতি-মাতার কোলে 
বসে কর্ম করতে করতে চিত্ত শুদ্ধ হয়ে যাবে। চিত্ত শুদ্ধ হয়ে 
গেলে আর কর্ম করতে হবে না। এই ছুটিই তো দরকার 
-অজ্ঞ এবং অজিতেন্দ্রিয় হলেই কর্ম করতে হবে। তা ন৷ 
হলে অর্থাৎ ষার বিষয়াসক্তি নেই এবং যার ভগবৎকথাতে রুচি 
জেগেছে তার পক্ষে বেদোক্ত কর্মের অধিকার নেই । ভগবান 
বলেছেন ঃ 


ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৎ। গীত! ৩৫ 


এক ক্ষণও জীব কর্ম না করে থাকতে পারে না । ব্যাকরণ- 
শাস্ত্রে নিদ্রাকেও ক্রিয়া বল! হয়েছে । কোনটিই নৈষষর্ম্য নয়। 
ভগবছুদ্দেশো যে কাজ তারই নাম নৈক্র্ম্য । কর্মের দ্বারা অমৃত 
পাওয়া যাবে না, বিকর্ম হল বিষ। অযবতের সন্ধান চাই, যাতে 
বিকর্ম অবসর না পায়। এইজন্য বিষয়বিরক্ত এবং ভগবৎকথায় 


নবষোগীন্দ্রসংবাদ ২৪১ 


শ্রদ্ধাশীল-_এই হুইজন ছাড়া সকলের প্রতি শ্রুতি-মাতা৷ বেদোক্ত 
কর্মের উপদেশ করেছেন। 

যোগীন্দ্র বললেন-_-অজিতেক্দ্রিয় ব্যক্তি ঘদি বেদোক্ত কর্ম না 
করে তাহলে বিকর্ম করবে। তার ফলে মৃত্যু হতে মৃত্যুকেই 
লাভ করবে। জীব সতত বিকর্ম করে; কিন্তু তার ফল যে 
হুখ তা জানে না। ভক্তিসাধনে পৌছুলে অন্য সাধন ত্যাগ 
হবে, কিন্ত এ তাগজনিত প্রত্যবায় হবে না । যেমন ব্রহ্মচারীর 
ধর্মত্যাগে গৃহস্থের প্রত্যবায় হয় না, গৃহস্থের ধর্মত্যাগে বাণ 
প্রস্থীর এবং বাণপ্রস্থীর ধর্মত্যাগে সন্যাসীর প্রত্যবায় হয় 
না, অথবা কর্মী, যোগী, জ্ঞানী যদি সব ছেড়ে ভক্তিপথে যায় 
তাতে প্রত্যবায় নেই। তাই ভগবান বললেন £ 


সবধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ । 
অহং ত্বাং সর্পাপেভ্ো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥ 
_গীতা ১৮৬৬ 


কৃষ্ণবিমুখ জীব ছুই প্রকার : (১) কুষ্ণই একমাত্র প্রভু একথা 
জানে না। (২) অথব! কৃষ্ণ প্রভূ একথ। জানে, কিন্ত জেনেও 
ভজে না। অজিতেন্ড্রিয় ব্যক্তি অতিশয়রূপে বিষয় গ্রহণ করে 
ইন্দিয় চরিতার্থ করবে এবং তাতে অতিশয় দুঃখ পাবে । শ্ুতি- 
মাতা তা সহ্য করতে পারলেন না। তাই পরম কারুণিক। বেদ- 
মাতা তা বারণ করবার জন্য কর্ম বিধান করলেন । বেদ ফল- 
শ্রতির দ্বার! জীবের বৈদিক কর্মে রুচি জন্মাচ্ছে ৷ বেদের তাৎপর্য 
হল জীব যাতে বিকর্ম করতে অবসর ন! পায়--বিহিতকর্মে 
১৬ 


২৪২ নবযোগীব্দ্রমংবাদ 


জবীবকে ব্যস্ত রাখতে চায় । শুধু মুখে ভয় নয়, বিকর্ম করলে 
তাকে ছুরবস্থাও ভোগ করায়। অন্যথ৷ তার আজ্ঞা কেউ পালন 
করবে না। বিবেকী ব্যক্তি এইভাবে বেদের তাৎপর্য বুঝবে। 
বুঝে নিজের অজিতেক্দ্রিয়তা ছুর্বার এটি লক্ষ্য করে বিকর্ম যাতে 
না করে তাতে সাবধান হয়ে বিহিত কর্ম করবে। শ্রীম্বামিপাদ 
টাকায় বলেছেন, বিহিত হয়ে করবে, নি£সঙ্গ অর্থাৎ ফলাকাক্ষা- 
রহিত হয়ে করবে । ঈশ্বরে কর্ম এবং তার ফল উভয়ই অপ্পণ 
করবে, অর্থাৎ কর্ম এবং ফল উভয়েতেই অভিনিবেশহীন হবে। 
যেমন কোন মনিবের জমি চাষ করে চাষী- সে জানে জমি 
ষনিবের। সে যা কাজ করছে তা মনিবের কাজ। তাই 
কাজে তার অভিনিবেশ নেই এবং ফলে তো৷ স্বতরাং নেই-ই। 
এর দ্বারাই নৈক্ষম্য লাভ হবে। আচ্ছা, কর্ম করলে তো৷ 
আসক্তি হবেই, সুতরাং ফলেও আসক্তি হবে। এর দ্বার 
নৈক্ষর্ম্য লাভ হবে কেমন করে? ঈশ্বরে অপলিত কর্ম করবে। 
কর্ম করে ঈশ্বরে অর্পণ করবে না। অপিত কর্ম কেমন ? কাজ 
ঈশ্বরের, আমি তার ভূতামাত্র । প্রভুর জমি ভৃত্য চাষ করে__ 
জানে মনিবের কাজ_-এ বোধ আগেই হয়েছে। আমি 
ভৃত্যমাজ্জ ফল মনিবের, আমার নয় । গ্ীতাতেও ভগবান 
বললেন-_ কর্তা হয়ো! না, কর্ম করে অর্পথ করলেও অর্পণকর্ত 
হতে হয় । মাঝখানে কর্তা হলে তাতেও দোষ-_ভগবানই এক- 
মাত্জ কর্তী। দরওয়ান যেমন ধনীর গৃহে পাহার থাকে, কেউ 
যাত্তে কোন ভ্রব্য অপহরণ করতে না পারে । অপহরণ করলেই 
ধরে, তেমনি ভগবান কর্তা, মায়া তার দীসী দরওয্ান। 


নবষোগীজ্্রসংবাদ ২৪৩ 


জীব কৃষ্ণের কর্তৃত্ব চুরি করছে কি নাদেখে। “অহং কর্তী' 
ভাবলেই মায়! তার হাতে হাতকড়া পরায়, তাকে সাজা দেয় । 
তদন্ত সংস্যতির্বন্ধঃ পারতন্্ঞ্চ ততকৃতম্‌। ভা. ৩২৬৭ 


জীবের কর্মে রুচি উৎপাদনের জন্যই এধ্ুতি ফলশ্রাতি 
দিয়েছেন । অগদপানে লড্ডুকদানের মত। যেমন যে রোগী 
তার রোগ ভাল করতে চায়, সে নাড়ুর পোভে ওষুধ খায় ন 
এমনিই খায়, তেমনি যে ব্যক্তি বৈদিক কর্মের তাৎপর্য বুঝতে 
পারে তার পক্ষে আর ফলশ্রতির দরকার নেই। আয়ু, 
যশ, আরোগ্য, পুত্র, সম্পদ, মান, মর্ধাদারূপ ফল সে চায় 
না। কিন্তু এর দ্বারা তার নৈক্ষমা লাভ হচ্ছে কেমন 
করে? কর্মী জীবের ফলশ্রুতি দেখে বেদের কর্মে রুচি হল, 
নাড়ুরূপ ফলশ্রুতি দেখে কর্মে প্রবৃত্তি হল, মা যেমন শিশুকে 
ভুলিয়ে নাড়ুর লোভ দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ান এবং পরে নাড়ু, 
দেনও। শ্রুতি-মাও তেমনি নানাবিধ ফল জীবকে দেন-_ 
জীব পরে বুঝতে পারে বেদের মর্মকথা এ সকল ফললাভে 
নয়। বৃহদারণ্যক উপনিষদের বাণী অনুশীলন করে জীব বুঝল ; 

যে! বা এতদক্ষরমবিদিত্বাইস্মাল্লোকাং প্রেতি স কৃপণ: । 

যে ব্যক্তি পরমপুরুষকে না জেনে এই দেহ ত্যাগ করে সে 
কপ, অর্থাৎ তুচ্ছ দেহত্যাগের আগে অন্ততঃ অক্ষর- সেই 
পরমপুরুষকে জানতে হবে, তখন জীব ভাবতে লাগল- তাহলে 
পরমপুরুষকে জানাতেই কি সমগ্র বেদবাক্যের তাৎপর্য? যারা 
আত্মাকে জানে না, তাদের জীবন তুচ্ছ। যজ্জের দ্বার 


২৪৪ নবযোগীন্্রসংবাদ 


বেদান্ুবচনের দ্বারা, পরমপুরুষকেই জানতে হবে, তখন জে 
বুধল- বৈদিক কর্মের ফল তাহলে নশ্বর স্বর্গাদি স্থখভোগ 
নয়। যেকোন অনুষ্ঠানের তাৎপর্য হল ভগবানকে জানা 
_যাগযজ্ঞ যা কিছু সকলের পর্যবসান হল পরমপুরুষের জ্ঞানে। 
যেমন সকল নদীর গতির পর্যবসান হল সাগরে । তখন আর 
তাকে নানাবিধ ফলশ্রুতি-রূপ নাড়ু দিতে হয় নাঁ_নাড়্‌ 
ছাড়াই ওষুধ খায়। তাই বিচারে দেখা গেল কর্মই নৈক্ষর্মা 
দান করে। শ্রুতিতে বলা আছে-ন্বর্গকামো যজেত' 
অর্থাৎ যে যজ্ঞ করবে তার স্বর্গ কামনা থাকলে অর্থাৎ স্বগ 
আকাভিক্ষিত হলে স্বর্গ ফল হবে। আর কামনা না৷ থাকলে 
স্বর্গ ফলরূপে আসবে না। অতএব ফলই যদি না এল, 
তাহলেই নৈক্ষর্ম্য-সিদ্ধি। বেদ যা ফলশ্রুতি দেখালেন তা 
বালকের প্রতি বিধান। শ্রীজীবপাদ বললেন- বিজ্ঞজনের প্রতি 
কি ব্যবস্থা বলছি, শোন। কর্ম গ্রহণ করানোর অর্থ হল 
ভগবদর্চনা কর্ম গ্রহণ করান । ঘি খেয়ে যদি উদরাময় হয়, 
তাহলে ঘি খেয়েই তা ভাল হবে; কিস্ত এই ছুটি ঘি এক 
নয় । যা খেয়ে রোগ ভাল হবে, তা হল অন্য দ্রেব্ 
মেশান ঘি। কর্মই বন্ধন ঘটায় তা ঠিক, কিস্ত এই কর্মই 
আবার অন্যের সঙ্গে মিশিয়ে করলে অর্থাৎ ভগবদারাধনার 
সঙ্গে মিশিয়ে করলে তাতে কর্মবন্ধন টুটে যায়। যেমন 
একজন লোক আর একজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধেছে, আবার 
আর একজন লোক এসে তা খুলে -দিতে পারে। কর্ম 
আটকাবার পন্থা, গন্তবাস্থানে পৌছাতে দেয় না। বেদশান্ত্র 


নবযোগীজ্্রসংবাদ ১৪৫ 


নানাবিধ ফলশ্রুতির ছায়। দিয়ে পথিককে, সাধককে আহ্বান 
করে। সাধক তাতে লুব্ধ হয়। পথে বৃক্ষের ছায়ায় লুক্ধ 
পথিক যদি বিশ্রাম নেয়, তাহলে তার যেমন গস্তবাস্থানে আর 
তাড়াতাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠে নাঁ_দেরী হয়ে যায়, তেমনি 
কর্মমার্গের বেদ ফলশ্রুতি ছায়া তৈরী করে। তাতে যদি 
সাধক আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তাহলে আর তার গস্তব্যস্থল গৌর- 
গোবিন্দপাদপদ্মে পৌছান হয়ে উঠবে না। অ্ূর্যান্ত-নিলাম 
মনে রাখতে হবে- আয়ুস্য অস্ত যাবার আগে গৌরগোবিন্দ 
বলে যেতে হবে। বেদের করমনার্গের ছায়া! এই যে বুঝতে 
পারে তাকেই ভগবান বেদবিদ্‌ বলেছেন । যোগীন্্র বলছেন__ 
এমন কর্ম কর, যার দ্বারা কর্ম ছিন্ন হয়--সেই কর্মই যোগী 
বিজ্ঞের প্রতি উপদেশ করেছেন। 

ঈশ্বরে অপিত কর্ম করলে সেই মহিমায় নৈক্র্ম্য লাভ হবে 
শিশুমতির জন্য বেদের কর্মযোগ বলা হয়েছে । এখন বিজ্ঞজ্নের 
প্রতি কর্ম উপদেশ করছেন । যে বান্তি আশু অর্থাৎ অতি 
শীঘ্র অনাদি অবিদ্। হৃদয়গ্রন্থি বিষয়ভোগের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ 
করতে চায় (গ্রন্থি বলা হয়, কারণ বিষয়বাসনাতে হৃদয়ে গেরো 
পড়ে গেছে )। এই বিষয়বাসনার মাত্র! যে কতদূর পর্যস্ত তা 
আমরা বুঝি না,কারণ আমরা ছোটখাট নিয়েই ব্যস্ত। এ 
হৃদ্গ্রন্থি কার? এ গ্রন্থি পরমাত্বার নয়, কারণ তার কোন 
গ্রন্থি হয় না, কারণ পরমাত্মার কোন ফলের আকাঙ্ষা 
নেই। জীবাত্মাই ভাবনাতে ফলের ভোক্তা, আসলে কল যে 
স্থখ ও হুঃখ, এটি ভোগ করে মন। প্রকৃতির মায়ানষ্ট খা 


২৪৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


পরমাস্মার হতে পারে নাঁ। কোন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ছেলে 
যেমন বন্ধুত্বের খাতিরে বন্ধুর সঙ্গে যাবনিক খান্ভের সামনে বসে 
মাত্র কিন্ত খায় না, তেমনি জীবাত্মার প্রতি নহে পরমাস্মাকে 
প্রকৃতির খাগ্যের কাছে বসতে হয় বটে, কিন্তু সে প্রকৃতির খাছ 
খায় না। যে ব্যক্তি সেই হৃদ্গ্রন্থি ছেদন করতে তাড়াতাড়ি 
চায়, সে ভগবান কেশবের উপাসনা করবে- এটি তন্ত্রো 
উপাসনা, অর্থাৎ শাগ্ল্য ্ৃত্র এবং বৃহন্নারদীয় স্থত্রে যে 
উপাসনার কথা বল! আছে। বেদোক্ত বিধির দ্বার! 
ভগবদারাধনা করবে । বৈদিক কর্ম করে যে নৈষষর্ম্য লাভ তা 
বহুকালসাপেক্ষ আর দেবা্চনার ফলে ষে নৈকষর্ম্য লাভ তাতে 
ভাড়াভাড়ি কাজ হয়। অক্ষর পরিচয় করাতে শিশুর যেমন 
গুরুমশাই-এর দরকার হয়, তেমনি সাধন-জগতেও গুরুকরণের 
প্রয়োজন ৷ শাস্ত্রে মন্ত্র দেওয়া আছে; জপে নেব এ কথা বললে 
হবে না। সর্বভূতে তো ভগবান আছেন তবে ছু'জে পাওয়া 
যায় না কেন? কিন্তু আমরা গ্রহণ করতে পারি না বলে 
ভগবান নেই-_একথা। বলা যায় না । ইন্দ্রিয়ের শক্তি দরকার, 
তা না হলে শুধু বস্ত থাকলেও পাওয়। যায় না । ভগবান 
চি্বন্ত আর আমাদের ইন্দ্রিয় প্রাকৃত, জড় ; তাই ইন্দ্রিয় তাকে 
গ্রহণ করতে পারে না । প্রাকৃত জগতেও দেখা ষায় সঙ্জাতীয় 
ইন্দ্িয়ের মধ্যে এক ইন্দ্রিয় অপরের কাজ করতে পারে না। 
কান চোখের কাজ করতে পারে না ইন্দ্রিয় যথা অধিকারে 
কাজ করে। অর্থাৎ ষে ইন্জিয়ের যে বিষয় গ্রহণে অধিকায়, 
নে ইন্দ্রিয় সেই বিষয় গ্রহণ করে | এখন প্রয়োজন হচ্ছে, 


নবযো গীন্্রসংবাদ ২৪৭ 


প্রাকৃত ইন্দ্বিযরকে যদ্দি চিৎ করতে পারা যায়, তাহলে সেই 
চিৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে চিৎ ভগবানকে পাওয়া সম্ভব হবে । এখন 
এই ইন্দ্রিয়কে আমাদের নিজেদের চেষ্টায় চিৎ করতে পারব 
না। ধারা ইন্দ্রিয়কে চিৎ করেছেন, তাদের কৃপায় আমাদের 
ইঞ্জিয় চিৎ হবে । কয়লার ময়ল! কিছুতে যায় না, কোটি 
কোটি বছর পড়ে থাকলেও নয়; কিন্ত ষে মুহূর্তে অগ্নি তাকে 
স্পর্শ করে সেই মুহুর্তে তার ময়ল! দূর হয়, তেমনি কয়লার 
মত মালিন্তপূর্ণ ইন্দিকে যখন কৃপা-অগ্নি স্পর্শ করে সেই 
মুহুর্তে তার মালিন্ত চলে যায় । শ্রীগুরদেবের সন্দশিত 
পথে অর্চনা করতে হবে, অভিমত শ্রীমৃতি স্থাপনা করে 
অর্চনা করতে হবে। বানা এবং আসন্তর শুচি হয়ে উপাসনা 
করতে হবে । বাহ্যশুচিতা দেহ, জল এবং মৃত্তিক দ্বারা 
মার্জম করে এবং আস্তরশুচিতা, দস্ত, অহঙ্কার, অভিমান, 
ছেেষ, হিংস! ত্যাগ করে। অঙ্গন্যাস করন্যাস করে দেহ শুদ্ধ 
করতে হবে। পুষ্পমাল্য প্রভৃতি অর্চনাব উপৰকরণকে 
কীটাদ্দি থেকে শ্তদ্ধ করতে হবে। শ্রীজীব গোস্বামিপাদ 
অর্চনামার্গ বিচার করেছেন, বিস্তবান গৃহীর পক্ষে অর্চনা 
একান্ত প্রয়োজন । অর্চনাতে খরচ বাঁচাবার জন্য যদি সেই 
ব্যক্তি কেবল হরিনাম করে, তাহলে তার পক্ষে হরিনাম ফল 
দেবেন না। ভাতে বরং বিত্তবান ব্যক্তির বিত্তশাঠ্য দোষ হবে । 
আত্মত্্লত বস্ত দিয়ে ভগবানের সেবাকাজ করতে হবে । অর্থাৎ 
নিজের জিনিষের প্রয়োজনে যে মূল্য দিয়ে কেন। হয়, ভগবানের 
সেবার জব্য ভার চেয়ে অন্ততঃ কিছু বেশী মূল্য দিয়ে কিনতে 


২৪৮ নবযোগীজ্দসংবাদ 


হবে, ঘাতে নিজের ভোগের বস্তু অপেক্ষা ভগবানের ভোগেৰ 
সামগ্রীর উৎকর্ষ হয়। ভগবানের তো কোন কিছু গ্রহণের 
প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাকে খেতে দিতে জানতে হবে । ভগবান 
ভক্তের অণু উপহারও পরম আদরে গ্রহণ করেন কিস্তু অবিদ্বানের 
পুজা গ্রহণ করেন না । আপন সুখের জন্য যারা আরাধনা করে 
তার! অবিদ্বান, আর ভগবানের স্থথের জন্য যারা পুজা করে 
তার! বিদ্বান। ভগবানের কাছে আমরা কামনার পৃতিগন্ধ 
মাখিয়ে পূজা দিই। কাজেই তিনি তা গ্রহণ করতে পারেন না। 
তবে যে গ্রহণ করেন সে করুণ হয়ে দয়া করে গ্রহণ করেন। 
আমরা প্রাণ খুলে বলতে পারি না প্রভু, তোমার বিচারে যা 
ভাল হয়, তাই দাও। বিচারে কৃষ্ণভক্তিই সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ত। 
ভগবানের শ্রীচরণে সেইটিই প্রার্থনীয় বস্তু হবে। পুজার সময় 
নিজেকে অব্যগ্রতা দ্বার! শুদ্ধ করতে হবে। মৃত্তিকে অনুলেপন 
দ্বারা শুদ্ধ করতে হবে। পাছ্যাদ্দি সম্মুথে স্থাপন করে 
সমাহিতচিত্তে অঙ্জন্তাস, করন্যাস করে মৃলমন্ত্রের দ্বার! অর্চনা 
করতে হবে। অঙ্গ হুদয়াদি, উপাঙ্গ সুদর্শনাদি, এবং পার্ধদের 
সঙ্গে অভিমত সেই সেই মূত্তিকে পাস, অর্ঘ্য, আচমনীয়, 
স্লানীয়, বস্ত্র, ভূষণ, গন্ধ, মালা, দৃবা, পুষ্প, ধৃপ, দীপ এবং নানা 
উপহারের দ্বারা! পুজ। করে বিধি-অনুযায়ী স্তব করে হরিপাদপন্লে 
নমস্কার করবে। স্বামিপাদ বলেছেন--আতপচালের ছার! 
বিষুঃ ভগবানের এবং কেতকীকুম্মের দ্বারা মহেশ্বরের পূজ 
করবে না। শ্রীচক্রবতিপাদ অর্থ করেছেন-_অক্ষত অনুপহত 
অর্থাৎ যা ভোগ করা হয় নি, এমন পুষ্পমাল্য প্রত্ভৃতি ছারা 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৪৯ 


কেশবের অর্চনা করবে । কেশবই একমাত্র হৃদয়গ্রস্থি ছেদন 
করতে পারেন। নিজেকে ধ্যানের দ্বারা তন্ময় রাখতে হবে । 
অর্থাৎ অন্থগত হয়ে আবিষ্ট থাকতে হবে। ফ্রুব “অহংগ্রহ” 
উপাসন! করেছিলেন, কিন্তু তার চেয়ে অনুগত হয়ে উপাসনাতে 
কাজ হয় বেশী । শ্রীজীবপাদ বলেছেন- ধনকামী ব্যক্তি যেমন 
জগতকে ধনময় দেখে, কামুক ব্যক্তি যেমন কামিনীময় দেখে, 
ধীর ব্যক্তি তেমনি জগৎকে নারায়ণময় দেখে । কারণ নিজে 
যদি হরি হয়ে যায় তাহলে আর উপাসনা! হয় ন। উপাসনার 
শেষে নির্মাল্য মস্তকে ধারণ করবে । পরে বিগ্রহকে ব্বধামে 
প্রেরণ করাবে, অর্থাৎ শয়নাদি করাবে । হরিবিগ্রহের বিসর্জন 
নেই, কারণ জীব নিত্যকুষ্ণদাস । তাই বিসর্জন দেবে কখন? 

এইভাবে যে ব্যক্তি তান্ত্রিক কর্মযোগ অনুসারে অগ্নি বা স্থর্য 
বা জল বৰা অতিথি অথবা! নিজ হাদয়ে হরিবুদ্ধি করে অর্চনা 
করে সে ব্যক্তি অনায়াসে হাদগ্রন্থি ছেদন করে মুক্তিলাভ করে ! 
তাই যোগীন্দ্র পাঞ্চরাত্র মন্ত্রোন্ত এবং বেদোক্ত কর্মের বিধান 
দিলেন । মহারাজ নিমি যে প্রশ্ন করেছিলেন “কর্ম কাকে 
ৰলে” _যোগীন্দ্র এইভাবে তার উত্তর দিলেন । 


5:0১ 


পওস প্রন্ন 


শ্রীনিমিরাজ বললেন__পূর্বেই বলা হয়েছে অর্চনামর্গে নিজ নিজ 
অভিমত মুত্ি 'প্রতিষ্ঠা করে বন্দনা করবে । তাহলে কি কি 
মতি আছে তা জানতে হবে। তবে তো স্তুতি কর! ঘাবে। 
তাহলে যত প্রকার অবতার আছেন সব জানতে হবে। এই 
সকল্প অবতারের গুণ, চরিত্র এবং তত্ব জানা চাই। মহারাজ 
নিষি প্রশ্ন করলেন £ 


যানি যানীহ কর্মাণি যে; স্বচ্ছন্দজন্মভিঃ | 
চক্রে করোতি কর্তা বা হরিস্তানি ক্রবস্ত নঃ ॥ 
__-ভা. ১১৪1১ 


ভগবানের জন্ম স্বচ্ছন্দ, জীব কিন্তু কর্মবশান্ুগ, জীবের জন্ম 
কর্মজনিত | তাই ভগবানের জন্মের সঙ্গে জীবের জন্মের এত 
পার্থক্য । ভগবানের জন্ম এবং কর্ম চিং জাতি, নিজের ইচ্ছায় 
নিয়ন্ত্রিত । কিন্তু বুঝা তো! যায় না, বুঝতে পারলে তো আর 
কোন গোলমাল নেই । জীবের জন্ম ও কর্মের উপাদান আর 
ভগবানের জন্ম ও কর্মের উপাদানের মধ্যে পার্থক্া কয়লা 
ও অগ্নির মত। প্রাকৃত নিয়ে ঘর করি আমরা । তাই 
অপ্রাকৃতের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। জলচর 
প্রাণী যেমন স্থলচর প্রাণীর খবর রাখতে পারে না। তাই 
ভগবানকে যে জীব জানতে পারে না_এ জীবের দোষ নয়, 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৫১ 


কিন্ত যোগ্যতা রোজগার করতে হবে । এই অধিক অধিকার 
একমাত্র মানুষেরই আছে । অনুশীলন করতে করতে ক্ষণিকের 
মধ্যে জানা হয়ে যাবে। মার খেয়ে কেউ বিষ্তা মুখস্থ করতে 
পারে না, কিন্তু বিদ্ভাতে যদি বস লেগে ষায় তাহলে আপনিই 
মুখস্থ হয়ে যাবে । শ্রীগুরুবৈষবের আদেশে নাম করতে হবে। 
একদিন যখন নাম করতে কবতে বস লেগে যাবে, তখন 
হরিনীমই নাম করিয়ে নেবে । আমাকে করতে হবে না। 
ভগবানের শ্রীমূতি চিদ্ঘনবস্ত, শগবানের জন্ম কর্ম ঠিক ঠিক 
জানতে পারলে জীবের অনাদি অবিষ্ভাব ফলে যে জন্ম, তার 
নাশ হবে। ভগবানের জন্ম আবির্ভাব ম্বাত্র। নিমিরাজ প্রশ্ন 
করলেন-__ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান তিন কালের অবত্বার এবং 
তাদের কর্মের কথা বলুন। সপ্তম যোগীন্দ্র দ্রমিল এ প্রাশ্বের 
জবার দিচ্ছেন । শ্রীদীপিকাদীপনকার দ্রমিল শবের ব্যাখা 
করেছেন - ধ্যানে ক্ফৃত্িপ্রাপ্ত অবতারগণের সঙ্গে দ্রুত মিলিত 
হন, তাই ভাব নাম দ্রমিল। এখন কথা হচ্ছে ধ্যানপ্রাপ্ত 
রূপ তো সাক্ষাৎ নয়। যেমন কাগজ ও কালির ছবিতে রূপ 
&ণ দেখা যায় না, কিন্তু অথান্ুরবধ প্রসঙ্গে শ্রাশ্তকদেব এর 
জবাব দিয়েছেন । ভগবানেব প্রতিমাকে মনে মনে ভাবলেও 
তাতেই ভাগবতী গতি লাভ হবে। এর থেকে সিদ্ধান্ত হল 
প্রতিমা ও স্বরূপ ভিন্ন নয়। চিত্রপটে গোবিন্দ-ইচ্ছাতেই 
গোবিন্দ প্রকাশ পান, মানুষ তাকে প্রকাশ করতে পারে ন1। 
চিত্রপটকে ভজন দিয়ে যেচে যেচে কথ! বলাতে হবে । চিত্রপটও 
কথা বলে। জড় দেহে অগু-চৈতন্ত প্রবেশ করে দেহ যদি চঙ্গে 


২৫২ নবযোগীক্সংবাদ 


বলে, তাহলে কাগজে বিভূচৈতন্ প্রবেশ করলে সে কেন কথ! 
বলবে না? আর বিভুচৈতন্তের তো প্রবেশ নেই, তিনি 
আছেনই- অগ্নি, জল, গুর্য, অতিথি এরা তো ভগবানের 
অধিষ্ঠান। এদের পুজা করলে ভগবানের পৃজা কর! হয়: 

দ্রমিল যোগীক্স বললেন__ভগবানের গুণ অনস্ত, যখন 
তখন তা কি বল! সম্ভব? অনস্ত ভগবানের অনস্ত গুণ যিনি 
বলতে চান তার বুদ্ধি শিশুর মত। পৃথিবীর ধুলিকণা যদি 
বা গণনা কর! সম্ভব হয়, তবু ভগবানের গুণ বলে শেষ করা 
যায় না। একই ভগবানের অনন্ত গুণ কেমন করে সম্ভব? 
অনন্ত রুচির অনন্ত জীবকে আয়ত্ত করতে ভগবান নিজে 
অনস্ত গুণ প্রকাশ করেছেন, কেহ যেন বঞ্চিত না হয়। 
অনস্তই যদি হয় তাহলে কেমন করে বল! যাবে ? 


“পক্ষী যেমন আকাশের কিছুই না পায় টের 
যতদূর শক্তি উড়ি যায় ।” 


এটি যোগীন্দের দৈন্য প্রকাশ- যথামতি যথাকৃপা বুদ্ধিরূপ পাখা 
দিয়ে যতটা উড়তে পারি ততটা বলব । 

আদিদেব নারায়ণ পুরুষাবতার হলেন- প্রথম, দ্বিতীয় ও 
তৃতীয় পুরুষাবতার সত্ব, রজ, তমঃ-_-এই তিন গুণের সাম্যাবস্থাই 
প্রকতি। কালপ্রভাবে রজোগণ অধিক হলে স্থপতি হয়। 
প্রকৃতিগর্ভ থেকে মহত্বত্ব পুত্র জাত হয়। মহত ্রষ্টা হলে 
ভার পুরুষ নাম। ব্রহ্ষাণ্ডের বীজ হল মহত্তত্ব। মহত্ত্ব 
থেকে অহংকারতত্ব। তমোগুণ থেকে পঞ্চমহাভূত। এই 


নবষোগীন্দ্রসংবাদ ২৫৩ 


পথ্ভূতে বিরচিত ব্রহ্ষাণ্ড। পরমপুরুষ অংশে এই ব্রন্ষাণ্ডে 
প্রবিষ্ট হন-__-“তৎ স্থষ্টা তদনুপ্রাবিশৎ ৷ এর নাম গর্ভোদশায়ী, 
প্রতি বস্তকে বাঁচাবার জন্য ইনি প্রবেশ করেন। সং-ই তো 
সত্তা । বস্তু তো মায়িক। মায়িক বস্তব অসং-_তার ভেতরে 
সং না থাকলে সে সং হতে পারে না। সৎ এবং অসং 
এই ছই-এর অতীত য। তার নাম অনির্চচনীয় মিথ্যা । মায়িক 
বস্তর না বাচাই স্বভাব । তাকে বাঁচাধার জন্তাই ভগবান 
প্রবেশ করলেন। অসৎ যখন সত্তা লাভ করেছে তখন ঈশ্বর 
যে তাতে প্রবিষ্ট এটি অনুমান করা যায়, অবশ্য ভগবান এখানে 
মুরলীধর হয়ে প্রবেশ করেন নি। সচ্চিদানন্দ ভগবানের সন্ধিনীর 
কণা ব্রহ্মাগুকে ধরে রেখেছে । সন্ধিনীর কণা শক্তি, ভগবান 
শক্তিমান! শক্তি ও শক্তিমান তো অভিন্ন। তাই বলা হয়ভগবানই 
প্রবেশ করলেন । মহাবিষুর শরীরে ত্রিভুবন, অর্থাৎ উধ্ব, 
মধ্য এবং অধোলোক। অনস্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ড ধীর প্রতি রোমকুপে 
হাওয়া আসা করে । আমরা সকলে ব্যন্টি জীব, সমষ্টি হলেন 
হিরণ্যগর্ভ। অস্তর্যামীর কাছ থেকে জীব জ্ঞান লাভ করে। 
আমর! যখন মানুষ, তখন ভগবানকে জানতে হবে। ভগবান 
ছড়া আর কিছু জ্ঞাতব্য নেই। ঘটে পটে ভগবানের সত্বা 
আছে, কিন্তু তিনি তো শুদ্ধ ভগবান নন। সে সব বস্তুতে 
যে ভগবানের অবস্থান তাতে মায়াগুণের মিশ্রণ আছে। 
তাই তা জানলে হবে না, তত্ব জানতে হবে, অর্থাৎ কৃষ্ণ- 
পাদপন্ম জানতে হবে। এটি জানলে জীবের প্রশংসা, আর না 


জানলেই নিন্দা । 


২৫৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আদিদেব পুরুষাবতার এবং গ্রণাবতার গ্রহণ করেন। 
মায়ার গুণের মারফতে ভগবানকে দেখ! যাচ্ছে বলে তাকে 
গুণাবতার বল। হয় । রজোগুণের দ্বারা ব্রহ্মা, তমোগুণের 
দ্বার! রুত্র বল। হুল, কিন্তু সত্বগুণের দ্বারা বিষুণ এরকম বলা 
হয় নি। বিষণ ধর্মসেতু । শ্রীজীবপাদ সিদ্ধান্ত করলেন__ 
“সত্বেন” বলা হয় নি, কারণ বিষু হলেন শুদ্ধন্বরূপ। জত্বগুণের 
দ্বারা পালন কাজ হয়, সত্বগ্ণ ভগবানের গ্রহণের দরকার 
হয় না, সান্িধ্যমাত্রে উপকারক | “সর্গায় রক্তম্” এখানে 
রক্ত পদে লাল রংকে বুঝাচ্ছে না, সক্ত বদতে আসক্ত, তা 
না হলে তামসিক যোনি বক সাদ। হয় কি করে? তম্বোগুণের 
দেবতা শিব শুত্রকান্তি হন কেমন করে? বরং সত্বগুণাধিপতি 
বিষ্ুই কাল। ব্রন্মা স্যষ্টিতে আসক্ত। ব্রহ্মার এক নাম 
শতধুতি-_ কারণ তার ধৈধ অসীম, ব্রহ্মাণ্ডুের সকল জীব তার 
পুত্র । কেউ তার আদেশ পালন না করলেও তিনি ধৈর্য ধারণ 
করে থাকেন। ব্রহ্মা হলেন বিশ্বস্থ্টিকতা_-মূল উপাদানকে 
নিয়ে ব্রহ্মা স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই বিশ্ব চরাচর স্যপ্ি করেন । 

এর পরে ভগবানের নর-নারায়ণ অবতার । দক্ষ প্রজাপতির 
কন্যা মুত্তি হলেন ধর্মের স্্রী। এদের পুত্র হলেন নরনারায়ণ 
খধি। ইনি নৈক্ষর্মা লক্ষণ কর্ম নিজে আচরণ করে উপদেশ 
করেছিলেন । কর্মের ফল বন্ধন-_এই বন্ধন যদি না ঘটে তার 
নাম নৈষষর্্য, যেমন জগতে সংপাত্রে দান করলে বলা হয় এ 
খরচ হচ্ছে না_তোল! থাকছে । তেমনি নৈধর্ম্য লক্ষণ কর্ম 
জমার খাতাতেই ওঠে, খরচের খাতায় ওঠে না। কর্মের ফজ 


নবযোগীন্দ্সংবাদ ২৫৫ 


বন্ধন- পিপাসায় জলপান করলে তৃপ্তি--এই তৃপ্তিই আবার 
পিপাসার স্থষ্টি করে__কর্মই আমাদের বেঁধে রেখেছে । এমন 
কর্ম করতে হয়, যা! কর্মের এই বন্ধনদোষ ক্ষালন করে 
এই কর্মের নামই নৈষষম্য-লক্ষণ কর্ম। ঘি খেয়ে যদি উদরাময় 
হয়, ঘিই তার ওষুধ । কিন্তু ওষুধ-ঘি শুধু ঘি নয়_ দ্রব্য 
মেশান ঘি । শ্রীমন্ভাগবত বললেন__কর্ম তোমার বন্ধন ঘটিয়েছে, 
কর্মই কর। তবে দ্রব্য মিশিয়ে কর্ম কর। ভগবানের কর্ম 
কর--এই কর্ম তোমার বন্ধন মুক্ত করবে। ভক্তি কর্মের 
দ্বার বন্ধন নাশ হবে। শ্রবণ কীতন। স্মরণ, বন্দন কম 
হলেও এগুলি ভগবৎসম্পকিত বলে এর দ্বারা বন্ধন হবে না, 
মুক্তিই হবে। যেমন আকৃতিতে মানুষ-_একজন মানুষের 
দ্বারা বন্ধন আবার অপর মানুষের দ্বার! মুক্তি-_আকৃতিতে 
সাম্য কিন্ত প্রকৃতিতে ভেদ--তেমনি বন্ধনের কর্ম এবং ভগবং 
কর্ম দেখতে একরকম হলেও প্রকৃতিতে ভেদ আছে । একজন 
বন্ধন ঘটায় অপরটি বন্ধন মুক্ত করে। শ্রীগোপালতাপনী 
শ্র্তি বলেছেন-_“ভক্তিরেবাস্ত ভজনম্‌। ইহামুত্রফলভোগ- 
বিরাগেন অমুশ্মিন্নেব মনঃ কল্পনম--এতদেব নৈক্ষর্মাম্‌।' 
নরনারায়ণ খাষি নারদাদি মুনিকে উপদেশ দিয়েছন__নারদের 
বৈষ্ণবধর্মের গুরু হলেন নর-নারায়ণ খষি। এই খাষি বদ্রিকা- 
আমে শ্রীযুতি রপে আজও আছেন । 

নরনারায়ণ খবি গভীর ধ্যানে তম্ময়, ভার ঘন ধ্যানে ইন্দ্র 
কুপিত হয়েছেন । ইন্দ্র আশঙ্কা করলেন- খাবি ধ্যানের দার! 
পুণ্য অর্জন করে আমার ধাম ্বর্লোক জয় করবেন । এই 


২৫৩ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আশঙ্কায় খষির মহিমা! না জেনে তার তপোভঙ্গের জন্তে ইন্জ 
মদনকে পাঠালেন, সঙ্গে দিলেন অন্দরা, বসম্ত এবং দক্ষিণপবন। 
ধধি মনে মনে বিষয়টি বুঝে নিলেন- এ হল ইন্দ্রকৃত অপরাধ । 
তাই গর্বলেশশুন্ত হয়ে মদনকে বললেন-_“হে মদন, মঙলয়মারুত 
ও দেববধূগণ, তোমরা ভয় পেও না-_জগতের সকল জায়গাই 
ভয়ের আমার কাছে আবার ভয় কেন? আমার দেওয়। 
আতিথ্য গ্রহণ করে আশ্রমকে অশুন্ত কর। খাষির এই কৃপা- 
বাক্য শুনে সগণে মদন লজ্জিত হয়ে খধিচরণে প্রণত 
হল। খষি মদনকে বিভু বলে সম্বোধন করেছেন -_তুমি বিভু, 
তুমি পার-_জগৎ মুগ্ধ করবার তোমার সামর্থ্য আছে । এখানে 
বিচারের বিষয় আছে । শিবের তপোভঙ্গে দেখা যায় শিব ক্রুদ্ধ 
হয়ে মদনকে ভন্মীভূত করেন। ক্রোধ প্রশমিত করবার জন্য 
দেবতারা অনুরোধ করেছেন, কিন্তু খবি নরনারায়ণ ক্রুদ্ধ হন নি 
_হেসে মদনের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরাজিতকে সম্পূর্ণ 
মধাদা দিয়ে পরাজিত করেছেন, আতিথা গ্রহণ করিয়েছেন । 
শিব পরাজিত মদনকে মর্ধাদ দান করেন নি--খষি মনে মনে 
বুঝেছেন ইন্দ্রপ্ররোচনায় মদন এসেছে । তাকে প্রচুর সমাদর 
দেখিয়েছেন_খধিকে ক্রোধ স্পর্শও করে নি। এইটিই 
নরনারায়ণ খষি ও শিবের তপোভঙ্গের পার্থক্য ৷ 

নরনারায়ণ খষি মদনকে প্রশ্ন করেছেন_তুমি আমার 
তপস্ার বিত্ক করতে এসেছ কেন ? মদন বলছেন--তোমাকে 
ভগ্গবান বলে বুঝি নি। খবি বললেন ভগবান বলে বুঝে না 
থাক, ভগবন্ধাস বলে বুঝেছে। ভগবন্ধাস না৷ হলে তে। কেউ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৫৭ 


তপস্যা করে না, দাসের ওপরেই বা বিদ্ধ করতে এসেছ 
কেন ? মদন বললেন__অপরাধ করা আমার স্বভাব, অপরাধ 
ক্ষমা করা তোমার স্বভাব। তুমি যে আমাদের শক্তির গণনা 
করবে না__ এতো জানা কথাই । তোমার দাসেরাই আমাকে 
গণনা করে না_তোমার অনুগ্রহে তারা আমাদের গণনা করে 
না। যারা ভগবানের পাদপদ্ম ভজে_ দেবতারা তাদের বনু বিদ্ধ 
ঘটায় । খষি প্রশ্ন করলেন কেন বিদ্ব ঘটায়, ভক্তের কি 
অপরাধ ? ভক্তের কোন অপরাধ নয়__মাংসধষের জন্য ভক্তের 
শ্যায়কেও দেবতারা অন্যায় বলে মনে করে। ভক্ত তো 
মাসর্ষের পাত্র নয়- পাত্র না হলে কি হয়। মংসরী ব্যক্তি 
অপাত্রকে পাত্র করে নেয়। যারা তোমাকে ভজে, তারা 
দেবতাদের সব লোক অতিক্রম করে তোমার পাদপয্সে যায় । 
তা দেবতারা সহা করে না, দেবতারা অপমানিত বোধ করে। 
যার তোমাকে ভজে না তাদের কোন বিদ্প দেবতারা! করে না 
ভক্ত ভগবানের ভজন করে, ভগবন্ধামে গমন করে । কারণ 
বাক্য আছে £ 

যাস্তি দেবব্রতা দেবান্‌ পিতুন, যাস্তি পিতৃত্রতাঃ | 

ভূতানি যাস্তি ভূতেজ্যা যাস্তি মদ্যাজিনোইপি মাম্‌॥ 

_ গীতা ৯২৫ 

তাই দেবতার! মাতসর্ধবশে তাদের বিদ্বু ঘটায়-_যাতে তারা 
তোমার লোকে যেতে না পারে । প্রজা কর দিলে যেমন রাজা 
তার ওপর কোন বিত্ব ঘটায় না, তেমনি যারা যজ্ঞ করে 
দেবতাদের হবিঃ দান করে, দেবতারা তাদের কোন বিস্প করে 

১৭ 


২৫৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


না। ভক্তের তো তাহলে দেবতাদের হবিঃ দান কর! উচিত ; তা 
না করে তারা তো অন্যায়ই করে- না, অন্ঠায় করে না । ভক্তেব 
এ আচরণ যে অন্যায় নয়” তা দেবতারা বুঝতে পারে না । 
বক্ষমূলে জলসেচ করলে সমস্ত শাখাপ্রশাখা যেমন আপনা 
আপনি তৃপ্তি লাভ করে- মুলে জলসেচ ছাড়া যেমন 
শাখাপ্রশাখাকে তৃপ্ত করার অন্ত কোন উপায় নেই- ইন্দ্রিয় 
তৃপ্তি হবে যদি প্রাণ তৃপ্ত হয়, ইন্ট্রিয়কে খাছ দিলে ইন্দ্রিয় তর্পণ 
হয় না, তেমনি ভগবদারাধন। করলে সমস্ত দেবতার আরাধন। 
হয়ে ষাঁয়, কারণ ভগবান বলেছেন “মত্ত সবং প্রবর্ততে' | 
আরাধনারপ জল যদি কষ্চরণমূলে অর্পণ করা যায়, তাহলে 
শাখাপ্রশাখারপ সকল দেবতাই তৃপ্ত হন। মদন যে আজ এই 
তত্বকথা বলছেন এটিও নারায়ণের কৃপায় । কৃষ্ণ তৃপ্ত হলে 
ইন্্রাদি দেবতা শাখাপ্রশাখা আপন! থেকেই প্রফুল্লিত হবে। 
মদন খবিকে বলছেন-_ভক্তেরা তোমার পাদপনম্মে আরাধনাবূপ 
জন দিয়ে ইন্দ্রাদি দেবতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে । তোমার তত্ব 
বুঝতে পারলে এ বোধ হয়, কিন্তু ইন্দ্রাদি দেবতার তো! সে বোধ 
নেই। তারা নিজের পদমর্যাদাতে এতই গবিত যে তা বুঝবার 
সামর্থ্য তাদের নেই । মদনের কথা শুনে ভগবান বলছেন- কিন্তু 
দেবতাদের তে। মহিমা! আছে, তাদের মহিমা রক্ষা কর। ইন্দ্রাদি 
দেবতার বিদ্ু উৎপাদনের হেতু এমন কিছু বল, যাতে তাদের 
মহিমা বজায় থাকে । তার উত্তরে মদন বলছেন---তক্ত থাকে 
মায়ার জগতে এই ব্রহ্মাণ্ডে আর তুমি থাক চিৎ জগতে । 
মায়ার জগং থেকে ওপরে উঠতে গেলে সিড়ি চাই । দেবতারা যে 


$৬ 


নবযোগীজ্দসংবাদ ২৫৯ 


ভক্তের ওপর বিস্তর স্থ্টি করে-_এ বিদ্ধ হল সোপান । ভক্ত এই 
বিদ্বকে সোপান করে তোমার কাছে যায়। প্রহ্নাদ এ 
বিভ্বরাজি অতিক্রম করে তোমার কাছে গেছেন। তার দৃঢ় 
বিশ্বাস হরি তাকে নিশ্চিত রক্ষা করবেন। শরণাগতি যদি 
আন্তরিক হয়, তাহলে ভগবান রক্ষা করেন। যখন রক্ষা হয় 
না, তখন ভগবানের ক্রি নয়__শরণাগতির ক্রুটি । মদন বলছেন 
হে ভগবান, তোমার কৃপায় আমার বুদ্ধি খুলেছে । ভক্ত বিদ্বের 
দ্বারা অভিভূত তো! হয়-ই না, বরং বিদ্বের মস্তকে পদাঘাত 
করে চলে যায়_ঞ্ব তাই করেছেন । এব দ্বারা জগতকে 
দেখিয়েছেন ভগবদ্দাস মৃতুার মস্তকে পদাঘাত করে ভগবানের 
কাছে ষায়। ভক্তির আসম্বাদ যারা পেয়েছে তাদের জগতের 
স্থখছুঃখ কোনটাই গণনা হয় না। প্রথমে তারা সুখছুঃখ 
ছটিকেই সমদৃষ্টিতে দেখে, ভক্তির আস্বাদ কার কত হচ্ছে_-তা 
সুখছ্ঃখের সমদৃষ্টির ওপরে বিচার হবে। এক বস্ত। হীরে যদি 
রোজ পাওয়া যায়, তাহলে যেমন এক পয়সার লাভ বা এক 
পয়সার ক্ষতি কোনটাই গণনার মধ্যে আসে না, এও তেমনি । 
তারপর বিচার হবে সুখ এবং ছুঃখএই ছুটির মধ্যে 
কঞ্:প্রাপ্তির অনুকূল কে আর প্রতিকূল কে? বিচারে দেখা যায় 
স্থখ প্রতিকূল আর ছুঃখ অনুকূল। তাই ভক্ত ছুঃখ বিপদ 
প্রার্থনা করে। তুলসীদাসজী বলেছেন _স্ুখমে পড়ুক বাজ, 
ছুখমে বলিহারী যাই” । কারণ সে ঘড়ি ঘড়ি হরি স্মরণ করায়। 
কুস্তী মা! গোবিন্দের কাছে বিপদ প্রার্থনা করেছেন । বিপদই 
ভগবৎপ্রাপ্তির আন্ুকুল্য করে । দেবতারা ভক্তকে বিদ্ধ দিয়ে 


২৬৩ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ভগবানের কাছে যাবার সিঁড়ি তৈরী করে দেয়। এতে তাদের 
ভক্তের সেবা কর! হয়ে যায় এবং এই স্থত্রে তারা ভগবানেরও 
সেবা করে। মদন বলছেন- আর যারা তোমাকে ভজে না, 
তাদের ছুটি গতি: (১) কামের বশবর্তণা হয়, অথবা 
(২) ক্রোধের বশবর্ত্ণ হয় । ভক্তের জীবনে বিদ্ধ হল কষ্টিপাথর 
_কষ্টিপাথরে ঘসলে কোন সোন! কি দামের যেমন বুঝা যায় 
বিদ্বের সম্মুখীন হলে তেমনি কোন ভক্তের কেমন দাম বুঝা যায়। 
যারা ভগবানকে ভজে না, তার! হয় কামের বশীভূত হয়, না 
হয় ক্রোধের বশীভূত হয়। কামের বশীভূত হলে তবু কিছু 
ভোগ পায়। আর যার! কামনারপ অপার জলধি পেরিয়ে 
এসেছে, তার৷ ক্রোধের বশীভূত হয়, তারা অতি মন্দ। মদন 
বলছেন-_ আমার যে রূপ দেখছেন এ আমার আসল রূপ নয়, 
আমার রূপ নানা ভাবে দেখ! যায় ক্ষুধা, তৃষ্ণা, সবই কামের 
চেষ্টা, “দবং কামস্ত চেষ্টিতম্ঃ । কামন! সবত্রব্যাগী, ঘে কোন 
সুখানুভবের নামই মদন । কাম শব্দে বাসনা বুঝায়। শীত, 
গ্রীষ্ম, বর্ধা, বসম্তু তো! এতদিন ধরে ভোগ করা হল। এতে 
অভ্যাস হওয়া উচিত কিন্তু অভ্যাস তো হয় না। কামনা জয় 
করা বড় কঠিন, কামনা অপার জলধি কিন্তু জগতে এমন 
অনেক তেজস্বী খষি আছেন- ধারা এ কামনাকে জয় করেন । 
কিন্ত কপালের ফের এমনি যে তার সাগর পেরিয়ে গোম্পদে 
ডভোবেন। ক্রোধকে গোম্পদ বল হয়েছে, কারণ ক্রোধ 
বেশীক্ষণ থাকে না। তাই গোম্পদ ক্রোধের বশীভূত হলে 
তাদের সকল চেষ্টাই বিফল হয়। তোমার পাদপন্প তার! 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৬১ 


ভজে নি; এই জন্য কপালের ফের তাদের ভোগ করতে হয় 
_-তারা ছুশ্চর তপস্তা বৃথা ত্যাগ করে। শ্্রীম্বামিপাদ 
রলেছেন-_খাতোদকে টাকার কলসী ফেলে দেওয়ার মত বৃথা 
তাদের তপস্থা। নষ্ট হয় _“ন দ্ানীয় ন ভোগায়”। টাকার কলসীর 
মত তপস্যার ধন কামনা জয়ের দ্বারা ভোগে লাগে না। 
আবার বিষ্ণুর উপাসনা করে নি, তাই ন মোক্ষায়। মোক্ষেও 
লাগে না, কিন্তু অভিশাপাদি বাক্যের দ্বারা বৃথা নষ্ট হয়। 
মদনের স্ততির মধ্যে ধষি এশ্বর্ধ প্রকাশ করলেন, বনু সুন্দরী 
অঞ্পর! স্যপ্টি করলেন, যা দেখে মদন অবাক হয়ে ভাবলেন 
_-অহো। রূপম্চ । এই স্ত্রীগণ কিন্ত প্রাকৃত বিভৃতি। খষি 
বলছেন,_তোমাদের মুগ্ধ করতে চিৎ বিভূতিতে হাত দিতে 
হয় নি-_ প্রাকৃত বিভূতিই যথেষ্ট । খষি বলেন এদের মধ্যে 
থেকে একজনকে অন্তত নাও যে স্বর্গের ভূষণ হবে ; তখন 
উর্বশীকে নিয়ে মদন স্বর্গে চলে গেলেন । ইন্দ্র উবশীকে দেখে 
বিস্মিত হলেন । মদন দেবতাদের সভায় নারায়ণের সব কথ। 
বললেন, ইন্দ্র ভীত হলেন । কিন্তু নারায়ণেব অভয় পাদপদ্প- 
বলেই ইন্দ্র সে যাত্রা রক্ষা পেলেন । 

হংস, দত্তাত্রেয়, কুমার, সনকাদি মুনিগণ --এ রা ভগবানের 
জ্ঞানকলায় অবতীর্ণ, প্রাকৃত বিষয় সম্পর্ক এদের হয় নি, এরা 
ভগবানের অবতার । খষভদেব-__নবযোগীন্দ্রের পিত৷ ( যোগীন্দ্ 
বড় গরব করে পিতার নাম উল্লেখ করেছেন )। এঁরা সকলেই 
আত্মযোগ উপদেশ করেছেন । এর মধ্যে হংসাবতার উপাখ্যান 
উল্লেখযোগ্য । একবার সনকাদি মুনিগণ পিতা! ত্রহ্মাকে প্রশ্ন 


২৬২ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


করেছিলেন, বিষয় এবং চিত্ত পরস্পর পরস্পরের প্রতি ধাবিত 
হয়। পরস্পরের প্রতি পরস্পরের আকধণ অতি ছুবার; 
কিছুতেই নিবারণ করা যায় না। সুযুক্ষু ব্যক্তি এর আকষণ 
থেকে কি করে নিজেকে মুক্ত করবে ? এই প্রশ্বই সকল মনীষী 
ব্যক্তির হওয়া উচিত । প্রত্যেকেই ধর্মযাজন কিছু না! কিছু করে, 
কিন্তু ঠিকমত পেরে ওঠে না । তাব আটকায় কোথায় ? চিত্তের 
বিষয়াভিনিবেশ তীব্র, আবার ভুক্ত বিষয় চিত্তে বাসনারূপে 
স্থিতি লাভ করে । যার ফলে কেউ কাউকে ছাড়তে পারে না । 
সনকাদি মুনি সমগ্র জীবের হয়ে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন 
এবং ভগবানের কাছ থেকে জীবের জন্য এর উত্তর রেখে গেছেন । 
তা না হলে এর উত্তর আমরা কোথায় পেতাম? সনকাদির 
পিতা ব্রহ্মা এ প্রশ্ববীজ বুঝতে পারলেন না। কারণ ব্রহ্গা 
কর্মধী, তার বুদ্ধি কর্মেতে আসক্ত। তাই অধ্যাত্ম প্রশ্মের উত্তর 
দিতে পারেন নি। শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবতিপাদ ব্রক্মাকে কর্মধী 
বলেছেন, তার থেকে রন্ধা রেহাই পান নি। কিন্ত শ্রীজীবপাদ 
ব্রহ্মাকে রক্ষা করেছেন । তিনি বললেন- ব্রহ্মার ওপরে যখন 
মায়। দিয়ে স্ষ্টিকাজের ভার পড়ল, তখন ব্রহ্মার আশঙ্কা হল মায় 
নিয়ে যখন কারবার তখন মায়া আমাকে স্পর্শ না করে_ যেমন 
ছুরি, কাঁচি নিয়ে কাজ করতে হলে হাত কাটবার সম্ভাবন! । 
ব্রহ্মার এই আশঙ্কা বুঝতে পেরে ভগবান আগেই ব্রহ্মধাকে বর 
দিয়ে রাখলেন _“ভবান্‌ কল্প-বিকল্পেষু ন বিষুহ্যাতি কহিচিৎ”। 
ব্রহ্মা নিজেও বলেছেন -আমার বাক্য কখনও মিথ্যাকে স্পর্শ 
করে না, আমার ইন্দ্রিয় কখনও বিপথে গমন করে না । কেন 


নবযোগীক্দুসংবাদ ২৬৩ 


এমন হয় না এর উত্তরে ব্রহ্মা নারদকে বলেছেন হরিদর্শনের 
অত্যন্ত উৎকগ্ঠায় আমি হৃদয়ে হরিকে ধারণ করেছি। তাই 
এই সব হয় না। এর তাৎপর্য হল উৎকণ্ঠা না হলে হরি ধরা 
যায় না । তাই যদি হয়, তাহলে ভগবান ব্রহ্গাকে কর্মধী বললেন 
কেন? শ্ীজীবপাদ ব্রহ্মার পক্ষ থেকে জমাধান করেছেন-__ 
হংসাবতারের মহিমা প্রকাশের জন্য ব্রক্মাকে কর্মধী বলা হয়েছে। 
ব্রহ্মাও যখন কর্মধী তখন জীবের আর কি কথা! জীব যেন 
এর থেকে সাবধান হয়। কর্ম চিত্তকে মলিন করে। ব্রহ্ধা 
যখন প্রশ্বের উত্তর দিতে পারলেন না, তখন পিতা হয়ে পুত্রের 
প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না-. এই লজ্জায় ভগবানের শরণ 
নিলেন । হংস যেমন ক্ষীর নীর পৃথক করে সেই স্বভাবে চিত্ত 
ও বিষয়, চেতন ও জড়, পথক করবেন । এইজন্য ভগবান হংস 
রূপ ধারণ করে পিতা ব্রহ্মা ও পুত্র সনকাদি মুনির মাঝখানে 
আবিভূত হলেন। হংসকে দেখে সনকাদি মুনিগণ অতিথি 
জেনে পাদবন্দনা করেছেন । পরে বিজাতীয় হংসাকৃতি দেখে 
প্রশ্ন করেছেন-_“কো। ভবান্‌ ?' হংসাবতার এই প্রশ্নে বিশ্মিত হয়ে 
বলছেন, ভোমাদের এ প্রশ্ন কাকে অবলম্বন করে ? দেহ, জীবাত্মা 
অথবা পরমাত্মা-কোনটিকে অবলম্বন করে প্রন্ন-_“কো ভবান, 
অর্থাৎ “আপনি কে? আত্ম অর্থাং জীবাত সম্বন্ধে এ প্রশ্ন হতে 
পারে না। কারণ সব আত্মার স্বরূপই সমান, সবাই চিদেকরূপ 
আর দেহ সেও তো সব পঞ্চভূতে গড়া পাঞ্চভৌতিক-_-অতএব 
দেহ সম্বন্ধে এ প্রশ্ন নয় । মাটির বাসনের দোকানে যেমন যে 
কোন পাত্রই হোক সবই মাটি দিয়ে গড়া আর ষদি পরমেশ্বর 


২৬৪ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


ভেবে আমাকে প্রশ্ন করে থাক-_“কো। ভবান?--তাও তো ঠিক 
নয়। কারণ পরমেশ্বর তো ছুটি নেই, যা আছে একটিই । তাহলে 
দশ্যাদৃশ্য সবই তো আমি । সবই যদি আমি, তাহলে কে বলবে-- 
“কো ভবান্ । আত্মজ্ঞানী সনকাদির পিতা বলে ব্রহ্মা নিজেকে 
গৌরবান্িত বোধ করেন। কখনও পিতার নামে পুত্রের পরিচয় 
হয়, কখনও আবার পুত্রের নামে পিতার পরিচয় হয় । সেই 
আত্মজ্ঞানী সনকাদি প্রশ্ন করে পিতাকে আজ বিব্রত করেছেন। 
আত্মা চিদেকরূপ, তার ওপরে চিত্ত ও বিষয়ের ছুটি জামা পরান 
আছে। চিত্ত ও বিষয় ছুটিই অধ্যস্ত দেহ। অনাদি কাল থেকে 
আত্মার গায়ে এ জামা পরান হয়েছে । তাই মুক্তির কোন 
ব্যবস্থাই নেই, এ জামা আর খোল যায় না। তবে যুক্তির উপায় 
কি? সুত্র হল-_নিষ্ষিঞ্চন ভগবংভক্তের করুণাদৃষ্টিতে অনাদি 
কালের এই জাম ছিন্ন হবে । জীবের হৃদয়েও মুক্তির বাসনা 
ওঠে । সংসারযন্ত্রণা' থেকে কেমন করে পরিত্রাণ পাব, এ বাসনা 
ওঠে, কিন্তু কাজে লাগান যায় না। কারণ চিত্ত ও বিষয় 
পরস্পর পরস্পরকে অবিরত আকর্ষণ করছে যুবক-যুবতীর 
মত। ভগবান বলছেন এ চিত্ত, বিষয় এবং তাদের আকর্ষণ 
সবই আমার স্থষ্টি। তাই ছাড়ান যায় না । মুক্তিকামীর প্রথম 
কর্তব্য হবে, চিত্তকে বিষয়ভোগ থেকে সরাতে হবে। ওষুধ 
পরে খেলেও চলবে, কিন্তু আগে কুপথ্য নিবারণ করতে হবে। 
উপবাস দিতে হবে, চিত্তকে বিষয় থেকে সরিয়ে নেওয়াই হল 
উপবাস। কিন্তু প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না হলেও ভাবনার দ্বারা তো৷ 
বিষয়ভোগ হবেই । বিষয় মনে মনে টেনে এনে বিষয় ভোগ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ১৬৫ 


হবে, কিন্ত মনে মনে বিষয়ভোগ করলেও ভাবনার সম্পর্ক ও 
প্রত্যক্ষ সম্পর্কের মধো ভেদ আছে । আগুনে হাত দিলে হাত 
পুড়ে যায়, কিন্তু মনে মনে আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায় 
না। রোগী খাগ্চ খেতে চায়, কিন্ত খেতে না দিলে রোগীর 
কল্যাণই হয়। কিন্তু মনের বিষয়ভোগ দারা মানসিক 
অনুস্থতা তো থেকেই গেল। দেহকে বিষয়ভোগ থেকে সরান 
সহজ, কিন্তু মনকে বিষয়ভাবনারহিত করা কঠিন। তান 
করতে পারলে তো মুক্তি নেই। এর জন্য আলাদা ওষুধ খেতে 
হবে। গৌরগোবিন্দপাদপন্ধ ধ্যানরূপ ওযুধপানে একমাত্র 
এ মানসিক অসুস্থতা দূর হয়। প্রাকৃত দেহবিষয় কুৎসিত 
এবং এর মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত জিনিষটি হল তার ক্ষণভঙ্গুরতা | 
কিন্তু তাকেও আমরা ভালবাসি, সুন্দর বলে গ্রহণ করি। 
অনুন্দরাক যদি স্থন্দর বলে গ্রহণ করা যায়, তাহলে সত্যকার 
স্ন্দর ভগবানকে মনকে বুঝিয়ে কেন গ্রহণ করান যাবে না। 
প্রিয় বলে যদি মন বুঝতে পারে তাহলেই গ্রহণ করবে । মনকে 
বুঝিয়ে বুঝিয়ে কৃষ্ণপাদপদ্ন ভালবাসাতে হবে । তার রূপ, গুণ 
লীল। শুনিয়ে শুনিয়ে মনকে কুষ্ণপাদপদ্মে মজাতে হবে । মনকে 
বুঝান পর্যস্তই পরিশ্রম-মন একবার বুঝে নিতে পারলে 
আর পরিশ্রম নেই। প্রাকৃতবিষয়ভোগকে প্রিয় বলে ভাবনাই 
ব্যাধি । ভগবানকে প্প্রিয় বলে মনকে ভাবতে হবে । মৃত্যুর 
আগে পরস্ত অস্ততঃ মনকে বুঝাতে হবে যে কৃষ্ণপাদপদ্ধ প্রিয়, 
যে ত! পারে সেই ব্যক্তিই সাধু। তারই জন্মমরণ সার্থক 
হংসাবতারের কথা এখনও আমর! শুনতে পাচ্ছি। কথার কত 


২৬৬ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


দাম। শ্রীশুকদেব তার আধ প্রজ্ঞাতে সে কথা ধরে রেখে 
আমাদের দিয়েছেন । 

হ্য়গ্রীব অবতারে ভগবান পাতাল থেকে বেদ উদ্ধার করেন । 
মধুদৈত্য বেদরাশিকে গ্রাস করেছিল, ভগবান যোগনিদ্রায় 
অভিভূত | ব্রহ্মা যোগনিদ্রার স্ত্াতি করলেন, যোগনিন্রা সরে 
এলেন, অচ্যুত জাগ্রত হলেন। হয়গ্রীব অবতারের সঙ্গে মধু- 
কৈটভ দৈত্যদের পাঁচ হাজার বছর ধরে যুদ্ধ হল । দৈত্য ছুজন 
যুদ্ধে সন্তষ্ট হয়ে ভগবানকে বললেন,-বর নাও । ভগবান 
দেখলেন, যোগনিদ্রার কাজ এর মধ্যেই আরম্ত হয়ে গেছে। 
ভগবান বললেন, “তোমরা আমার বধা হও" । দৈত্যেরা বলল, 
_-'তিথান্ত' । কিন্তু যেখানে জল নেই, সেখানে আমাদের বধ 
কর। ভগবান জান্ুর ওপরে রেখে মধুকৈটভ দৈত্যকে বধ 
করেন । মতস্ত-অবতারে ভগবান সত্যব্রত মন্ুকে প্লাবন হতে 
রক্ষা করেন। বরাহ-অবতারে ভগবান হিরণ্যাক্ষকে বধ করেন । 
কুর্ম-অবতারে মম্থনদণ্ড মন্দর পবতকে পুষ্ঠে ধারণ করেন । 
হরি-অবতারে একান্ত আত ও শরণাগত গজেন্দ্রকে রক্ষা! 
করেন। 

ত্রিকুট পবৰতে এক ম্বিপুল সরোবরে একটি যুখপতি করী 
করেণুদের নিয়ে জলবিহার করছিলেন। এমন সময় এ 
সরোবরে এক বলবান কুমীর গজেন্দ্রের চরণ আক্রমণ করলেন। 
গজেন্দ্র নিজের বলবিক্রম প্রকাশ করতে লাগলেন । কুমীরের 
বলও অল্প নয়, তিনিও মহাবেগে আকধণ করতে আরম্ভ 
করলেন । হস্তীর এই অবস্থা দেখে হস্তিনীর দল তাকে ত্যাগ 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ২৬৭ 


করে জল থেকে উঠে আত্মরক্ষা করল । বিপদে সংসারে এই 
অবস্থা হয় । আত্মীয়, পরিজন-_বিপদে পড়লে কেউ কারও নয় । 
এইভাবে সুদীর্থকীল গজেন্দ্রের কুমীরের সঙ্গে যুদ্ধে তার উৎসাহ 
শারীরিক মানসিক বল, ইন্দ্রিয়সামর্থা সবই ক্ষীণ হয়ে এল 
এবং কুমীর ক্রমশ তাকে জলের নীচে টানতে লাগলেন । 
এইভাবে গজেন্দ্রের যখন প্রাণ প্রায় যায় যায় অবস্থা শ্রীহরি- 
পাদপন্মে শরণাগতি নিয়ে গজেন্দ্র সমাহিত চিত্তে ভগবানের 
স্তব করতে আরম্ত করলেন । গজেন্দ্র কাতরস্বরে আতিভরে 
ভগবানের চরণে নিবেদন করছেন-- “প্রভু গো, কুমীরের 
আক্রমণে আমি ক্লান্ত, অবসন্ন, প্রাণ বোধ হয় আমার আর 
থাকবে না_-তবে তুমি তো অশেষ শক্তিমান-_বহু বিরুদ্ধ বিশেষণ 
দিয়ে প্রভৃকে আহ্বান করলেন গজেন্দ্র ধার জন্মকর্ম নেই, নাম- 
রূপ নেই, গুণদোষ নেই, তবু যিনি লোকের উৎপত্তি এবং 
বিনাশের অন্ত নিজ মায়ার দ্বারা সময়ে সময়ে জন্মকর্ম স্বীকার 
করেন তিনি আমার পরম গতি ভোন। তিনি অরূপ ব্রহ্গ 
আবার বনুরূপী ও অনস্তশক্তি, তিনি সকলের প্রকাশক, বিশ্বের 
নিয়ন্তা--বাকা, মন ও চিত্তের অপ্রাপা ; তিনি সঞ্চণ এবং নিগুণ, 
তিনি জ্ঞানঘন শান্ত, শুদ্ধ কৈবল্য-নাথ, নিষ্কারণ আবার পরম 
কারণ অক্ষর, অবাক্ত পরম্‌ ব্রহ্মা অতীন্দ্রিয়, তিনি আমাকে রক্ষা 
করুন। তিনি দেবতা! নন, দানব নন, স্ত্রী নন, পুরুষ নন, তিনি 
আমার মুক্তির জন্য আবিভূত হোন । 

এইভাবে বহু স্ততিবাদের পর ভগবান গরুড়ের পুষ্ঠে 
আরোহণ করে, চক্রধারণ করে বিপন্ন গজেন্দ্রের কাছে উপস্থিত 


২৬৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


হলেন। আকাশপথে গরুড়ের পষ্ঠে চক্রধারীকে দর্শন করে 
গজেন্দ্র ভগবানের চরণকমলে উপহার দেবার জন্য মানস সরোবর 
থেকে একটি বিকশিত কমল শু'ড় দিয়ে তুলে নিয়ে, মুখে উচ্চারণ 
করলেন--“হে নারায়ণ, হে অখিলগরো, হে ভগবন. তোমাকে 
নমস্কার | 

দয়াময়ের হৃদয়ে দয়ার উচ্ছলন হল-_ ভাবলেন, গরুড় শ্রথ- 
গতি হয়েছে । তাই ভক্তবাৎসল্যের আকধণে সহস! অবতীর্ণ 
হয়ে মহাবেগে গজেন্দ্রের কাছে এসে চক্রুদ্বারা কুমীরকে বিনাশ 
করে গজেন্জ্কে মুক্ত করলেন । 

ভগবান নরসিংহ অবতারে স্টিকস্তস্তে অবিভূ্ত হয়ে দৈতা- 
পতি হিরণ্যকশিপুর বক্ষা বিদারণ করে নিজতক্ত প্রহ্নাদকে রক্ষা 
করেন। হিরণ্যকশিপু মন্দর পরতে দীর্ধকাল তপস্যা কবে 
ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন । ফলে বর য! পেয়েছিলেন তাতে 
একরকম অমরত্বই লাভ হয়েছিল । কারণ জলে, স্থলে, অস্তরীক্ষে 
দিবা-রাত্রি, প্রাণবান-প্রাণহীন কোনও কিছুতে তার ম্বতুযু হবে 
না। হিরণ্যকশিপুর বাসমা ছিল অমর হওয়ার জন্য, অর্থাৎ 
যাতে কোন দিন প্রাকৃতবিষয়ভোগের নিরত্তি না হয়। কিন্ত 
ব্রহ্মার পক্ষে অমরত্ব দান সম্ভব নয় তবু প্রকারান্তরে প্রায় 
অমরত্বই লাভ হয়েছে, কারণ ব্রহ্মার স্থষ্ট কেউ তাকে বিনাশ 
করতে পারবে না। ব্রহ্মা হিরণ্যকশিপুর অভিলধিত বর দান 
না করে পারেন নি কারণ দৈতাপতি এমনই জোরালো তপস্থা। 
করেছেন । অবশেষে ব্রহ্মার বাক্যকে সফল করে ভগবান অর্ধেক 
পশ্রাজ সিংহমূততি এবং অর্ধেক মনুয্যমৃতিতে (ব্রহ্মার স্থপ্টির 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৬৯ 


বাইরে ) অচেতন স্ষটিকস্তম্তে আবির্ভূত হলেন। কারণ ক্ষটিক- 
স্তস্তের দিকে দৃষ্টি দিয়ে ভক্ত প্রহ্নাদ বলেছিলেন পিতাকে 
আমার প্রভুকে এই স্তন্তেও দেখা যাচ্ছে । এতে প্রহ্নাদেব 
বাক্যও রক্ষা হল, আরও রক্ষা হল দেবষিপাদ নারদ ও সনকাদি 
খষির বাক্য। সনকাদি খষির অভিশাপে কৈকুনাথের দ্বারী 
জয় এবং বিজয় প্রথম জন্মে হিরণ্যাক্ষ ও হিরণযকশিপুরূপে 
অবতীর্ণ, তিনজন্মে তাদের উদ্ধার ৷ ভগবানের সঙ্গে বিরোধিতা 
করবেন বলেই তারা আবিভূত হয়েছেন। দেবধিপাদ দেবরাজ 
ইন্দরকে বলেছিলেন দেবতাদের দৈত্যপতির উৎগীড়ন হতে 
নিষ্কৃতির একটিমাত্র উপায় ভক্ত প্রহ্লাদের ওপর দৈতারাজেব 
দ্রোহ আচরণ। যার ফলে ভগবানের আসন টলেছে, কারণ 
তেত্রিশ কোটি দেবতার ছুঃখে ভগবান বিচলিত হন নি, কিন্তু 
একটি ভক্তের ওপর অত্যাচার ভগবান সহ্য করতে পারেন নি। 
ভক্তের প্রেমে ভগবান এমনই বশীভূত | হিরণাকশিপুকে 
বিনাশ করে ভগবান সাধুদের অভয় দান করেন। 

কণ্ঠপ প্রজাপতির জন্য বালখিল্য খষির৷ কাষ্ঠ আহরণ 
করতে গিয়েছিলেন । মেখানে জলে নিমগ্ন হয়ে বিপদের 
সম্মুখীন হয়ে ভগবানের স্ততি করেন। তাতে সন্তষ্ট হয়ে 
ভগবান তাদের রক্ষা করেন। আবার দেবরাজ ইন্দ্র যখন 
বৃত্রাস্থরকে বধ করে ব্রন্মহত্য। পাপে লিপ্ত হন, তখনও ভগবান 
ইন্দ্রকে উদ্ধার করেন। অন্থুরগৃহে নিরুদ্ধা অনাথ দেবস্ত্রীদের 
ভগবান মুক্ত করেন। এইভাবে ভগবান বহু অবতারে 
আবিভূত হয়ে জগতের কল্যাণবিধান করেন । 


২৭০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


আবার কশ্যপ প্রজাপতির ওরসে ও দেবমাত। অদ্িতির 
গর্ভে বিষণ ভগবানের অনুজ হয়ে ভগবান বামন-অবতারে 
আবিভত হন। সমুদ্র মন্থনকালে ধ্বন্বস্তরী যখন অমুতকলস 
নিয়ে ওঠেন তখন দেবতা ও অন্ুর ছুই দলই সে অমৃত-আন্বাদনে 
লোলুপ । কিন্তু অস্থুরগণ অমৃতভোজী হলে পৃথিবীতে অনর্থ 
হবে_এই আশঙ্কায় ভগবান বিষণ নিজে মোহিনী-মুত্তিতে সে 
অমুত পরিবেশনের ভার নিলেন । অস্ুরেরা ভগবানের মায়ায় 
মুগ্ধ হলেন, দেবতাদের মাঝে সুধা ব্টন করা হল। দৈতাপতি 
বলিরাজ মোহিনীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তার চরণে আত্মসমর্পণ করে 
বলেছিলেন_-মোহিনী ! আমি তোমার হলাম, কিন্তু তুমি 
আমার হবে তো? মোহিনী বললেন---“মহারাজ, আমরা তো 
স্বৈরিণী রমণী, স্থতরাঁং আমাদের ওপর বিশ্বাস কি-_- ভবিষ্যতে 
দেখা যাবে । সেই দেখা যাবার দিনটি এসেছে, ভগবান যখন 
বামন-অবতারে বলিরাজের কাছে ভিক্ষাগ্রহণের ছলে ত্রিপাদ 
ভূমি প্রার্থনা করেছেন । স্ উপনীত ব্রাহ্মণবটু, মুণ্ডিতমস্তক, 
দণ্ডকমগ্ুলুধারী বলিরাজের দানের খ্যাতি শুনে এসেছেন দান 
গ্রহণ করতে । বামন ভগবান যখন বলিরাজের কাছে নিজের 
ক্ষুদ্র চরণের ত্রিপাদভূমি প্রার্থনা করেন, বামন ভগবানের শ্রীচরণ 
নখর হতে আরম্ভ করে মস্তক পর্যস্ত সবশুদ্ধ একহাত পরিমাণ-- 
তার মধ্যেই অসীম রূপের ছটা--প্রতি অঙ্গে অপরূপ রূপলাবণ্য 
__এ রূপদর্শনে বলিরাজ মুদ্ধ হয়েছেন । বলেছেন-_-ক্রাহ্ণবটু 
তুমি যা চাইবে তাই দেব।, বলিরাজের কথায় ভগবান প্রশংসা 
করে বললেন--অস্ুুররাজ ! তোমার পিতা বিরোচন নিজের শত্রু 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৭১ 


জেনেও ব্রাহ্মণবেশধারী দেবতাকে নিজের পরমায়ু দান 
করেছিলেন, কারণ তিনি ব্রাহ্মণবংসল ছিলেন__তুমি তোমার 
পূর্বপুরুষগণের যশস্মি-পদান্কই অনুসরণ করেছ । তাই তোমার 
কাছে কিঞ্চিৎ ভূমি ভিক্ষা করি । হে দৈত্যেন্ত্র! আমার পদের 
পরিমাণে তিনপদ মাত্র পৃথিবী চাই। রাজন, তুমি অসামান্য 
দাতা, আমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত তুমি দিতে পার, কিন্ত 
আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করব না ।' 

ভগবান বামনদেবের কথা শুনে বলিরাজ বিস্ময় প্রকাশ 
করে বললেন : 

অহো ব্রাহ্মাণদায়াদ বাচস্তে বৃন্ধসম্মতা 2। 

ত্বং বালে। বালিশমতিঃ স্বার্থং প্রতাবুধো। বথা ॥ ভা. ৮।১৯।১৫ 
ওহে ব্রাহ্মণবটু কথা তো বেশ বিজ্ঞের মত বলছ দেখছি, কিন্তু 
নিজের স্বার্থবুদ্ধিটুকুও তো৷ তোমার নেই : তা না হলে তোমার এ 
ক্ষু্রে চরণের তিন পাঁদ ভূমি প্রার্থনা করছ। বামন-ভগবান 
বললেন-__মহারাজ ! আমরা জিতেক্দ্রিয় পুরুষ, তাই তিন পাদ 
ভূমি পেলেই খুশী কিন্তু অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিকে সাআ্রাজা দিয়েও 
সখী করা যায় না। এর পরে বামন ভগবান ত্রিবিক্রম মৃতি 
ধারণ করে এক চরণে সমগ্র মত্যভূমি, দ্বিতীয় চরণে সমগ্র ব্বর্গ- 
ভূমি এবং দেহকে বিস্ফীরিত করে তুবর্লোক, অস্তরীক্ষলোক 
অধিকার করলেন । নাভিদেশ থেকে তৃতীয় চরণ প্রকাশ করে 
তার স্থান প্রার্থনা করলেন, কিন্তু বলিরাজের তো আর স্থান 
নেই। ভগবান বলিকে তিরস্কার করে বরুণ পাশ দিয়ে বেঁধেছেন, 
তোমার সত্যরক্ষা কর মহারাজ । বঙ্সিরাজ বলেছেন-_তিরক্কার 


২৭১ নবযোগীক্দ্রসংবাদ 


আমাকে করছ কর প্রভু, কিন্তু আমার পক্ষে দাস হয়ে প্রভুকে 
তো! কিছু বলা সাঁজ না। তবু কিছু না বলে পারছি না, তুমি 
ভূমি প্রার্থনার সময় যে চরণ -দেখিয়েছিলে, ভূমি গ্রহণে 
সময়ে কি সেই চরণ আছে? তৃতীয় চরণের স্থান যখন বলিরাজ 
দিতে পারছেন না, ভগবানের বাক্যবাণে যখন জর্জরিত হচ্ডেন, 
তখন বলিরাজের স্ত্রী রাণী বিদ্ধ্যাবলী ছুটে এসেছেন, বলেছেন 
_-মহারাজ ! এখনও দর্প-অভিমান আছে-_নিজের মাথাটি 
ভগবানের এ রাঙা চরণে নিবেদন করে বলতে পারছেন ন! না 
মহারাজ ! এই সবন্ধয তোমার চরণে দিলাম । তখন বলিরাজ 
নিজের মাথাটি ভগবানের কাছে পেতে দিয়ে বললেন £ 
পদং তৃতীয়ং কুরু শীঞ্চি মে নিজম্‌। 

ভগবান তার তৃতীয় চরণ বলিরাজের মস্তকে দিয়ে তাকে 
আত্মসাৎ করলেন । এখানে প্রশ্ন হতে পারে ভগবানের যে চরণ 
স্বর্গ এবং মত্যভূমি অধিকার করেছে দেই চরণ এ ক্ষুদ্র মস্তকে 
স্থান পেল কি করে? মহাজন সমাধান করেছেন__-তা হবে 
না! কেন? বলিরাজ তে তার মস্তকের বুদ্ধি দিয়ে এ ত্রিভুবন 
অধিকার করেছেন । ধনের চেয়ে যেমন ধনী বড়, তেমনি 
্র্গ মত্যভূমির চেয়ে বলিরাজের মস্তকের স্থান বড়। তাই 
ভগবানের তৃতীয় চরণের স্থান বলিরাজের মস্তকে অনায়াসে 
হতে পারবে । ভগবান বামনদেব বলিরাজকে করুণা করে 
আত্মসাৎ করেছেন। বলিরাজ আত্মনিবেদন করেছেন, তার 
আত্মনিবেদনের মন্ত্র“মাং মদীয়মহং দদে'_-“তোমার চরণে, 
আমাকে দিলাম এবং আমার বলতে যাকিছু আছে সবন্ব 


নবযোগীব্রসংবাদ ২৭৩ 


তোমার চরণে দিলাম ।” মুহুর্তের জন্য ভগবান বলিরাজকে 
বরুণপাশে আবদ্ধ করেছিলেন, বিনিময়ে সারাজীবনের মত 
স্বতলে বলিরাজের দ্বারে দ্বারী হয়ে আছেন। 
এর পরে ভগবানের পরশুরাম ও রাম অবতার ৷ পরশুরাম 
হৈহয়পুর অর্থাৎ কাতবীধপুরে এবুশ বার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় 
করেছিলেন । এখানে যোগীন্দ্র বলেছন-_যে রাম পুথিবীকে 
একুশ বার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন, তিনিই সাগ্নর বেধেছিলেন £ 
সোইন্িং বন্ধন দশবন্তুমহন্‌ জলঙ্কং সীতাপতিজয়তি 
লোকমলত্বীতিঃ ॥ ভা. ১১1৪২১ 
এখানে অংশাংশিনোর্ভেদাভিপ্রায়াং_ পরশুরাম অংশ রামচন্দ্র 
মংশী। জনক রাজার এশ ধনু ভঙ্গ করে ভগবান রামচন্দ্র 
জানকীকে বিয়ে করেন। “দলঙ্কং দশবজ্জমহন+ এখানে 
লঙ্কার সঙ্গে দশাননকে বধ করেছিলেন। 'এ অর্থ করলে 
সমীচীন হবে না, তাহলে তো লঙ্কাও ধ্বংস হয়ে যেত। এখানে 
এই রকম অর্থ করতে হবে- লঞ্ধায় অবস্থিত রাবণকে বধ 
করেছিলেন । এখানে ভগবান রামচন্দ্র সম্বন্ধে জয় ঘোষণা 
করে যোগীন্দ্র বললেন_-“জয়তি সীতাপতি”__'জয়তি” বর্তমান 
কাল দেওয়া আছে । কারণ সীতাপতি তখন প্রকট। ভ্রেতাুগের 
ঘটনা । লোকমল্বকীতি সীতাপতি-_লোকের মল যিনি বিনাশ 
করেন-মল হল অবিদ্ভাজনিত ভগবানে অরুচি। এই 
অরুচি ঘিনি বিনাশ করেন তিনিই মলত্বকীতি। রামচন্দ্র 
ভগবান মর্যাদাপুরুষোত্তম, তার প্রতিটি লীলাই করুণ; তাই 
প্রতিটি জীলাই লুন্দর। রামচন্দ্রের জীবনে বিরহে মিলন 


১৮ 


২৭৪ নবযোগীন্সংবাদ 


আরও সুন্দর হয়েছে । অলঙ্কার শাস্ত্রেও বলা আছে বিরহ 
না থাকলে মিলনের মাধুর্য হয় না। কাপড় কষজলে ডুবিয়ে 
নিয়ে তাতে রং ধরালে যেমন রং খোলে তেমনি বিরহকষ- 
জলে চিত্ত ডোবাঁলে তাতে মিলনের রঙ ভাল ধরে। বিরহেব 
পরে মিলনের ভোগ হয় বেশী। নিরন্তর মিলনে ঠিক 
মিলনের মধুর আম্বাদ পাওয়া যায় না। কৃষ-অবতারে 
এই বিরহ অবস্থা প্রকট হয়েছে। কৃষ্ণ ভগবান সম্বন্ধে 
বলা হয়েছে-“নিরস্তর কামক্রীড়া যাহার চরিত'_ নিজ 
আনন্দিনী শক্তির সঙ্গে সর্বথা বিহার, এটিই ভগবত্তার চরম । 
সকলেই নিজ শক্তির সঙ্গে বিহার করে- গীতশক্তি, চিত্রশক্তি 
_-এদের সঙ্গে বিহার করেই লোকে সুখ পায়। জীবের পক্ষে 
নিজশক্তিকে মৃতি দেবার সামর্থ্য নেই,কিন্ত ভগবানের সে সামর্থা 
আছে। তাই ভগবান তার আনন্দিনীশক্তির রূপ দিয়ে 
অসংখ্য গোপবালার সঙ্গে বিহার করেছেন। এর নামই 
শ্রীলীলামুকুটমণি রাসলীলা । “আনন্দং ব্রহ্মণো রূপম” এই 
আনন্দিনী শক্তির সঙ্গে ভগবানের বিহার, রাধামাধবের বিহাব 
-__এইটি স্বাভাবিক । এটি আরম্ভ হয়েছে রামচন্দ্র স্বরূপে । 
এখানেই প্রথম বিরহ আস্বাদন। রামচন্দ্রের জগতের সঙ্গে 
ব্যখহার এত স্বাভাবিক যে তার ভগবস্তাকে যেন বুঝা যায় না। 
ভগবান যখন অংশাবতারে এসেছেন, তখন তার কাজ আমাদের 
সঙ্গে মেলে না। ভগবান যতই পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়েছেন 
ততই তার ব্যবহার স্বাভাবিক হয়েছে। শ্রীশুকদেব রামচরিত্র 
বর্ণন করেছেন £ বনপথে চজ্তে চলতে রামচন্দ্র অনুজ লক্ষ্মপকে 


নবযোগীক্দরসংবাদ ২৭৫ 


বলছেন--বনের পায়ে-হাটা পথ আগাছায় ঢেকে গেছে; 
আধমল পথ চেনা যাচ্ছে না। লক্ষ্মণ বুঝতে পারলেন না এ 
কথার সার্থকতা কি? এর অর্থ হল কলিকালে উপধর্মরূপ 
আগাছা এত বৃদ্ধি পাবে যে তাতে আসল ধর্মের পথ ঢেকে 
যাবে- আসল ধর্মের পথ চেন! যাবে না-ভগবান রামচন্দ্র 
পিতৃ-আদেশে বনগমন করেছেন এবং তায় দ্বারা দেবতাদের 
কার্য সিদ্ধি হয়েছে। রাম-অবতারের আসল কারণ পিতা 
দশরথ ও মাতা কৈশল্যার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রেম 
আব্বাদন, দেবতাদের কার্যসিদ্ধি গৌণ, যেমন ভগবান কৃষ্ণের 
কংসবধ কাজটি অকিঞ্চিংকর ; কিন্তু প্রেমদান এবং প্রেম 
আস্বাদন কাজই মুখ্য । চণ্ডীতে বিষুশক্তিই তো অস্থুরবধ 
করেছেন। এখানেও বিষণুশক্তি দিয়েই অস্ুরবধ অর্থাৎ 
রাবণবধ হতে পারত । সেজন্য ভগবান রামচন্দ্রের আসবার 
প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু দশরথ কৌশল্যার প্রেমে মুগ্ধ হয়েই 
তাদের বাৎসল্যপ্রেম আন্বাদনের জন্যই রামচন্দ্রের আবির্ভাব । 
চতুবিংশতি চতূযুগের ত্রেতায় রামচন্দ্র অবতার, আর 
অষ্টাবিংশতি চতুর্গের দ্বাপরে ভগবান কৃষ্ণন্দ্রের আবির্ভাৰ 
অর্থাৎ রামচন্দ্রের আবির্ভাবের সতের যুগ পরে কৃষ্ণচন্দ্রের 
আবির্ভাব। বর্তমানে সপ্তম বৈবস্থত মনুর রাজত্ব চলছে। 
ধর্মশীল যছুরাজের বংশে কৃষ্ণ জন্মেছেন। যছুর পিতা! মহারাজ 
বযাতি শুক্রাচার্যকন্া দেবযানীর পাণিগ্রহণ করেন । রাজকন্তা 
শত্মিষ্ঠা সহত্্র দাসীসঙ্গে দেবযানীর দাসী হয়ে থাকলেন । 
অবিবাহিতা অবস্থায় দাসী শমিষ্ঠার গর্ভে পুরুর জন্ম হওয়ায় 


২৭৩ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


মহারাজ যযাতির ওপর শুক্রাচার্ষের অভিশাপ হয়। তার ফলে 
যযাতি জরাগ্রন্ত হন। এই জরা জোষ্টপুত্র যু নেন নি; তিনি 
ভাবলেন, আমার যৌবন দিয়ে পিতার জর! নিলে তা দিয়ে 
তো! হরিভজন হবে না। উচ্ছিষ্ট খাগ্ভ দিলে ভিখারীও খায় না, 
আর হরিভজন এই উচ্ছিষ্ট দেহ দিয়ে কেমন করে হবে? 
উচ্ছিষ্ট দেহ ভগবানকে দেওয়া চলে না, কিন্তু ভগবান অত্যন্ত 
লোভী বলে তিনি গ্রহণ করেন | যছুমহারাজ্ঞ বিচার করেছেন 
_পিতার বাক্য লঙ্ঘন করায় তার অপরাধ হল কি না। 
পিতা জন £ 1১) প্রকাশক পিতা, (২) পরমপিতা ৷ ঈশ্বর 
সকন্সের পিতা--তাই পিতৃদ্রোহ করলেই দগ্ডভোগ করতে 
হৰে। জগতে কর্তবা ও অকর্তব্য ছুট আছে--ঝণশোধ কর্তব্য 
আর হারভজন অবশ্য কতব্য । হরিপাদপদ্মে মজে তাকে ভজতে 
পারলে আর কিছু করতে পার! যাবে না। এই জন্যই 
ভগবানের চরণকে পগস্ম বলা হয়েছে । চরণপল্ম তাই ভক্ত 
ত্রমরকে আকৃষ্ট করবে। ভ্রমর পদ্মে আকৃষ্ট হলে তার পক্ষে 
যেমন আর কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়, তেমনি হরিপাদপন্নভজন 
ছেড়ে ভক্তেরও আর কিছু করা সম্ভব নয়। শ্রীমপ্তাগবত 
বললেন, বে বাক্তি হরিপাদপদ্মভজন করে তার কোন খণ থাকে 
না। ভগবানের নিজের মতও তাই। তাই বলেছেন £ 
সবধর্মীন পরিত্যজ) মামেকং শরণং ব্রজ । গীতা ১৮৬৬ 
এর পরে ভগবান কুষ্চন্দ্রের আবির্ভাবপ্রসঙ্গ যোগীন্দ্র উল্লেখ 
করেছেন । পৃথিবীর ভার হরণের জন্য ভগবান কৃষ্ণচন্দ্র যদুকুলে 
আবিভূতি হয়েছেন। যা কখনও ছিল না, তার জন্ম হয়। 


নবযোগীল্্রসংবাদ ২৭৭ 


ভগবানের জন্ম হল বল! চলে না, কারণ তিনি নিতাকাল 
আছেনই। তিনি অজ হলেও বলবার জন্য বল! হয়, ভগবান 
জাত হলেন--“অজোখপি জাতো৷ ভগবান্‌ যথাগ্রি | ভগবান 
কৃষ্ণের আবির্ভাবের কারণ যোগীন্দ্র যা উল্লেখ করলেন-_ 
ভূমির ভার হরণ সেটি ঠিক কথা নয়--ভূমির ভার হরণ 
উপলক্ষ্য মাত্র। কৃষ্ণ আবির্ভাবের অনেক কারণ। গীতায় 
অ্জুনের কাছে ভগবান যে কাঁরণ উল্লেখ করেছেন ঃ 

যদ! যদ হি ধর্মস্ গ্লানির্বতি ভারত | 

অভ্যুত্থানমধর্মস্ত তদাত্মানং স্থজাম্যহম্‌ ॥ 

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ ছুদ্কৃতাং। 

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥ গীতা ৪।+-৮ 
এ হল ভগবানের অন্য অবতারের কারণ-্বয়ং ভগবানের 
আবির্ভাবের কারণ-_এটি হতে পারে না। 

শ্রীরাসলীলা প্রসঙ্গে শ্রীশুকদেব উল্লেখ করেছেন £ 
অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষং দেহমাস্থিতঃ | 
ভজতে তাদৃশীঃ ক্রীড়া যাঃ শ্রুত্বা তৎপরো ভবে ॥ 
ভা. ১০।৩৩।৩৭ 

স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণচন্দ্রের আবির্ভাবের কারণ বলছেন- মানুষের 
দেহকে আশ্রয় করে ভগবান যে আবিভূতি হলেন, তা 
প্রাণীদের প্রতি অনুগ্রহ বিধানের জন্য । তিনি জগতে আবিরভৃতি 
হয়ে এমন লীল! প্রকাশ করলেন যা শুনে জীবের তার প্রতি 
রতি হয়। ভগবানের এই মানুষ দেহ আশ্রয় সম্বন্ধে গখীতাতেও 
বল। আছে £ 


২৭৮ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 
অবজানস্তি মাং মূঢা মানুষীং তমুমাশ্রিতম্‌ । 
পরং ভাবমজানস্তে। মম ভূতমহেশ্বরম্‌ ॥ গীতা ৯।১১ 

আমার মহান্‌ এশবর্য জানে না বলেই তারা আমাকে মানুষ বলে 
মনে করে অর্জন এবং এতেই আমাকে অবজ্ঞ। করা হয়। 
মানুষের মত ভগবান দেখতে হলেও, উপাদান এক নয়-_ 
স্র্ণপিগুনিমিত মানুষ যেমন মানুষ নয় । ভগবানের দেহের 
উপাদান সং চিৎ আনন্দ, আর মানুষের দেহের উপাদান রক্ত 
মাংস মেদ মঞ্জা অস্থি চর্ম প্রভৃতি । মানুষের দেহ যদি 
ভগবানের হয় তাহলে তিনি কি গরুড়ের পিঠে উঠতে পারেন ? 
শ্রীমম্মহা প্রভুর বাক্য £ 

প্রাকৃত করিয়া মানে বিষুণ কলেবর । 

বিষুনিন্দা আর নাহি ইহার উপর ॥ 
মানুষীং তন্ুম বলতে মানুষের শরীরের যেমন সন্নিবেশ 
ভগবানের দেহের সন্নিবেশ সেই রকম । মানুষ যেমন দেহকে 
আশ্রয় করে, ভগবান তেমনি দেহকে আশ্রয় করেছেন বললে 
ভুল হবে। ভগবান দেহী এবং তার দেহ নিত্য । বল! আছে: 

গৃঢ়ং পরং ব্রহ্ম মনুষ্যলিঙ্গমূ। ভা. ৭1১০।৪৮ 
তাইতো বাক্য আছে £ 

কৃষ্ণের যতেক খেল। 
সবোত্ম নরলীল। 
নরবপু তাহার স্বরূপ । 

জীচৈতন্চন্দ্রোদয় নাটকে শ্রীমন্মহা প্রভুর মহাপ্রকাশের অবস্থা 
বর্ণন করা আছে। মুরারির অধ্যাত্ম যোগ ভাল লাগে, বাশিষ্ঠ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৭৯ 


পড়ে, ভক্তি ভার রোচে না। আর মুকুন্দের উপাস্য হলেন 
চতুভূ্জ নারায়ণ__শঙ্গ-চক্র-গদা পদ্মধারী। দ্বিভূজ মুরলীধর 
স্বরূপকে তিনি ভগবান বলে মানতে চান না। অদ্বৈত আচাধ 
প্রভু মহাবিষু অবতার শ্রীমন্মহা প্রভুকে জিজ্ঞাসা করলেন-_-প্রু 
এটা কি তোমার মত নয় ? মহাপ্রভু বললেন-__“ভক্তিরসের 
বন্যা বইয়ে গঙ্গার জলে নয়নের জল মিশিয়ে তুমি ষে আমাকে 
এনেছ আচার্য তুমিও এই কথা বলছ ?' মহাপ্রভু বললেন-__ 
'ভগবানের স্বাভাবিক রূপ দ্বিভুজ আব এঁচ্ছক রূপ চতুর্ভজ 
বন্থভুজ'। তত্বকথা হল ভগবান মনুয্যদেহ নিত্য ধারণ করে 
আছেন, গোলোকেও তিনি দ্বিভুজ--এইটিই তার নিতারূপ। 
ঘ্বিভূজ রূপ তার বড় প্রিয়, তিনি এই রূপ বড় ভালবাসেন । 
তাই তার প্রিয় মানুষকে দ্বিভূজ করে গড়েছেন তার প্রিয় হবে 
বলে। পাগুবজননী কুস্তীও ভগবান কৃষ্ণচন্দ্রের আবির্ভাব সম্বন্ধে 
কার উল্লেখ করেছেন £ 


ভবেশ্মিন্‌ ক্রিশ্যমানানামবিদ্ভাকাম কর্মভিঃ। 
শ্রবণস্মরণার্হান করিষ্যন্নিতি কেচন ॥ ভা. ১1৮৩৫ 


অবিস্ভা, কাম এবং কর্মের দ্বারা জীব নিয়ত ক্রিষ্ট। ভগবান এ 
জগতে আবির্ভূত হয়ে যে লীল! করলেন, তা শ্রবণ করে, কীর্তন 
করে, শ্মরণ করে জীব অচিরে কৃষ্ণপাদপন্ম লাভ করবে । কৃষঃ 
চরণান্থজ দর্শনের ফলে তার সকল রেশ নিবৃত্ত হয়ে যাবে এবং 
জস্মমরণ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে। কৃষ্ণ-আবির্ভাবের এইটিই 
হেতু । কুন্তীমাও বলেছেন পৃথিবীর ভারহরণের জন্য ভগবানের 


২৮০ নবযোগীব্্রসংবাদ 


আবি9াঁব, কিন্ত সেটি গৌণ; কারণ জীবের ক্লেশ দূর করাই 
মুখ্য উদ্দেশ্য | 

যোগীন্দ্র বললেন, দেবতাদের পক্ষে য৷ ছুক্ধর, ভগবান যু 
বংশে জন্মগ্রহণ করে তাই করবেন। পুথিবীর ভার অপহরণের 
জন্য স্বয়ং ভগবানের আসবার দরকার হয় না, আবেশ অবতারের 
দ্বারাই সে কাজ হয়। রজোগুণ থেকে অন্থুরের জন্ম । রজোগুণ 
এবং তমোগুণকে দমন করে সত্বগুণ বৃদ্ধি করাই পুথিবী রক্ষা । 
প্রতিটি শরীরে তিনটি ধাতুর প্রভাব দেখ! যায়__বায়ু পিত্ত কফ, 
রজঃ সত্ব ও তম: গুণের মত। রজোগুণকে আশ্রয় করে ব্রহ্গা, 
তমোগুণকে আশ্রয় করে শিব এবং সত্বগুণে বিষণ ভগবান। 
অনুর দমন করে ভগবান পৃথিবীর ভার হরণ করেন, অর্থাৎ সত্থ 
গুণ বৃদ্ধি করেন। এই প্রথিবীর ভার হরণের জন্য ব্রহ্মা, শিব, 
নারদ এবং অন্যান্য দেবতা ক্ষীরসাগরের তীরে গিয়ে ক্ষীরোদ- 
শায়ীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন_ দেবতারা মানুষ হয়ে, 
খষিরা গাভী হয়ে, তৃণগুল হয়ে গোকুলে জন্ম নেবেন। কৃ 
অভিন্নতব বলদেব অগ্রজ হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন । ব্রজবাসী 
সকলে দেবতা। এখন কথ হচ্ছে ভগবান যদি ভারহরণের জন্যই 
আবিষ্ৃত হন, তাহলে এত সব আয়োজন কেন? তাহলে বুঝা 
যাচ্ছে, ভারহরণ আসল কাজ নয়--উপলক্ষণমাত্র । ভগবানের 
অন্ত উদ্দেশ আছে। হ্বয়ংভগবান শ্রীগোবিন্দের আবির্ভাবের 
আসল উদ্দেশ্য হল পরকীয়া রম আন্বাদন। ধীর! গোবিন্দের 
মনের কথা জানেন অর্থাং গোবিন্দে বিশ্বস্তধী যারা ভার! 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ২৮১ 


সেই কারণই উল্লেখ করেছেন। শ্রীরাসলীলা প্রসঙ্গে শ্রীশুকদেৰ 
বললেন £ 
ভগবানপি তা রাত্রীঃ শারদোফুল্লমল্লিক! ৷ 
বাক্ষ্য রস্তং মনশ্চক্রে যোগমায়ামুপাশ্রিতঃ ॥ 
_- তা. ১০।২৯।১ 


ভগবাঁন অজুরনের কাছে তার আবির্ভাবের যে কারণ উল্লেখ 
করেছেন, সেটি ফাঁকা কথা ; কারণ অন তো নর্মসখা নন, তাই 
আসল মনের খবর দেন নি। কুষফ্ের কাজ অশ্থরমারণ নয় £ 
বিষু, ঘারে কৃষ্ণ করেন অস্ুর সংহার। 

কৃষের কাজ তাহলে কি? নিরন্তর কামক্রীড়া যাহার চরিত। 
কৃষ্ণ অখিলমাধুর্ধঘন বিগ্রহ, অন্ুরমারণ কাজ তার হতে পারে 
না। পালনকর্তা বিষ্ণুর ওপরেই পৃথিবী রক্ষার ভার । তাই অসুর 
বিনাশ করে, রজোগুণকে দমন করে, সত্বগুণকে বধিত করে তিনি 
পৃথিবী রক্ষা করেন। গোলোকেও দাস্ত, অখ্য, বাৎসল্য, মধুর, 
চার রসের খেলা ৷ গোলোকাধীশ শ্রীগোবিন্দ তার পরিকর নিয়ে 
এলেন ভূ-বুন্দীবনে লীলা করতে । তবু গোলোকের লীলা! 
অপেক্ষা ভূবন্দাবনের লীলার মাধূর্ব সমধিক । এ বৈশিষ্ট্যের 
কারণ কি? তারাই তো লীলা! করেছন, বনভোজনের মত 
এতে নৃতন আস্বাদ। সেই একই চাল-ডাল, লোকজন, ভবু 
বনভোজনের আন্বাদ বেশী। 

বাক্পতি বেদবক্তা লোকপিতামহ ব্রন্ধা স্বয়ং ভগবান 
গ্রীগোবিন্দের আবির্ভাবের কারণ নির্দেশ করেছেন £ 


২৮২ নবযোগীক্্রসংবাদ 


প্রপঞ্চং নিশ্রপঞ্চোইপি বিড়ম্বয়সি ভূতলে । 
প্রপন্নজনতানন্দসন্দোহং প্রথিতুং প্রভো ॥ 

_-ভা. ১5।১৪।৩৭ 
হে প্রভূ, তুমি নিজে নিশ্প্রপঞ্চ হয়েও প্রপঞ্চের মত ব্যবহার 
কর। ভগবান যেন প্রশ্ন করছেন-_কেন ত্রচ্মন্, এটি করবার 
প্রয়োজন কি বলতে পার? ব্রহ্মা বলছেন- প্রভু, তোমার 
দয়া হলে বলতে পারি--যারা “যা কর গোবিন্দ বলে সর্বস্ব 
ত্যাগ করে পড়ে আছে তাদের আনন্দবিধানের জন্য, ভূভার- 
হরণের জন্য ভগবানের আবির্ভাব_এ কথা ব্রহ্মা বলেন নি। 
ভক্তের আনন্দবৃদ্ধিই তার আবির্ভাবের কারণ। ব্রহ্মা এবং 
শ্রীশগুকদেব যে কারণ নির্দেশে করলেন তাতে পাওয়া গেঙ্গ 
ভক্তানন্দ বৃদ্ধি। 

শ্রীশুকদেব রাসলীলার প্রসঙ্গে ভগবানের আবির্ভাবের 
কারণ দেখিয়েছেন £ 
রেমে তয়া চাত্বরত আত্মারামোইপ্যখণ্ডিতঃ। 
কামিনাং দর্শয়ন্‌ দৈশ্ং স্ত্রীণাং চৈব ছুরাত্মতাম্‌॥ 
ভা. ১০।৩০1৩৫ 
রাধা আদি ব্রজরামাগণ সকলেই মহাভাবের গণ, কৃষ্ণ হতে 
দ্বিতীয় নন এবং দ্বিতীয় নন বলেই ভগবানেব আত্মরতভাব 
টিকল। তারাও কৃষ্ণই__ কৃষ্ণ হলেন বিষয়কৃষ্ণ আর গোগীর! 
হলেন আশ্রয়কঞ্চ। আশ্রয়কৃষ্চ এবং বিষয়ক্চ বললে ভাঙগ 
শোনায় না বলে বলা হয় নি। বিষয়কুঞ্ণ স্বয়ং ভগবান নিজে 
রসম্বরূপ পরম আম্বা্--পরম চরম মাধূর্ষের খনি। রস আহ 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৮৬ 


নিজেকে আন্বাদন করবার জন্য অন্য আকারে দাড়ালেন । 
কষ আনন্দন্বরূপ, কিন্ত সে আনন্দকে তো কারো ভোগ 
করা চাই। আনন্দ ভোগের শক্তিই হলেন নিত্য পরিকর। 
গোপীরূপে আনন্দভোক্তা আন্বাদন করবার জন্ত কুষ্ণই 
দাড়ালেন-_ এ কথা বলবার জন্য বলা । তা ন! হলে অনাদিকাল 
থেকে এ আম্বাদক স্বরূপ হয়েই আছে । শ্রীশুকদেব বলেছেন-__ 
'মহারাজ, এ গোপীর। কেউ কৃষ্ণ হতে দ্বিতীয় মন, ভিন্ন নন £ 
রেমে রমেশে ব্রজনুন্দরীভির্যথার্ভকঃ স্বপ্রতি বিশ্ববিভ্রমঃ | 
_চ্ভা, ১০।৩৩।১৭ 

শ্বীশুকদেবের 'রেমে তয়! চাত্বরত'__ এই বাক্যে বিরুদ্ধবাদীরা 
ব্যাখ্যা করেন, রাসলীলার কারণ ভগবান গোগীসঙ্গে বিহার 
করলেন, কামীর ছঃখ ও স্ত্রীজনের ছুষ্টতা জগতে দেখবার 
জন্য ॥ কিন্তু এই যদি রাসলীলার কারণ হয়, তাহলে রাসলীলার 
ফলশ্র্ণতি যে শুকদেব বলেছেন £ 

বিক্রীড়িতং ত্রজবধূভিরিদঞ্চ বিষ্ণোঃ 

শ্রদ্ধান্বিতোইশৃণুয়াদথ বর্ণয়েদ্‌ যঃ। 

ভক্তিং পরাং ভগবতি প্রতিলভ্য কামং 

হৃদ্রোগমাশ্বপহিনোত্যচিরেণ ধীরঃ ॥ ভা. ১০।৩৩।৪০ 
রাধা আদি গোপবালাদের সঙ্গে শ্রীগোপীবল্লভের এই রসময়ী 
লীলাকথা ধার! গ্রী গুরআন্ুগত্যে শ্রদ্ধাভরে কানে শুনবেন অথবা 
কীর্তন করবেন, তারা শ্রীগোপীজনবল্লভের পাদপদ্সে শুদ্ধাভক্তি 
লাভ করবেন এবং হৃদয়ের কামনা রোগ অচিরে দূর হবে । 
কামাদি সম্ভাপ ঠাদের আর কখনও সন্তপ্ত করতে পারবে না। 


২৮৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


শুকদেবের পূর্ব ও পরবাক্যে তাহলে সামগ্স্ত থাকে না। এটি 
ব্যাসকুটের মত শুককুট বলতে পারা যায়। মহাজন ছাড়া এর 
থেকে উদ্ধারের আর কোন উপায় নেই। এর থেকে আসল য৷ 
পাওয়। যায়, তা হল ভগবান শ্রীরাসলীল। করে জগতে প্রেমের 
লীলা দেখালেন এবং জগতকে বুঝালেন_ এই প্রেমের 
লীলা দেখে বুঝে নাও যে জগতের কাম কত ঘ্বণ্য। চিটে 
গুড়ের আম্বাদ কত ঘৃণা বুঝতে পারা যায় যখন টাটকা মধুর 
আম্বাদ জিভে লাগে । স্বয়ং ভগবান শ্রীগোবিন্দের রাসবিহারের 
প্রাকৃত উপমা হয় না। কেউ কেউ বলেন_ এ রাসবিহার 
আর কিছ নয়, জীবাত্মা! পরমাত্মার মিলন, জীবাত্বা রাঁধা এবং 
পরমাতআ! কৃষ্ণ-এ হল যোগীর কথা, ভাল কথা। যেকোন 
উপায়ে প্রাকৃত সংসর্গ ত্যাগ-_তাও উপমা হয় না। কারণ 
জীবাত্মা! এবং পরমাত্মার মিলন হল অণু ও বিভূর মিলন। 
কিন্তু কথা হচ্ছে রাধা তো! জীবাত্মা নন 

রাঁধাকৃষ্ণ এক আতা ছুই দেহ ধরি। 

অন্ঠোন্তে বিলসয়ে রম আম্বাদন করি ॥ 
গোগীর সঙ্গে কৃষ্চমিলনের উপমা হয় না, কারণ রাধাকৃষ্ণ ভিন্ন 
নন, একই । তা যদি না হত তাহলে এ রাসলীল। মুনিদের 
বন্দনীয় হত না। 

যে স্ত্রীসঙ্গ মুনিগণ করেন নিন্দন। 

তারাও রামের রামে করেন স্তবন ॥ 
মনের স্ুখছঃখ যেমন মন দিয়েই বুঝা যায় ভগবানও তেমনি 
নিজ্জেকে বিছিয়ে রমণ করেছেন। যোগীন্দ্র মহারাজ নিমির 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ২৮৫ 


যজ্তর্শালায় সকলের সামনে কথ! বঙ্গছেন, তাই ভগবান কৃষ্ণের 
আবির্ভাবের গৃঢ় কথাটি বলতে পারেন নি। সাধারণ কারণটি 
মাত্র বলেছেন £ 
ভূমের্ভারাবতরণায় যুষজন্মা জাতঃ করিষ্যতি 
স্থবরৈরপি দুষরাণি। ভা. ১১।৪।২২ 
অস্থরগণ সবৃগ্ণের বিরোধী । তাই তার! পৃথিবীর ভার। 
জগতে এই অস্থরের বৃদ্ধিতে অনুস্থতা৷ বৃদ্ধি পাঁয়। উপবাসে সন্ত 
গুণ বৃদ্ধিপায়। দৈত্যগণ পৃথিবীর ব্যাধি। এই ব্যাধির চিকিৎসার 
জন্ম ভগবান চিকিংসক আসেন। অন্ুরবিনাশে রজোগ্ুণ 
বিনাশ করেন । দৈত্যগণ তো বাইরের-_অস্তরের দৈতা আছে । 
রাজোগ্ণ প্রবল হলে মানুষ আমরাই অস্থর- এটি ভিতন্রের | 
এটিও জগতের ভার। ভগবান বলেছেন £ 
দে ভূতসর্গে। লোকেইস্মিন্‌ দৈব আম্মুর এব চ। 

_ গীতা ১৬৬ 
বিষুতক্ত এবং অস্ুর-_এর মধ্যে অন্ুর যারা তারা দেখতে মানুষের 
আকার কিন্তু বৃত্তি অন্ুরের । মিথ্যাকথা বলা, অসছৃপায়ে 
অর্থ-উপার্জন-_অপরাধ পাপ এ সবই অস্থুরের কাজ। প্রথম 
দৈত্য হল প্রকাশ্য অস্থুর, আর এরা হল অপ্রকাশ্ঠ অনুর । 
শক্ত যাঁর! তাদের চেন! যায়, তাদের কাছ থেকে সাবধান হওয়া 
ষায়,কিন্ত যার! মিত্রবেশী শত্রু তাদের কাছ থেকে সাবধান হওয়া 
কঠিন। তাই এরা আরও ভয়ানক । বিষুবৈষ্ণবনিন্দা, প্রবর্চন! 
কপপটতাঁ_এ সবই অন্ুরবৃত্তি। বৈষ্বনিন্দুকের ভার পৃথিবী 
কখনও সহা করেন না। কৃষ্ অবতীর্ণ হয়ে প্রকাশ্য অনুর বিনাশ 


২৮৬ নবযোগীব্্সংবাদ 


করেছেন । আর তার লীলাকথ শাস্ত্ররূপে জগতে রেখে গেছেন, 
তার দ্বারা আজও অপ্রকাশ্ট অন্থুর বিনাশ হচ্ছে। তাহলে 
কৃষ্ণেরই ছুটি কাজ। কৃষ্ণের যে কোন কাজ দেবহৃষর-__প্রথম 
গণ্য পৃতনাবধ, শেষ গণ্ডুষ কেশীবধ। যে কেশী দৈত্যের ত্্ষোয় 
দেবতাগণ কম্পিত হন তাকে কৃষ্ণ বধ করলেন গলার ভেতর 
হাত ঢুকিয়ে । পতন! মায়ের বেশে গোকুলে এসেছে । গোম্বামি- 
পাদগণ ধরেছেন পৃতনা রাক্ষপী গোকুলে এল কেমন করে, 
সচ্চিদানন্দ ভগবদ্ধাম গোকুল, যেখানে শুদ্ধভক্তেরই একমাত্র 
গতি। মুক্তপুরুষ যেখানে আসতে পারে না, সেখানে 
'পুতনা লোকবালদ্বী রাক্ষলী রুধিরাশনা”_সে এল কেমন 
করে? গোম্বামিপাদগণ সিদ্ধান্ত করেছেন__লীলাশক্তির 
অন্থমোদনে পৃতনা গোকুলে এসেছে । লীলাশক্তি কেন 
অনুমোদন করলেন ? প্রয়োজন হল শ্রীগোবিন্দের মহিমা 
প্রকাশ। শক্তির কাঁজ হল শক্তিমানের মহিমা! ঘোষণ। করা । 
পৃতনা রাক্ষসী সেও যখন মাতৃগতি সদ্গতি লাভ করল, কৃষ্ণানন্দ 
পেল, তখন তাকে দেখে যে কেউ কৃষ্ণপাদপদন্মে আসতে পারে 
এতেই ভগবানের মহিমা প্রকাশ পেল। পুতনার পরিবর্তে যদি 
কোন বৈকুষ্ঠপার্ষদ আসতেন তাহলে মহিমা প্রকাশ পেত ন|। 
কংস পৃতনাকে পাঠিয়েছেন, বলে দিয়েছেন__“অসাধারণ বালক 
দেখলেই খেয়ে ফেলবি, শিশু কৃষ্ণের অসাধারণত্ব আনন্দবৃন্দা- 
বনচম্পু গ্রন্থে শ্রীকবি কর্ণপূর গোম্বামিপাদ বর্ণনা করেছেন-_ 
কৃষঃতন্ু এতই কোমল যে মা যশোমতী কোলে নিতে শঙ্কা 
করেন, নিজে নীচু হয়ে স্তনহুপ্ধ পান করান । পৃতনা মায়ের বেশে 


নবযোগীজ্দ্সংবাদ ২৮৭ 


সজ্দিত হয়ে এসে কৃষ্ণকে বক্ষে তুলে নিয়ে যশোদা-মা ও রোহিনী 
“মাকে তিরস্কার করেছেন হ্যাগা তোরা কেমন মা? সোনার 
ৰাছাকে মাটিতে রেখেছিলি ? মায়েদেরও স্বাভাবিক দৈশ্বশে 
মনে হয়েছে__সত্যিই তো, আমরা গোপালের মা হবার উপযুক্ত 
নই। এই রমণীই গোপালের মা হবার উপযুক্ত। কৃষ্ণতক্তি 
যাজন করতে হলে দেন্য চাই--আর কৃষেের দৈন্-_সে তো 
অনেক উচুতে । পৃতনা কালকুট বিষমাখানো।স্তনের কৌটাটি যখন 
কৃষণবদনে তুলে দিল তখন কৃষ্ণ কিন্তু আপত্তি করেন নি। কৃষ্ণ 
ভাবছেন লীলাশক্তি গোকুলে পুতনাকে ডেকে আনলেন কিছু 
তাকে দেবার জন্, কিন্ত আমি তাকে কেমন করে দিই । আমাকে 
কিছু না দিলে ত আমি কিছু দিতে পারিনা । আমাকে 
কিছু দিলেই তাকে কিছু দেবার বিধান আছে । পুতন৷ তো 
আমাকে বিষ দিয়েছে, এর বদলে তো ওকে কিছু দেওয়া যায় 
না। ওকে কিছু দিতে গেলে তো! ওর কাছ থেকে শুধু বিষ 
নিলে হবে না। তাই কৃষ্ণ পৃতনার পঞ্চপ্রাণ সেই বিষের সঙ্গে 
মিশিয়ে নিয়েছেন, এর বদলে তাকে সদ্গতি দিয়েছেন । জগৎ 
ষদি প্রশ্ন করে- হ্যাহে কৃষ্ণ, তুমি যে পুতনার বিষদানের বদলে 
তাকে সদ্গতি দিলে--এ তোমার কেমন বিচার হল? তার 
উত্তরে কৃষ্ণ বলবেন- পৃতনা তো শুধু বিষ দেয় নি, তার পঞ্চ 
প্রাণ দিয়েছে, পূতনা বুঝতে পেরেছে তার পঞ্চপ্রাণ কৃষ্ণ চুরি 
করেছেন। তাই "ছাড় ছাড় ছাড়'__বলে স্তনের বৌটাটি কষ, 
বদন থেকে টেনে নিয়ে কোল থেকে তাকে ফেলে দিতে চেয়েছে, 
কিন্ত কৃষ্ণ তো আর ছাড়েন না । কৃষ্ণের এমনই স্বাভাব যে 


২৮৮ নবযো গীন্দ্রসংবাদ 


একবার আদর করে যে তাকে বুকে তুলে নেয়, সে ছাড়ছে 
চাইলেও কুষ্ণ তো! তাকে ছাড়েন না-_এইটিই তো সাধকের 
ভরসা । আমরা তো প্রতি মুহূর্তে কৃষ্চচরণ বিস্মৃত হতে চাই, 
কিন্ত কৃষ্ণ যদি না ভোলেন তবে তো কাজ হবে । কৃষ্ণ যে সব 
অস্থর বধ করেছেন এ সব কাজই দেবতাদের অসাধ্য । 
কেশীদৈত্য কৃষককে কামড়াবে বলে ছুটেছে, ভগবান তার 
হাতকে তপ্ত লোহার মত করে কেশীর গলার ভেতর ঢুকিয়ে 
দিয়েছেন । কেশী দৈত্য ফেটে গেল । কংসের ১০৮ হাত ধনুর্ভজ, 
কুবলয়াপীড় বধ, কালীয়দমন, গিরিগোবর্ধনধারণ, কোনটিই 
মানুষের কাজ নয়__এরও পরে শ্রীশুকদেব রাসবিহার বলেছেন । 
দই ই গোপবালার মধ্যে শ্টামসুন্দর বিহার করেছেন, আকাশের 
চাঁদ জগণে বিস্মিত হয়ে অস্ত যেতে ভুলে গেছেন । গোবিন্দ 
মনে মনে গোপবালাদের সঙ্গে রমণের ইচ্ছা করলেন । এই 
মনের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে কাজ হওয়! উচিত ছিল, তা! কিন্তু হয় 
নি। অনেক পরে বাঁশী বাজিয়ে গোপবালাদের আকর্ষণ 
করেছেন, নিকুপ্জের ছ্বারে শ্যামনাগর ধাড়িয়েছেন, মনে মনে 
ইচ্ছা করলেন, সব ঠিক-ঠাক হল, অনেক পরে বাশী 
বাজালেন। ভগবানের ইচ্ছামাত্রে কাজ তার আবার আয়োজন 
কি আছে? বাধা কিসের? শ্রীগোবিন্দমবন্ধ শ্রী-বৃন্দাবনসবস্থ 
শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবতিপাদদ এই ব্যবধানের কারণ নির্দেশ 
করেছেন। গোঁপবালারা পরোটা রমণী । গোবিন্দ বংশীনিনাদের 
আগে ভাবছেন পরকীয়া রদ আম্বাদন করা চলে কি না। 
একমাত্র শ্রীগোবিন্দ ছাড়া অন্ত কোন ভগবান পর্যস্ত পরকীয়া 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ১৮৯ 


রস আস্বাদন করতে পারেন না, তাতে দোষ হয় । জ্্রীউজ্জবল- 
নীলমণি গ্রন্থে বলা আছে £ 


নেষ্টা যদ্জিনি রসে কবিভিঃ পরোটা 
তদ্গোকুলাম্বজদৃশাং কুলমন্তরেণ 
আশংসয়! রসবিধেরবতারিতানাং 
কংসারিণ! রসিকমণগ্ডলশেখরেণ ॥ 


শৃঙ্গাররসে পরোটা রমণী অঙ্গীভূত হয় নি, কিন্ত গোকুলস্মন্দরী 
বাদ দিয়ে পরকীয়া রসভোগের কলে যে লঘুত্ তা অন্য নায়ক 
সম্বন্ধে, কৃষ্ণ সম্বন্ধে নয়। শ্রীউজ্জল কৃষ্ণ আবিভাবের কারণ 
বলেছেন-_-“রসনির্যাসব্াঙ্গার্থাবতারিণী'--রস নিধাস আম্বাদনের 
জন্য । তত্বকথায় এইটিই দাড়াল, কৃঞ্ের ওপরে আর কেউ নেই । 
জগতে যা! কিছু আছেন সবই তিনি । একই টাকা যেমন ভিন্ন 
ভিন্ন চেহারায় ভোগের বস্তুতে পরিণত হয়, তেমনি এক গোবিন্দ, 
যিনি ভোগের বস্ত্র, তিনি ধাম পরিকর রূপে আপনাকে বিস্তৃত 
করে রেখেছেন। তাই রমিকতাঁর জন্যই এই পরকীয়া রসের 
স্থষ্টি। তা না হলে' গোপবালাবা তো৷ তত্বত কৃষ্ণ হতে অভিন্ন, 
পরকীয়া তাই অতি গৃঢ় রসের কথা। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বলা 
হয়েছে, গোপবালারা কৃষ্ণের নিত্যকান্তা, রসের নির্যাস 
আব্বাদনের জন্য লীলাশক্তি তাদেরই পরকীয়! করলেন। তাৎপর্য 
একমাত্র কৃষ্ণনুখ । কৃষ্ণ গোগীর জন্য ব্যাকুল, আবার গোগী 
কৃষ্ণের জন্য ব্যাকুল, বস্তত তার! কিন্তু অভিন্ন । অগ্নি যদি তার 
দাহিকাশক্তিকে, চন্দ্র যদি তার জ্যোতস্নাকে অন্বেষণ করে, তা 
১৯ 


২৯০ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


যেমন অসম্ভব, কৃঞ্ণও গোপী অন্বেষণ করছেন বা গোঁপী কৃষ্ণ 
অন্বেষণ করছেন এও অসস্ভব। উভয় উভয়কে খু'জছেন-__এ এক 
লীলার বিচিত্র পরিপাটি । এমন অপূর্বতা আর কখনও দেখা যায় 
নি। তত্বের ওপরে রণের স্থান, তত্ব বুঝে তাকে ভূলে রসভোগ 
করতে হবে । তব্ব মনে থাকলে ব্যাঘাত (বাধা ) সম্ভব হবে ন৷ 
অথচ রসলীলার তরঙ্গ বাঁধা না পেলে উঠবে না, বরং তত্বের 
বোধে লীলার তরঙ্গ স্তিমিত হয়ে যাবে। তত্ব বাহন, রস বাহ | 
যেমন ঘোঁড়া বাহন দামী কিন্তু মানুষ যে তার পিঠে চড়ে তার 
দাম ঘোড়ার চেয়েও বেশী । তাই তত্বের চেয়ে রসের দাম বেশী। 
লীলারমের কাছে তত্বের খাতির নেই। সখারসে ব্রজসখা৷ 
শ্রীদাম তত্ব কৃষ্ণের কাঁধে চড়ে অপরাধ করে নি, কারণ কোন 
দণ্ড সে পায় নি। 

রাসস্থলীতে মনে মনে রমণ ইচ্ছার অনেক পরে ভগবান 
বংশীনিনাদ করেছেন । ভগবান বংশীনিনাদ পরে করলেন কেন? 
ভাবছেন__পরকীয়া রস আমার আস্বাদন কর! চলবে কি না। 
পরকীয়া রসের গুরু হলেন শ্রীমন্মহা প্রভু। মহাপ্রভু বলেছেন 
--“শুক সে আমার তত্ব জানেন সকল? । শ্রীচৈতন্যমনো বৃত্তি হল 
শুদ্ধ পরকীয়া রস। কৃষ্ণ চিন্তা করছেন পরকীয়া রস আস্বাদন 
করা ঠিক হবে কি না, ধর্মবিগহিত কাজ করতে যাচ্ছি । কৃষ্ণের 
যখন এই প্রকার চিন্তা, তখন কৃষ্ণকে তত্বের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে 
না। লীলারস আন্বাদন এখন-_এ সময়ে তত্ব ভুলতে হবে । 
কৃষ্ণের এই চিন্তা হওয়ায় বাশী বাজাতে সাহস হচ্ছে না । পর- 
কীয়া রস আন্বাদনে ধর্ম, বেদ, দেবতা, সমাজ সব লঙ্ঘন করতে 


নবযোগীন্দ্রসংবাদ ২৯১ 


হবে। কিশোর বয়স কৃষ্ণের, কত আর বুদ্ধি, লোকনিণ্দা হবে 
জগৎ কি বলবে? ভরসা পাচ্ছেন না । গোবিন্দ যখন এইভাবে 
চিন্তাগ্রস্ত সে সময় গোবিন্দ ভাবনা দেখে আকাশে টাদ উঠলেন । 
চন্দ্র পূর্বদিগ বধূর শ্রীমুখ নিজকরের (কিরণের) দ্বারা মাজন করে 
যেন কৃষ্ণচকে বুঝাচ্ছেন__“গগো কৃষ্ণ, আমি তোমার পুবপুরুষ, 
অতিবৃদ্ধ দ্বিজরাজ-_আমিও এ বয়সে ইন্দ্রপত্রী পুবদিগ বধূর 
রসান্বাদনে লুব্ধ, পরকীয়া রস আম্মদন করছি । আর তুমি 
আমার বংশধর, তাতে বয়সে নবীন, আর তুমি ত্রা্মণ নও 
গোপজাতি ; তোমার পরকীয়া রস আস্বাদনে ভাবনা কি? তুমি 
সানন্দে পরকীয়া রস আম্বাদন কর। আমি তোমার সাক্ষী 
রইলাম। তখন ভগবান আশ্বস্ত হয়ে ভরসা পেয়ে বংশী নিনাদ 
করলেন ? 
জগৌ কলং বামদৃশাং মনোহরম্‌। ভা. ১1২৯৩ 

তাহলে দেখা যাচ্ছে ভগবান কুষ্চন্দ্রের কাজ দেবতাদের পক্ষে 
শুধু ছুষ্ধর নয়, অন্য দেবতাদের তো বটেই, এমন কি শিব 
বিরিঞ্চিরও আরাধ্) । 

কৃষ্ণ ভগবান যে যে লীলা করেছেন সবই দেবতাদের 
অসাধ্য । কংসবধ করতে কৃষ্ণ পারতেন না_কংস সম্বন্ধে মাম! 
_তাই বধ ' করলে পাছে দোষ পড়ে কৃষ্ণ সেজন্য কোন অস্ত্র 
দ্রিয়ে কংসকে বধ করেন নি। কুবলয়াগীড় হস্তী বধের পরে কংস 
ভয়ে আধমরা হয়ে যান, কংস জেনেছেন মৃত্যু তার অতাস্ত 
নিকট । তারপর যখন মল্লেরা পরাজিত হল তখন কংস আর 
ভরসা পান নি। কংসকে ধাকা দিয়ে সিংহাসন থেকে মাটিতে 


২৯১ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


ফেলে দিয়ে বিশ্বস্তর মৃতিতে ভগবান তার ওপর গড়িয়ে 
পড়লেন, বিশ্বস্তরের চাপে কংস বিগতপ্রাণ হলেন । কংসবধের 
সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে কংসের শ্বশ্তর জরাসন্ধ আঠার বার মথুরা 
আক্রমণ করেছে, জরাসন্ধের দ্বারা প্রেরিত কালযবন কৃষ্ণের 
পিছনে তাড়া করেছে, কৃষ্ণ ভয়ে পালাচ্ছেন__এও লীলার 
পরিপাটি । ধাঁর একাংশের দ্বারা সমস্ত জগৎ ধৃত হয়ে থাকে 
তার আবার ভয় কি?তার ভয় তো দূরের কথা, তার 
দাসেরই ভয় থাকে না, ভ্রেতাধুগের রাজা যুচুকুন্দকে ভক্তি 
লাভ করান--এ সব কাজ দেবতাদের পক্ষেও হু্ষর। 

প্রভুর দাসের কত ক্ষমতা দেখা যায় শ্রীহনুমীনজীব 
চরিত্রে। মাতা অঞ্জনাকে যখন হনুমানজী প্রভূ রাম- 
চন্দ্রকে দর্শন করান তখন রামচন্দ্রের অঙ্গে ক্ষত দেখে অঞ্জনা 
বলেন__“হনুমান ! তুমি নিজের অঙ্গে বাণ ধারণ করে প্রভৃকে 
রক্ষা কর নি কেন? তুমি সাগরের ওপরে নিজেকে বিছিয়ে 
দিয়ে প্রভুর সেতুবন্ধনের ক্লেশ নিবারণ কর নি কেন? প্রভুর 
দাসের যদি এত সামর্থ্য হয়, তাহলে প্রভুর কা কথা ? 
মথুরাতে কৃষ্ণ যুদ্ধ করেছেন । বৃন্দাবন থেকে কৃষ্ণ তো শুধু 
হাতে গেছেন। জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বৈকু্ধ থেকে 
রথ, ঘোড়া, অস্ত্র এল | কৃষ্ণ সমুদ্রমধ্যে দ্বারকাপুরী নিমাণ 
করলেন, স্বর্গ হতে স্তধর্মীসভা পারিজাত পুষ্প নিয়ে এলেন-__ 
এ সবই দেবছুক্ষর। দ্বারকার অতুলনীয় বৈভব, দেবরাজ 
ইন্দ্র সেখানে কৃষ্দর্শনলালসায় দৌবারিককে উৎকোচ দান 
করেন। 


নবযো গীন্দ্রসংবাদ ২৯৩ 


শ্রীআনন্দবুন্দাবনচম্পু গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ আবিাবেব কারণগুলি 
শ্রীকবিকর্ণপুর গোস্বামিপাঁদ দেখিয়েছেন ঃ 
আত্মারামান্‌ মধুরচরিতৈর্ভক্তিযোগে বিধাস্তযন্‌ 
নানালীলারসরচনয়া নন্দয়িয্যন্‌ স্বভক্তান্‌ 
দৈত্যানীকৈভূবিমতিভরাং বীতভারাং করিষ্ঠুন্‌ 
মৃত্যানন্দো ব্রজপতিগেহে জাতবৎ প্রাছুরাসীং ॥ 
আত্মারাম মুনিদের প্রতি ভক্তিযোগ দানের জন্ত নিজ ভক্ত- 
গণের আনন্দবিধানের জন্য এবং দৈত্যভারে আক্রান্তা পৃথিবীকে 
ভারমুক্ত করবার জন্য মূত্তিমান আনন্দপ্রাতিমা শ্রীকষ্চভগবান 
ব্রজরাজ নন্দমহারাজের গৃহে জাত হলেন। 
ভক্তের স্বখবিধান কর'ল ভগবান নিজে শ্খী হন। আবার 
ভক্ত সুখ পায় যদি ভগবান স্তুখ পান। এর মধ্যেই প্রেমদান 
লীলা আছে। এ প্রেমদান দেবতাদের সাধা নয়, প্রেমদান 
তো দূরের কথা, কৈবল্য মুক্তি পযন্ত দেবতারা দিতে পারেন 
না। এই মুক্তি দেবার ভার মাত্র ছুজনের ওপর কৃষ্ণ 
দিয়েছেন-_শিব ও শিবানী । এরা ভক্তিও দেন। কারণ 
তার! নিজেরা নিতামুক্ত এবং পরমভক্ত । তাই মুক্তি এবং 
ভক্তি ছুই-ই দ্রিতে পারেন। মাঝপথে ভক্তি বা মুক্তি তারা 
চুরি করবেন না--তাই বিশ্বাস করে কৃষ্ণ তাদের ওপর দেবার 
ভার দিয়েছেন । 
প্রেমদানের জন্য চারটি উপায় কৃষ্ণ গ্রহণ করেছেন 
প্রেমমাধূর্ঝ, রূপমাধূর্য, লীলামাধূর্য এবং বেণুমাধূর্য । এই চাবটি 
গুণ গোবিন্দের নিজন্ব । গোবিন্দ জীবকে আকর্ষণ করবার 


২৯৪ নবযোগীন্দ্রসংবাদ 


জন্য তার প্রেমমাধুরী, রূপমাধুরী, লীলামাধুরী ও বেণুমাধুরী 
সাজিয়ে রেখেছেন; যেমন গয়না কাপড় পরে অন্যের দৃষ্টি 
আকধণ করা হয়। গোবিন্দ দেখে ভালবাসতে ইচ্ছা কবে 
না, বেদবিধি লঙ্ঘন করে না, এমন ধৈর্যবান কে আছে? 
প্রেমদান কথাটির মানে কি? প্প্রেম মানে কৃষ্ণকে ভালবাসতে 
ইচ্ছা__এরই উপায়ূপে কৃষ্ণ চারটি নিয়েছেন__ প্রেমমাধুধ, 
লীলা-মাধু্ধ, বেণুমাধুর্য ও রূপমাধূর্ষ-_এই চারটি মাধূর্যই সাগরের 
মত। এই বেণুমাধূ সাগরের একটি কণ! যদি শ্রীগুরুবৈষ্ণবকৃপা 
বায়ুর দ্বার তাড়িত হয়ে কানে প্রবেশ করে তাহলে অপ্রকাশ্ঠ 
অস্থর বিনাশ হয়ে যাবে, অপ্রকাশ্য অসুর হল কৃষ্ণবিখুখ জীব । 
তাদের বিনাশ মানে প্রাণে বিনাশ নয়, কৃষ্ণপদে চিত্ত উন্মুখ 
হলেই অপ্রকাশ্য অস্থর বিনাশ হল। প্রাকৃত ভোগস্রখ জল 
থেকে সাধুগুরুবৈষ্ণব সিড়ি দিয়ে উঠে কৃষ্ণপাদপন্ন ভাঙ্গায় 
যদি উঠা যায়, তবে অস্ুর বিনাশ হবে । কৃষ্ণঅবতার সম্বন্ধে 
যত চিন্তা করা যাবে ততই কথা আছে। এ কথা অফুরন্ত । 

অহিংস নীতি প্রচার করেছেন বুদ্ধ। যজ্ঞ করবার যাঁরা 
অধিকারী নয় তাদের প্রতি যজ্ঞ নিষেধ করেছেন। কলির 
শেষে কক্ষি আবিভূত হয়ে বিনাশ করবেন | শ্রীদ্ধাদশে উক্তি 
আছে £ 

যদ] চন্দ্রশ্চ স্ূর্যশ্চ তথ! তিহ্যবৃহস্পতী 

একরাশৌ সমেঘ্ৃত্তি তদা ভবতি তৎ কৃতম্‌ ॥ ভা. ১২২২৪ 
যে সময়ে পুধ্যা নক্ষত্রের সঙ্গে একযোগে চন্দ্র, সয ও বৃহস্পতি 
একরাশিতে সমাগত হবেন তখনই সত্যযুগ আরম্ভ হবে । 


নবযোগীন্দসংবাদ ২৯৫ 


শ্রাদ্বিতীয়েও বলা আছে £ 
যহ্যালয়েষপি সতাং ন হরে: কথাঃ স্ত্রা 
পাবগ্ডিনো দ্বিজজন] বুষল। ন্রদেবাঃ 
স্বাহ। স্বধা! বষড়িতি স্ম গিরো ন যত্র 
শাস্ত। ভবিধতি কলেভগবান্‌ যুগান্তে ॥ 
ভা. ১।৭।৩৮ 
কলিযুগের অন্তে যখন সাধুর আলয়েও হরিকথা থাকবে না, 
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য--এই তিন বর্ণ পাষস্তী হবে, শুদ্র রাজার 
আসনে বসবে, আর স্বাহ! স্বধা! বষট্‌ ইত্যাদি বাক্যের লোপ 
হবে, তখন তিনি কলির শাসনকতা হবেন । 
সপ্তম যোগীন্দ্র শ্রীদ্রমিল অবতারবাদকথা সমাপ্ত করছেন £ 
এবংবিধানি কর্মীণি জন্মানি চ জগৎপতেঃ 
ভুরীণি ভূরিযশসো বণিতানি মহাভুজ ॥ ভা. ১১1৪1২৩ 
এইভাবে জগৎপতি শ্রীগোবিন্দ জন্মাদি লীলা থেকে আরম্ত করে 
বিবিধ লীল। প্রকাশ করে ভাব অতুলন যশোরাশি বিস্তার 
করেছেন । 


অফম প্রন্ম 
মহারাজ নিমির অষ্টম প্রশ্ন__-অভক্তের অর্থাৎ যারা ভগবৎপাঁদ- 
পল্ম ভজনা করে না তাদের গতি কি? 
ভগবস্তং হরিং প্রায়ো ন ভজন্ত্যাতববিত্তম। £ 
তেষামশান্তকামানাং কা নিষ্ঠাবিজিতাত্মনাম্‌ ॥ ভা. ১১৫1১ 

মহারাজ নিমি যোগীন্দ্রকে আত্মবিত্তমা বলে সম্বোধন করেছেন । 
জীবাত্বা ও পরমাত্মাকে যারা বুঝতে পারে তারা আত্মবিৎ। শুধু 
জীবাত্বাকে বুঝা যায় না, যে কোন আলো মিশিয়ে নিতে হবে। 
ব্রহ্ম পরমাত্মা, ভগবান যে কোন তত্ব জানবার জন্তা যে আলে। 
নেওয়া হবে তার দ্বারাই জীবাত্মার জ্ঞান হবে, জীবাত্মীকে 
জানাবার জন্য আর পূথক আলো জ্বালতে হবে না । গীতা গ্রন্থে 
এইজন্যই জীবাত্মার স্বরূপ নিরূপণ কর! হয়েছে । জীবাত্মার 
উপদেশের জন্য বলা হয় নি। পরমাত্মীকে পাবার অধিকারী 
একমাত্র জীবাত্বা, আর চতুবিংশতি তত্ব__-তারা অজা অর্থাৎ 
প্রকৃতির গণ, তাই তারা পরমাত্মার অনুসন্ধান করতে পারবে না। 
পরমাত্মজ্কান যাদের হয়েছে তারা আত্মবিদ্‌; ভগবজজ্ঞানী 
ব্যক্তি হল আত্মবিত্ম। আর কৃঞ্খজ্ঞান যাদের হয়েছে তারা 
আত্মবিত্তর । এখানে ভগবান এবং হরি দুজনকেই বিশেষ্য অথব৷ 
ভগবানকে বিশেষণ এবং হরিকে বিশেষ্য হিসাবে ধর! যায়। 
ভগবান হরিকে যারা ভজে না তাদের ফলশ্রতি